এই সিরিজের অন্যান্য পোষ্টগুলো ( , , )

 

মূল : মিশিও কাকু

Naturally Occurring Antimatter

আমাদের বর্তমান প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিপরমাণু তৈরি করা একটি ব্যয়বহূল কাজ । যদি এমন হত পৃথিবীর বাইরে অর্থাৎ মহাশূণ্যে খূব সহজেই প্রতিপরমাণু পাওয়া যেত ? অনুসন্ধানকারী দল জানিয়েছেন যে ব্যাপারটা দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য পৃথিবীর বাইরে প্রতিপরমাণুর পরিমাণ (পরমাণুর তুলনায়) খুবই নগণ্য , যা পদার্থবিদদের একটু অবাকই করেছে । আমাদের এই বিশ্বজগতে প্রতিপরমাণু হতে পরমাণুর পরিমাণ বেশি যা ব্যাখ্যা করা একটু কঠিন। বিজ্ঞানীরা মনে করেন বিশ্বজগতের সৃষ্টির শুরুতে পরমাণু এবং প্রতিপরমাণুর পরিমাণ ছিল সমান । আর এখন প্রতিপরমাণুর পরিমাণ কেন কম তা বিজ্ঞানীদের কাছে একটি ধাঁধা । সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধানটি প্রস্তাব করেছিলেন বিজ্ঞানী Andrei Sakharov , যে ১৯৫০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য Hydrogen bomb এর নকশা করেছিলেন । Sakharov এর  মতবাদটি হচ্ছে বিশ্বজগত সৃষ্টির শুরুতে অর্থাৎ Big Bang এর সময় পরমাণু এবং প্রতিপরমাণুর পরিমাণ সমান ছিল না । এই সমতা অমান্য করাকে বলা হয় CP-Violation

বর্তমানে এটি (সমতা অমান্য) একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার মূলকেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছে । Sakharov এর তত্ত্ব অনুযায়ী এই মহাবিশ্বে বর্তমানে যতো পরমাণু আছে সবই Left over (বাম-হাতি নিয়ম মেনে চলে), কারণ বস্তু এবং প্রতিবস্তুর মধ্যে ধ্বংসের মাধ্যমে প্রতিবস্তুর বিলুপ্তি হয় ; Big Bang-ই হচ্ছে এই দুইয়ের (বস্তু এবং প্রতিবস্তুর) মধ্যে মহাজাগতিক প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্তির কারণ (অর্থাৎ অল্প কিছু বস্তু অবশিষ্ট ছিল তাই ‘প্রায়’ শব্দটি ব্যবহার করলাম )। আমরা আজ যে মহাবিশ্ব দেখতে পাই তা অল্প কিছু পরিমাণ অবশিষ্ট বস্তু হতে সৃষ্ট । আমাদের শরীরে যে পরমাণু আছে তা সবই Left over , যা বস্তু ও প্রতিবস্তুর মধ্যে মহাবিস্ফোরণের পরে অবশিষ্টাংশ হতে সৃষ্ট । এই তত্ত্ব এমন একটি সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে যে প্রকৃতিতে অল্প কিছু পরিমাণ প্রতিবস্তুর থাকার সম্ভাবনা রয়েছে । আমরা যদি এর উৎস খুজে পাই তাহলে প্রতিবস্তু ইঞ্জিনে ব্যবহারের জন্য প্রতিবস্তুর উৎপাদন খরচ কমে যাবে । প্রাকৃতিকভাবে গচ্ছিত এই প্রতিবস্তু সনাক্ত করা আমাদের জন্য খুব একটা কঠিন কাজ হবার কথা না । যখন ইলেকট্রন এবং প্রতিইলেকট্রন পরস্পর সংস্পর্শে আসে তখন এরা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গামা রশ্মি উৎপন্ন করে যার শক্তি হচ্ছে ১.০২ মিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট বা তারও বেশি । মহাবিশ্বের গামা রশ্মির শক্তি বিশ্লেষণ করলেই প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত প্রতিবস্তু বের করা সম্ভব হবে । Northwestern University এর Dr. William Purcell মিল্কওয়ে গ্যালাক্সিতে প্রতিবস্তুর ঝর্না খুজে পেয়েছেন বলে দাবি করেন, যা গ্যালাক্সির কেন্দ্র হতে খুব একটা দূরে না । মনে করা হচ্ছে যে প্রতিবস্তুর এই ঝর্না সাধারণ হাইড্রোজেন গ্যাসের সংস্পর্শে এসে ১.০২ মিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট গামা রশ্মির সৃষ্টি করছে । আর এই দাবি যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে মহাবিশ্বে প্রাকৃতিকভাবে এমন আরো অনেক প্রতিবস্তুর থলি ( Packet) পাওয়া যাবে যা Big Bang এর সময় ধ্বংস হয়ে যায়নি ।

