গল্পটার শুরু একজন জার্মান জীববিজ্ঞানী এমি নোবেল (Emmy Klieneberger-Nobel) কে নিয়ে। গ্রাজুয়েশানের পর তিনি গবেষণা করতেন জার্মানির ফ্র্যাঙ্কফুট বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু জন্মগতভাবে ইহুদী হওয়ায় ১৯৩৩ সালে জার্মানি থেকে বহিস্কৃত হন নাজি বাহিনীর নির্দেশে। অগত্যা এই মহতি লন্ডনে পাড়ি জমান এবং যোগ দেন বিখ্যাত লিস্টার ইনস্টিটিউটে; মাইকোপ্লাজমা (Mycoplasma) নামক ব্যাকটেরিয়া-প্রজাতির উপর কাজ করা শুরু করেন। কিন্তু খুব বেশি দেরি হয়নি একটা অদ্ভুত এবং দারুণ জিনিস খুঁজে পেতে। আমরা জানি প্রায় সব ব্যাকটেরিয়াতেই সাধারণ অবস্থায় কোষপ্রাচীর থাকে এবং এর রকমফেরের উপর নির্ভর করে গ্রাম-পজিটিভ বা নেগেটিভ প্রকারভেদ করা হয়। কিন্তু এমি এমন একধরনের ব্যাকটেরিয়ার প্রকার খুঁজে পেলেন যার কোন কোষপ্রাচীর নেই! এই ব্যাকটেরিয়া ফর্মটির নাম দিলেন L-ফর্ম। নামটি তিনি নিয়েছিলেন লিস্টার ইনস্টিটিউটের আদ্যাক্ষর থেকে। এরপর অনেক প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ারই প্রাকৃতিকভাবে L-ফর্ম এর প্রকার পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু মাইকোপ্লাজমা নিয়ে এমি কাজ করলেও এবং এই ব্যাকটেরিয়াতে কোষপ্রাচীর না থাকলেও এই ব্যাকটেরিয়াকে L-ফর্ম বলা হয়না। এই ব্যাকটেরিয়ার সাধারন অবস্থাতেই কোন কোষপ্রাচীর থাকেনা। L-ফর্ম তখনই বলা হয় যখন সাধারন অবস্থার ব্যাকটেরিয়াতে কোষপ্রাচীর থাকে কিন্তু সেটা থেকে উদ্ভুত কোন ব্যাকটেরিয়াতে থাকেনা। অর্থাৎ এটা কোন ব্যাকটেরিয়ার এক বিশেষ ফর্ম। যেমন,  Bacillus subtilis এ সাধারন অবস্থায় কোষপ্রাচীর থাকে, কিন্তু এই প্রজাতির কোন কোন কোষে থাকেনা; তখন সেই কোষপ্রাচীরবিহীন ব্যাকটেরিয়াকে L-ফর্ম বলা হয়।

 

এমি নোবেল

আমরা জানি কোষপ্রাচীর তৈরি হয় পেপটাইডোগ্লাইকান আস্তরণ দিয়ে। L-ফর্ম ব্যাকটেরিয়ার জেনোম পুরোপুরিই এর মাতৃকোষ বা আসল কোষের মত হলেও এই ব্যাকটেরিয়াতে কোন পেপটাইডোগ্লাইকান থাকেনা। শুধু লিপিডের স্তর দিয়ে এরা আবৃত। আসলে L-ফর্ম ব্যাকটেরিয়া দুইধরনের হয়। একটা স্ট্যাবল ফর্ম , আরেকটা আনস্টেবল (stable form এবং unstable form)। আনস্টেবল ফর্মের ব্যাকটেরিয়াগুলি নিজেদের মত অনেকগুলি ব্যাকটেরিয়া তৈরি করতে পারে; আবার এরা কোষপ্রাচীর-সহ ব্যাকটেরিয়াতেও ফিরে যেতে পারে। অন্যদিকে স্টেবল ফর্মের ব্যাকটেরিয়াগুলি কোষপ্রাচীরসহ ব্যাকটেরিয়াতে ফিরে যেতে পারেনা। যেহেতু এই ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীর নেই, সেহেতু এর আকৃতি ধরে রাখার কোন বালাই নেই। যেমন, Bacillus subtilis ব্যাকটেরিয়া হল রড আকৃতির। কিন্তু L-ফর্ম হলে এদের গোলাকার দেখা যাবে। নিচের ছবিটি দেখুন।

