মেরী শেলীর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন নিশ্চয়ই অনেকে পড়েছেন। প্রাণ আসলে কি? প্রাণকে কি কখনো বোঝা যাবে? তৈরি করা যাবে কৃত্রিম ভাবে? এই প্রশ্নগুলো নানা পদের মানুষকে ভাবিয়েছে, অনেক সময় বিব্রতও করেছে। কিন্তু বিজ্ঞানকে কখনোই নিবৃত্ত করা যায় নি মানুষের ক্ষমতা কতদূর তা আরেকবার যাচাই করে দেখতে। ক্রেইগ ভেন্টরের কৃত্রিম প্রাণ আসলেই কৃত্রিম ‘প্রাণ’ কি না, এ বিষয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, সমালোচনা করেন। তাই বলে কৃত্রিম জীবন নিয়ে গবেষণা থেমে থাকে নি। সম্প্রতি এই ধারাবাহিকতায় মাইল ফলক হিসেবে বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের কোষ থেকে তৈরি করলেন কৃত্রিম জেলিফিশ।

জীববিজ্ঞানে যারা কারিগরীবিদ্যা ফলান, তাদের বলা যায় জৈবকারিগর বা বায়োইঞ্জিনিয়ার। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন জৈবকারিগর এই কৃত্রিম জেলিফিশ তৈরি করেছেন ইঁদুরের হৃদকোষ ও সিলিকন ব্যবহার করে। এই কৃত্রিম সৃষ্টিকে তাঁরা নাম দিয়েছেন মেডুসয়েড। এই মেডুসয়েডকে কোন বিদ্যুৎ ক্ষেত্রের মধ্যে রাখলে দেখা যায় সে ঠিক জেলিফিশের মতোই সাঁতরে বেড়াচ্ছে! এই গবেষণার নের্তৃত্ব দিয়েছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কিট পার্কার। তিনি বলছেন: ‘শারীরতাত্ত্বীকভাবে আমরা একটা জেলিফিশ তৈরি করছি। যদি এর কাজ-কর্ম দেখেন, তাও এটি জেলিফিশ। তবে জেনেটিক্স অনুযায়ী, এটা একটি ইঁদুর!’

সিলিকন আর ইঁদুরের কোষ দিয়ে তৈরি কৃত্রিম জেলীফিশ

পার্কার মূলত কাজ করেন মানুষের হৃদকলা (হার্টটিস্যু) -র কৃত্রিম মডেল নিয়ে। মেডুসয়েড তৈরি করার পেছনে একটা বিশেষ লক্ষ্য আছে তাঁর। মেরুদন্ডী প্রাণীদের হৃদপিন্ড আসলে একটা পাম্পের মতো। মানব হৃদপিন্ডের পাম্প (মাসকুলার পাম্প) আসলে কিভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য এই মেডুসয়েডের তৈরি। আসলে সকল বিজ্ঞানী/কারিগরেরা এভাবেই অগ্রসর হন। তাঁরা যে কোন কিছুর মৌলিক নীতিটা প্রমাণ চেষ্টা করেন একটি মডেল তৈরির মাধ্যমে। মেডুসয়েডও একধরনের মডেল।

২০০৭ সালে পার্কার মাসল-পাম্প কিভাবে কাজ করে বোঝার জন্য মডেল খুঁজছিলেন। তখন জেলিফিশের প্রদর্শনী দেখে এই বুদ্ধিটা আসে তাঁর মাথায়। এই প্রজেক্টের বেশিরভাগ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন জানা নওরোথ। তিনি মুন জেলীফিশের (Aurelia aurita) সব কোষগুলো ম্যাপ করা শুরু করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিলো বোঝা যে জেলীফিশেরা কিভাবে সাঁতার কাটে। মুন জেলিফিশ মাত্র এক-স্তরের পেশি দিয়ে তৈরি। এই পেশিস্তর ফাইবার দিয়ে কেন্দ্র বরারবর সজ্জিত থাকে। সাঁতার কাটার জন্য জেলিফিশের এই পেশিস্তরে কেন্দ্র থেকে একটি সংকোচন ছড়িয়ে পড়ে প্রান্ত বরাবর। ঠিক যেভাবে পুকুরে একটি ঢিল একটা তরঙ্গ তৈরি করে, সেভাবে বৈদ্যুতিক সিগনাল এই বেশিস্তর বরাবর ছড়িয়ে পড়ে।

