অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। যাকে বলে Cats and dogs! আর বিলু বিছানায় উপর হয়ে পত্রিকার খেলার খবর পড়ছে। এমন সময় বেল বেজে উঠল। দরজা খুলতেই বিলু আনন্দে আত্মহারা। হাসান মামা এসেছেন!

বিলুর ঘরে ঢুকে মামা বললেন,
-কি বৃষ্টি পড়েছে দেখেছিস! একবারে কুকুর বেড়াল যুদ্ধ!

বিলু কিছু না বলে হাসতে থাকলো। হাসান মামা বিলুর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। বিলুর মতে হাসান মামা জানেন না এমন কোন জিনিস নেই। গতবার বিগব্যাঙ নিয়ে কি গল্পটাই না করলেন হাসান মামা! দারুণ ইন্টারেস্টিং মানুষ। অণুজীব বিজ্ঞানে অনার্স করেছেন গত বছর। আরে বিলুর পরিচয় তো দেয়া হয় নি! ও এই বার ক্লাস নাইনে উঠেছে।

-কিরে এভাবে দাত কেলাচ্ছিস কেন? হাসান মামা বললেন।
-এমনিতেই! তুমি আজকে এদিকে আসলা যে?
-ভার্সিটি থেকে আসার সময় হঠাৎ বৃষ্টি! তাই তোদের বাসায় চলে এলাম।

হাসান মামা আর বিলু পা তুলে বিছানায় বসল।

-মামা তুমি না কোন সাবজেক্টে পড়ছ?
-Microbiology, বাংলায় বললে অণুজীব বিজ্ঞান।
-ও, অণুজীব মানে কি মামা?
-অণু মানে ছোট। তাই অণুজীব হচ্ছে ছোট জীব। তবে সেই ছোট যেমন তেমন ছোট না। অনেক অনেক ছোট!
– কত ছোট?
-তুই খালি চোখে দেখবি না এমন ছোট। এদের দেখতে মাইক্রোস্কোপ লাগবে।
-ওরে বাপরে! তো অণুজীব কারা?
-হুম, এদের অনেকের নাম কিন্তু তুই শুনেছিস। যেমন ধর, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এদের নাম তুই আগে শুনেছিস, তাই না?
-হুমম শুনেছি।
-তারপর আছে আর্কিয়া(Archaea), ছত্রাক, শৈবাল, প্রটোজোয়া। এরা সবাই অণুজীব, বুঝেছিস?

বিলু হা না কিছুই বলল না।

-আচ্ছা ঠিক আছে তোকে এদের সম্বন্ধে একটু বিস্তারিত ভাবে বলছি। যেমন ধর, ব্যাকটেরিয়া। এদের গঠন কিন্তু খুব সরল। আর এরা এককোষী। আরো ভালোভাবে বললে এরা প্রোক্যারিয়ট। প্রোক্যারিয়ট মানে জানিস?

বিলু মাথা নাড়ল। সে জানে না।

-প্রোক্যারিয়ট মানে হচ্ছে এসব জীবের কোষে নিউক্লিয়ার মেমব্রেন থাকে না। আর এদের নিউক্লিয়াসও সুগঠিত নয়।
-আচ্ছা মামা, ব্যাকটেরিয়া দেখতে কেমন?
-ভালো প্রশ্ন করেছিস। ব্যাকটেরিয়া বিভিন্ন আকারের হতে পারে। রডের মত হতে পারে তখন এদের বলে ব্যাসিলাস(Bacillus), গোলাকার হলে এদের বলে কক্কাস(Coccus) আর কর্ক স্ক্রু এর মত বাঁকানো হলে বলে স্পাইরাল(Spiral)। তবে এরা তারার মত বা বর্গাকারও হতে পারে!
-আচ্ছা মামা এরা কি একা থাকে? নাকি আমাদের মত পরিবার হিসেবে থাকে?

