বিজ্ঞান রিভিউ লিখতে বসে শুধু দুটি ঘটনাই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। একটি হিগস্ বোসন আর অপরটি কিউরিওসিটি। বলতে গেলে এই দুটি জিনিসই ২০১২ সালের বিজ্ঞান জগতের পুরোটা দখল করে রেখেছে। কিন্তু একটু ঘাটাঘাটি করে যা খুঁজে পেলাম তা মোটামুটি পিলে চমকানোর মত। আজ ২০১২ সালের উল্ল্যেখযোগ্য কিছু বিজ্ঞান অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করব। প্রথমে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়দুটি নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা যাক।

হিগস-বোসন আবিষ্কার:
এই লেখাটি যখন শুরু করেছি তখন পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞানীগণ হিগস-বোসন আবিষ্কৃত হয়েছে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন না। আমাদের এই মহাবিশ্ব যে সব মৌলিক কণিকা দ্বারা তৈরি হয়েছে বিজ্ঞানীরা সেগুলোকে এখটি সার্বজনীন মডেলের মাধ্যমে ব্যখ্যা করার চেষ্টা করেন। এটাকে standard model বলা হয়। এই স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুসারে ব্যখ্যা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখলেন কিছু কিছু কণিকা যেগুলো ভরযুক্ত তাদের আসলে ভর থাকার কথা নয়। আবার ভরের উপস্থিতি বিদ্যমান অথচ কোনো কণিকা পাওয়া যাচ্ছে না, এমন ক্ষেত্রও বিদ্যমান। এই পরিস্থিতিকে ব্যখ্যা করতেই হিগস বোসন কণিকার সুত্রপাত। বিজ্ঞানীরা ধরে নেন কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেগুলোতে কোনো কণার অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না সেগুলোতে হিগস নামের একধরনের কণা বিদ্যমান। এই কণিকার অস্তিত্ব প্রমাণের জন্যই গত বছর Large Hedron Collider এ এ সংক্রান্ত পরীক্ষা-নীরিক্ষা চালান এবং নতুন এক ধরনের কণিকার অস্তিত্ত্ব আবিষ্কার করেন। এই নতুন আবিষ্কৃত কণিকাটি হিগস্ কিনা সেই ব্যাপারে তাঁরা পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন না। এই লেখা যখন পোষ্ট করা হচ্ছে তার আগের দিনই নতুন প্রাপ্ত কণিকাটি হিগস্ বোসন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

হিগস শনাক্তকরণ চলছে

মঙ্গল গ্রহে ‘কিউরিওসিটি প্রেরণ’:
গতবছরের আগষ্টের ৬ তারিখে মঙ্গল গ্রহ ‘কিউরিওসিটি’ নামক রোভার স্কাউটের সফল অবতরণ করানো হয়। একে প্রেরণের প্রধান উদ্দেশ্যগুলো হচ্ছে মঙ্গলে প্রানের অস্তিত্ব সম্বন্ধে ধারনা লাভ, জলবায়ু এবং ভুগঠনের জ্ঞান অর্জন। কিউরিওসিটি আকারে একটি ছোট গাড়ির সমান যার মধ্যে আছে হাইরেজ্যুলেশন ক্যামেরা, এক্সরে ডিফ্রাক্টোমিটার- যার মাধ্যমে কোনো ক্রিষ্টালের গঠন জানা যায়। নমুনা সংগ্রহের জন্য এর মধ্যে একটি ড্রিল মেশিন রয়েছে। বিশেষ কোনো বস্তুর প্রতি কৌতুহল তৈরি হলে কিউরিওসিটি লেজার নিক্ষেপের মাধ্যমে এর কিছু অংশ বাষ্পে পরিণত করে সেই বাষ্পের বর্ণালী নিরিক্ষা করতে পারে। এই রোভারের মধ্যে মোট ১৭ টি ক্যামেরা আছে যেগুলোর একেকটি একেক কাজের জন্য পারদর্শী। এছাড়া রাসায়নিক বিশ্লেষন এবং গবেষনার জন্য এর ভেতরে ছোট-বড় অনেকযন্ত্রপাতি সংযোজন করা আছে। এই যন্ত্রটিকে একটি স্বয়ংস্বম্পূর্ণ গবেষণাগার বলা যায়। শক্তি সরবরাহের জন্য এই রোভারটিতে একটি পারমানবিক ব্যাটারী সংযোজিত হয়েছে যা আগে প্রেরিত যানগুলোর চেয়ে ব্যতিক্রম। এই রোভারটি ইতিমধ্যে প্রচুর তথ্য পৃথিবীতে পাঠিয়েছে এবং আরো দেড় বছর ধরে অনেক তথ্য পৃথিবীতে পাঠাবে। মঙ্গলে মানুষ প্রেরনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য এই রোভারের গবেষণার মাধ্যমে বহুলাংশে জানা যাবে।
নিজের ধাতব হাতে তোলা কিউরিওসিটি রোভারের ছবি

