“তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা
মন জানো না –
তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা?”

উঁকুন, কৃমি ছাড়াও মানবদেহে স্হায়ীভাবে বসবাস করে অজস্র অণুজীব। আমরা দেহকে একটি ঘন অরণ্যের সাথে তুলনা করতে পারি। এই অরণ্য ব্যাক্টেরিয়াতে কিলবিল করছে। মনস্তাত্ত্বিক কারণে মানুষ সাধারণত সংখ্যা বা পরিসংখ্যান পছন্দ করে না। তাই আমি বলবো না মানবদেহে দশ ট্রিলিয়নের মতো ব্যাক্টেরিয়া থাকতে পারে। তবে একটা তুলনা করা যেতে পারে। দেহে মোট কোষের তুলনায় ক্ষুদে ব্যাক্টেরিয়াদের সংখ্যা দশগুণ – চিন্তা করা যায়! অবশ্য এটা ঠিক যে আমাদের দেহকোষ একটি ব্যাক্টেরিয়ার চাইতে আকারে দশগুণের মতো বড়ো হয়। তাহলে কি প্রতিটি কোষের ভেতরে দশটি ব্যক্টেরিয়া থাকে? না। এরকমটা হলে আমরা আর বাঁচতে পারতাম না। আমাদের দেহঘরের বেশীরভাগ প্রত্যঙ্গই জীবাণুমুক্ত। দেহের বহির্ভাগেই অধিকাংশ ব্যাক্টেরিয়া বসবাস করে। লালনের গানের একটা কলি আছে “… আট কুঠুরী নয় দরজা আঁটা/ মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা …”। সেই নয় দরজা, মানে দেহে যেখানে উন্মুক্ত হয়েছে সেখানেও অণুজীবের সাবলীল বসবাস।

“আকাশ ভরা, সূর্য-তারা
বিশ্ব ভরা প্রাণ
তাহারই মাঝখানে, আমি পেয়েছি
আমি পেয়েছি মোর স্থান – বিস্ময়ের।”

শিশু কিংবা জ্যোতির্বিদদের মতো আকাশের অজস্র গোলাকার তারা দেখে আমরা বিস্মিত হই। অথচ আকাশে দৃশ্যমান তারাদের চাইতে বহুগুণ বেশি প্রাণ ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদের দেহের ভেতর-বাহিরে। এজন্য অবশ্য আতঙ্কিত হয়ে জীবানুনাশক সাবান গায়ে মাখার দরকার নেই। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া বেশীরভাগই কিন্তু ততটা খারাপ নয়। সাধারণত এই ব্যাক্টেরিয়ারা নিরীহ। ত্বকের মৃত কোষ, ঘাম ও অন্যান্য নিঃসৃত রাসায়নিক খেয়ে ওরা বেঁচে থাকে। সম্ভবত আমাদের দেহই এদেরকে পুষে থাকে। ত্বকের উপর খাওয়াদাওয়া করে জায়গাটাকে ওরা “দখলে” রাখে। এই “দখলদারী” কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এরা ত্বক দখলে রাখে বলেই ক্ষতিকর জীবাণুরা ত্বকের উপর উপনিবেশ গড়ে তুলতে পারে না। শরীর-দূর্গের বাইরে পরিখার মতো কাজ করে এই বন্ধুরা। আমাদের পেটের নাড়ি-ভূড়ি-অন্ত্রে যেসব ব্যাক্টেরিয়াদের বসবাস, তাদের ভূমিকাও একই রকম। মূল কাজ জায়গা দখলে রাখা। কেউ কেউ আমাদেরকে ভিটামিনও দিয়ে থাকে। আমরা যা খাই, তার খুব সামান্য অংশ এরা চুরি করে।


