প্রথম পর্ব —  দ্বিতীয় পর্ব
[পুরোনো কথা দু’একটা বলে নেই। ভিন তারার গ্রহ থেকে স্বাতী তার খুব দ্রুতগামী নভোযান নিয়ে পৃথিবীতে বেড়াতে এসেছে। তার নভোযান খুব দ্রুত চলে। একবার সে আমার বাড়ির জানালার পাশ দিয়ে আলোর গতির অর্ধেক গতি নিয়ে উড়ে গেল। এই উড়ে যাবার মূহুর্তে আমার ঘরের ঘড়ি ০ সেকেন্ড দেখাল, অন্যদিকে স্বাতীও তার নভোযানের ঘড়ির মান ০ সেকেন্ড করে দিল। এই উড়ে যাওয়ার পর আমার ঘড়িতে যখন ২ সেকেন্ড সময় যাবে, তখন আমার কাঠামোতে স্বাতীর ঘড়িতে ১.৭৩ সেকেন্ড সময় দেখাবে। এইখানে ‘আমার কাঠামো’ কথাটা প্রয়োজনীয়, কারণ স্বাতীর কাঠামোতে ‘আমার ঐ সময়ে’ স্বাতী কি সময় দেখছে সেটা আমি জানতে পারব না। অন্যদিকে স্বাতীর কাঠামোতে স্বাতীর ঘড়ি যখন ১.৭৩ সেকেন্ড দেখাবে, তার কাঠামোতে আমার ঘড়িতে তখন ১.৫ সেকেন্ড বাজবে, ১.৭৩ সেকেন্ড নয়। স্বাতীর কাঠামোতে যখন স্বাতীর ঘড়ি ১.৭৩ সেকেন্ড দেখাচ্ছিল, আমার কাঠামোতে তখন আমার ঘড়ি কত সময় দেখাচ্ছিল সেই প্রশ্নটা করা যাবে না। কারণ এটার যদি কোন উত্তর থাকে তাহলে পরম বা absolute দেশ-কালের একটা নিউটনীয় ধারনা সত্য হবে। আমরা জানি আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলে পরম দেশ-কাল বলে কিছু নেই।]

স্বাতীর সঙ্গে যখন ওপরের প্রপঞ্চ নিয়ে কথা হচ্ছে, সেই সময় মৃত্তিকা রাণী এসে উপস্থিত। স্বাতীকে নিয়ে তার আবার কিছু ঈর্ষাপরায়ণতা আছে। মৃত্তিকা উদ্ভিদবিদ, আপেক্ষিকতা নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই। সেবলল, ‘তোমরা কি নিয়ে কথা বলছ?’ আমি বললাম, ‘আপেক্ষিকতা নিয়ে।’ মৃত্তিকা বলল, ‘তারপর?’

আমি বললাম, ‘স্বাতীর সঙ্গে একটা বিষয়ে তর্ক হচ্ছে।’

তর্কের বিষয়বস্তুটা তাকে বলার পর মৃত্তিকা বলল, ‘হুঁ।’ হুঁ-টা যেনএকটু তাচ্ছিল্য মেশানো ছিল। আমি বললাম, ‘হুঁ মানে?’

‘হুঁ মানে তোমরা পদার্থবিদরা সরল জিনিসকে জটিল করে দাও।’

‘তার মানে?’

‘মানে খুব সহজ,’ বলে মৃত্তিকা, ‘তোমরাই তো বললে এটা আপেক্ষিকতা। তুমি আর স্বাতী দুটো জাড্য কাঠামোতে বসে এক অপরের কার্যাবলী দেখছ। দুটো কাঠামোর কোনটাই বিশেষ নয়। তোমার মনে হবে স্বাতী সেকেন্ডে ১৫০,০০০ কিলোমিটার বেগে সামনে চলে গেল, স্বাতী ভাবল তুমি সেকেন্ডে ১৫০,০০০ কিলোমিটার বেগে পেছনে চলে গেলে। তোমার ফ্রেমে স্বাতীর ঘড়ি শ্লথ চলবে, আর স্বাতীর ফ্রেমে তোমার ঘড়ি শ্লথ চলবে, এটা না বোঝার কি হল?’