এবার একে একে কিছুটা কম আলোচিত বিষয়গুলোর অবতারণা করা যাক:

জিনগতভাবে পরিবর্তিত রেশম পোকা: জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংএর মাধ্যমে একপ্রজাতির রেশম পোকার জিনগত পরিবর্তন ঘটানো হয়। এই পরিবর্তনের ফলে রেশমপোকার উৎপাদিত রেশমের গঠনে পরিবর্তন ঘটে এবং এর দৃঢ়তা বৃদ্ধি পায়। এই দৃঢ়তা ইস্পাতের চেয়েও বেশী। এর ফলে ভবিষ্যতে এই দৃঢ় রেশম ব্যবহারে মাধ্যমে আরো দৃঢ় স্হাপনা, অবকাঠামো নির্মান এবং যন্ত্রপাতি তৈরি করা যাবে বলে আশা করা যায়।
রেশম পোকা

কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষনক্ষম পলিমার উদ্ভাবন: ক্যালিফোর্নিয়ার একদল গবেষক একধরনের প্লাস্টিক তৈরি করেছেন যা কার্বনডাইঅক্সাইড শোষক করতে পারে এবং বায়ুমন্ডলে নিঃসৃত কার্বন-ডাই অক্সাইড হ্রাস করতে পারে। এই ঘটনা অনেকটা সালোক-শংশ্লেষন প্রক্রিয়ায় কার্বন-ডাই অক্সাইড শোষনের মত। এই প্লাস্টিক ব্যবহার করে প্লাস্টিকের গাছ(!) তৈরি করে বায়ুমন্ডলের গ্রিনহাইজ প্রভাব প্রতিরোধ করতে কার্যকরী ভুমিকা রাখতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নতুন তথ্য সংরক্ষণ পদ্ধতি: IBM এর গবেষকগণ তথ্য সংরক্ষণের একটি নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। এর মাধ্যমে কম্পিউটারের তথ্য সংরক্ষণের একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হল। এই পদ্ধতিতে প্রতি বিটি তথ্য সংরক্ষণের জন্য মাত্র বারোটি আয়রন পরমানুর প্রয়োজন হয়। বর্তমানে বাজারে যেই হার্ডডিস্ক পাওয়া যায়, তাতে প্রতি বিট তথ্য সংরক্ষণের জন্য প্রায় ১০ লক্ষ পরমাণুর প্রয়োজন হয়। নতুন পদ্ধতিতে তথ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে খুব অল্প জায়গায় বিপুল পরিমান তথ্য ধারন সম্ভব হবে এবং প্রতিটি যন্ত্র যেগুলোতে তথ্য ধারনের দরকার হয় সেগুলোর আকৃতি কমে আসবে।

