ডারউইনের বিপজ্জনক শিষ্য

রিচার্ড ডকিন্স এর একটি সাক্ষাৎকার
ফ্রাঙ্ক মিয়েল
অনুবাদঃ কোয়েল দাশ এবং খান তানজীদ ওসমান

প্রথম পর্ব

অনুবাদের ভূমিকাঃ
রিচার্ড ডকিন্সকে আর নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। মূল লেখাতেই একটি ভূমিকা দেয়া আছে তাঁর উপর। তাই এখানে আর কথা বাড়াচ্ছি না। লেখাটি ‘স্কেপসিস’ (Scepsis) নামক একটি বিজ্ঞান এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট ভিত্তিক অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। বেশ কিছু খুবই কৌতুহল উদ্দীপক এবং চমৎকার বিষয় সাক্ষাৎকারটিতে উঠে এসেছে। অনুবাদটির প্রথম পর্বে মূলতঃ বিকল্প প্রাণের গঠন, বুদ্ধিমত্তার বিবর্তন, জীবের উপলবদ্ধির- বিকাশ, জগৎ, প্রেক্ষাপট এবং বিবর্তন ইত্যাদি নিয়ে কথা হয়েছে। সবচেয়ে আগ্রহজনক বিষয়টি সম্ভবত এই আলোচনাটি যেখানে বলা হচ্ছে আমাদের এখনও এমন উপলব্ধি (ইন্দ্রিয়গাহ্য) রয়ে গিয়েছে যার ফলাফল বাস্তবতায় আমাদের জন্য হানিকর হতে পারে।

সাক্ষাৎকারঃ
অক্সফোর্ড-র নিউ কলেজের বিশিষ্ট সভ্য রিচার্ড ডকিন্স, বিবর্তন জীববিজ্ঞানের জগতে অধুনা একজন প্রথম-সারির চিন্তাবিদ হিসেবে খ্যাত। এই বিষয়ে তিনি একজন অন্যতম প্রখ্যাত লেখকও বটে। তাঁর বই সমূহ –The selfish gene (১৯৭৬; বর্ধিত, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৮৯), The extended phenotype (১৯৮২, ১৯৮৯), The blind watchmaker (১৯৮৬), এবং বর্তমানে Brockman Science Masters Series (মূল বই, ১৯৯৫) –এর River out of Eden  সাধারন এবং পন্ডিত, উভয় ধরনের পাঠকের মধ্যেই নতুন কিছু শব্দের পরিচিতি ঘটিয়ে দিয়েছে। যেমন ‘blind watchmaker’, ‘selfish genes’, ‘memes’, ‘green beards’, ‘blomorphs’, ‘arms races’, ‘sheriff genes’, এবং ‘outlaw genes’. দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকা (The New York Times) তাঁর বইগুলির বণর্ণা দিতে গিয়ে লিখেছে, “এক ধরণের জনপ্রিয় বৈজ্ঞানিক লেখনী যা পড়ে পাঠক নিজেকে একজন জিনিয়াস ভাবা শুরু করেন”! এবারের গ্রীষ্মে ক্যালিফোর্নিয়াতে ডকিন্স Human Behavior and Evolution Society-তে ‘চেতনার বিবর্তন মডেল’ (Evolution of perceptual models) এবং Skeptics Society-তে ‘সৃষ্টিতত্বের বিভ্রান্তিসমূহ’ (Fallacies of Creationism) নিয়ে আলোচনা করেন। এছাড়াও Skeptic ম্যাগাজিনের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে ডারউইনিজমের সাফল্য, সীমাবদ্ধতা, ব্যবহার এবং অপব্যবহার নিয়েও কথা বলেন ডকিন্স। কটূক্তি বা সমালোচনায় যিনি কখনো লজ্জাবোধ করেননি; যাঁকে Wired ম্যাগাজিন “বিবর্তনের দুষ্ট বালক” হিসেবে অভিহিত করেছে। Skeptic-এর সাথে এই আলোচনাটিতে তিনি ডারউইনবাদ, পৃথিবীর বাইরে জীবনের উপস্থিতি, ধর্ম- মানব-মনের ভাইরাস, নৈতিকতা, রাজনীতি, punctuated equilibrium (ডারউইনের ন্যাচারাল সিলেকশান তত্ত্বকে চ্যালেজ্ঞ করা একটি তত্ত্ব) এবং বিবর্তনিক জীববিজ্ঞানের ভবিষ্যত নিয়ে কথা বলেছেন।