 

অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে গোলাকৃতির L-ফর্ম এর Bacillus subtilis দেখা যাচ্ছে

আবার এই ব্যাকটেরিয়া যে বিভিন্ন আকারের বল তৈরি করতে পারে সেটা নিচের ছবিটিতে দেখতে পাবেন। এই জিনিসটি ঘটে কারন কোষপ্রাচীর না থাকায় দ্বিবিভাজন ঘটে আগোছালোভাবে। ফলে একেকটা একেক আকারের নতুন ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়।

 

বিভিন্ন আকারের L-ফর্ম এর Bacillus subtilis 

 

এবার একধাপে চলে আসি ২০০৯ সালে। নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জেফ এরিংটন (Jeff Errington) প্রথমবারের মত কৃত্রিমভাবে কোষপ্রাচীরবিহীন Bacillus subtilis তৈরি করেছিলেন। এটা তিনি করেছিলেন ব্যাকটেরিয়ার জেনোমে পরিবর্তন এনে- কোষপ্রাচীর তৈরি হওয়ার জৈবরাসায়নিক পদ্ধতি বন্ধ করে দিয়ে। এর ফলে তৈরি হওয়া L-ফর্ম ব্যাকটেরিয়াটি স্বাভাবিক ব্যাকটেরিয়ার মতই নতুন ব্যাকটেরিয়া তৈরি করতে পারতো। জেফ আসলে বুঝতে চেয়েছিলেন কোষপ্রাচীরের প্রোটিনগুলি কোষ বিভাজনে কোন ভূমিকা পালন করে কিনা। এই গবেষণা থেকে জেফ বুঝেছিলেন যে এই প্রোটিনগুলি কোষ বিভাজনে আসলে অংশগ্রহণই করেনা।

 

তাহলে এখন প্রশ্ন আসে বিবর্তনের শুরুতে যেই আদিকোষ তৈরি হয়েছিল সেটার কি আসলেই কোষপ্রাচীর দরকার ছিল? ব্যাপারটার একটু গভীরে যাওয়ার আগে আরেকটা বিষয় আলোচনা করে নেই।

 

আমরা জানি যদি তেলকে পানির উপর ছেড়ে দেই তবে তারা পানিতে মিশে না গিয়ে ছোট বড় বিন্দু হয়ে পানির উপরে ভেসে বেড়ায়। এর কারন তেলের হাইড্রোফোবিক (পানি পছন্দ করেনা এমন) লিপিড অণু পানি থেকে নিজেকে দূরে রেখে একজায়গায় জড়ো হয় এবং যতটা কম সম্ভব পানির সঙ্গে সারফেস এরিয়া তৈরি করার জন্য কাছাকাছি আসলে একবিন্দুর সাথে আরেকবিন্দু মিশে যায়। আবার এখন যদি এই তেলের বিন্দুগুলিকে একটু নেড়ে দিন তবে দেখবেন এরা ভিন্ন আকার তৈরি করেছে এবং এদের সংখ্যার পরিবর্তন হয়েছে। এবার আসি ফ্যাটি এসিড এ। আমাদের কোষআবরণী তৈরি করে একধরনের ফ্যাটিএসিড। এরাও লিপিড অণুর মতই। এসব অণুর একদিকে থাকে হাইড্রোফোবিক অংশ, অন্যদিকে থাকে হাইড্রোফিলিক (পানি পছন্দ করে এমন) অংশ। এদেরকে পানিতে ছেড়ে দিয়ে এরা মাইসেলি বা লাইপোজম তৈরি করবে, যেখানে হাইড্রোফোবিক অংশগুলি ভিতরের দিকে নিজেদের হাইড্রোফোবিক অংশের মধ্যে জড়ো হয়ে থাকবে, আর হাইড্রোফিলিক অংশগুলি বাইরের দিকে পানির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করবে। ফলে, একস্তর (মাইসেলি) বা দ্বিস্তরের (লাইপোজম) গঠন তৈরি হবে। ছবিগুলি দেখে নিনঃ

