এই সিরিজের অন্যান্য পোষ্টগুলো ( , , , )

মূল : মিশিও কাকু

Founder Of Anti Matter

প্রতিপরমাণু কি ? এটা চিন্তা করে বিস্মিত হতে হয় যে প্রকৃতি যথার্থ কোন কারণ ছাড়াই সাব-অ্যাটমিক কণাদের সংখ্যা দ্বিগুণ করেছিল । আমরা এতোদিন জেনে এসেছিলাম প্রকৃতি সম্পূর্ণ মিতব্যয়ি, কিন্তু এখন আমরা প্রতিকণার কথা জানি আর তাই প্রকৃতিকে মনে করা হয় (অপ্রয়োজনীয়) বস্তুকে সবচেয়ে বেশি অপব্যয় করেছে । প্রশ্ন আসে যদি প্রতিবস্তু থেকে থাকে তাহলে কি প্রতিমহাবিশ্বও আছে? এই প্রশ্নের উত্তর পাবো আমরা প্রতিবস্তুর উৎপত্তিস্থল খুঁজে বের করার মাধ্যমে । সত্যিকারার্থে প্রতিবস্তুর আবিষ্কারের তারিখটি হচ্ছে ১৯২৮ সাল, পল ডিরাকের অসামান্য কাজ হতে । তাকে ভাবা হয় বিংশ শতাব্দীর কয়েকজন প্রতিভাধর বিজ্ঞানীদের মধ্যে একজন । তিনি ছিলেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়য়ের গণিতের লুকেশিয়ান অধ্যাপক পদে (১৯৩২ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৭ বছর), এই একই পদে ছিলেন (৪০০শত বছর পূর্বে) স্যার আইজ্যাক নিউটন, এবং বর্তমানে আছেন স্টিফেন ডব্লু . হকিং । ডিরাক ১৯০২ সালে  (আগস্ট ৮)  জন্মগ্রহণ করেন,  তিনি ছিলেন অনেক লম্বা আর তাঁর শরীর ছিল পেশীবহুল ।

চিত্র : পল অ্যাড্রিয়েন মরিস ডিরাক

১৯২৫ সালে যখন কোয়ান্টাম বিপ্লব শুরু হয়েছে সেই সময়ে ডিরাক ছিল ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র । তিনি কোয়ান্টাম তত্ত্বের স্রোতের প্রতি টান অনুভব করতে শুরু করে । কোয়ান্টাম তত্ত্বের ভিত্তি ছিল এই ধারণার উপর যে কোন কণা যেমন ইলেকট্রন কে বিন্দুর ন্যায় শুধু কণা হিসেবেই বর্ণনা করা হয় না, তরঙ্গ হিসেবেও বর্ণনা করা যায়, যা শ্র্যোডিঙারের বিখ্যাত তরঙ্গ সমীকরণ বর্ণনা করে (তরঙ্গ সমীকরণটি বর্ণনা করে কোন বিন্দুতে কণা খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা) । ডিরাক অনুধাবন করতে পারেন শ্র্যোডিঙারের সমীকরণের ত্রুটি । এই সমীকরণ দ্বারা অল্প গতিতে চলমান ইলেকট্রনের গতিবিধি বর্ণনা করা সম্ভব কিন্তু উচ্চ গতিতে চলমান কণার গতিবিধি বর্ণনা করতে ব্যর্থ কারণ উচ্চগতিতে চলমান বস্তু আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব মেনে চলে, আর শ্র্যোডিঙারের সমীকরণটি ছিল আপেক্ষিক তত্ত্ব বিহীন ।