স্কেপটিকঃ ইংল্যান্ডে সর্বাধিক বিক্রীত বইগুলির একটি, আপনার সাম্প্রতিক প্রকাশিত ‘River out of Eden’, এ বিবর্তনের পর্‍্যায়ক্রমিক ধারা বুঝাতে গিয়ে গভীর সমুদ্রের একধরনের ব্যাকটেরিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন যা পরিপাক-প্রক্রিয়ায় অক্সিজেনের যায়গায় সালফার ব্যবহার করে। পৃথিবীতে পরিপাকের প্রয়োজনে বিকল্প এই ‘জ্বালানি’র অস্থিত্ব কি এই সম্ভবনাকেই প্রবল করে তুলে না যে এই মহাবিশ্বে অন্য কোথাও প্রাণের অস্থিত্ব থাকা সম্ভব যারা হয়ত কার্বনের জায়গায় ভিন্ন কাঠামো ব্যবহার করছে?

ডকিন্স: এটা তো সত্যি হতেই হবে, তাই না? বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর আঙ্গিকে আপনি প্রাণ তৈরির জন্য একটা বিকল্প প্রাণ-রসায়ন অনুমান করে নিলেন, কিন্তু তারপর এমন কোন উদাহরণ-ই আপনি পৃথিবীতে খুঁজে পেলেন না- যা বিন্দুমাত্রও একটা বিকল্প প্রাণ-রসায়নের সাক্ষর রাখে, সেক্ষেত্রে এটি আপনার অনুমানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। কিন্তু, যখনই এই পৃথিবীতেই প্রাণের জন্য একটি বিকল্প প্রাণ-রসায়নের অস্থিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় তখনই এটা অনেক যৌক্তিক মনে হয় যে এই মহাবিশ্বের অন্য কোথাও বিকল্প প্রাণ বিকশিত হয়েছে।

স্কেপটিকঃ তাহলে জীবনের অত্যাবশ্যকীয় উপাদান (sine qua non) বলতে আপনি কি মনে করেন? প্রাণের অস্থিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য কোন উপাদান (কাঁচামাল) বা পরিবেশকে আপনি অপরিহার্য্য বলবেন?

ডকিন্সঃ সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে এমন কোন উপাদান প্রয়োজন যা স্ব-প্রজননক্ষম অর্থাৎ নিজেই নিজের উৎপাদন ঘটাতে সম্ভব। ঠিক কি উপায়ে এই ধরণের উপকরণ পাওয়া সম্ভব তা সঠিকভাবে জানতে গেলে আমাকে আসলে একজন রসায়নবিদ হতে হবে। আমি অবশ্যই একজন রসায়নবিদকে বেছে নেব যে এমন একটি পরিবর্তিত রাসায়নিক প্রকল্প উদ্ভাবন করবে যেটা স্ব-প্রজননে সহায়তা করবে, একটি সমগ্র পরিবর্তিত ব্যবস্থা, যা মূলতঃ, প্রাণের উন্মেষ ঘটাবে। রসায়নের কিছু স্ব-অনুঘটন প্রক্রিয়া যেখানে নূন্যতম পূর্বাবশ্যকীয় (prerequisites) উপকরণ পাওয়া গেছে, তা নিয়ে রসায়নবিদেরা ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। ‘অত্যাবশ্যকীয় উপাদান’, আপনি যেভাবে বললেন, তা আসলে স্ব-প্রজনন। রাসায়নিক ভাবে পেতে গেলে এটি কতটা দুরূহ হবে তা আমি জানিনা।

স্কেপটিকঃ এই মহাবিশ্বের কোথাও না কোথাও “বুদ্ধিমান” প্রাণের অস্থিত্ব রয়েছে- এটা আপনার কতটুকু সত্য মনে হয়?