প্রাণের নতুন কেমিক্যাল কোড: এতদিন পর্যন্ত প্রাণের রাসায়নিক কোড বহন এবং বিস্তারের জন্য দুধরনের পদার্থের অস্তিত্ব ছিলো। একটি হচ্ছে DNA এবং অপরটি RNA. কিন্তু এ বছরই গবেষকগণ এক নতুন ধরনের কেমিক্যাল উদ্ভাবন করেছেন যার নাম দিয়েছেন XNA. XNA এর গঠন অনেকটা ডিএনএর মতোই তবে এই ক্ষেত্রে ডিএনএতে অবস্থিত রাইবোজসুগারটির বদলে এখানে ভিন্ন ধরনের চিনির অনু ব্যবহার করা হয়েছে। মোট ছয় ধরনের চিনির অণু ব্যবহার করে XNA তৈরি করা হয়েছে।এই XNA যুক্ত অর্গানিজমকে পরিবেশে ছেড়ে দিয়ে দেখা গেছে যে এরা DNA এর মতোই প্রতিলিপি তৈরি করতে সক্ষম এবং স্বাধীনভাবে বংশবৃদ্ধি করতে সক্ষম। এই নিয়ে বিস্তারিত পাবেন http://www.bigganblog.org/?p=1079 এখানে।

ত্রিমাত্রিক প্রিন্টিং: এর আগে প্রিন্ট মিডিয়া ছিলো মুলত কাগজ বা কাপড়, যার উপরে দ্বিমাত্রিক প্রিন্টিং করা হত। কিন্তু এই বছর আস্ত একটি ত্রিমাত্রিক বস্তুকে কম্পিউটারে ডিজাইন করে প্রিন্টারের মাধ্যমে তৈরি করে ফেলার প্রযুক্তি ব্যপক প্রসার লাভ করে। ত্রিমাত্রিক প্রিন্টিং এর ধারনা যদিও নতুন নয় তথাপি গতবছরই এই প্রযুক্তি প্রথম বাণিজ্যিক ভাবে বিস্তৃত হয় এবং সাধারণের নাগালে আসে। তাছাড়া এবছরই সবরকম আকৃতি, সবরকম বস্তুর জন্য ত্রিমাত্রিক প্রিন্টিং এর ক্ষেত্র বিস্তৃত হয়। ত্রিমাত্রিক প্রিন্টিংএর মাধ্যমে অনেক জটিল জটিল ডিজাইন, স্হাপত্য ও যন্ত্রাংশ খুব সহজে তৈরি করা সম্ভব হবে।

কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন: ভ্রমণ না করিয়ে কোনো বস্তুকে একস্থান থেকে অন্যস্থানে তাৎক্ষণিকভাবে প্রেরণ করাকে টেলিপোর্টেশন বলা হয়। তবে কোয়ান্টম টেলিপোর্টেশনের সংঙ্গা আরেকটু বিশেষায়িত। অভ্যন্তরীন স্থানে পরিভ্রমন না করিয়ে এক কিউবিট (কোয়ান্টাম তথ্যের একক) পরিমান কোনো তথ্যকে একস্থান থেকে অন্য স্থানে প্রেরন করাই হল কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন। এই বছর কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশনই হয়তো হয়ে উঠবে আমাদের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম।

উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যাটারি: প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে বিভিন্ন যন্ত্রপাতির কর্মক্ষমতা। এই কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাদের শক্তি চাহিদা। বিশেষ করে তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক যন্ত্রগুলো যেমন কম্পিউটার, মোবাইল ফোন প্রভৃতির কর্মক্ষমতা কিছুদিন পরপর আগের চেয়ে দ্বিগুন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই যন্ত্রগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত ব্যাটারিগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা সেই হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এর ফলে এই যন্ত্রগুলোর কার্যক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। গত বছর ব্যাটারিখাতে কিছু উল্ল্যেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। IBM এর গবেষণাগারে বর্তমানে ব্যাবহৃত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির কার্যকারীতা কয়েকগুন বাড়ানোর মত প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়। এই নতুন ব্যাটারিগুলোকে লিথিয়াম-এয়ার ব্যাটারি নাম দেয়া হয়। এটা অনেকটা ফুয়েল সেলের মত কাজ করে। ব্যাটারি ব্যবহৃত হওয়ার সময় এটা বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহন করে এবং লিথিয়াম পারঅক্সাইড উৎপন্ন করে। এই প্রক্রিয়াটি উচ্চ শক্তি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে অতি অল্প সময়ে বিপুল শক্তি খরচ করা সম্ভব হয়। ব্যাটারি যখন চার্জ করা হয় তখন এর বিপরীত প্রক্রিয়ায় সঞ্চিত শক্তি সঞ্চিত হয় এবং অক্সিজেন বাতাসে মুক্ত হয়।