সত্যিই তো! এটা তো বোঝারই কথা। আমার ঘড়িতে যখন ২ সেকেন্ড বাজবে, আমার কাঠামোতে স্বাতীর ঘড়িতে তখন ১.৭৩ সেকেন্ড বাজবে, তেমনই স্বাতী যখন তার ঘড়িতে ২ সেকেন্ড দেখবে তার কাছে মনে হবে আমার ঘড়িতে ১.৭৩ সেকেন্ড বেজেছে। আমাদের দুজনের কাঠামোর মধ্যে একটা প্রতিসাম্য তো বজায় থাকবে। তাই স্বাতী তার ঘড়িতে ১.৭৩ সেকেন্ড দেখবে, সে ভাববে আমি ১.৫ সেকেন্ড দেখছি।

একজন উদ্ভিদবিদের কাছে সহজ ব্যাখ্যা শুনে আমি ও স্বাতী দুজনেই একটু দমে গেলাম। মৃত্তিকা মুখ বাঁকিয়ে হাসল। তারপর বলল, ‘তোমরা পদার্থবিদরা সহজ জিনিসকে জটিল করে ফেল। যেমন তোমরা বলছ দুটি ঘটনা যদি একজনের ফ্রেমে যুগপৎ অর্থাৎ একই সঙ্গে ঘটে থাকে, সেটা আর একজনের কাঠামোতে যুগপৎ হবে না। কিন্তু তোমরা ট্রেনের উদাহরণটা কেন দিচ্ছ না? স্বয়ং আইনস্টাইন তো যুগপৎ ঘটনার একটা ব্যাখ্যা দিতে রেলগাড়িকে ব্যবহার করেছেন। জান না যে পৃথিবীর তাবৎ পাঠ্যপুস্তক সেই উদাহরণটাই ব্যবহার করে?’

চিত্র ১: মৃত্তিকার কাঠামোতে, ট্রেনের বাইরে প্ল্যাটফর্মের দু'পাশে, মৃত্তিকা ও স্বাতীর থেকে সম দূরত্বে, একই সময়ে দুটি বজ্রপাত হল।

চিত্র ১: মৃত্তিকার কাঠামোতে, ট্রেনের বাইরে প্ল্যাটফর্মের দু’পাশে, মৃত্তিকা ও স্বাতীর থেকে সম দূরত্বে, একই সময়ে দুটি বজ্রপাত হল।

সত্যিই তো, ভাবলাম আমি। বললাম, ‘দাঁড়াও, দেখি আমি এই ঘটনাটা বর্ণনা করতে পারি কিনা। মনে কর একটা রেলগাড়ি বেশ জোরে পশ্চিম থেকে পূব দিকে যাচ্ছে সমবেগে। ট্রেনের একদম মাঝখানে স্বাতী বসে আছে। ধর কোন একটা নির্দিষ্ট সময়ে ট্রেনটা একটা স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম পার হচ্ছে। প্ল্যাটফর্মটার দৈর্ঘ্য ট্রেনের সমান। আরো ধরা যাক প্ল্যাটফর্মের ঠিক মাঝখানে তুমি মৃত্তিকা দাঁড়িয়ে আছ। আর ট্রেনটার সামনের দিকটা ঠিক প্ল্যাটফর্মের সামনের দিকের সমান। ঠিক সেই সময়ই মৃত্তিকার ঘড়ি অনুযায়ী দুটো বজ্রপাত হল যেটা কিনা ট্রেনের ঠিক সামনে ও ঠিক পেছনে প্ল্যাটফর্মটাকে ঝলসে দিল কালো দাগে। পেছনের দাগটা হল A আর সামনের দাগটা হল B। মৃত্তিকার কাছে এই বজ্রপাতদুটো একই সময়ে দেখা যাবে। কারণ A ও B বিন্দু দুটি তার থেকে সম দূরত্বের। কাজেই বজ্রপাতের ঝলকানি তার কাছে আলোর গতিবেগে যতটুকু সময় লাগে সেই সময়ের পরে যুগপৎ ভাবে এসে পৌঁছাবে। যদিও এই ঘটনাদুটো মৃত্তিকার কাছে যুগপৎ, কিন্তু স্বাতীর কাছে সে দুটি যুগপৎ নয়।’

