আপনি কি নিজেকে কখনো জিজ্ঞেস করেছেন যে , সময় কি ? আমরা সবাই সজ্ঞাবলে কিংবা ব্যবহারিক প্রয়োগে সময় ব্যাপারটা সহজেই বুঝতে পারি । কিন্তু সময় বলে প্রকৃতপক্ষে কোন কিছু কি অস্তিমান ? এটা কি প্রকৃতির কোন বল ? এটি কি স্পর্শ দ্বারা বোধগম্য কোন সত্ত্বা ? নাকি এটা মানুষের তৈরি কোন কিছু যা উপলব্ধিতার সীমা ছাড়ানো কোন কিছুকে উপলব্ধিতার সীমার ভেতর আনার প্রচেষ্টা চালায় ?

সিন ক্যারল ক্যালটেকের একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ । তিনি হিগস বোসন নিয়ে The Particle at the End of the Universe নামে একটি বই লিখেছেন । তার আরেকটি বইয়ের নাম হল “From Eternity to Here: The Arrow of Time and the Origin of the Universe” । তিনি সময় সম্পর্কে একবার বলেছিলেন ,

” প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক থেকে বর্তমানের অনেক পদার্থবিদ বিস্ময়ের সাথে মনে করেন , হয়তোবা সময় বলে কিছু নেই । হয়তোবা এটি শুধুমাত্র এক প্রকার ভ্রম ব্যতীত কিছু নয় । কিন্তু যদি কেউ আপনাকে বলে , ” সন্ধ্যা ৭ টায় রেস্তোরাঁয় থেকো ” । আপনি এতে কোনরূপ বিচলিত হয়ে বলবেন না যে , “এটা দ্বারা কি বুঝায় ? ৭ টা মানে ? আমার কোন ধারণা নেই । ” আমরা সবাই জানি যে , সময় কি কিংবা এটা কিভাবে কাজ করে । আমাদের পদার্থবিদ্যার মৌলিক সূত্রে এর অনেক ভুমিকা রয়েছে । কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটুকু জেনে মুক্তি পাবার চেয়ে এটা ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করা উচিত ।”

আমরা অতীতের কথা স্মরণ করতে পারি কিন্তু আপনি পারবেন না ভবিষ্যতের কথা স্মরণ করতে । আপনি ভবিষ্যতের জন্য আপনার কাজকে পছন্দ করে রাখতে পারবেন । যেমন আপনি আজ রাতে কি খাবেন তা ঠিক করে রাখতে পারেন । কিন্তু আপনি গতকাল রাতে কি খেয়েছেন তা পুনরায় ঠিক করতে পারবেন না । আমরা অতীতকে কখনো পরিবর্তন করতে পারিনা কিন্তু ভবিষ্যতকে গড়ে তুলতে পারি নিজের পছন্দ অপছন্দ দ্বারা । আমরা ক্রমাগত আমাদের অতীতকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাই ভবিষ্যতের দিকে কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর আবিষ্কার করি যে ভবিষ্যৎটাই অতীত হয়ে গেছে । প্রশ্ন জাগতে পারে তাহলে বর্তমানটা আসলে কি ? বর্তমান বলে আসলে কিছু নেই । মানুষের জীবনটা আসলে অতীত আর ভবিষ্যতের মিশেল ।

এবার মায়ান সভ্যতার একটা স্থাপনার কথা বলি ।

মায়ান সভ্যতার একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা । এর চারপাশে চারটি সিঁড়ি রয়েছে । প্রতিটিতে ৯১ টি করে ধাপ । ৪ দিয়ে গুণ করলে হয় ৩৬৪ । আর উপরে আরেকটি ধাপ রয়েছে । সব মিলিয়ে হয় ৩৬৫ যা এক বছরে ৩৬৫ দিন নির্দেশ করে । তাই দালানটিকে সময় গণনার খুব ভাল একটি নিদর্শন বলা যেতে পারে । আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগের মায়ান সভ্যতার জ্যোতির্বিজ্ঞান ও স্থাপত্যশিল্পে এমন জ্ঞান সত্যি বিস্ময়কর ।