কৃত্রিম জেলিফিশ:
সিলিকোন এবং গবেষনাগারে প্রস্তুত হৃদপেশী ব্যবহার করে সঞ্চালনক্ষম কৃত্রিম জেলিফিশ তৈরি করা হয়েছে। বিস্তারিত http://www.bigganblog.org/?p=1353 এই পোস্টে।

জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কার:
জিনোম সিকোয়েন্স বিশ্লেষণের সহজ প্রযুক্তি উদ্ভাবন হওয়ায় এই বছর প্রচুর প্রাণী ও উদ্ভিদের জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কার করা হয়েছে।

উপরে আলোচিত ঘটনাগুলোর বাইরেও আরো অনেক উদ্ভাবন ও আবিষ্কার রয়েছে যেগুলো অনায়াসে এই তালিকায় স্থান পেতে পারে। মাস অনুযায়ী নিচে এর তালিকা দেয়া হল:
জানুয়ারী:
১. ইঁদুরের উপর স্টেমসেল প্রয়োগ করে এর আয়ু দুই থেকে তিনগুন বৃদ্ধি করা গেছে। এই প্রক্রিয়ায় এক সময় হয়তো মানুষের আয়ুও বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।
২. খুবই নিন্ম রোধ বিশিষ্ট অতি সূক্ষ পরিবাহক তার উদ্ভাবন করা হয়েছে যা সূক্ষ ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতিতে ব্যবহারযোগ্য।
৩. আমেরিকা, ফ্রান্স ও ইতালির গবেষকদের নিয়ে পরিচালিত একটি দল তুলা আঁশ থেকে একধরনের কর্মক্ষম ট্রানজিস্টর তৈরি করেছেন। এই ট্রান্সজিস্টরগুলো কাপড়ের মধ্যে ব্যবহার করা সম্ভব। এর মাধ্যমে পরিধেয় পোশাকের মধ্যে ইলেক্ট্রনিক্স যুক্ত করে জীবন-যাপন আরো সহজসাধ্য করা যেতে পারে।
৪. গবেষকগণ একধরনের হরমোন আবিষ্কার করেছেন যা পেশীতে ব্যায়ামের মত একই ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
৫. অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক কার্যকর হেপাটাইটিস-সি এর টিকা তৈরি করেছেন।
৬. পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্রাকৃতির মেরুদন্ডী প্রাণী আবিষ্কৃত হয়েছে। এটি একটি ব্যঙ যার দৈর্ঘ্য মাত্র ৭ মিলিমিটার।

সবচেয়ে ক্ষুদ্রাকৃতির মেরুদন্ডী প্রানী

৭. জোতির্বিদগণ সবচেয়ে দুরবর্তী বামন গ্যালাক্সী খুঁজে পাওয়ার ঘোষনা দিয়েছেন যা পৃথিবী থেকে ১০০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে।
৮. দক্ষিন কোরিয়ার একদল গবেষক একধরনের টাচস্ক্রীন তৈরি করেছেন যা ডিএনএ অণুর উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে।
৯. আমেরিকার একদল বিজ্ঞানী মস্তিষ্কের সিগন্যাল থেকে মনের কথা উদ্ধার করার একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন।

