আজকাল প্রায় সব দৈনিক পত্রিকাতেই রাশিফল দেয়া হয়। রাশিফল বলে দেয় মানুষের ভাগ্যে কি আছে। তাছাড়া, মানুষের ভাগ্য নাকি তার জন্মের সময়েই ঠিক হয়ে যায়। জন্মের সময় আকাশে গ্রহনক্ষত্রের অবস্থানই নাকি মানুষের ভাগ্য রচয়িত।

এছাড়া আমরা টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন দেখি হরলিকস খেলে না কি ছেলে মেয়েরা ‘লম্বা-শক্তিশালী-বুদ্ধিমান’ হয়ে যায়। ডেটল সাবান না কি ৯৯% জীবাণু মেরে ফেলে। ফেয়ার-এন্ড-লাভলী (অথবা ফেয়ার-এন্ড-হ্যান্ডসাম) নাকি গায়ের রঙ ফর্সা করতে পারে।

বলা বাহুল্য, উপরের কোনটাই সত্য নয়। পৃথিবীর উপর গ্রহ-নক্ষত্রের কেবল অতি সামান্য মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আছে। এছাড়া অন্য কোন প্রভাব নেই। বাড়ন্ত ছেলে-মেয়েদের দিনে যে পরিমাণ পুষ্টি লাগে, হরলিকস দিয়ে তা পুরণ করা যায় না। পানিতে এক চামুচ হরলিসকস গুলিয়ে খেলে এই পুষ্টি পুরণ হবে না। প্রয়োজন সুষম খাদ্য।হরলিকস দিয়ে এই পুষ্টি পুরণ করতে গেলে মুঠো মুঠো হরলিকস খেতে হবে।
আর আমাদের দেহের অধিকাংশ অনুজীবই উপকারী। তারা ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়াদের বিপক্ষে যুদ্ধ করে। তাই ডেটলের দাবী সত্য হলে সে অধিকাংশ উপকারী ব্যাক্টেরিয়া মেরে ফেলে। তাহলে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে।

ত্বকের রঙ নির্ভর করে মেলানিনের উপর। মেলানিন সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুণী রশ্মি থেকে আমদের বাঁচায়। ফেয়ার-এন্ড-লাভলী ত্বকের মেলানিন কমাতে পারে না। আর যদি কখনো কমায়, তাহলে তা আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের জন্য ক্ষতিকর হবে। কারণ দেখা গেছে, সাদা চামড়ার মানুষ আমাদের বিষুবীয় ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের সূর্যালোকের সংস্পর্শে এলে ত্বকের ক্যান্সার সহ নানা রকমের সমস্যায় ভোগে।

বোঝাই যাচ্ছে, উপরের সকল প্রচারই আসলে আধুনিক কুসংস্কার। এদেরকে বলা হয় অপবিজ্ঞান। সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানের একটি ইতিবাচক প্রভাব আছে। তাই বিজ্ঞানের মুখোশ নিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা অত্যন্ত সহজ। এই ধারণাগুলো বহুল প্রচারিত হলেও এদের পেছনে কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এগুলো প্রচার করা হয় পণ্য বিক্রির উদ্দেশ্যে। অপ্রয়োজনীয় এসব পণ্য বিক্রির মাধ্যমে মুনাফা লোটা হয়।

এই অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে সচেতন হওয়া খুবই জরুরী। নিজেরা সচেতন হওয়ার সাথে সাথে এদের বিরুদ্ধে প্রচারণাও প্রয়োজন সাধারণের মধ্যে। কারণ এই অপবিজ্ঞানগুলোর প্রধান শিকার হয় সাধারণ মানুষ।

পাশাপাশি প্রয়োজন বিজ্ঞানচর্চা। বিজ্ঞান, অপবিজ্ঞানের চাইতে অনেক মজার। অনেক আকর্ষণীয়। প্রকৃতি, মহাকাশ, মহাবিশ্ব, মানুষের সমাজ নিয়ে জানার মতো অনেক আগ্রহোদ্দীপক বিষয় আছে। আমরা যদি এসব জানি এবং তা ছড়িয়ে দেই, তাহলে মানুষ বিজ্ঞানমনষ্ক হবে। বিজ্ঞান মনষ্ক মানে এই নয় যে সবাই বিজ্ঞানী হয়ে উঠবে। বিজ্ঞান মনষ্ক মানে বিজ্ঞানীদের মতো চিন্তা করা, তাদের মতো খুটিয়ে দেখা, জানা।

বিজ্ঞানের গল্প মানুষকে যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে শেখায়। তখন সে নিজেই সচেতন হয়ে উঠে তার চারপাশ নিয়ে – বুঝে নেয় কোনটি ঠিক আর কোনটি ভুল। তাই বিজ্ঞান চর্চাই অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে সবচাইতে ভালো প্রতিষেধক।