 

বিজ্ঞানীরা ভেবে থাকেন- প্রথম দিককার আদিকোষের গঠনে হয়তো এভাবেই লাইপোজম দিয়ে তৈরি হয়েছিল যার ভেতরে ছিল ডিএনএ এবং অন্যান্য জিনিসপত্র। তেলের বিন্দুগুলিকে যেমন নেড়ে দিলে একটা ভেঙে কয়েকটা হয়ে সংখ্যায় বেড়ে যেতে পারে তেমনি আদিকোষের বিভাজনও একইভাবে হয়েছিল ধারনা করা যায়। কিন্তু যুক্তি দিয়ে ধারণা করা গেলেও তত্ত্বকে প্রমাণ করা চাট্টিখানি কথা নয়।

 

আজকে, মানে ২৮ জুলাই, ২০১৩ এ, বিখ্যাত সেল পত্রিকায় একটি গবেষণাপত্রে দেখানো হয়েছে আসলে এমন যান্ত্রিক কোষবিভাজন  L-ফর্ম এর ব্যাকটেরিয়াতে ঘটতে পারে। মনে রেখেছেন হয়তো লিপিড আবরণী দিয়েই L-ফর্ম এর ব্যাকটেরিয়া আবৃত। গবেষণার বিজ্ঞানীদলটি Bacillus subtilis কোষ থেকে কোষপ্রাচীর মুছে দিতে চেয়েছেন এনজাইম ব্যবহার করে, অর্থাৎ জেনোমে কোন পরিবর্তন না করে। একটি ছাড়া কোন ব্যাকটেরিয়াই বাঁচেনি! এই একটি ব্যাকটেরিয়া কেন বাঁচল এবং সংখ্যাবৃদ্ধিও করছে সেটা খুঁজে বের করতে চাইলেন তারা। ফলে কোষটিকে নিয়ে তার জেনোমে কোন পরিবর্তন হয়েছে কিনা দেখতে চাইলেন। অনেক খুঁজেটুজে দুইটি জিন- AccA এবং AccD এর সিকোয়েন্সের ঠিক আগের সিকোয়েন্সে (upstream sequence) দুইটি মিউটেশান খুঁজে পেলেন। এই মিউটেশান দুইটি আসলে ব্যাকটেরিয়াটিতে ফ্যাটি এসিডের অণু তৈরিতে সাহায্য করছে। ফলে L-ফর্ম ব্যাকটেরিয়া কোষটিতে বেশি বেশি লিপিডের আবরণী তৈরি হচ্ছে। এই লিপিড আবরণী কোষটির সাইটোপ্লাজমকে আবৃত করে রাখছে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে ব্যাকটেরিয়াটি নিজের মধ্যে এমন একটা পরিবর্তন এনেছে যেটা দিয়ে সে নিজে বেঁচে থাকছে।

 

আবার কোষটি আকারে বেড়ে যাচ্ছিল- বিজ্ঞানীদল ধারনা করলেন যে একই আবরণীর ভিতরে ডিএনএ এবং সাইটোপ্লাজম বিভাজন হচ্ছে বলে কোষটি আকারে বেড়ে যাচ্ছে (নিচের ছবিটি দেখে নিন)। সংখ্যাবৃদ্ধির কারন হিসেবে তারা ধারণা করছেন কোন জৈবযান্ত্রিক বল, যেটা কোষটির সাইটোপ্লাজমকে টুকরো টুকরো করছে এবং যেসব নতুন কোষ তৈরি হচ্ছে তারা নিজেদের সাথে করে ডিএনএ অণুও নিয়ে যাচ্ছে। ফলে টুকরোগুলি বেশি বেশি লিপিড আবরণীর তৈরি করে বেঁচে থাকছে এবং নতুন কোষ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। গবেষণার এই ফলাফলগুলি থেকে বিজ্ঞানীরা ধারনা করছেন এমনকিছুই হয়তো ঘটেছিল যখন প্রথম কোষগুলি তৈরি হচ্ছিল বিবর্তনের শুরুর দিকে।