সময় গণনার জন্য মায়ানরা সূর্যকে ব্যবহার করত । মুসলিমরা চন্দ্রকে ব্যবহার করে মাস ও বছর নির্ধারণ করতে । কিন্তু আজকের এই দিনে বিজ্ঞান শুধুমাত্র সূর্য আর চন্দ্রে কিংবা নক্ষত্রে থেমে থাকেনি । এখন দিনের দৈর্ঘ গণনা করতে রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করা হয় । দুটি রেডিও টেলিস্কোপ পৃথিবীর দুই স্থানে স্থাপিত রয়েছে । যখন দুটি টেলিস্কোপেই একই সাথে রেডিও তরঙ্গের সিগন্যাল পাওয়া যায় তখন থেকে সময় গণনা শুরু হয় । পৃথিবী একবার নিজ অক্ষের উপর আবর্তিত হলে পুনরায় একই সাথে সিগন্যাল পাওয়া যায় । তখন সময় গণনা শেষ করলে আমরা এক দিন সমান কত মাইক্রো সেকেন্ড তা জানতে পাই । দেখা যায় প্রায়ই দিনের দৈর্ঘ কয়েক মাইক্রো সেকেন্ড হ্রাস বৃদ্ধি হয় । রেডিও টেলিস্কোপ দ্বারা সবচেয়ে নির্ভুলভাবে দিনের দৈর্ঘ পরিমাপ করা যায় ।

 

 

উপরে প্রদর্শিত ছবিটি জার্মানির ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইন্সটিটিউট অব রেডিওএস্ট্রোনমিতে স্থাপিত একটি ১০০ মিটার ব্যাসবিশিষ্ট একটি টেলিস্কোপের ।

বর্তমানে পারমানবিক ঘড়ির সাহায্যে সবচেয়ে নির্ভুলভাবে সময় পরিমাপ করা হয় । একটি সিজিয়াম নির্মিত পারমানবিক ঘড়ির কথা বিবেচনা করা যায় । এতে সিজিয়াম পরমানুতে ইলেকট্রন লাফ দিয়ে নিম্নশক্তিস্তরে গমন করে । আবার যখন উচ্চশক্তিস্তরে ফিরে আসে তখন সে আলোকরুপে শক্তি বিকিরন করে । এক একটি পরমানু এভাবে প্রতি সেকেন্ডে  ৯ বিলিয়ন সংখ্যক বার শক্তি বিকিরন করে । কখনই এর চেয়ে কম বেশী হয় না । তাই এর সাহায্যে সবচেয়ে নিখুঁতভাবে সময় নিরূপণ সম্ভব হয় ।

 

 

উপরোক্ত চিত্রে একটি পারমানবিক ঘড়ির মূলনীতি দেখানো হয়েছে । এছাড়াও নানা ধরনের ঘড়ি রয়েছে যা নিখুঁতভাবে সময় পরিমাপ করতে পারে । যার সরল ছন্দিত স্পন্দন আছে এমন যেকোন কিছু দিয়েই আপনি সময় পরিমাপ করতে পারবেন ।

সময়ের সবচেয়ে ভাল ব্যাখ্যাটা যিনি দিয়েছেন তার প্রসঙ্গে আসি । বুঝতেই পারছেন আইনস্টাইনের কথা বলছি । তিনি ১৯০৫ সালে তার বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রকাশ করেন । নিউটন বলেছিলেন স্থান আপেক্ষিক কিন্তু কাল পরম । কিন্তু আইনস্টাইন প্রথম বলেন স্থান এবং কাল এই দুইই আপেক্ষিক । পরম বা ধ্রুব শুধুমাত্র আলোর বেগ । তিনি বলেন গতি যত বাড়ে ঘড়ি তত আস্তে ঘুরে । অর্থাৎ সময় বেড়ে যায় । কিন্তু এই তত্ত্ব দিয়ে মহাকর্ষকে ঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না । তাই তিনি দীর্ঘ আট বছর গবেষণা করে ১৯১৫ সালে সাধারন আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রকাশ করলেন । এই তত্ত্বে তিনি এক অসাধারণ ধারনার অবতারণা করলেন । তিনি সময়কে একটি মাত্রা হিসেবে প্রকাশ করলেন । অর্থাৎ স্থানের তিনটি আর কালের একটি মিলে চারটি মাত্রা । স্থানকালকে একটি চাদর হিসেবে কল্পনা করুন । এবার চাদরে একটি ভারী গোলক রাখুন । ধরুন এটি সূর্য । চাদরটি নিচের দিকে ডেবে কুঁচকে যাবে । এবার একটি ছোট বলকে এর মধ্যে ছেড়ে দিন । ধরুন এটি পৃথিবী । বলটি ঘুরে ঘুরে গোলকের সাথে লেগে যাবে । কিন্তু বাস্তবে সৌরজগতে তা হয় না । পৃথিবী ঘুরতেই থাকে । কারণ এটি উপবৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরে । আর উপবৃত্তাকার কক্ষপথে পৃথিবীর কেন্দ্রাকর্ষী বলের চেয়ে ঘূর্ণন বল বেশী হয় । তাই পৃথিবীর কক্ষপথে কোন পরিবর্তন আসে না । যাই হোক মহাশূন্যে অবস্থিত কোন বস্তুর (নক্ষত্র , ডার্ক ম্যাটার ইত্যাদি) ভর যত বেশী হবে সে তত বেশী স্থানকালকে বক্র করে ফেলবে । তাই তার মহাকর্ষ বলও বেশী হবে । তাই মহাকর্ষকে স্থানকালের বক্রতার ফসল হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায় । নিম্নের চিত্রটি থেকে এটা ভালভাবে বুঝা যায় ।

