[ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের গবেষক ড. আনোয়ার হোসেনের এ সাক্ষাৎকারটি নেযা হয়েছিলো ক্যান্সার জিন সনাক্তকরণ সম্পর্কিত একটি গবেষণা কাজ নিয়ে। গবেষণাপত্রের লিঙ্ক: PubMed]

আপনাদের কাজটি একটু ব্যাখ্যা করে বলবেন কী?
আমাদের কাজটি ছিল ক্যান্সারের ওপর। আমরা একটা নতুন জিন প্রস্তাব করেছি, যে জিনটা কি না ক্যান্সারের জন্য দায়ী হতে পারে। এ ধরনের জিন আগে দেখা যায়নি। মানুষের ডিএনএতে কিছু কিছু জায়গায় এমন সব জিন থাকতে পারে, যা কি না ক্যান্সার তৈরি করে। মেজ পরিবারে এ রকম অনেক জিন দেখা যায়। সাধারণত মানুষের তিন আর পনেরো নম্বর ক্রোমোজমে এ জিনগুলো থাকে। তবে আমাদের প্রস্তাবিত জিনটি পাঁচ নম্বর ক্রোমোজমে আছে।

প্রস্তাবিত এ জিনটি নিয়ে পরে কী ধরনের গবেষণা করা দরকার?

বিশ্লেষণ করে মনে হচ্ছে, এ জিনটি টিউমার টিস্যুর সঙ্গে জড়িত। এ জন্য আমরা বায়োইনফরমেটিকস ব্যবহার করছি। সত্যি সত্যিই জীবকোষে এ জিনটির কারণে ক্যান্সার হয় কি না তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। তা হয়তো এখানেই বা বাইরে অন্য কোনো গবেষক পরীক্ষা করে দেখবেন।

 

MAH

 


সহজ করে বললে বায়োইনফরমেটিকস আসলে কী?

আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি যাকে বলা হয় উত্তর জিনোম সিকোয়েন্সিং যুগ। এখন জীবকোষকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আর এ জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে বায়োইনফরমেটিকস। বিজ্ঞানের খুব আধুনিক একটি বিভাগ হলো বায়োইনফরমেটিকস। বায়োইনফরমেটিকস বিজ্ঞানীদের কাজকে অনেক কমিয়ে দেয়। আগে পেনিসিলিন নিয়ে কাজ করার সময় একটা সামান্য পরিবর্তন আনার জন্য যেখানে ২০ বছর লাগত, বায়োইনফরমেটিকস সেখানে কাজটিকে হয়তো দুই বছরে নিয়ে আসে।

বাংলাদেশে বায়োইনফরমেটিকস নিয়ে কী ধরনের কাজ হচ্ছে?
বাংলাদেশে বায়োইনফরমেটিকস বলা যায় তার শৈশব পার করছে। বাংলাদেশে এখন কয়েকজন বিজ্ঞানী তৈরি হয়েছেন, যাঁরা বায়োইনফরমেটিকস নিয়ে খুব ভালো কাজ জানেন। যেমন_ড. জেসমিন, রুহুল আমিন তালুকদারসহ কয়েকজন। ইতিমধ্যে বায়োইনফরমেটিকস নিয়ে কাজ করার জন্য একটি সোসাইটিও তৈরি করা হয়েছে।

আপনার এ কাজটি নিয়ে কিছু বলুন?
বাইরে থেকে দেশে আসার পর দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগে বায়োইনফরমেটিকস গবেষণাগার নেই। তখন আমার লক্ষ্য ছিল এখানে বায়োইনফরমেটিকসের কাজ শুরু করতে হবে। পাশাপাশি নতুন গবেষকদের বিজ্ঞানের এ বিভাগে কাজ করার জন্য দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। ২০০৬ সাল থেকে অণুজীববিজ্ঞান বিভাগে বায়োইনফরমেটিকস নিয়ে কাজ শুরু হয়। আর বর্তমান গবেষণাটা শুরু হয় ২০০৭ সালে, যা ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়। এখন আমাদের বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী তৈরি হয়েছেন এবং হচ্ছেন, যাঁরা বায়োইনফরমেটিকস নিয়ে কাজ করার যোগ্যতা রাখেন।

এখন কী নিয়ে কাজ করছেন?