প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট প্রতিবস্তু খুজে বের করার জন্য ২০০৬ সালে রাশিয়া , ইতালি , জার্মানি এবং সুইডেনের সম্মেলিত উদ্যোগে PAMELA (Payload for Antimatter-Matter Exploration and Light-Nuclei Astrophysics ) নামক একটি কৃত্রিম উপগ্রহ মহাশূন্যে স্থাপন করা হয় যার কাজই হচ্ছে প্রতিবস্তুর থলি অনুসন্ধান করা । প্রতিবস্তু অনুসন্ধানের পূর্ববর্তী মিশনগুলো সম্পন্ন করা হয়েছিল অনেক উচ্চতা সম্পন্ন বেলুন এবং স্পেস সাটোল এর মাধ্যমে , আর তাই ডাটা এক সপ্তাহের বেশি সংগ্রহ করা যেত না । অন্যদিকে PAMELA কক্ষপথে থাকবে কমপক্ষে ৩বছর । রোম বিশ্ববিদ্যালয়ের Piergiorgio Picozza হলেন এই দলের (PAMELA উৎক্ষেপণ) একজন সদস্য, তিনি ঘোষণা করেন “এই পর্যন্ত যত Detector (প্রতিবস্তু সনাক্তের) পাঠানো হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে ভাল হচ্ছে এটি এবং আমরা অনেক সময়ের জন্য এটি ব্যবহার করতে পারব ।”

PAMELA কে এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যেন এটি সাধারণ উৎস হতে নির্গত মহাজাগতিক রশ্মিকে সনাক্ত করতে পারে, এর মধ্যে যেমন আছে সুপারনোভা, এবং এমন অসাধারন কিছু হতে, যেমন এমন কিছু নক্ষত্র হতে যা পুরোটাই প্রতিবস্তু দিয়ে সৃষ্ট (যদিও প্রতিবস্তুর নক্ষত্র বিজ্ঞানীরা কল্পনা করেন কিন্তু এর বাস্তব প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি) । PAMELA প্রতিহিলিয়ামের অস্তিত্বের উপর লক্ষ রাখবে, যা প্রতিবস্তুর নক্ষত্র বা প্রতিনক্ষত্রের মধ্যে হতে সৃষ্ট (আবার বিজ্ঞানীদের সেই কল্পন ) । যদিও বর্তমান কালের Sakharov এর মতো বেশিরভাগ পদার্থবিদরা বিশ্বাস করেন যে Big Bang-ই হচ্ছে বস্তু এবং প্রতিবস্তুর প্রায় সম্পূর্ণ বিলুপ্তির কারণ (আবারো আমি মনে করিয়ে দিতে চাই যে বস্তু সম্পূর্ণ রুপে বিলুপ্ত হয়নি কিছু পরিমাণ অবশিষ্ট ছিল , আর তাই দিয়েই এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি) ।  এই ক্ষেত্রে PAMELA কর্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি একটু অন্য রকম , তাদের মতে ঐ বিলুপ্তির সময় সম্পূর্ণ প্রতিবস্তুর মহাবিশ্ব হারিয়ে যায়নি এবং শুধু তাই নয় বর্তমানে প্রতিনক্ষত্রের অস্তিত্বও রয়েছে ।

চিত্র : PAMELA

যদি মহাবিশ্বের গভীরে অল্প কিছু পরিমাণও প্রতিবস্তুর অস্তিত্ব থেকে থাকে তাহলে তা সংগ্রহ করে করে অবশ্যই Starship চালনার কাজে ব্যবহার করা হবে । NASA এর Institute for Advanced Concept মহাশূন্যে প্রতিবস্তু সংগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পন্থা গ্রহণ করেছে শুধু তাই নয় এই পন্থাটি গবেষণা এবং পরিচালনার জন্য সাম্প্রতিক কালে একটি  তহবিলও গঠন করেছে । Hbar Technologies এর জেরাল্ড জ্যাকসন বলেন “প্রাথমিকভাবে, আপনি একটি জাল তৈরি করে কি করতে চান অবশ্যই মাছ ধরতে চাইবেন ” এই প্রোজেক্টে এটি  (Hbar Technologies) হচ্ছে অন্যতম অগ্রগামি একটি প্রতিষ্ঠান ।

 

