এই সিরিজের অন্যান্য পোষ্টগুলো  ( , , )

 

মূল : মিশিও কাকু

শুদ্ধ বায়ুশূন্য স্থানে প্রতিপরমাণুরা চিরস্থায়ী , কিন্তু ঐ স্থানে যদি অল্প কিছু পরিমানও বায়ু থেকে থাকে তাহলে পরমাণু  ও প্রতিপরমাণু এর মধ্যে সংঘর্ষ হবে এবং প্রতিপরমাণু  গুলো ধ্বংস (Annihilate)হয়ে শক্তিতে রূপান্তর হবে ।

১৯৯৫ সালে CERN  ৯টি প্রতিহাইড্রোজেন পরমাণু বানানোর ঘোষণা দিয়ে ইতিহাস রচনা করে । ফার্মিল্যাব এর বিজ্ঞানীরাও বসে ছিলেন না , তাঁরা ১০০টি প্রতিহাইড্রোজেন পরমাণু বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল । একমাত্র উৎপাদনের ব্যয় ব্যতিত এমন কোন বাধা নাই যা বিজ্ঞানীদের প্রতিপরমাণু  উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে । অল্প কিছু আউন্স (১ আউন্স = ১/১৬ পাউন্ড ) প্রতিপরমাণু  উৎপাদনে একটি জাতি পর্যন্ত দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে । বর্তমানে  প্রতি বছর এক গ্রামের দশ বিলিয়ন থেকে এক বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ প্রতিপরমাণু  উৎপাদন করা হয় । যা ২০২০ সালের মধ্যে ৩ গুন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে । প্রতিপরমাণুর অর্থনীতি খুবই খারাপ । ২০০৪ সালে CERN এক গ্রামের কয়েক ট্রিলিয়ন ভাগের এক ভাগ প্রতিপরমাণু  উৎপাদন করতে খরচ করেছে ২০ মিলিয়ন ডলার । বর্তমানে এক গ্রাম প্রতিপরমাণু উৎপাদন করতে গেলে খরচ হবে ১০০ Quadrillion ডলার এবং প্রতিপরমাণু ফ্যাক্টরীকে টানা ১০০ বিলিয়ন বছর সচল থাকতে হবে , আর এই জন্যই প্রতিপরমাণু পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু ।

“এই পর্যন্ত CERN যে পরিমান প্রতিপরমাণু উৎপাদন করেছে তা যদি আমরা পরমাণুর সাথে ধ্বংস করি ” ( তাহলে কি করা যাবে মনে হয়? ) তা CERN এর একটি বিবৃতি হতে পরিস্কার হতে পারি “আমাদের কাছে একটি বাল্ব কে কয়েক মিনিট জ্বেলে রাখার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ শক্তি আছে ।”

প্রতিকণা সংরক্ষণ অনেক বড় একটি সমস্যা কারণ কণার সংস্পর্শে আসলেই বিস্ফোরণ হয় আর তাই একটি সাধারণ পাত্রে প্রতিকণা রাখা আত্মহত্যা ছাড়া আর কিছুই না । যখন প্রতিকণা ঐ পাত্র কে স্পর্শ করবে তখনই বিস্ফোরণ হবে (কারণ পাত্র সাধারণ কণা দিয়ে বানানো) । তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কিভাবে প্রতিকণা কে সংরক্ষণ করবো ? একটা পদ্ধতি হচ্ছে , প্রথমে প্রতিকণা কে গ্যাস-আয়নে ionize  করতে হবে এবং পরে একটি বিশেষ ম্যাগনেটিক বোতল এ সংরক্ষণ করতে হবে , এই বোতল কে বিশেষ ম্যাগনেটিক বোতল বলার কারণ হচ্ছে এই বোতলের মধ্যে ম্যাগনেটিক ফীল্ড আছে আর এই ফীল্ডে প্রতিকণা খূব সাবধানে সংরক্ষণ করা হয় । এই ম্যাগনেটিক ফীল্ড প্রতিকণাকে বোতলের দেওয়াল স্পর্শে বাধা দিবে ।

