বইমেলা থেকে বই কিনেছেন নিশ্চয়ই অনেকেই। খেয়াল করলে দেখবেন অনেক বইয়ের পিছনে সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে কালো উলম্ব লাইনের সমষ্টি নিয়ে একটা ছবির মত আছে। এটাকে বলে বারকোড (barcode)। প্রত্যেকটা আলাদা বই এর বারকোড বিভিন্ন, একই বইয়ের বারকোড একই রকম। একটা বই যেমন ‘হিমু পাড়লো ডিম-হুমায়ুন আহমেদ’ এর বারকোড অন্য বই ‘মিসির আলী ঘুমায়-হুমায়ুন আহমেদ’ এর চেয়ে ভিন্ন। তবে সবগুলা ‘হিমু পাড়লো ডিম’ বইয়ের একই সংস্করণের বারকোড একই। আমি যেই দেশে থাকি সেখানে বড় মলগুলোতে আপেলের পর্যন্ত বারকোড থাকে (আমাদের দেশেও কোথাও কোথাও নিশ্চয়ই পাওয়া যায় এমন বারকোডেড আপেল)। আপেলের গায়ে স্টিকার দিয়ে বারকোড লাগানো থাকে। আপেলের আকার, রং, আয়তন, স্বাদ এসব আরও কিছু বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে একটা আপেলের স্বকিয়তা তৈরি হয়, যার জন্য একটা বারকোড দেয়া হয়। মনে কর, একটা আপেলের নাম ‘ক্যালিফোর্নিয়া গোল্ডেন আপেল’। একটা দোকানে এই আপেলের বারকোড সব একইরকম হবে।

আসলে বারকোড এর প্রয়োজনীয়তা কি? উদাহরণ দিয়ে বলি। একটা মানুষকে দেখেই আমরা কি তার সম্বন্ধে সবকিছু জানতে পারি? উত্তর হল ‘না’। হয়তো কিছু ধারনা পেতে পারি, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে বোঝা অসম্ভব। কিন্তু যদি, এই মানুষটার সব তথ্য কোন ডাটাবেইসে (database) জমা থাকতো, আর মানুষটাকে একটা বারকোড দিয়ে দেয়া যেতো তবে সেই বারকোড স্ক্যান করে নিমিষেই তার যাবতীয় তথ্য কোন ভিসুয়াল ইন্টারফেইস বা কম্পিউটারের মাধ্যমে জানা যেত। জেনেটিক গবেষকরা স্বপ্ন দেখছেন একদিন পৃথিবীর সব মানুষের ডিএনএ সিকোয়েন্স সংরক্ষণ করা হবে, বার্থ সার্টিফিকেট বা ন্যাশনাল আইডি কার্ড এর মত। কিন্তু মানুষভেদে সংরক্ষিত ড্যাটা, অসংখ্য ড্যাটার মধ্ যে খুঁজে পাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় কি? উত্তর হচ্ছে বারকোডিং। বারকোডিং কোন বাস্তব জিনিসের সাথে ডিজিটাল জগতের সংযোগের মাধ্যম। ইদানিং আমরা কোন কোন সেলফোনের ক্যামেরা ব্যাবহার করেও বারকোড স্ক্যান করতে পারি। কনসার্ট কখন-কোথায় হবে সেটা জানা থেকে শুরু করে একটা ক্যামিকেল কতটুকু টক্সিক সেটা পর্যন্ত সবকিছুই এরকম ডিজিটালাইজেশানের অধীনে আনা যায়। তাহলে ব্যাকটেরিয়া বাদ যাবে কেন?