চিত্র : তিনটি এককেন্দ্রিক গোলক

প্রতিবস্তু সংগ্রহের এই পদ্ধতিটি তিনটি এককেন্দ্রিক গোলকের উপর নির্ভর করে সৃষ্ট , প্রত্যেকটি গোলক ল্যাটিস তার দিয়ে জালের মত গঠিত । সবচেয়ে বাইরের গোলকটির পরিধি হচ্ছে ১৬ কিলোমিটার এবং ধনাত্মক চার্জযুক্ত তাই এটা ধনাত্মক চার্জযুক্ত প্রোটনদের দূরে সরিয়ে রাখবে । কিন্তু ঋণাত্মক প্রতিপ্রোটনদের কে আকর্ষণ করবে । প্রতিপ্রোটনগুলো বাইরের গোলকে জমা হয়ে গতি ধীর হয়ে দ্বিতীয় গোলকটি অতিক্রম করবে এবং সবশেষে ১০০ কিলোমিটার পরিধির সবচেয়ে ভিতরের গোলকে গিয়ে স্থির হবে । প্রতিপ্রোটনগুলোকে ম্যাগনেটিক বোতলে জমা করা হবে এবং পরে প্রতিইলেকট্রনের সাথে মিশে প্রতিহাইড্রোজেন পরমাণুর সৃষ্টি করবে ।

জ্যাকসনের হিসেব অনুযায়ী বস্তু এবং প্রতিবস্তুর বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রন করে যদি Spacecraft এর জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় তাহলে মাত্র ৩০ মিলিগ্রাম দিয়েই প্লুটো গ্রহে পৌছান সম্ভব ।  জ্যাকসন আরো বলেন ( আমাদের নিকটতম নক্ষত্র ) আলফা সেন্টরাই (Alpha Centauri) তে পৌছাতে Starship এর জ্বালানি লাগবে মাত্র ১৭ গ্রাম প্রতিবস্তু । জ্যাকসন দাবী করেন যে শুক্রগ্রহ এবং মঙ্গলগ্রহের কক্ষপথের মধ্যে ৮০ গ্রাম প্রতিবস্তু আছে , যা Space Probe এর মাধ্যমে সম্ভবত সংগ্রহ করা যাবে ।

চিত্র : Space Probe

এই বৃহৎ প্রতিবস্তুর সংগ্রাহকটিকে প্রেরণের ব্যাপারে আমরা হয়তো চিন্তাও করতে পারবোনা এই শতাব্দীর শেষ অবধি অথবা তারও বেশি সময় পরে এর প্রধান কারণ হচ্ছে  সচল করার জটিলতা এবং ব্যয় । অনেক বিজ্ঞানীরা স্বপ্ন দেখেন যে পৃথিবীর বাইরে ভাসমান ঊল্কা হতে প্রতিবস্তু সংগ্রহের (Flash Gordon কমিকসে্ একটি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয় যে একটি উত্তপ্ত প্রতিবস্তুর উল্কা মহাবিশ্বে ভেসে বেড়াচ্ছিল যা কোন গ্রহের সংস্পর্শে এসে একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ সৃষ্টি করতে পারে) ।

যদি প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট প্রতিবস্তুর অবস্থান মহাশূন্যে খুজে না পাওয়া যায় তাহলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রতিবস্তু পৃথিবীতে সৃষ্টিতে হয়তো আমাদের অপেক্ষা করতে হবে কয়েক দশক এমনকি শত বছর পর্যন্ত । কিন্তু মনে করা হয় যে প্রতিবস্তু উৎপাদনে প্রযুক্তিগত সমস্যা হয়তো একদিন সমাধান করতে পারব , আর এটাই আমাদের সামনে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয় একদিন হয়তো প্রতিবস্তুর রকেট আমাদের নিয়ে যাবে অন্য কোন দুরের নক্ষত্রে ।

চলবে…

………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………

মিশিও কাকুর Physics of the impossible বইয়ের ১০ম অধ্যায়টি নিজের ভাষায় লিখার চেষ্টা করেছি । এই পোষ্টে কিছু চিত্র সংযোজন করলাম যা মূল বইয়ে ছিল না শুধু পাঠকের বুঝার সুবিধার জন্য ।

 

 

 

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত Reply

    মিশিও কাকুর মুল ভাষই হোক, আর আপনার অনুবাদের হাত হোক … এই পোস্টটা বেশ সহজ লেগেছে। আগামী বছর আমরা কি আপনার একটা বই পাবো??

    • অজানার সন্ধানে Reply

      আরাফাত@ধন্যবাদ
      বই বের করার চিন্তা এখনো করিনি ।

  2. আরাফাত Reply

    এই ইন্টারেস্টিং সিরিজটার পরবর্তী আপডেট দিলেন না যে? … বিশেষ করে হিগস-বোসন নিয়ে আলোড়নের এই গরম সময়ে? আপনার ইমেইল ঠিকানাটা পেতে পারি?? আমার ইমেইল ঠিকানা ac.arafatএটgmail.com।

    • অজানার সন্ধানে Reply

      কেমন আছেন ?

      আমি অনেক দুঃখিত এই জন্য আমার নিজের কিছু ঝামেলার জন্য লেখাটা দেওয়া হচ্ছে না । তবে আবার শুরু করার ইচ্ছা আছে ।
      আমার ই-মেইল ঠিকানা হচ্ছে

      ojanarsondhane@gmail.com

      ভাল থাকবেন ……

আপনার মতামত