ফেব্রুয়ারী:
১. সফলতার সঙ্গে বিশ্বের সর্ববৃহৎ টেলিস্কোপটি চালু করা হয়েছে।
২. অল্প সময়ের মধ্যে স্নায়বিক ক্ষয় পূরণের একটি পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়েছে।
৩. শ্যামন মাছের ডিএনএর সাথে সিলভার পরমাণু যুক্ত করে প্রথমবারের মত কর্মক্ষম ডিএনএ কম্পিউটার তৈরি করা হয়েছে।
৪.হার্টএ্যটাক এড়ানোর জন্য হৃদপিন্ডের ক্ষতিগ্রস্থ কোষ মেরামত করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন আমেরিকার বিজ্ঞানীরা।
৫. নাসার বিজ্ঞানীগণ মহাশুন্যে কঠিন অবস্থার(C-60) উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন।

ফুলারিন

৬. প্রথমবারের মত কোনো পরমানুর অভ্যন্তরের চার্জঘনত্বের ছবি তোলা হয়েছে।

মার্চ:
১. এইডস প্রতিরোধে নতুন কার্যকরী অগ্রগতির ঘোষনা দেয়া হয়। এই পদ্ধতিতে একটি প্রচলিত ক্যান্সার নিরাময়কারী ঔষধ ব্যবহার করা হয়।
২. ক্যালিফোর্নিয়ার একটি কম্পানী প্রচলিত সবচেয়ে সস্তা সোলার সেলের দামের অর্ধেক দামে সোলার প্যানেল তৈরি করেছে।
৩. প্রথমবারের মত যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে নিউট্রিনো প্রেরণের পরীক্ষা করা হয়েছে।
৪. প্রথমবারের মত একটি চতুষ্কোণ গ্যালাক্সী পর্যবেক্ষণ করেছেন জোতির্বিদগণ।

চতুষ্কোণ গ্যালাক্সী

এপ্রিল:
১. অস্ট্রিয়া এবং জাপানের উদ্ভাবকগণ সোলার সেল তৈরি করেছেন যা মাকড়সার জালের চেয়েও সরু এবং এতই নমনীয় যে একটি চুলের চারদিকে প্যাঁচানো যায়।
২. প্রথমবারের মত সমগ্র মহাবিশ্বের কম্পিউটার মডেল তৈরি করা হয়েছে যেখানে বিগব্যাং থেকে শুরু করে আধুনিক মহাবিশ্ব পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
৩. জার্মান বিজ্ঞানীগণ একধরনের ওয়াল পেপার তৈরি করেছেন যা ভুমিকম্প হলে ঘর-বাড়ি ভেঙে পড়ার গতি হ্রাস করবে। ফলে ভুমিকম্পের ফলে সৃষ্ট প্রাণহানি কমে যাবে।
৪. বয়সের সাথে সাথে কাজ বন্ধ হয়ে যায় মানবদেহের এমন জিনগুলো শনাক্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে যথোপযুক্ত নিরাময়ের মাধ্যমে এই জিনগুলোর কার্যকারিতা বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
৫. গবেষকগণ একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটার উদ্ভাবন করেছেন যা কেবলমাত্র ৩০০ টি পরমাণ দিয়ে গঠিত। এর কর্মক্ষমতা এতোটাই প্রবল যে প্রচলিত পদ্ধতিতে এই কর্মক্ষমতা সম্পন্ন একটি কম্পিউটার তৈরি করলে তার আকৃতি হবে পুরো বিশ্বব্রাহ্মান্ডের সমান।