ডকিন্সঃ প্রথমে, যে কোনরূপ জীবন খুঁজে পাওয়াই খুব কঠিন মনে হতে পারে। তারপর যখন প্রাকৃতিক নির্বাচন শুরু হয়ে যায় (যেহেতু জীবনের উৎপত্তি মানেই প্রাকৃতিক নির্বাচনের উৎপত্তি), তখন সুগঠিতভাবে ধাপে ধাপে এগোনো প্রক্রিয়ায় কিছু তথ্য প্রক্রিয়াকরণের যন্ত্রের (যেমন মানুষের মস্তিস্ক) বিবর্তনের মাধ্যমে আপনি বুদ্ধিমত্তায় পৌঁছাতে পারেন। অন্যদিকে, সত্যিকার অর্থে পৃথিবীতে কি ঘটেছে তা যদি লক্ষ্য করেন তবে দেখবেন, পৃথিবীর জন্মের পর থেকে শুরু করে হয়ত শত কোটি বছরের কম সময়ে একেবারেই প্রাথমিক একটা প্রতিকূল পরিবেশে প্রাণের জন্ম হয়েছে। কিন্তু, উচ্চপর্যায়ের বুদ্ধিমত্তার যে ক্রমবিকাশ তা কেবলমাত্র গত বিশ-লক্ষ বছর ধরে পরিলক্ষিত হয়। সুতরাং, এটাই মনে হয় যে, এই গ্রহে, পৃথিবীর উৎপত্তি হতে প্রাণের বিকাশ ঘটা পর্যন্ত যে জন্যে সময় লেগেছে- তার চাইতে অনেক অনেক গুণ বেশি সময় লেগেছে প্রাণের উৎপত্তি থেকে বুদ্ধিমত্তার উদ্ভব ঘটা পর্যন্ত।

স্কেপটিকঃ তাহলে কি আপনি বলতে চাচ্ছেন বুদ্ধিমত্তার উদ্ভবই বড় পদক্ষেপ?

ডকিন্সঃ এটা বলা আদৌ আমার ইচ্ছা নয়, কিন্তু সময়ের মাপকাঠিতে এই বৈষম্যই একমাত্র তথ্য যা আমাদের কাছে রয়েছে। আমাদের কাছে একটি মাত্রই নমুনা আছে- এই গ্রহের প্রাণ। কিন্তু সেই সত্যের খাতিরে, আমার ব্যক্তিগত অভিমত এই যে- যখনই প্রাণের অস্থিত্ব পাওয়া যায় তখনই বুদ্ধিমত্তার উদ্ভব ঘটানো এমন কিছু কঠিন বিষয় না। এই ধারণা আমাকে চরম আলোড়িত করে যে হয়ত এই যে প্রাণের উন্মেষ- এটা খুব দুরূহ কোন ব্যাপার না।

স্কেপটিকঃ তাই যদি হয়ে থাকে, তবে এই ‘বুদ্ধিমত্তা’কে আপনি কি ধরণের গুণাবলী দ্বারা সংজ্ঞায়িত করবেন? আমি এক্ষেত্রে সে সমস্ত ধারণার কথা বলতে চাইছি যেমন ইমানুয়েল ক্যান্ট এর কারণ নির্ণায়ক (apriori ideas) কিছু চিন্তার তালিকা, যেমন, সময় এবং মহাশূণ্য, (time and space) সংখ্যা (number), কারণ ও ফলাফল (cause and effect) ইত্যাদি। এমনকি হতে পারে, যেমন ধরুন, এমন একটা জীবনের উদ্ভব হল যার মনের মানচিত্রে সময়ের ধারাপথ পেছনের দিকে প্রবাহিত হয়, (উল্লেখ্য, আমাদের মনে সময় সবসময় সামনের দিকে যায়) অথবা কোন সুর্নিদৃষ্ট দিকেই যায় না?