চিত্র-১: ম্যাগনেটিক বোতল বা Penning Trap ।

একটি প্রতিকণা ইঞ্জিন এর জন্য এমন একটি মজবুত বিক্রিয়া প্রকোষ্ঠ বা Reaction Chamber  বানাতে হবে । যেখানে প্রতিকণার প্রবাহ , সাধারণ কণার সংস্পর্শে এসে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ হবে অর্থাৎ এমন নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ হবে যাতে করে আমরা কোন দুর্ঘটনা ছাড়াই ইঞ্জিন কে সচল করতে পারব । যেমন রকেটে অনেকটা এই ধরনের প্রকোষ্ঠ দেখা যায় । (এই ধরনের ইঞ্জিন দিয়ে যেই রকেট চলবে আমরা সেই রকেট কে প্রতিকণা রকেট বা Antimatter Rocket বলব ) আর এই বিস্ফোরণের ফলে যে আয়ন সৃষ্টি হবে তা প্রতিকণা রকেটের শেষভাগে এমন ভাবে নিক্ষিপ্ত হবে যা রকেট কে সম্মুখ দিকে চালনা করবে । ভবিষ্যতের আকাশ যানের জন্য এমন একটি ইঞ্জিন নকশা হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কারণ প্রতিকণা ইঞ্জিনের কর্মদক্ষতা সম্পর্কে আমাদের কোন সন্দেহ থাকার কথা নয় । টেলিভিশন সিরিজ Star Trek এ আমরা দেখতে পাই তাদের যান-বাহন চলাচলের জন্য যে শক্তির প্রয়োজন তার প্রধান উৎস হচ্ছে প্রতিকণা ; নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে এইসব যানের ইঞ্জিন গুলো চালিত হয় ।

চিত্র-২: প্রতিকণা ইঞ্জিন

An antimatter Rocket

পেনিসিল্ভিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ জেরাল্ড স্মিথ প্রতিকণা রকেটের প্রধান প্রস্তাবকারী । তিনি বিশ্বাস করেন যে ৪ মিলিগ্রাম পজিট্রন (ইলেকট্রনের প্রতিকণা) যথেষ্ট একটি প্রতিকণা  রকেট কে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মঙ্গল গ্রহে নেওয়ার জন্য ।

চিত্র-৩: প্রতিকণা রকেট ।

তিনি উল্লেখ করেন যে সাধারণ রকেটের জ্বালানি হতে প্রতি-কণা  রকেটের জ্বালানি শতকোটি গুন ( Billion Times) বেশি শক্তিশালী । এই ধরনের জ্বালানী তৈরীর প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে Particle Accelerator এর মাধ্যমে প্রতি-প্রোটনের রশ্মি সৃষ্টি করা এবং পরে তা Penning Trap এ সংরক্ষণ করা । স্মিথ যখন Penning Trap টি নির্মাণ করেন , Penning Trap টির ওজন ছিল ২২০ পাউন্ড (যা তরল হাইড্রোজেন ও তরল হিলিয়াম হতে বেশি ) এবং যা কিনা ম্যাগনেটিক ফীল্ডে trillion সংখ্যক  প্রতিপ্রোটন সংরক্ষণ করতে পারে (খুবই নিম্ন তাপমাত্রায় প্রতি-প্রোটনের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য , পাত্র যে পরমাণু দিয়ে গঠিত তার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য হতে অনেক বড় , আর তাই প্রতিপ্রোটন নিজেদের ধ্বংস না করে পাত্রের দেয়ালে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে)। তাঁর বিবৃতি অনুযায়ী এই Penning Trap এ ৫দিন পর্যন্ত প্রতিপ্রোটন রাখা সম্ভব ( সবশেষে তারা সাধারণ পরমাণুর সাথে মিশে ধ্বংস হয় )। তাঁর এই Penning Trap এ এক গ্রামের শতকোটি ভাগের এক ভাগ প্রতিপ্রোটন সংরক্ষণ করা সম্ভব । তাঁর লক্ষ হচ্ছে এমন Penning Trap বানানো যাতে এক মাইক্রো গ্রাম প্রতিপ্রোটন রাখা সম্ভব হবে ।