মে:
১. ফ্রেঞ্চ গবেষকগণ সিলিসিন নামক সিলিকনের এক পরমানু স্তর বিশিষ্ট পর্দা তৈরি করেছেন যা কার্বনের রূপভেদ গ্রাফিনের সমতুল্য।
২. চীনের বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশনের মাধ্যমে ৯৭ কিলোমিটার দূরে ফোটন কণিকা প্রেরণ করে নতুন বিশ্বরেকর্ড করেছেন।
৩. আমেরিকার বিজ্ঞানীরা একটি যন্ত্র তৈরি করেছেন যাতে কৃত্রিমভাবে রূপান্তরিত ভাইরাসের মাধ্যমে বিদ্যূত উৎপাদন করা যায়।
৪. আমেরিকার উদ্ভাবকগণ বারংবার তথ্য সংরক্ষণ করা যায় এমন একটি ডিজিটাল মেমরি উদ্ভাবন করেছেন যা ডিএনএ ব্যবহার করে তৈরি।
৫. সবচেয়ে এফিশিয়েন্ট সোলার সেল তৈরি করা হয়েছে যা এর উপর আপতিত ৪৩.৫% সূর্যকিরণকে বিদ্যুতে রূপান্তরিতে করতে পারে। প্রচলিত সোলার সেলে এই দক্ষতা প্রায় ৩০% এর কাছাকাছি।

জুন:
১. পক্ষাঘাতগ্রস্থ ইঁদুরকে চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সচল করা সম্ভব হয়েছে।
২. আমেরিকার গবেষকগণ নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া ধারনক্ষম এক ধরনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। বর্তমানে প্রচলিত পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে ফিশন প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপাদন করা হয় যা ঝুঁকিপূর্ণ। সেই তুলনা ফিউশন প্রক্রিয়া অনেক নিরাপদ। এই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে ফিউশন প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের দরজা উন্মুক্ত হল।
৩. ইউরোপের সবচেয়ে প্রাচীন গুহাচিত্র আবিষ্কৃত হয়েছে যা ৩৮০০০ বছর পুরোনো।

৪. পদার্থবিদগণ গোল্ড আয়ন সংঘর্ষের মাধ্যমে কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমা তৈরি করেছেন যা বিগব্যাং এর পরবর্তী মহবিশ্ব সম্পর্কে ধারনা তৈরি করে।

জুলাই:
১. বিজ্ঞানীগণ প্রথমবারের মত সরাসরি ডার্ক ম্যাটার শনাক্ত করেছেন।
২. প্রথমবারের মত HIV প্রতিরোধক কার্যকর ব্যবস্থা উদ্ভাবিত হয়েছে। এই প্রতিরোধক এখনো সংক্রমিত নয় এমন প্রাপ্ত বয়ষ্ক ব্যক্তির HIV সংক্রমন রোধে কাজ করবে।
৩. বোন ম্যারো প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে দুইজন ব্যক্তি HIV মুক্ত হয়েছেন।

আগষ্ট:
১. নৃবিজ্ঞানীগণ কেনিয়ায় দুইলক্ষ বছরের পুরাতন একনতুন মানবপ্রজাতির ফসিল আবিষ্কার করেছেন।
২. দক্ষিনকোরিয়ার গবেষকগণ একধরনের কার্বন ব্যাটারি উদ্ভাবন করেছেন যা প্রচলিত ব্যাটারীর চেয়ে ১২০ গুন দ্রুত রিচার্জ করা যায়।
৩. নক্ষত্রের অন্তিমদশায় এর আকৃতি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এর নিকটে ঘুর্নায়মান গ্রহগুলোকে গ্রাস করে ফেলে। জ্যোতির্বিদগণ প্রথমবারের মত এই ধরনের একটি ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছেন।
৪. জোতির্বিদগণ প্রথমবারের মত দুই exoplanet আবিষ্কার করেছেন যা দ্বি-নাক্ষত্রিক (binary star) সিস্টেমে প্রদক্ষিণ করে।

সেপ্টেম্বর:
১.মঙ্গলের শিলায় কিছু গোলাকার বস্তু শনাক্ত করা হয়েছে যা থেকে ধারনা করা হচ্ছে দীঘদিন পুর্বে মঙ্গলে অনুজীবের উপস্থিতি ছিল।