তরুণ ডিরাক, শ্র্যোডিঙারের সমীকরণ কে আপেক্ষিক তত্ত্ব সম্বলিত করে নতুনভাবে আবার সৃষ্টি করেন । ১৯২৮ সালে ডিরাক আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব সম্বলিত করে শ্র্যোডিঙারের সমীকরণের নতুন একটি সংস্করণ প্রস্তাব করেন । ঐ দিন পদার্থ বিজ্ঞানের সমাজ অভিভুত হয়েছিল (ডিরাকের এই কর্মের জন্য) । ডিরাক তাঁর বিখ্যাত বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব সম্বলিত ইলেকট্রনের সমীকরণ আবিষ্কার করেছিলেন Spinors নামক উচ্চতর গণিত প্রয়োগ করে । গণিতের প্রতি (ডিরাকের এই)কৌতূহল সারা বিশ্বের জন্য বয়ে আনে আলোক মশাল ।

ইলেকট্রনের নতুন সমীকরণ সৃষ্টি করতে গিয়ে ডিরাক বুঝতে পারেন যে আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ E=mc2 সম্পূর্ণ সঠিক না । এই সমীকরণটা এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যা দেখা যেত Modern Avenue এর বিজ্ঞাপনে, বাচ্চাদের T-Shirt এ, কার্টুনে, এমনকি (টিভি সিরিজের অতিমানব)সুপার হিরোদের জামাকাপড়েও, আসলে আইনস্টাইনের সমীকরণ আংশিকভাবে সঠিক ছিল, মূলত সঠিক সমীকরণটি হচ্ছে E=+-mc2  (এখানে ঋণাত্মক চিহ্ন আসার কারণ হচ্ছে উভয় পক্ষকে বর্গমূল করা হয়েছে)।

কিন্তু পদার্থবিদরা ঋণাত্মক শক্তি পরিহার করেন । পদার্থ বিজ্ঞানে একটি স্বতঃসিদ্ধ আছে যা বলে যে ‘বস্তু সব সময় নিম্ন শক্তিস্তরে অবস্থান করে ’ (এর কারণ হচ্ছে পানি সব সময় নিম্নস্তরে অবস্থান করে যাকে আমরা Sea level বলে থাকি )। যেহেতু বস্তু সব সময় নিম্ন শক্তি স্তরে অবস্থান করে তাই ঋণাত্মক শক্তির ভবিষ্যত হয়ে গিয়েছিল অনিশ্চিত, এর অর্থ হচ্ছে সকল ইলেকট্রন সর্বশেষ হোঁচট খায় নিম্নের অসীম ঋণাত্মক শক্তিতে । তাই ডিরাক একটি নতুন ধারণার প্রবর্তন করেন যাকে বলা হয় ‘ডিরাক সি’ । তিনি ধারণা করলেন যে মহাবিশ্ব ছিল স্থির তাই সকল ঋণাত্মক শক্তির স্তর ইতিমধ্যেই পূর্ণ হয়ে গিয়েছে । গামা রশ্মি সাধারণত সংঘর্ষ করে ঋণাত্মক শক্তির স্তরের একটি ইলেকট্রনের সাথে এবং ধনাত্মক শক্তির স্তরে পাঠিয়ে দেয় ।

আমরা দেখতে পাই গামা রশ্মি ডিরাক সিতে একটি ইলেকট্রন ও একটি হোলের সৃষ্টি করে । এই হোল ভ্যাকুয়ামে বাবল এর মতো আচরণ করে; এই বাবল এর ইলেকট্রনের মত একটা চার্জ আছে তবে তা ধনাত্মক । অন্যভাবে বলা যায়, এই হোল প্রতিইলেকট্রনের মতো আচরণ করে । তাই ডিরাক সিতে বাবল প্রতিবস্তুর মতো আচরণ করে ।

চিত্র : ডিরাক সি

ডিরাকের (প্রতিইলেকট্রনের)ভবিষ্যত বাণীর কয়েক বছর পর কার্ল ডেভিড অ্যান্ডারসন প্রতিইলেকট্রন আবিষ্কার করেন (এই জন্য ডিরাক ১৯৩৩ সালে নোবেল পুরস্কার পান এবং অ্যান্ডারসন পান ১৯৩৭ সালে)।