যদিও প্রতিপরমাণু  পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু , তারপরেও প্রতি বছরেই এর মূল্য নাটকীয়ভাবে কমে আসছে । (বর্তমানে এক গ্রাম প্রতিপরমাণু র মূল্য ৬২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার ) শিকাগোর বাইরে ফার্মিলাবে এমন একটি Particle Injector নির্মাণ করা হয়েছে যার দ্বারা প্রতি বছর ১.৫ হতে ১৫ ন্যানোগ্রাম পর্যন্ত উৎপাদন সম্ভব , যা আগের চেয়ে দশগুণ বেশি যা প্রতিপরমাণু র মূল্য কমানোর পিছনে মূল ভূমিকা পালন করবে ।  নাসার বিজ্ঞানী Herold Gerish বিশ্বাস করেন যে প্রযুক্তির আরো উন্নতির সাথে সাথে প্রতি মিলিগ্রাম প্রতিপরমাণুর মূল্য ৫০০০ ডলারে নামিয়ে আনা সম্ভব । নিউ মেক্সিকোর Synergistics Technologies Dr. Steven Howe বলেন “আমাদের লক্ষ হচ্ছে প্রতিপরমাণু কে বৈজ্ঞানিক কল্প কাহিনি হতে বাস্তবে নিয়ে আসা এবং একে বাণিজ্যিকভাবে পরিবহন ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে যথাযথ ব্যবহার করা” ।

এই পর্যন্ত যত Particle Accelerator নির্মাণ করা হয়েছে , এগুলোর (Particle Accelerator ) দ্বারা শুধু প্রতিপ্রোটন উৎপাদনই না অন্যান্য গবেষণা মুলক  কাজও করা হতো  আর তাই এই Particle Accelerator এ গড়ে প্রতিপ্রোটন উৎপাদন কম হতো । জেরাল্ড স্মিথ বলেন কেন আমরা এমন একটি Particle Accelerator নির্মাণ করছিনা যার কাজই হবে শুধু প্রতিপরমাণু উৎপাদন করা আর তখনই আমরা প্রতিপরমাণুর মূল্য কমিয়ে আনতে পারব ।

আমরা বর্তমান প্রযুক্তির উন্নতির মাধ্যমে অধিক পরিমাণ প্রতিপরমাণু  উৎপাদন করে এর মূল্য কমিয়ে আনতে পারি । স্মিথ মনে করেন এমন একটা সময় আসবে যখন প্রতিপরমাণু  রকেট হবে আমাদের সৌর জগতের মধ্যে বা বাইরে যাবার প্রধান বাহন । আর ততদিন পর্যন্ত প্রতিপরমাণু  রকেটকে আমাদের ছবি আঁকার ক্যানভাসের মধ্যেই  সীমাবদ্ধ রাখতে হবে ।

চলবে……

………………………………………………………………………………………………………………

মিশিও কাকুর Physics of the impossible বইয়ের ১০ম অধ্যায়টি নিজের ভাষায় লিখার চেষ্টা করেছি । এই পোষ্টে কিছু চিত্র সংযোজন করলাম যা মূল বইয়ে ছিল না শুধু পাঠকের বুঝার সুবিধার জন্য ।

 

 

 

 

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত Reply

    আমাদের শক্তি সমস্যার চমৎকার সমাধান প্রতিপদার্থ। অন্তত তাত্বিক ভাবে। সেখানে সমস্যা হলো প্রযুক্তিগত। আমরা প্রযুক্তিকে এখনো যথেষ্ট উপরে নিয়ে যেতে পারি নি। আমি আশা করি এই খরচ বৃথা যাবে না। হয়তো পঞ্চাশ/একশ বছর পর মানুষ এর সুফল পাবে।

  2. অজানার সন্ধানে Reply

    আরাফাত@..ধন্যবাদ

    আপনার সাথে আমিও একমত । এক সময় প্রতিকণার কথা কেউ কল্পনাও করেনি । কিন্তু তাত্ত্বিক ভাবে বের করার পরই কিন্তু প্রতিকণা বাস্তবের মূখ দেখেছে । আর আশার কথা হল বিজ্ঞানীরা মনে করেন মহাশূন্যে প্রাকৃতিকভাবে প্রতিকণা আছে । Big Bang এর সময় সব প্রতিকণা ধ্বংস হয়নি……

  3. methun Reply

    এটা একটা অসাধারন ওয়েবসাইট। আমার অনেক দিনের পুরোনো আশা আজ পূর্ন হল এখন আমি ঘরে বসেই সব মজার মজার বিজ্ঞান শিখতে পারব। কি যে মজা!!!! উফ আজ আনন্দে লাফাতে ইচ্ছে করছে!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!!

আপনার মতামত