[কিছুদিন আগে মারা গেছেন প্রথিতযশা বাঙ্গালি বিজ্ঞানী প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম। তাঁর মৃত্যুর পর একটা জিনিস প্রবলভাবে অনুধাবন করলাম আর তা হল বাঙ্গালির বিজ্ঞান বিমুখতা। জামাল নজরুল ইসলামকে বলা হত ছোট দেশের বড় বিজ্ঞানী কিন্তু নিজ দেশের খুব কম লোকই তাঁকে চিনতেন। তাঁর মৃত্যুর পর কৃতী নিভৃতচারী গবেষকদের নিয়ে একটা ধারাবাহিক লেখার তাগিদ অনুভব করলাম। সেই ধারায় আজকের প্রবন্ধটির নায়ক প্রফেসর আবুল হুসসাম।]

শিক্ষা ও কর্মজীবন:[১][২]

আবুল হুসসামের জন্ম ১৯৫২ সালে কুষ্টিয়া জেলায়। কুষ্টিয়ায় প্রাথমিকভাবে পড়াশোনা শেষ করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর রসায়ন বিভাগ থেকে ১৯৭৫ সালে বিএসসি এবং ১৯৭৬ সালে এমএসসি সম্পন্ন করেন। ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে analytical chemistry তে পিএইচডি অর্জন করেন। এর পর ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি ইউনিভার্সিটি অফ মিনেসোটার রসায়ন বিভাগে পোষ্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৮৫ সালে তিনি ভার্জিনিয়ার জর্জ ম্যাসন ইউনিভার্সিটিতে রসায়ন ও জৈবরসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন।

ড. আবুল হুসসামের গবেষণার বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত ইলেক্ট্রোএনালাইটিকাল কেমিস্ট্রি, এনভারনমেন্টাল কেমিস্ট্রি এবং কেমিস্ট্রি ইন অর্গানাইজড মিডিয়া। প্রথম দিকে তাঁর গবেষণার অন্তর্গত ছিল তড়িৎরসায়ন, spectroscopic এবং FTIR বিশ্লেষণ। পরবর্তীতে তিনি কম্পিউটার নিয়ণ্ত্রিত যন্ত্রপাতি উদ্ভাবণ করেন এবং আরো জটিল গবেষণার প্রতি মনোযোগ দেন।  এই ধরনের গবেষণার তাঁকে পানির বিভিন্ন বিশাক্ত দ্রব্য সনাক্তকরণ এবং সেগুলোর প্রশমনের সুযোগ তৈরি করে দেয়। এই সময় তিনি বাংলাদেশ ও পুর্বভারতের ভূ-গর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক সমস্যার প্রকোপ দূরীকরণে কাজ করার তাগিদ অনুভব করেন এবং এই লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালে  কাজ শুরু করেন। তাঁর কাজের প্রতিবন্ধকতা ছিলো বিপুল পরিমান মানুষের বিশেষত গ্রামীন দরিদ্র মানুষের সুপেয় পানির চাহিদা পুরনে সহজ্যলভ্য এবং কম খরচে আর্সেনিক দূর করা।

 

নিরলস প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের পর কয়েক বছরের মধ্যে ড. হুসসাম সনোফিল্টার তৈরি করেন। তাঁর দুইভাই আবুল মুনির ও আবুল বারাকাত এই কাজে তাঁকে সহায়তা করেন। এই ফিল্টারটি পানিতে উপস্থিত আর্সেনিক প্রায় সম্পূর্ণরূপে দূর করে। ফিল্টারটি তৈরিতে তিনি অত্যন্ত সহজলভ্য এবং সস্তা জিনিস ব্যবহার করেন যার মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিকের বালতি, স্হানীয় ভাবে প্রাপ্ত বালি, ইটের খোয়া, লোহার কম্পোজিট এবং কাঠকয়লা। এই উদ্ভাবনের স্বীকৃতিসরূপ তিনি ২০০৭ সালে US National Academy of Engineering (NAE) কর্তৃক Grainger Challenge Prize for Sustainability পুরষ্কার লাভ করেন। এই পুরষ্কারের মূল্যমান প্রায় আট কোটি টাকায়। ইন্জিনিয়ারিংএর সর্বোচ্চ পুরষ্কারগুলোর মধ্যে এটি একটি। তাঁর পুরষ্কারের ৭০ ভাগ অর্থ তিনি গ্রামীন দরিদ্রমানুষের জন্য আর্সেনিক ফিল্টার তৈরি করে দেয়ার জন্য ব্যয় করার ঘোষনা দিয়েছেন। এছাড়া ২৫ ভাগ ব্যয় হচ্ছে উচ্চতর গবেষণার জন্য। বাকী ৫ ভাগ তিনি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ফান্ডে দান করেছেন। একই বছর অর্থাৎ ২০০৭ সালে তিনি বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন কর্তৃক Global Hero of the Environment সম্মাননা লাভ করেন।[২][৩][৪]