এমনই চিন্তা থেকে, বিজ্ঞানীরা ভাবছেন ব্যাকটেরিয়াকে কিভাবে বারকোড দেয়া যায়। মনে রাখা দরকার বায়োলজিকাল সিস্টেমের (biological system) বারকোডিং ঠিক আক্ষরিক বারকোডিং নয়। সহজভাষায় এটা জেনোম সিকোয়েন্সের কিছু অংশ যা দিয়ে একটা জীবকে চেনা যায়। ডিএনএ বারকোডিং এর নাম আপনারা হয়তো শুনে থাকবেন। তবে ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে ঝামেলা হল ব্যাকটেরিয়া, যেমন, ই. কলাই (E. coli) শুধু ই. কলাই নয়। এর অনেকগুলা স্ট্রেইন (strain) আছে। যেমন ই. কলাই কে১২ (E. coli K12), এখানে কে১২ (K12) দিয়ে স্ট্রেইন বোঝায়। একটা ব্যাসিলাস সিরিয়াস (Bacillus cereus) থেকে একটা ব্যাসিলাস সাটিলিস (B. subtilis) এর পার্থক্য করার সবচেয়ে সহজ এবং উপযোগী উপায় হল এর ১৬এস রাইবোসোমাল আরএনএ (16s ribosomal RNA) সিকোয়েন্স। ১৬এস রাইবোসোমাল আরএনএ স্পেসিসের পার্থক্য বের করার জন্য অসাধারন, কারন একেক স্পেসিস এর ১৬এস রাইবোসোমাল আরএনএ একেকরকম হয়। চমৎকার। কিন্তু ঝামেলা বাঁধে এর পরের শ্রেণীবিভাগে। যেমন, ই. কলাই এর দুইটা স্ট্রেইনের পার্থক্য আমি কিভাবে বের করব যেখানে পার্থক্য খুবই নুন্য? এজন্য এমন একটা ক্রায়টেরিয়া বের করতে হবে যাতে ব্যাকটেরিয়ার স্পেসিসভেদে পার্থক্য না হয়, কিন্তু স্ট্রেইনভেদে পার্থক্য হয়। সম্প্রতি একটা গবেষণা এই সমস্যার একটা চমৎকার সমাধান বের করেছে। জলি (Jolley) এবং সহযোগীরা মিলে ৫৩টি আরপিএস (rps) জিন বের করেছেন যা প্রায় সব ব্যাকটেরিয়াতেই থাকে, কিন্তু স্পেসিস অনুযায়ী ভিন্ন হয়না (reference)। এই ৫৩ টি জিন স্ট্রেইন অনুযায়ী একেকরকম হয়। হোল-জেনোম-সিকোয়েন্স এর উপর ভিত্তি করে জলির ল্যাব প্রায় ১৯০০ টি ব্যাকটেরিয়া ড্যাটাবেইস এ সংযুক্ত করেছে যা থেকে সহজেই আরপিএস জিনের সিকোয়েন্স থেকে কোন নতুন স্ট্রেইন নির্ণয় করা যাবে। ব্যাকটেরিয়া ফ্যামিলির ডাইনোসরাকায় আয়তনের তুলনায় ১৯০০ টি ব্যাকটেরিয়া প্রায় কিছুই নয়। কিন্তু, এই ১৯০০ টির জেনোম সিকোয়েন্স জানা আছে বলেই এদের স্ট্রেইন পর্যন্ত শ্রেনিবিভাগ বা বারকোডিং করা যাচ্ছে খুবই সহজ উপায়ে। এমন একসময় আসবে যখন পৃথিবীর প্রায় সব জীবের জেনোম সিকোয়েন্স জানা যাবে। সম্প্রতি একটা নতুন টেকনোলজির আবিস্কার হয়েছে, ন্যানোপোর ডিএনএ সিকোয়েন্সিং (nanopore DNA sequencing), যা দিয়ে প্রায় ১৫ মিনিটে মানুষের জেনোম সিকোয়েন্স করা যাবে বলে দাবি করা হচ্ছে। আর তাই, পৃথিবীর প্রায় সব জানা জীবের জেনোম সিকোয়েন্স খুব অতিকল্পনা নয়। কয়েকদিন পর হয়ত আমার খাবার গ্লাসের পানিতে স্ক্যান করে নিমিষেই বলে দিতে পারবো কিকি ব্যাকটেরিয়া আমি খেতে যাচ্ছি।

 

Reference:

Jolley, K. A. et al. Ribosomal multi-locus sequence typing: universal characterization of bacteria from domain to strain. Microbiology 26 Jan 2012.

লিখেছেন খান ওসমান

আমি জীববিজ্ঞানের ছাত্র। বর্তমানে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আছি। https://www.facebook.com/khan.osman.1

খান ওসমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 30 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত Reply

    আরপিএস নিয়ে দেখলাম — রাইবোজমাল প্রোটিন জিন এরা। রাইবোজোমাল প্রোটিন জিন তো হাউসকিপিঙ জিনের মধ্যে পড়ে … তাই এদের মধ্যে পার্থক্য রিলেটেড স্পিশিসে কম হওয়ার কথা … তারপরেও যখন এদেরকেই ব্যাবহার করছে, ধারণা করছি স্নিপ বিশ্লেষণ এই ‘বারকোডিং’-এর মূলনীতি। আর পনের মিনিটে জিনোম সিকোয়েন্সিঙ তো অসাধারণ ঘটনা — সামনে বড় বড় কাজ আসছে — জিনোমিক্স সহ যাবতীয় ‍অয়িক্সের!

আপনার মতামত