অন্যভাবে বলা যায়, প্রতিবস্তুর অস্তিত্ব আছে তার স্বপক্ষে প্রমান হচ্ছে ‘ডিরাক সমীকরণের দুই ধরনের সমাধান আছে, একটি হচ্ছে বস্তুর জন্য এবং অপরটি হচ্ছে হচ্ছে প্রতিবস্তুর জন্য’ (এবং ফলাফলটি বিশেষ আপেক্ষিকতা সম্বলিত হয়) ।

ডিরাক সমীকরণ শুধু প্রতিবস্তুর সম্পর্কেই ভবিষ্যৎ বানী করে নাই এর সাথে সাথে ইলেকট্রনের ঘূর্ণন (Spin) সম্পর্কেও ভবিষ্যৎ বানী করেছিল । সাব-অ্যাটমিক কণারা ঘূর্ণমান লাটিমের ন্যায় (নিজ অক্ষে) ঘুরে । ইলেকট্রনের এই ঘূর্ণন বুঝার মাধ্যমে আমরা বুঝতে সমর্থ হয়েছি যে কিভাবে ট্রান্জিস্টার ও সেমিকন্ডাকটরের মধ্যে ইলেকট্রন প্রবাহিত হয়, আর এটাই (ইলেকট্রনের এই ঘূর্ণন) হচ্ছে আধুনিক ইলেক্ট্রনিক্সের ভিত্তি ।

স্টিফেন ডব্লু.হকিং দুঃখ প্রকাশ করেন যে ডিরাক তাঁর সমীকরণের পেটেন্ট করেন নাই বলে । সে লিখেন “ডিরাক সৌভাগ্যবান হতেন যদি সে ডিরাক সমীকরণের পেটেন্ট করে যেতেন তাহলে সে প্রতিটি টেলিভিশন, ওয়াকম্যান, ভিডিও গেম, এবং কম্পিউটার হতে রয়েলটি পেতেন ।”

চিত্র : Westminster Abbey এর পাথরের ফলকে ডিরাকের বিখ্যাত সমীকরণটি ।

বর্তমানে Westminster Abbey এর পাথরের ফলকে ডিরাকের বিখ্যাত সমীকরণটি নকশা করা আছে, যা নিউটনের সমাধি হতে খুব বেশি দূরে না । মহাবিশ্বে এটি মনে হয় একমাত্র সমীকরণ যাকে এতো সম্মান দেওয়া হয়েছে ।

Dirac And Newton

বিজ্ঞানের ইতিহাসবেত্তারা নিউটনের সাথে তুলনা করে খুজে বের করতে চান, কিভাবে ডিরাক তাঁর বৈপ্লবিক সমীকরণ এবং প্রতিবস্তুর অস্তিত্বের ধারণায় পৌঁছেছিলেন । কাকতালীয়ভাবে নিউটন ও ডিরাকের মধ্যে অনেক কিছুরই মিল খুজে পাওয়া যায়, যেমন উভয়েই বিশ বছর বয়সে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁদের জীবনের কিছু সময় কাজ করেছিলেন, উভয়েই গণিতের (লুকেসিয়ান) শিক্ষক ছিলেন, শুধু তাই নয় চারিত্রিক দিক দিয়েও তাঁদের মধ্যে অনেক মিল খুজে পাওয়া যায় : এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, সাধারণ মানুষের সাথে মিশার ক্ষমতা তাঁদের মধ্যে কম ছিল ।  উভয়েই তাঁরা স্বল্পভাষী স্বভাবের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন । ডিরাক কে সরাসরি কোন কিছু জিজ্ঞাসা না করলে সে নিজে থেকে কিছুই বলতেন না, আর জিজ্ঞাসা করা হলে তাঁর উত্তর হতো ‘হ্যাঁ’ অথবা  ‘না’ অথবা  ‘আমি কিছুই জানি না’ ।