আমি একটু দম নেই। স্বাতী আর মৃত্তিকাদুজনেই চুপ করে থাকে। এগুলো তাদের কাছে অজানা জিনিস না।

আমি আবার বলতে শুরু করি, ‘ধরা যাক স্বাতীর ট্রেনটা বেশ জোরে যাচ্ছে। তাহলে স্বাতী B’র ঘটনাটা আগে দেখবে, কারণ B’র ঘটনাটা বহন করে যে আলোক তরঙ্গ স্বাতীর দিকে আসছে তার ট্রেনও সেদিকে ছুটে যাচ্ছে। আর A থেকে যে আলোক তরঙ্গ আসছে সেটাকে আর একটু বেশী দূরত্ব পার হতে হচ্ছে। স্বাতী ভাববে B’র ঘটনাটা আগে ঘটেছে, অর্থাৎ বজ্রপাতটা সেখানে A’র আগেই ঘটেছে। এখন যেহেতু স্বাতীর ট্রেন সমবেগে যাচ্ছে, আপেক্ষিকতার একটা পস্টুলেট বা স্বীকার্য অনুযায়ী স্বাতীর কাঠামোটা হল একটা জাড্য কাঠামো, স্বাতীর পক্ষে কোন ধরনের পরীক্ষা করা সম্ভব নয় যা দিয়ে কিনা সে বুঝতে পারে সে দ্রুতগতিতে ভ্রমণ করছে এবং প্ল্যাটফর্মের কাঠামোয় A ও B’র ঘটনা যুগপৎ।

চিত্র ২: স্বাতীর কাছে A ও B থেকে আলো ভিন্ন সময়ে এসে পৌঁছাবে। স্বাতী ভাববে B'র ঘটনা A'র আগে ঘটেছে। এই ধারনাটা স্বাতীর কাঠামোতে ঠিক, মৃত্তিকার কাঠামোতে নয়। মৃত্তিকা ভাববে স্বাতীর ট্রেনের গতিমুখের জন্য স্বাতী ভিন্ন ভিন্ন সময়ে A ও B'র ঘটনা দেখছে। দুটো ধারনাই সঠিক তাদের নিজের কাঠামোতে।

চিত্র ২: স্বাতীর কাছে A ও B থেকে আলো ভিন্ন সময়ে এসে পৌঁছাবে। স্বাতী ভাববে B’র ঘটনা A’র আগে ঘটেছে। এই ধারনাটা স্বাতীর কাঠামোতে ঠিক, মৃত্তিকার কাঠামোতে নয়। মৃত্তিকা ভাববে স্বাতীর ট্রেনের গতিমুখের জন্য স্বাতী ভিন্ন ভিন্ন সময়ে A ও B’র ঘটনা দেখছে। দুটো ধারনাই সঠিক তাদের নিজের কাঠামোতে।

স্বাতী বলল, ‘কিন্তু আমার ফ্রেম যদি জাড্যই হয় আমার কি ঐ দুটো ঘটনা, অর্থাৎ A ও B’র ঘটনা একসাথে দেখার কথা নয়?