ডকিন্সঃ সেক্ষেত্রে জানতে হবে বুদ্ধিমত্তা বলতে কি বুঝায়, আমি সত্যিই এটা নিয়ে কখনো ভাবিনি। আপনি এমন একটা তাত্ত্বিক প্রশ্ন উপস্থাপন করলেন যেখানে বলা হচ্ছে, ‘এমন কি একটি প্রাণ হতে পারে যার সময়ের ধারনা পশ্চাতমুখী?’ আমি কল্পনাই করতে পারছি না যে এটা দেখতে কেমন হবে। কিন্তু আমি এরকম করে সত্যিই তেমন ভাবিনি।

স্কেপটিকঃ এই পৃথিবীতে অন্য যে সব প্রজাতি সম্বন্ধে জানি, তাদের মধ্যে বিড়াল এবং কুকুর এর সাথে আমরা সবচাইতে বেশী পরিচিত। আমি সবসময়ই বিস্মিত (সেইসাথে আনন্দিত) হই কি করে আমার কুকুরটি আমার সাথে সহবস্থান করছে যার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তন্ত্র গুলি আমার চেয়ে একেবারেই আলাদা-  এরা সব কিছুই সাদা এবং কালো দেখতে পায়, ত্রিমাত্রিক চেহারায় নয়; আমার চাইতে একেবারে প্রায় বিপরীত অনুপাতে তাদের ঘ্রাণ এবং দৃষ্টি শক্তিকে ব্যবহার করে। তা সত্ত্বেও তারা আমাদের একই জগতে মানচিত্রে রয়েছে; তারা আমাদের জন্য পত্রিকা নিয়ে আসতে পারে, দুষ্কৃতিকারীদের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে, হতাশার দিনগুলোতে আমাদের আনন্দ দিতে পারে। এই সমস্ত ব্যাপারগুলো এবং বিভিন্ন প্রজাতির শুধুমাত্র শরীরেই নয়, অধিকন্তু দর্শনবোধেও যে বিভিন্নতা তা বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে কিভাবে দেখা হয়?

ডকিন্সঃ এটা বেশ লক্ষ্য করবার মত একটা ব্যাপার। কুকুরের ব্যাপারে বলা যায় যে এদের গৃহপালিত করে গড়ে তোলা হয়েছে, এবং গৃহপালনের সুব্যবস্থাদির কারণে এক ধরণের অসতর্ক নির্বাচন সৃষ্টি হয় যার ফলে মানুষের সাথে সহবস্থান সম্ভব হয়। যেহেতু তাদের বন্য আদি-পুরুষ হল নেকড়ে, যারা মুখভঙ্গি এবং অন্যান্য ইশারার সাহায্যে পরপষ্পরের সাথে ভাবের আদান-প্রদান করে, সেহেতু এটা অনুমেয় যে গৃহপালিত কুকুরেরা আরও বেশী সহজভাবে মানুষের অনুভূতি এবং মুখভঙ্গি বোঝা সম্ভবপর- এমনভাবে (প্রাকৃতিক) নির্বাচিত হয়েছে। আর তাই বন্য কুকুরেরা হাসে না, বরং অন্য ভাবে, যেমন তাদের চোখ দিয়ে মানুষের কাছে আবেদন তৈরী করে। হয়ত তাদের আদলটাই পরিবর্তিত হয়ে অনেকটাই মানুষের মত আর খুব অল্পটাই নেকড়ের মত হয়েছে। সযত্নে বিবেচনা করা কোন কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, বরং কেবলমাত্র (গুঢ়) কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমে।