জেলিফিশের মতো হৃদপিন্ডেও ঠিক একই ঘটনা ঘটে। একটি বৈদ্যুতিক সিগনাল ছড়িয়ে পড়ে এবং মাসকুলার পাম্পে সংকোচন ঘটায়। পার্কার হৃদপিন্ডের এই মডেলটিই তৈরি করতে চাচ্ছিলেন। নওরোথ প্রথমে সিলিকনের একটি যৌগ পলি-ডাই-মিথাইল-সিলোক্সানের নির্দিষ্ট সজ্জার একটি শিট নেন। এই শিটের উপরে তিনি ইঁদুরের হৃদপেশির একটি স্তর তৈরি করেন। বিদ্যুতক্ষেত্রের মাঝে রাখলে এই হৃদপেশী দ্রুত সঙ্কুচিত হয়। এই সঙ্কোচন জেলিফিশের মতোই। ইলাস্টিক সিলিকনের স্তর সঙ্কুচিত হৃদপেশীস্তরকে আগের অবস্থায় নিয়ে যায়। পানিতে দুইটি ইলেকট্রোডের মধ্যে রাখলে মেডুসয়েড সত্যিকারের জেলিফিশের মতোই সাঁতার কাটে। এমনকি জেলিফিশ তার মুখের দিকে যেভাবে পানির-তরঙ্গ তৈরি করে খাবার খায়, সেরকম জলতরঙ্গও তৈরি করে মেডুসয়েড।

পার্কার বলেন, ‘আমরা কৃত্রিম জীববিজ্ঞানকে একটি নতুন স্তরে নিয়ে গিয়েছি। এর আগে জীবিত কোষের মধ্যে নতুন জিন প্রবেশ করানোকেই বলা হতো কৃত্রিম জীবনের মতো কিছু একটা। আর আমরা প্রাণী তৈরি করেছি। এটা কেবল জিন নয়, বরং শারীরতত্ত্ব এবং কাজ নকল করা।’

উপরের লেখাটি নেচার নিউজে প্রকাশিত প্রবন্ধের অনুবাদ। নেচার নিউজে মার্কো গাইলেন নামে এক ভদ্রলোক মন্তব্য করছেন, প্রাসঙ্গিক মনে ভাবানুবাদ হওয়ায় নিচে দিয়ে দিলাম:

‘মেডুসয়েড কি জীবিত? প্রাণীদের দেহে সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আলাদাভাবে জীবিত ধরা হলে এটাকেও জীবিত বলা যায়। মেডুসয়েডকে হয়তো একটি জীব বলা যাবে না, তবে অঙ্গ বলা যেতে পারে। … যেহেতু এর একটি বিদ্যুত ক্ষেত্র লাগে, তাই বলা যায় এক অর্থে মেডুসয়েড ‘খেতে’ পারে বা শক্তি অর্জন করতে পারে। অবশ্য এই শক্তি অর্জন বা ‘খাওয়া’ অন্যান্য জীবের মতো নয়। তবে খাদ্য গ্রহণ জীবের পারিপার্শ্বিক পরিবেশের উপর নির্ভরশীল। সে হিসেবে মেডুসয়েডের সাথে বড় পার্থক্য দেখি না। জীবনের একটি শর্ত হলো প্রজনন, যে ক্ষমতা মেডুসয়েডের নেই। খচ্চরও তো প্রজননশীল না, তবুও তাকে আমরা জীবিত ধরি। … আবার এখানে যে পালস দেয়া হয়, এই পালস অবশ্যই হৃদকোষের, জেলিফিশের পালস না। সে হিসেবে এটা কৃত্রিম জেলীফিশ নয়। তবে অন্তত মেডুসয়েড একটি কৃত্রিম অঙ্গ, যা মানুষের চোখে জেলিফিশের মতোই লাগবে। আর এটির প্রাণ কৃত্রিমভাবে তৈরি নয়, বরঙ জীবিত ইঁদুর কোষ এখানে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই এটাকে আক্ষরিক অর্থে কৃত্রিম জীবন বলা যাবে না …’

 

মূল লেখা: http://www.nature.com/news/artificial-jellyfish-built-from-rat-cells-1.11046

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

লিখেছেন আরাফাত রহমান

অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি শিক্ষার্থী। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।

আরাফাত রহমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 73 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. bengalensis Reply