পায়ের পাতার আরেক জগত

ঘন অরণ্যের সাথে দেহবাসী অণূজীবদের তুলনাটা যদি যুতসই মনে হচ্ছে না? সেক্ষেত্রে পায়ে পাতাকে আমরা দেহের ক্রান্তীয় বাদল বনের (রেইন ফরেস্ট) সাথে তুলনা করতে পারি। পায়ের পাতায় প্রতিটা ইঞ্চিতে আছে দশ হাজারের মতো ঘামগ্রন্থি। বাদল বনের মতো এই জায়গাটা ছত্রাক দিয়ে ভরা। একটা বিশেষ জাতের ছত্রাক (ট্রাইকোফাইটন রাবরাম) এখানে আধিপত্য বিস্তার করে থাকে। এদের বাগান (ভিন্নার্থে জঙ্গল) আমাদের পায়ে বেড়ে উঠে। সাধারণত এরা আমাদের ক্ষতিও করে না, উপকারও করে না। তবে বেশী বেড়ে গেলে আবার “এথলেটস ফুট” নামের একটা রোগ তৈরি করতে পারে এরা।

ছত্রাক ছাড়া অন্য অণূজীবরাও পায়ের পাতাকে ভালোবাসে। আমরা আগে প্রোটিন তৈরির ইট, অ্যামিনো এসিডের কথা জেনেছি। দেহ থেকে ঘামের সাথে বের হওয়া এই এসিড খেয়ৈ বেঁচে থাকে চামড়ার স্ট্যাফ. (স্ট্যাফাইলোকক্কাস এপিডার্মিস) নামের ব্যাক্টেরিয়া। সারাদিন বাইরে থেকে বাসায় এসে পা না ধুলে যে গন্ধটা অন্যদের বিরক্তি তৈরি করে তার জন্য দায়ী এরা। কারো কারো পায়ে উৎকট দুর্গন্ধ তৈরি হলে বুঝতে হবে চামড়ার স্ট্যাফ ছাড়াও ব্যাসিলাস সাবটিলিস নামের ব্যাক্টেরিয়া মহাসমারোহে খাওয়া-দাওয়া-বংশবিস্তার করছে।


জ্বরঠোঁসা কিংবা-ইঁদুর বেড়াল খেলা

আপনার আগে যদি কখনো চিকেন-পক্স হয়ে থাকে তাহলে নিশ্চিন্তে থাকুন। এই রোগটা আর কখনোই আপনার হবে না। কেন? কারণ বিবর্তনের মাধ্যমে মানবদেহ একটি চতুর রোগ-প্রতিরক্ষা-পদ্ধতি (অনাক্রম্যতা/ ইমিউনিটি) গড়ে তুলেছে। এর ফলে সে কোন রোগে আক্রান্ত হলে দায়ী ব্যাক্টেরিয়া বা ভাইরাসটাকে চিনে রাখে। সুস্থ হওয়ার পরে আবার দেহের মাঝে সেই একই ব্যক্টেরিয়া/ভাইরাসটাকে দেখতে পেলে কোন সুযোগ না দিয়েই নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। তাই সাধারণত দ্বিতীয়বার একই কারণে রোগ হয় না – যদি না ব্যাক্টেরিয়া বা ভাইরাসটা বিবর্তনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে যায়।

চিকেন পক্স হয় ভাইরাসের জন্য। চিকেন পক্স বহু বছর আগে সেরে গেলেও এর ভাইরাসটা কিন্তু আপনার দেহের মাঝে ঘুমিয়ে আছে সন্তর্পনে। আপনি দূর্বল হলেই সে জেগে উঠবে সন্তর্পনে। তারপর তৈরি করবে জ্বর ঠোসা। কিছুদিন একটু ভুগিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়বে আপনার দেহের ভেতরে।

আরো একটা মজার প্রসঙ্গে যাই। টক্সোপ্লাজমা গন্ডী বলে বিচিত্র এক পরজীবি আছ। এদের মূল পোষক হলো বেড়াল। একমাত্র বেড়ালের দেহের মধ্যেই এরা বংশবৃদ্ধি করে। তাই সে এমন বাহক খুঁজে বেড়ায় যাকে কিনা বেড়াল খেতে পারে। যেমন ধরা যাক ইদুর। সাধারণত ইদুর বেড়ালের মূত্র এড়িয়ে চলে। কিন্তু টক্সোপ্লাজমা আক্রান্ত ইদুর বেড়ালের মূত্রের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ অনুভব করে। ফলাফল একটাই – বিড়ালের সহজ শিকারে পরিণত হওয়া। ইদুরের সাথে সাথে টক্সোপ্লাজমাও বেড়লের দেহের ভিতরে গিয়ে বংশবৃদ্ধি করে, ছড়িয়ে দেয় নিজেকে।