স্কেপটিকঃ ১৯৩০ সালে, ভন উয়েক্সকুল বিভিন্ন ‘বাস্তব জগত’-এর বর্ণণা দিতে গিয়ে ‘পরিবেশের প্রভাব’ বা ‘Umwelt’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন; এর মানে হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন সংবেদনশীল সংস্থানের (sensory system, প্রত্যঙ্গ) মাধ্যমে প্রাণী নিজের নিজের জগৎ তৈরি করে। তিনি এমনকি কিছু যন্ত্রও তৈরী করেছেন প্রাণীর উপলদ্ধির প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেতে বা তৈরী করতে (তিনি Weltanschauungen শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যার মানে হল- কোন একটি বিষয়ে বিভিন্ন ধরণের তুলনামুলক মতামত)।  পোকা-মাকড়ের যৌগিক চোখের অনুকরণে তিনি (ভন উয়েক্সকুল) চোখের কিছু যন্ত্রাংশ বানিয়েছেন- যেন তা দিয়ে একটা পোকা যেভাবে দেখতে পায় সেইভাবে দেখতে পাওয়া সম্ভব হয়। যেটা পরা-বাস্তব জগতের জিনিসপত্র বলে ভাবা হত সেটা আমরা এখন একদম বাস্তব-জগতেই তৈরি করছি; ভন উয়েক্সকুল যা তৈরী করেছেন তার চাইতে আরও অত্যাধুনিক যন্ত্র আমরা বর্তমানে তৈরী করতে পারি। আপনার কি মনে হয় এটা একটি সম্ভাব্য মূল্যবান গবেষণার বিষয়বস্তু হতে পারে?

ডকিন্সঃ ভন উয়েক্সকুল বিভিন্ন প্রাণীর উপলব্ধির জগতের যে বিভিন্নতা সেটা বের করার জন্য পরিবেশের প্রভাব (Umwelt)-এর ধারণাটি ব্যবহার করেছেন। তিনি এমন একটি পথ আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন যেখানে আমরা ঠিক প্রাণীটির মত করে উপলব্ধি করতে পারব; যেমন, ধরা যাক একটি মাছি বা বাদুড়, আলোর মেরুকরণ (polarization) অথবা বর্ণালীর অতি-বেগুনী রশ্মি দেখতে পায় এবং সাধারণ ভাবে আমরা যেভাবে দেখি সেভাবে জগৎকে দেখতে পায়না। আমি মনে করি এটা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিছুটা রূপকের মাধ্যমে ‘নিজের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে’ অন্য আরেকজনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা। আমাদের অত্যন্ত গভীর মানব-কেন্দ্রিক কিছু ব্যাপার আছে, যেমন মূল্যবোধ এবং নৈতিকতা। আমরা যদি খুব অসচেতন ভাবেও একজন বিবর্তনবাদী হই, তারপরও কিছু মানুষ সব সময় জুডিসীয়-খৃষ্টীয় মত অনুসারে চিন্তা করবে যে বিশ্বে সব কিছুই তৈরি হয়েছে মানব কল্যানের স্বার্থে এবং যদি মানব কল্যানে ভূমিকা রাখে তবেই কোন বৈজ্ঞানিক গবেষণা যথাযথ হবে। এই যে ‘নিজেকে অন্য আরেকটি প্রজাতির উপলদ্ধি দ্বারা অনুভব করার চেষ্টা’ এটা আমার কাছে অভিনন্দন পাওয়ার মত একটা শিক্ষা। কিন্তু গত রাতে Human Behavior  and Evolution Society’র সামনে আমার বক্তৃতাতেও যেমন বলেছি, আমরা যেমনটা ভাবছি যে অন্য প্রজাতির উপলদ্ধির জগৎটা আমাদের চেয়ে ভিন্ন হবে- সে রকমটা নাও হতে পারে, যদিও তারা (বিভিন্ন প্রজাতি) ভিন্ন কোন শরীরবৃত্তীয় মাধ্যমে উপলব্ধির তথ্য সংগ্রহ করছে।

স্কেপটিকঃ তবে কি প্রাকৃতিক নির্বাচন আমাদের ভাবাতে বাধ্য করছে না যে সময় একটি সুনিদর্ৃষ্ট দিকে চলছে? এবং একই সাথে প্রাকৃতিক নির্বাচন ক্যান্ট (ইমানুয়েল)- এর কারণ নির্ণায়ক (a priori) ধারণা এবং পয়েগেট এর তত্ত্ব (cognitive development theory, মানুষের বুদ্ধিমত্তা বিকাশের তত্ত্ব) অনুযায়ী আমাদের চালিত করছে?