মহাবিশ্বে অবাক হয়ে প্রশ্ন করার মতো অনেক কিছু আছে।
– আফ্রিকাতে একধরনের মাছ আছে যারা কি না অন্ধ। তারা চারপাশে এক ধরনের বিদ্যুৎক্ষেত্র তৈরি করে। এই ক্ষেত্রে সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা শিকারকে খুঁজে নেয়। এই ক্ষেত্র ব্যবহার করে তারা একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করে।
– কবুতরেরা চৌম্বকক্ষেত্রের সামস্যতম পরিবর্তন বুঝতে পারে। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের যে ক্ষমতা, তার এক সহস্রাংশের পরিবর্তন তারা অনুভব করতে সক্ষম। চারপাশের বস্তু, পথ চিনতে তারা এই ক্ষমতা ব্যবহার করে।
– গ্যালাক্সীগুলোর কেন্দ্রে কোয়াসার অচিন্তনীয় বিষ্ফোরণ সৃষ্টি করে। এ বিষ্ফোরণ চার পাশের অনেক গ্রহকেই ধ্বংস করে দেয়।
– পূর্ব আফ্রিকায় আগ্নেয়গিরির ঠান্ডা হয়ে যাওয়া লাভায় মানুষের পূর্বপুরুষের পদচিহ্ন পাওয়া গেছে। এর বয়স প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ বছর। বোঝা যায়, মানুষের ইতিহাস কতো পুরনো।
– আমাদের দেহের প্রতিটি কোষে ডজনখানেক মাইটোকন্ড্রিয়া আছে। মাইটোকন্ড্রিয়া কোষের ‘পাওয়ার হাউজ’ – কোষের শক্তিকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। সাম্প্রতিক প্রমাণ বলছে যে শত কোটি বছর আগে এই মাইটোকন্ড্রিয়া স্বাধীন অনুজীব ছিলো। পরে এরা আরো বড় কোষের মধ্যে ঢুকে পড়ে। বড় কোষ মাইটোকন্ড্রিয়াকে পুষ্টি দেয়, আর মাইটোকন্ড্রিয়া দেয় শক্তি। তার মানে, ব্যাপক অর্থে আমরা একক কোন জীব নই। ভিন্ন ভিন্ন রকমের প্রায় এক হাজার কোটি একক জীবের সমন্বয় আমরা – একটি জৈব যন্ত্র।

বিজ্ঞান চর্চার এবং অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে প্রচারণা বিজ্ঞান নির্ভর নতুন দেশ গড়ে তুলবে।

তথ্যসূত্র Broca’s Brain by Carl Sagan

বরিশাল শাখার পত্রিকা ধ্রুবআলোর জন্য তৈরি।

লিখেছেন আরাফাত রহমান

অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি শিক্ষার্থী। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।

আরাফাত রহমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 67 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

    • শুভ রহমান Reply

      ধন্যবাদ, ইমতিয়াজভাই।

  1. মাসুম বিল্লাহ Reply

    অপবিজ্ঞান আসলে অসচেনতারই বহিঃপ্রকাশ

  2. hotalamin Reply

    একটি মজার অপবিজ্ঞান হল বারমুডা ট্রাইঙ্গেল। অনেক রহস্য আর অনেক কাহিনী লিখে এটিকে যেন বিজ্ঞানের একটি বিস্ময় বানিয়ে ফেলা হয়েছে।
    আমাদের বাঙালীদের মনে কুসংস্কার আর বিজ্ঞানের মধ্যে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এর একটি হল বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর হয়। আমাদের মানুষের এমকি কিছু কিছু ডাক্তারের মধ্যেও এই ধারনা আছে যা অবাক করার মত।

    আপনার লেখার জন্য ধন্যবাদ। অপবিজ্ঞান দূর করা যাবে বিজ্ঞান চর্চা বৃদ্ধির মাধ্যমে।

    • শুভ রহমান Reply

      হ্যাঁ, মানুষের মাঝে যে কত উল্টা পাল্টা ধারণা।
      বারমুডা ট্রায়াঙ্গল বিষয়ক ‘বিশ্ময়ের’ পেছনে সেবার একটা বইয়ের অবদান মনে হয় সবচাইতে বেশি। মিথ্যাও ছড়ালো, একটা ব্যবসাও হলো আর কি। বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বর হতে পারে যদি কারো এলার্জি থাকে। এখন সবার তো সব বিষয়ে এলার্জি থাকে না। অনেকের তো চিংড়িতে এলার্জি আছে। তাই বলে কি সবাই এখন চিংড়ি খাওয়া বন্ধ করে দেব?

      বিজ্ঞানকর্মীরাদের কাজ তাহলে কি?

  3. K M Hassan Reply

    অপবিজ্ঞানের সবচে বড় মিত্র হলো এই সব বিষয়ে আমাদের অতি সহজ বিশ্বাসপ্রবণতা..
    আর এই বিশ্বাসপ্রবণতার কিছু বায়োলজীক্যাল ব্যাখ্যাও আছে।
    আইজ্যাক আসিমভে একটা মন্তব্য আছে ..
    “The saddest aspect of life right now is that science gathers knowledge faster than society gathers wisdom.”

    • শুভ রহমান Reply

      “The saddest aspect of life right now is that science gathers knowledge faster than society gathers wisdom.”

      আসলেই …। ধন্যবাদ আপনাকে।

  4. Subhendu Chaudhuri Reply

    Arafat Bhai, in appreciation of your effort I wish to quote a few lines of Robert Frost,

    “The woods are lovely, dark and deep,
    But I have promises to keep,
    And miles to go before I sleep,
    And miles to go before I sleep.”

    Just keep it up.

আপনার মতামত