২. জাপানী গবেষকগণ দ্রুত তথ্য প্রেরণের নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। এই প্রযুক্তিতে একটি মাত্র তারের মধ্য দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ১ পেটাবাইট (১০ লক্ষ গিগাবাইট) তথ্য ৫০ কিলোমিটার দুরে প্রেরণ করা যায়।
৩. জোতির্বিদগণ মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির চতুর্পাশে গ্যালক্সির প্রায় সমান ভরের তপ্ত গ্যাসস্তর আবিষ্কার করেছেন।

অক্টোবর:
১. প্রথমবারের মত একটি চার নক্ষত্র বিশিষ্ট গ্রহ ব্যবস্থা আবিষ্কার করা হয়েছে (যেখানে একটা গ্রহ চারটি তারাকে প্রদক্ষিন করে)।
২. নতুন একধরনের জিন থেরাপি উদ্ভাবন করা হয়েছে যা বংশগত রোগ সংক্রমন প্রতিরোধ করতে পারে।

নভেম্বর:
১. প্রথম HIV প্রতিষেধক টিকা পরিক্ষা-নীরিক্ষা শেষে বাজারজাতকরনের জন্য প্রায় প্রস্তুত।
২. Large Hadron Collider একটি অতিবিরল কণিকা শনাক্ত করেছে যা প্রচলিত supersymmetry তত্ত্বকে হুমকীর মুখে ফেলেছে।
৩. ন্যানোটেক সুতা এবং প্যারাফিন মোম থেকে কৃত্রিম পেশী তৈরি করা হয়েছে যা এর ওজনের তুলনায় ১ লক্ষ গুণ ভারী বস্তু তুলতে সক্ষম।
৪. থ্রি-ডি প্রিন্টারের মাধ্যমে কার্টিলেজ (কোমলাস্থি) তৈরির পথে বড় অগ্রগতি হয়েছে।
৫. দ্বিতীয় বৃহত্তমআবিষ্কৃত হয়েছে।

ডিসেম্বর:
১. জোতির্বিদগণ অদ্যাবধি প্রাপ্ত সবচেয়ে দুরবর্তী গ্যালাক্সি আবিষ্কার করেছেন। এই গ্যালাক্সিটি বিগব্যাং এর পর ৩৮০ মিলিয়ন বছরের মধ্যে গঠিত হয়েছিল। গ্যালাক্সীটি পৃথিবী হতে ১৩.৩৭ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে।

২.পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগতির ট্রেন চীনে চালু হয়েছে।

আজ এই পর্যন্তই। আগামী বছর আবার দেখা হবে। যারা উপরের তথ্যগুলোর রেফারেন্স খুঁজছেন তারা এই উইকিপিডিয়া আর্টিকেলটি http://en.wikipedia.org/wiki/2012_in_science দেখতে পারেন।

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

লিখেছেন bengalensis

পোস্টডক্টরাল গবেষক: Green Nanomaterials Research Center Kyungpook National University Republic of Korea.

bengalensis বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 70 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    শুধু দারুণ বললে কমই বলা হবে …। চমকপ্রদ সব অগ্রগতি! সামনে কি দিন যে অাসতে যাচ্ছে তা কল্পনারো অতীত! অারেকটা মজার বিষয় হলো হিগস বোসন কনফার্মেশনের নিউজটা কিন্তু অতটা পাবলিসিটি পায় নি।

    • bengalensis Reply

      আসলে কণাটা যখন ডিটেক্ট করা হয় তখনই সবাই মোটামুটি বুঝে গিয়েছিল এটা হিগস্। কনফার্মেশনটা একটা আনুষ্ঠানিকতার মত ছিলো। কণাটি যখন পাওয়া যায় তখনই অনুমান ছিলো এই কণাটি হিগস না হওয়ার সম্ভবনা ৩৫ লাখের মধ্যে ১। একারনের কনফার্মেশন নিয়ে কারো মধ্যে কোনো উত্তেজনা ছিলো না।

আপনার মতামত