ডকিন্সঃ হ্যাঁ, আমি একমত।

স্কেপটিকঃ অন্যদিন রাতে আপনার আরেকটি বক্তব্যে আপনি বলছিলেন যে উপলদ্ধির মাধ্যমে যে চেতনার জগৎ একটি প্রানী তৈরি করে সেটা তার কাছের (এমনকি দূরের) পূর্ব-পুরুষেরা যেভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের ভিত্তিতে লালন করেছে সেভাবেই তৈরি হয়। একটি প্রাণীর সংবেদনশীল তন্ত্রের বিবর্তনের চেয়ে দ্রুত কি তার চেতনার জগতের সৃষ্টি হতে পারে? আজকের সময়ে কি এমন অনেক প্রাণীই রয়েছে যারা এমন একটি সংবেদনশীল জগতে বাস করছে যার অস্তিত্ব বর্তমানে নেই (যেসব উপলব্ধি বা সংবেদনগুলো বর্তমান জগতে ব্যবহারিক গুরুত্বে অপ্রয়োজনীয় বা কখনো হানীকর), যেমন মথ পোকা মোমবাতির শিখা দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে?

ডকিন্সঃ অনুমান করা যায় যে, যখন একটি মথ কোন মোমবাতির শিখা দেখে তার প্রতি সাড়া দিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তার দৃষ্টিশক্তির অসীমতায় শিখাটি অনিন্দ্যসুন্দর কোন বস্তু রূপে ধরা দেয়, এবং ঠিক সেই মুহূর্তের তাড়নাতেই কাজটি করে, বাস্তব পরিবেশের কথা ভুলে গিয়ে। এ রকম বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে কোন প্রাণীর বোধদয় হওয়ার অনেক আগেই চেতনার বা উপলব্ধির জগতের সৃষ্টি হয়।

স্কেপটিকঃ মানুষের ক্ষেত্রে কি কখনো এমনটা হয়েছে?

ডকিন্সঃ মানুষ তো সম্পূর্ণভাবে নিমজ্জিত আছে “মোমবাতির শিখা”-র সমার্থক কিছু উপায় দিয়ে। সবচেয়ে খারাপ উদাহরণটা হল আমাদের মিষ্টি আর চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি যে আগ্রহ;  প্রকৃতিতে নিয়ম হচ্ছে, যখনই তুমি এ ধরণের খাবার পাবে, খেয়ে নিবে। কিন্তু, যখনি প্রয়োজনের তুলনায় বেশী হয়ে যায় তখন এগুলো আমাদের জন্য ক্ষতিকর হয়ে যায়। আধুনিক জীবনে আমরা বেশিরভাগই যুদ্ধ করছি আমাদের লক্ষ্য অর্জনের যন্ত্রগুলি ব্যবহার করার জন্য (ইন্দ্রিয়), যেগুলো আমাদের মধ্যে প্রাকৃতিক ভাবেই তৈরী হয়েছে প্রকৃতি থেকেই লক্ষ্য খুঁজে বের করার প্রয়াসে। কিন্তু এখন এইসব লক্ষ্য খোঁজার যন্ত্রগুলি পরিবর্তিত হয়ে ভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেমন অর্থ তৈরী অথবা মানসিক আনন্দ লাভ। প্রাকৃতিক নির্বাচন আমাদেরকে কতগুলো এমন ‘পূর্বশর্ত’ দিয়ে সমৃদ্ধ করেছে যার ফলে প্রকৃতিগতভাবেই আমরা নিজেদের মধ্যে ‘সেলফিশ জিন’ (selfish gene) এর টিকে থাকাকে ত্বরান্বিত করি। পূর্বশর্তই এগিয়ে চলে, যদিও মোমবাতির আলোকশিখাময় এই পৃথিবী আমাদের ইনক্লুসিভ ফিটনেস (inclusive fitness, প্রজাতির প্রজনন ক্ষমতা বা বংশবৃদ্ধির সাফল্য) -কে ত্বরান্বিত করে না।

স্কেপটিকঃ জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং যুদ্ধ কে কি আপনি মোমবাতির আলোকশিখার উদাহরণ বলে মনে করবেন?