তিনটি কাজ চলছে। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু এবং অ্যান্টিবায়োটিক দূষণ; গরুর খুরাপচা রোগের ভাইরাস আর খাবারসংশ্লিষ্ট জীবাণু নিয়ে। এর মধ্যে গরুর খুরাপচা রোগের ভাইরাসের এপিটোপ ডিজাইন করে ভ্যাকসিন তৈরি করা যায় কি না দেখা হচ্ছে। এটাতেও বায়োইনফরমেটিকসের ব্যবহার আছে।

সামনে কী নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা?
বাংলাদেশের কোনো মৌলিক সমস্যা সামনে রেখে কাজ করতে চাই। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে জীবাণুরা প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। ফলে অ্যান্টিবায়োটিকগুলো আগের মতো কাজ করছে না। আগামী ১০ বছরে হয়তো দেখা যাবে এ দেশে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই আর কাজ করছে না। আমরা এমন একটি সালমনেলার জীবাণু পেয়েছি, যা ১০ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী! বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের প্রকৃত চিত্র এখনো জানা যায়নি। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর পাশাপাশি আছে অ্যান্টিবায়োটিক দূষণ। অ্যান্টিবায়োটিকগুলো পরিবেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে, পরিবেশ থেকে মানুষের খাদ্যে, সেখান থেকে আবার মানবদেহে। সেখানে হয়তো এটি কোনো কাজ করছে না, কিন্তু ব্যাকটেরিয়া তাকে চিনে ফেলে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু এবং দূষণের প্রকৃত পরিস্থিতি আসলে কি, তা নিয়ে কাজ করতে চাই।

এই যে অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি – এর জন্য দায়ী কে?
মূলত দায়ী আমাদের অজ্ঞতা ও ভুল ব্যবহার। ডাক্তার এবং রোগী উভয় পক্ষেরই এতে ভূমিকা আছে। অনেক সময় ভাইরাসজনিত ইনফেকশনেও অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। অথচ অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসের কোনো ক্ষতি করতে পারে না অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার জন্য। এ ছাড়া সরকারি কোনো রেগুলেটরি আইনকানুন নেই। রেজিস্টার্ড ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক কেনা যাবে না। আর রোগীকেও ওষুধের ডোজ পূর্ণ করতে হবে।

বাংলাদেশে গবেষণার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো কী কী?
প্রথম সমস্যা ফান্ডিং। গবেষণার জন্য অনেক টাকা লাগে, যা সহজলভ্য নয়। তা ছাড়া উপযুক্ত পরিবেশও নেই। ভালো কাজের জন্য এমন একটি পরিবেশ দরকার, যা গবেষকদের উদ্দীপ্ত করবে। আর ভালো কাজের স্বীকৃতিটাও দরকার।
১৯৯১-এর গণতান্ত্রিক সরকারের সময় থেকে ধীরে ধীরে বাংলাদেশে গবেষণা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। বর্তমান সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার পরিবেশ ফিরে আসে। পাটের জিনোমের মতো গবেষণার ক্ষেত্রে সরকার যে ত্বরিত পদক্ষেপ নিয়েছে, তা আসলেই প্রশংসার যোগ্য। আমরা এক বছরেই হয়তো উন্নত বিশ্বের মতো গবেষণার জায়গায় যেতে পারব না, তবে চেষ্টা করতে হবে। আরো একটা বড় সমস্যা হলো, গবেষণার রাসায়নিক উপকরণ কেনার পদ্ধতি। রি-এজেন্ট কিনতে গিয়ে গবেষকদের যে দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাতে দেখা যায়, অনেক রাসায়নিক দ্রব্যই নষ্ট হয়ে গেছে অথবা এদের কার্যক্ষমতা কমে গেছে। গবেষণার উপকরণের ওপর ট্যাঙ্ ও ভ্যাট কমানো যেতে পারে।

বাংলাদেশে গবেষণার ভবিষ্যৎ কেমন?

এ দেশে দক্ষ জনশক্তি আছে। গবেষণাগার, কাজের পরিবেশ আর সরকারি মঞ্জুরি এবং অর্থ পেলে এখানে আন্তর্জাতিকমানের গবেষণা করা সম্ভব। বাইরে থেকে বড় বড় গবেষক দেশে ফেরত আসতে চান। এখানে সার্বিক পরিপ্রেক্ষিতের উন্নতি হলে অনেক কাজ করা সম্ভব।

নবীন গবেষকদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
গবেষণার তো আসলে কোনো বিকল্প নেই। গবেষণা মানে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি। নবীন গবেষকদের এ জন্য শুধু নিত্যনতুন প্রযুক্তি জানতে হবে তা নয়, চিন্তা-চেতনা, কর্মদক্ষতাকেও আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে হবে। বিশ্বে প্রতিদিনই পরিবর্তন হচ্ছে। আমাদের তা বোঝার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছে আরাফাত ও আনোয়ার

কালের কন্ঠ সন্ধানীতে প্রকাশিত। ৫ জুলাই ২০১১।

লিখেছেন আরাফাত রহমান

অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি শিক্ষার্থী। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।

আরাফাত রহমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 67 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

আপনার মতামত