খারাপ খবর এই যে, টক্সোপ্লাজমা মানুষের মাথাতেও বাসা বাঁধতে পারে। সেখানে সে সাধারণত ঘুমিয়েই থাকে। কিন্তু ঘুম শেষে জেগে উঠলে সে কিছু রাসায়নিক ক্ষরণ করে। এই রাসায়নিকগুলো মানুষের আচরণের উপর প্রভাব ফেলে। সে উত্তেজনা-প্রবণ হয়ে যায়, কম সময়ের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।

এখন মানুষ উত্তেজিত হলে টক্সোপ্লাজমার লাভ কি? বিড়াল তো আর মানুষকে খায় না। কিন্তু না – হাজার হাজার বছর আগে একটা সময় ছিলো যখন মানুষ বন্য অবস্থায় বিপদসংকুল অরণ্যে শিকার করতো। চিন্তা করুন টক্সোপ্লাজমা আক্রান্ত এক আদি-মানবের কথা। তার বন্ধুরা যখন বাঘের তাড়া খেয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, টক্সোপ্লাজমার রাসায়নিকের প্রভাবে সে উল্টো তেড়ে যাচ্ছে বাঘের দিকে। ফলাফল একটাই – বাঘের পেটে মৃত্যু। আর বেড়াল তো বাঘের মাসী – ওরা একই গোত্রের প্রাণী।

ব্যাক্টেরিয়ারা যে কতভাবে আমাদেরকে প্রভাবিত করতে পারে – তা এক অদ্ভূত বিষয়!

আমরা যাদের নাম জানিনা
নবম-দশম শ্রেণীতে জীববিজ্ঞান পড়ার সময় বিভিন্ন প্রাণীদের বৈজ্ঞানিক নামকরণ শিখতে হতো। নামকরণ হতো ল্যাটিন ভাষায়। তাই বিষয়টা অনেক কাঠখোট্টা লাগতো। তখন ভাবতাম, বাংলাদেশের কোন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সবার অগোচরে থাকা কোন জীব আবিষ্কার করবো। তারপর সহজ কোন বৈজ্ঞানিক নাম দেব। অবশ্য সবার অগোচরে থাকা অপরিচিত কোন জীব আবিষ্কার করতে হলে এখন পাপুয়া নিউগিনির গহীন বনে যাওয়ার দরকার নেই। কেবল পায়ের পাতাটা হাত দিয়ে স্পর্শ করলেই হবে। সেখানে অন্তত কয়েকটা প্রজাতীর অণুজীব পাওয়া যাবে যাদের এখন পর্যন্ত আবিষ্কার করা হয় নি।

ব্যাক্টেরিয়া নিয়ে গবেষণা করতে হলে বিজ্ঞানীরা বিশেষ ক্ষেতে (পেট্রিডিশ) ব্যাক্টেরিয়াটাকে চাষাবাদ (কালচার) করেন। দূর্ভাগ্যজনক যে মাত্র ২-৫ শতাংশ ব্যাক্টেরিয়াকে এভাবে চাষ করা যায়। বাকি ন্যূনতম ৯৫ ভাগ অণুজীব আমাদের চারপাশেই আছে – কিন্তু আমরা তাদের চিনি না। চাষ করতে না পারলেও অবশ্য তাদের ডিএনএ বিশ্লেষণ করা সম্ভব। সেই ডিএনএ আমাদের পরিচিত ব্যক্টেরিয়ার ডিএনএ-র সাথে মেলে না।

লিখেছেন আরাফাত রহমান

অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি শিক্ষার্থী। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।

আরাফাত রহমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 67 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

আপনার মতামত