ডকিন্সঃ জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিজে কোন একক আচরণ প্রকাশের সত্তা নয়। এটাকে বলা যায়- একটি সম্মিলিত পরিবেশে একক একটি সত্তার বিভিন্ন প্রকাশের সামগ্রিক পরিণতি। সহজ কথায় যদি বলি, দুজন মানুষের মধ্যে আক্রমণতা এবং আনুগত্য’র যে বহিঃপ্রকাশ সেটাই হল সামাজিক আধিপত্য; কিন্তু এটা কখনো বলা যায়না যে প্রাকৃতিক নির্বাচন সুবিধাপ্রাপ্ত বা সুবিধাবঞ্চিত করেছে সামাজিক আধিপত্যকে। প্রাকৃতিক নির্বাচন একক সত্তার আচরণকে সুবিধা- প্রাপ্ত বা বঞ্চিত করে, যার সুষ্পট প্রকাশ হল সামাজিক আধিপত্য। যুদ্ধ বা জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে আমি এই বিভাগেই ফেলব।

 

লেখাটি সচলায়তনেও প্রকাশিত হয়েছে।

খান তানজীদ ওসমান।

লিখেছেন খান ওসমান

আমি জীববিজ্ঞানের ছাত্র। বর্তমানে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আছি। https://www.facebook.com/khan.osman.1

খান ওসমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 30 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. প্রশাসক Reply

    খান ওসমান আপনাকে স্বাগত জানাই বিজ্ঞানব্লগে। এই লিঙ্ক (http://www.bigganblog.com/wp-admin/profile.php) থেকে আপনার পরিচয় যুক্ত করুন। হ্যাপি ব্লগিং!

  2. আরাফাত Reply

    সাক্ষাতকারটা চিন্তাজাগরুক — কিছু নতুন চিন্তার সন্ধান দিলো। কুকুর-বিড়াল বা অন্যান্য পোকামাকড় আমাদের চেয়ে ভিন্ন একটা বাস্তবতার মডেলে বসবাস করে … তাদের গেম-রুল আমাদের চেয়ে ভিন্ন। সম্প্রতি কুকুরদের নেকড়ে থেকে বিবর্তনের উপর কয়েকটা লেখা পড়লাম। মানুষ-কুকুরের দুই ভিন্ন বাস্তবতা কিভাবে merge হয় তা একটা ইন্টারেস্টিঙ বিষয়। মথরা মোমবাতির শিখার প্রলোভন এড়োতে না পারলেও মানুষ কিন্তু পারে …। লেখাটার জন্য আবারো ধন্যবাদ — এই লেখাগুলো একেকজনকে একেক আইডিয়া দেয়, আপনি সম্ভবত দার্শনিক দিক গুলো নিয়ে মজেছেন …। কিছু টাইপো আছে … যেমন অস্থিত্ব বলতে “অস্থি” বা হাড্ডি সম্পর্কিয় কিছু বোঝাচ্ছে 🙂 … আপনি বলতে চেয়েছিলেন অস্তিত্ব … । … যাই হোক, লেখাটা ভালো লেগেছে 😀

    • খান ওসমান Reply

      হুম। শুধু সেটা না, আরও কিছু যায়গায় টাইপো আছে। আরেকটু সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ছিল। মোমবাতির শিখার ব্যাপারটা এড়াতে অনেকেই পারেম কিন্তু বেশিরভাগ পারেনা। যেমন, মিষ্টি খাওয়ার ব্যাপারটা। বনে থাকার সময় আমাদের শারীরিক পরিশ্রম বেশি হতো, তাই যত পারি মিষ্টি জিনিস খাওয়ার দরকার পড়তো শর্করা থেকে শক্তি অর্জনের জন্য। সেভাবেই স্বাদগ্রন্থিগুলো বিবর্তিত। এখনও সেই ধারা ধরে রেখেছি। তবে, অফিসরুমে বসে মিষ্টি খাই এখন।

      দার্শনিক টার্মগুলির অর্থ বেশিরভাগই আসলে কোয়েল দি (অন্য অনুবাদক) খুঁজে বের করেছেন। ধন্যবাদটা তার প্রাপ্য।

আপনার মতামত