 

 

১৩.৭ বিলিয়ন বছর আগে বিগব্যাং এর মাধ্যমে মহাবিশ্ব তার যাত্রা শুরু করেছিল । মহাবিশ্ব পুরোটাই একটা অসীম ভরবিশিস্ট পরমাণুতে আবদ্ধ ছিল । পরে তা সম্প্রসারিত ও পরিবর্তিত হতে হতে আজকের এই অবস্থায় উপনীত হয়েছে । মহাবিশ্ব এখনো প্রসারমান । প্রশ্ন হল বিগ ব্যাং এর আগে কি ছিল ? বিগ ব্যাং টা হলই বা কেন ? ধরে নিলাম বিগ ব্যাং এর আগে কিছুই ছিল না । আসলেই কি তাই ? কিছু না থেকে কিছু হয় কি করে ? তার মানে কিছু একটা ছিল । তখন কি সময় ছিল ? বিগ ব্যাং এর পর থেকেই নাকি পদার্থবিজ্ঞানের যাত্রা শুরু । তাহলে সময় থাকবে কি করে ! সময়ের উৎপত্তি যদি বিগ ব্যাং এর পর থেকে হয় তার মানে মহাবিশ্বের প্রসারনতার মাঝেই সময়ের বিস্তৃতি । মহাবিশ্বের প্রসারণ যদি থেমে যায় তাহলে কি সময়ও থেমে যাবে ? কিংবা যদি মহাবিশ্ব হঠাৎ সংকুচিত হতে শুরু করে তাহলে সময় কি বিপরীত দিকে ঘোরা শুরু করবে ? এবার ভেবে বলুন তো দেখি সময় জিনিসটা আসলে কি ? এখন কয়টা বাজে ? উত্তর ১৩.৭ বিলিয়ন বছর ৬ মাস ২৬ দিন ৫৬ সেকেন্ড .. ৫৭ সেকেন্ড …. এরকম । তবুও উত্তর অসম্পূর্ণ থেকে যায় । বিগ ব্যাং এর আগের সময়টা কিভাবে বাদ দিবেন আপনি ?

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    লেখাটা ইন্টারেস্টিং, আপনি তো বেশ ভালো লেখেন! আরো লিখুন। তবে বানানগুলো একটু যদি সতর্ক থাকতেন ভালো হতো কিন্তু। রেফারেন্স দিয়েন। ভালো থাকুন।

  2. ANONUMOUS Reply

    ভাল লিখেছেন ।

    ১.”৯ বিলিয়ন সংখ্যক বার” না বলে 9,192,631,770 বার বলা ভাল ।

    ২।”মহাবিশ্ব পুরোটাই একটা অসীম ভরবিশিস্ট পরমাণুতে আবদ্ধ ছিল”
    এখানে মনে হয় ‘পরমাণুতে’ না বলে একটি বিন্দুতে বলা উচিত । কারণ পরমাণু অনেক পরে সৃষ্টি হয়েছে ।

আপনার মতামত