ছবিটিতে দেখানো হচ্ছে কিভাবে L-ফর্ম আদি ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়-

 

 

জীবের বিবর্তনে, প্রথম আদিকোষগুলির প্রক্রিয়া সরল হওয়াটাই যুক্তিযুক্ত। কোষপ্রাচীরের মত অপেক্ষাকৃত জটিল গঠন তৈরি হওয়া জটিল অভিযোজন এবং সময়ের ব্যাপার ছিল। সেজন্য, লিপিড অণুর সাধারন ধর্মকে কাজে লাগিয়ে জীবকোষের বেঁচে থাকা এবং বংশবৃদ্ধির সরল প্রক্রিয়া অভিযোজন করা বাঞ্ছনীয় ছিল কোন সরল এবং আদি জীবকোষের। তাই সম্প্রতি বর্ণিত উপায়ে আদিকোষের বেঁচে থাকা বা বংশবৃদ্ধি করা খুব অস্বাভাবিক নয়, কি বলেন?

 

 

সূত্রঃ

http://en.wikipedia.org/wiki/L-form_bacteria

http://www.the-scientist.com/?articles.view/articleNo/36676/title/Floppy-Cells/

 

লিখেছেন খান ওসমান

আমি জীববিজ্ঞানের ছাত্র। বর্তমানে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আছি। https://www.facebook.com/khan.osman.1

খান ওসমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 30 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    পৃথিবীতে কীভাবে প্রাণের উদ্ভব হলো সেই রহস্যের একটা ধাঁধা হলো কোষ পর্দার উদ্ভব, কোষ পর্দার উদ্ভবকে সহজেই হাইপোথেসাইজড করা যায় লিপিডের মতো তেল ধর্মী পদার্থের বৈশিষ্ট্য দিয়ে, কিন্তু প্রমাণ কোথায় যে এই সাধারণ পর্দা দিয়েই আদি কোষ তৈরি হয়েছিলো, আর তারা কোষবিভাজন করতে পারতো? যদ্দুর বুঝলাম, এই পার্সপেক্টিভেই গবেষণাটা করা হয়েছে … আর ফলাফলটাও অাশানুরূপ। আপনার লেখাটা সেদিক দিয়ে ভালো হয়েছে অনেক।

    • খান ওসমান Reply

      ব্যাপারটি চিন্তা করলে দেখা যায় অনেকটা দৈবক্রমেই হয়তো ফ্যাটি এসিডের মত অণূ ডিএনএ কে ঘিরে ফেলেছিল- যেই জিনিসটা আমরা গবেষণাগারে ব্যবহার করি। কোন প্লাজমিড ডিএনএ যদি মানুষের সেললাইনে ঢুকিয়ে দিতে চাই তবে ডিএনএ’র সঙ্গে ফ্যাটি এসিড মিশিয়ে সেললাইনে দিয়ে দেই। ডিএনএ ঘিরে রাখা ফ্যাটি এসিডের এই গঠনকেও লাইপোজমই বলি।

      বিশেষায়িত অঙ্গাণুগুলি যেগুলি কোষ বিভাজনে কাজ করে তাদের উদ্ভবের আগে কোষ বিভাজন অনিয়ন্ত্রিত যান্ত্রিক বলের ফলেই হত ভাবাটা যুক্তিযুক্ত। এইধরনের বিভাজনের জন্য কোষপ্রাচীর থাকাটা অসুবিধাজনকই হওয়ারই কথা।

আপনার মতামত