ডিরাক ছিল অত্যন্ত নম্র এবং সে পছন্দ করত না কোন কিছু প্রচারে । যখন তাকে (১৯৩৩ সালে) নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয় তখন বিখ্যাত হবার ভয়ে তিনি তা গ্রহন করবেননা বলে ঠিক করেছিলেন । কিন্তু যখন সে বুঝতে পারল নোবেল পুরস্কার গ্রহণ না করলে আরো বেশি পরিচিত হয়ে যাবেন তাই পরে সে বাধ্য হয়ে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ।

নিউটন সম্পর্কে এমন কিছু ভলিউম আছে যেখানে অনুমান করা হয়েছে,  নিউটনের মানসিক অসুস্থতার কারণ হচ্ছে পারদ বিষক্রিয়া । কিন্তু বর্তমানে ক্যামব্রিজের (Psychologist)মনস্তত্ত্ববিদ Simon Baron-Cohen নতুন একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন যা সম্ভবত ব্যাখ্যা করে নিউটন ও ডিরাকের  অদ্ভুত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক গুলো । Baron-Cohen দাবী করেন যে তাঁরা  উভয়েই Asperger’s Syndrome এ আক্রান্ত ছিলেন, যা এক প্রকার অটিজম, Rain Man চলচিত্রের  (Raymond Babbitt এর চরিত্রটি) নির্বোধ পণ্ডিতের সাথে যার মিল পাওয়া যায় । Asperger ভোগ করা ব্যক্তিবিশেষে একটু চাপা স্বভাবের হয়ে থাকে, সামাজিক ভাবে কদর্য হয়, এবং আশীর্বাদ স্বরূপ এদের থাকে গাণিতিক সমস্যা সমাধানের অস্বাভাবিক ক্ষমতা, কিন্তু অটিস্টিক ব্যক্তিবিশেষ এরা সমাজে সক্রিয় থাকে, এবং গুরুত্বপূর্ণ কর্মগুলো সম্পাদন করে । যদি এই তত্ত্বটি সঠিক হয়, তাহলে খুব সম্ভবত বিস্ময়কর গাণিতিক সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা নিউটন ও ডিরাকের পুরস্কার হিসেবে পাওয়া, সামাজিকতা মানবতার শান্তি হতে তাঁদেরকে পৃথক করে ।

 

চলবে…

………………………………………………………………………………………

মিশিও কাকুর Physics of the impossible বইয়ের ১০ম অধ্যায়টি নিজের ভাষায় লিখার চেষ্টা করেছি । এই পোষ্টে কিছু চিত্র সংযোজন করলাম যা মূল বইয়ে ছিল না শুধু পাঠকের বুঝার সুবিধার জন্য ।

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    বেশ অনেকদিন পর আপনার লেখা পড়ে ভালো লাগলো। এই গল্পটা পড়তে দারুন লাগছে … তবে ডিরাক আর নিউটন অংশে ভাষাটা একটু এলোমেলো হয়ে গেছে … ভাগ্য ভালো ডিরাক তার সমীকরণ পেটেন্ট করেন নি … মানুষের জ্ঞানের কিছু কিছু জিনিস উন্মুক্ত রাখা উচিত … নিউটন যদি তার মহাকর্ষের সূত্র পেটেন্ট করতো কিংবা অাইনস্টাইন যদি তার সূত্র পেটেন্ট করতো তাহলে সেটা কিরকম হতো?

    • অজানার সন্ধানে Reply

      আরাফাত ধন্যবাদ । হ্যাঁ অনেক দিন পরে লিখলাম ।

      “তবে ডিরাক আর নিউটন অংশে ভাষাটা একটু এলোমেলো হয়ে গেছে”

      হ্যাঁ আপনার এই কথার সাথে আমিও এক মত পোষণ করি । দেখি সময় করে একটা শুদ্ধি অভিযান চালাবো । তবে আপনার কমেন্ট পড়ে ভালো লেগেছে ।‘ডিরাক আর নিউটন’ পার্টটায় ভাষার কিছু গোলমাল আছে । আশা করি খুব তাড়াতাড়ি ঠিক করে দিব ।
      ভালো থাকবেন……

আপনার মতামত