    আমার মতে এটাতে জৈব যন্ত্র বলা যেতে পারে।

    • আরাফাত Reply

      জৈবযন্ত্র তো অবশ্যই … এক হিসেবে প্রিয়ন-ভাইরাস-ব্যাক্টেরিয়া থেকে শুরু করে বহুকোষী জীব সকলেই জৈবযন্ত্র …। প্রিয়ন/ভাইরাসকে আপনি আলাদাভাবে জীবন কিংবা জীবিত বলতে পারবেন না … তারা কেবল জীবকোষকে ব্যবহার কর নিজেকে রেপ্লিকেট করার জন্য … প্রশ্ন হলো মেডুসয়েড কি ধরনের জৈব যন্ত্র? এটা কি কোন ধরনের খেলনা — কোন জৈবরোবট? এটা কি জীবিত? এর কৃত্রিমতার মাত্রা কতটুকু? ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক প্রশ্ন চলে আসে …

      • bengalensis Reply

        ভাইরাস কিন্তু জীব হিসেবে স্বীকৃত নয় এবং বিবর্তনের ট্রি এর মধ্যেও অন্তর্ভুক্ত নয়। এটাকে জীবনের bi-product হিসেবেই ধরা যায়। তারপরও ভাইরাসের একটা বিশেষ জীব বৈশিষ্ট্য আছে: এটা বংশবৃদ্ধি করতে পারে। সেই হিসেবে মেডুসয়েডের সাথে যন্ত্রের একটাই পার্থক্য। মেডুসয়েড carbon based জৈব পদার্থ দিয়ে তৈরি। আর জীবিত আমরা তাকেই বলতে পারি যেটা জীবনের বৈশিষ্ট্যগুলো ধারন করে। বাজার থেকে আমি যদি গরু মাংস কিনে আনি এবং সেটাকে যদি কোন ফোর্স ফিল্ডের মাধ্যমে নড়াচাড়া করি তাহলে কি তাকে জীবনের কাছাকাছি নেয়া যাবে? মেডুসয়েড কি আদৌ জীবনের বৈশিষ্ট্য ধারন করে? জেলিফিস এবং মেডুসয়েডের সাঁতারের মধ্যে মিল থাকলেও দুইটার ট্রিগারিং কিন্তু সম্পূর্ন ভিন্ন।

        • আরাফাত Reply

          ঠিকই আছে … একটু সংশোধন, ভাইরাস/প্রিয়ন ট্রি অব লাইফের মধ্যে নেই। তবে তাদের বিবর্তন হয়, হচ্ছে। তবে ভাইরাসের উদ্ভব কিভাবে হলো সে বিষয়ে একাধিক হাইপোথিসিস/তত্ত্ব আছে।
          আরেকটা কথা হলো, বংশবৃদ্ধির ক্ষমতা যদি জীবনের সংজ্ঞার মধ্যে আবশ্যিক হয় তাহলে খচ্চরকে কি আমরা প্রাণী বলবো?

          এখানে প্রশ্নটা হলো জীবনকে আপনি কিভাবে দেখতে চান – আলাদাভাবে তর্কের খাতিরে কিডনীকে ধরি, আপনার-আমার কিডনী কি জীবিত? সে কিন্তু ঠিকই তার কাজ করছে, যদিও সে প্রজনন করবে না কখনোই। যদি সংজ্ঞাটা একটু বড়ো হয়, একটু ছাড় দিতে পারেন তাহলে মেডুসয়েডকে হয়তো কিডনী স্তরের একটা অঙ্গের মতো জীবিত বলতে পারি। আর যদি সংজ্ঞা ছোট করি তাহলে মেডুসয়েডের সাথে সাথে অনেক জীবই ঝামেলায় পড়বে, যেমন ধরেন স্পঞ্জ।

          তবে জীবন আসলে কি এ নিয়ে আগ্রহটা আবার উসকে দিলেন। একটা বই পেয়েছি হাতে, About Life, Concepts in Modern Biology, ২০০৭ সালে প্রকাশিত … পড়ে দেখতে হবে 🙂

  2. ইমরান হাসান Reply

    আসলে আমার মতে মেডূসয়েড কে বায়োরোবট বললেই মানাবে বেশি ভালো। তবে কৌতূহল টো আমারও অনেক অনেক বেশি এই ক্ষেত্রে আসলে প্রাণ জিনিসটা কি এর অস্তিত্ব কীরূপ ? এটা কি কেউ জানতে পারবে না ? আসলে নিলসে বোরই মনে হয় সত্যি বলতেন “স্রষ্টা পাশা খেলতে খুব পছন্দ করেন”

    • আরাফাত Reply

      প্রাণ কি? কঠিন প্রশ্ন অনেক। একটা বই পড়ছি সম্প্রতি, about life, concepts in modern biology। শেষ হলে একটা লেখা দেয়ার ইচ্ছে আছে।

      কেমন আছেন ইমরান??

  3. Pingback: ২০১২ সালের বিজ্ঞান অগ্রগতি | Born Elegant's Blog

আপনার মতামত