আমি বললাম, ‘তুমি দুটো ঘটনা একসাথে দেখতে যদি ঐ আলো তোমার ট্রেনের দুপাশ থেকে নির্গত হত। অর্থাৎ মনে করে ট্রেনের দুপাশে দুটো টর্চ বাতি বা লেজার আছে। সে দুটো বাতি ট্রেনের সাথেই ভ্রমণ করছে। সেই দুটো যদি একই সময়ে জ্বলে উঠত তাহলে তুমি একই সময়ে ঐ দুটো ঘটনা দেখতে। সেইক্ষেত্রে সে দুটো যুগপৎ হত। কিন্তু বজ্রপাত দুটো তোমার ট্রেনের সাথে ভ্রমণ করছিল না, তাদের উৎস ট্রেনের বাইরে, তাই জন্য তুমি তাদের একসাথে দেখবে না।’

মৃত্তিকা বলল, ‘কিন্তু বজ্রপাতের ক্ষেত্রে, আমি প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে দেখব যে স্বাতীর কাছে A ও B থেকে আলো বিভিন্ন সময়ে পৌঁছেছে। B’র আলো আগে পৌঁছাবে, A’র আলো পরে। কিন্তু এই ঘটনাটার ব্যাপারে আমাদের উপসংহার ভিন্ন হবে। আমি যেখানে বলব, A’র থেকে আগত আলোকে বেশী পরিমাণ পথ যেতে হয়েছে বলে স্বাতী A’র ঘটনাটা পরে দেখছে, স্বাতী বলবে আসলে A’র ঘটনাটা পরে ঘটেছে বলে সে সেটা পরে দেখছে। এখানে কারুর ধারনাই বেঠিক নয়। দুটো ধারনাই দুজনের কাঠামোতে আলাদা আলাদা ভাবে ঠিক।  কারণ প্রতিটি জাড্য ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক নিয়ম একই ভাবে সংঘঠিত হবার কথা। আইনস্টাইন যখন তার বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব রচনা করেন তিনি দুটি মৌলিক  স্বীকার্য, যার ইংরেজি হচ্ছে postulate, তার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করেন। এর প্রথমটি হচ্ছে, সমস্ত জাড্য কাঠামোতে প্রাকৃতিক নিয়মাবলী একই থাকবে।’

‘তাহলে জাড্য কাঠামোর সংজ্ঞাটাও দিয়ে দাও,’ আমি বলি।

‘আমি যেরকম বুঝি সেভাবেই বলছি,’ মৃত্তিকা বলে, ‘জাড্য বা জড়ত্বীয় কাঠামোতে দেশ (স্থান) ও কাল (সময়) সমসত্ত্ব হবে, অর্থাৎ দেশ ও কাল একই ভাবে বইবে ও দিক-নির্ভর হবে না। আর প্রতিটি জাড্য কাঠামো অন্য একটি জাড্য কাঠামোর অনুপাতে ত্বরণশীল হবে না, অর্থাৎ একটি কাঠামো অন্য কাঠামোর তুলনায় একই গতিবেগে চলবে। আর যেই কাঠামোতে ত্বরণ নেই, সেই কাঠামোর মধ্যে বসে সেই কাঠামো যে গতিশীল সেটা কোনভাবেই বোঝা যাবে না।’

‘তুমি বলছ আমি যদি একটা বদ্ধ ঘরে থাকি আর ঘরটা যদি সম গতিতে ভ্রমণ করে আমি কোন ধরণের পরীক্ষার মাধ্যমে বুঝতে পারব না যে আমার ঘরটা ভ্রমণ করছে।’

‘না, কারণ স্থির থাকা আর সমগতিতে ভ্রমণের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। দুটো কাঠামোতেই পদার্থবিদ্যার নিয়মগুলো একই ভাবে খাটবে। যদি না খাটে তাহলে তো সমূহ বিপদ।’

‘তা বটে,’ আমি স্বীকার করলাম।

 

[পূর্বে ফেসবুক নোট হিসেবে প্রকাশিত]

লিখেছেন দীপেন ভট্টাচার্য

বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানকল্পকাহিনীকার।

দীপেন ভট্টাচার্য বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 14 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

আপনার মতামত