২০০০ সাল থেকে আবুল হুসসাম পরিবার বাংলাদেশে সনোফিল্টার বিতরণ শরু করে। কুষ্টিয়া নিজগ্রাম থেকেই এই বিতরণ শুরু হয়। প্রচুর স্কুল-কলেজ ও প্রতিষ্ঠানে সনোফিল্টার অনুদান দেওয়া হয়। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন: “ প্রথমে লেকজন আমাদের বিশ্বাস করতে চায় নি। কিন্তু যখন ফিল্টারটির কার্যকারিতা হাতে কলমে দেখানো হল এবং পাঁচ বছরে মাত্র ৩৫ ডলারে ফিল্টারের সব ব্যয় সংকুলন করার হিসাব দেওয়া হল তখন সবাই বিশ্বাস করতে শুরু করল।“[৫]

প্রফেসর আবুল হুসসাম একজন নিবেদিত প্রাণ বিদ্যানুরাগী। তিনি বাংলাদেশে পরিবেশবিষয়ক গবেষণার উদ্যোগ নিয়েছেন এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পরিবেশ উন্নতিকল্পে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি “জার্নাল অফ এনভারনমেন্টসায়েন্স” এর সম্পাদনা পরিষদের একজন সদস্য এছাড়া অনেক প্রখ্যাত জার্নালের রিভিউয়ার। বিভিন্ন জার্নাল ও বইয়ে এ পর্যন্ত তাঁর শতাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি মনে করেন উচ্চতর, সর্বব্যাপী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিদ্বারাই সম্ভব দারিদ্রের মূলোৎপাটন করা এবং এই লক্ষ্যেই তিনি নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।[৫]

পুরষ্কার ও সম্মাননা:[৬]

  • সম্মানসূচক ডক্টর অব সায়েন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০৯
  • National Academy of Engineering 2007 Grainger Challenge Prize Gold Award, 2007.
  • Bangladesh American Society for Humanity Award, 2007.
  • TIME Magazine, Global Heroes of the Environment Award, 2007.
  • Distinguished Alumni Award, Department of Chemistry, University of Pittsburgh, 2008.
  • Outstanding American by Choice Award, US Citizenship and Immigrations Services, 2008.
  • Distinguish Speaker Series Award, Kalamazoo Math and Science Center, Kalamazoo, Michigan, 2008.
  • Mercantile Bank Foundation Award in the field of Science and Technology, Bangladesh, 2010.

 তথ্যসূত্র:

১. http://en.wikipedia.org/wiki/Abul_Hussam

২. http://chemistry.gmu.edu/faculty/hussam/index.html

৩. http://www.somewhereinblog.net/blog/misscallmofizblog/28741247

৪. http://www.time.com/time/specials/2007/article/0,28804,1663317_1663323_1669907,00.html

৫. http://gazette.gmu.edu/articles/9780

৬. http://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%86%E0%A6%AC%E0%A7%81%E0%A6%B2_%E0%A6%B9%E0%A7%81%E0%A6%B8%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%AE

লিখেছেন bengalensis

পোস্টডক্টরাল গবেষক: Green Nanomaterials Research Center Kyungpook National University Republic of Korea.

bengalensis বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 70 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    খুব গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ … বাংলার নিভৃতচারী বিজ্ঞানীদের উপর গোছানো লেখা তেমন পাওয়া যায় না, বিভিন্ন রেফারেন্স ঘেঁটে ঘেঁটে এ ধরনের লেখা তৈরি অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য কাজ … আমাদের কীর্তিমান বিজ্ঞানীদের এভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে আপনি সময়োপযোগী দায়িত্ব পালন করছেন …

  2. ছাইপাঁশ Reply

    আমরা সমসাময়িক খ্যাতিমান কবি, চিত্রকর, সাহিত্যিক, পরিচালকদের মধ্যে থেকে কম পক্ষে পাঁচ ছয় জনের নাম যে কোনো সময় বলতে পারি কিন্তু কোনো বিজ্ঞানী বা বিজ্ঞান গবেষকের নাম বলতে পারি না।

    আপনার উদ্যোগটা খুবই ভালো। কিছু গুনী গবেষক/বিজ্ঞানী কে অন্তত চেনা যাবে, তাদের কাজ সমন্ধে ধারণা পাওয়া যাবে।

আপনার মতামত