হাসান মামা মুচকি হাসলেন।

-একটা মজার প্রশ্ন করেছিস! আসলে ব্যাকটেরিয়া একা থাকে না। এরা মাঝে মাঝে সিনেমার নায়ক নায়িকার মত দুজন মিলে হাত ধরে ঘুরাঘুরি করে। আবার চেইন বা গুচ্ছ আকারে অনেকগুলো একসাথে মিলে থাকতে পারে। তবে কারা কিভাবে থাকবে এটা নির্ভর করে এরা কোন গণ বা প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া তার উপর।
-দারুণ তো! আচ্ছা মামা এরা কি কিছু খায়? কথাটা বলে বিলু নিজেই কেমন যেন হয়ে গেল। যেন একটা উদ্ভট প্রশ্ন করে ফেলেছে!

মামা সেটা বুঝতে পেরে বললেন,

-খাবে না কেন? অবশ্যই খায়। এরাও তো জীব, নাকি? যদিও এরা এককোষী এদের সব কাজকর্ম করার জন্য তো খাবার দরকার আছে।

বিলু অবাক হয়ে বলল,

-তাহলে এরা কি খায়?
-এরা বিভিন্ন জৈব পদার্থ খাবার হিসেবে গ্রহণ করে। ধর, মাটিতে যেসব জীব মরে পচে যায় এদের কাছ থেকেও জৈব পদার্থ গ্রহণ করতে পারে। আবার জীবিত জীবের শরীরে ঢুকেও তা থেকেও জৈব পদার্থ গ্রহণ করতে পারে। কিছু ব্যাকটেরিয়া আছে যারা অজৈব পদার্থ থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে। কিছু ফটোসিনথেসিস প্রক্রিয়ায় নিজের খাবার নিজে তৈরি করতে পারে।

বিলুর বিস্ময় শুধু বেড়েই চলছিল। তখন মামা আবার বলা শুরু করল,

-এরা কিভাবে বংশবৃদ্ধি করে জানিস?
-না।
-এরা বাইনারি ফিশন(Binary Fission) বা দ্বিবিভাজন পদ্ধতিতে বংশবৃদ্ধি করে। এপদ্ধতিতে একটা কোষ ভেঙ্গে সমান দুই ভাগে ভাগ হয়ে দুইটা কোষ বা ব্যাকটেরিয়া হয়ে যায়। এভাবে একটা থেকে দুইটা, দুইটা থেকে চারটা, চারটা থেকে আটটা এমন করে চলতে থাকে। বুঝেছিস?
-হুম, আচ্ছা মামা তুমি যে বলছিলা আকিয়া না কি জানি? এগুলো সম্বন্ধে একটু বল না।
-ওইটা আকিয়া না, আর্কিয়া। আর্কিয়াও ব্যাকটেরিয়ার মত প্রোক্যারিয়ট। প্রোক্যারিয়ট কি মনে আছে?
-হা আছে। নিউক্লিয়ার মেমব্রেন থাকে না আর নিউক্লিয়াস সুগঠিত না।
-Good. তবে একটা মজার বিষয় কি জানিস? এদের সবসময় চরম বিরূপ পরিবেশে পাওয়া যায়। তিন ধরনের আর্কিয়া আছে। মিথেনোজেনস(methanogens), এক্সট্রিম হ্যালোফাইলস( Extreme halophiles) আর এক্সট্রিম থারমোফাইলস(extreme thermophiles). মিথেনোজেনসরা শ্বসনের পর বর্জ্য হিসেবে মিথেন গ্যাস ত্যাগ করে। আর যারা এক্সট্রিম হ্যালোফাইলস এদের অসম্ভব লবণাক্ত পরিবেশে পাওয়া যায়। নাম দিয়ে কিন্তু বুঝা যায় halo মানে salt আর philic মানে loving। Great Sea lake, Dead sea হচ্ছে ওরকম জায়গা। এসব জায়গায় এক্সট্রিম হ্যালোফাইলস পাবি।
– আর এক্সট্রিম থারমোফাইলস? বিলু চরম উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
-নামটা খেয়াল কর। thermo মানে heat আর philic মানে?
-loving
-Very good. তার মানে এরা কোথায় থাকবে?
-খুব উত্তপ্ত পরিবেশে।
-বাহ! এরকম জায়গার নাম বলতে পারবি?
-না।
-Yellowstone National Park. তবে আর্কিয়া কিন্তু মানুষের কোন রোগ সৃষ্টি করে না। আচ্ছা তোকে ব্যাকটেরিয়া আর আর্কিয়ার ছবি দেখাই বলে মামা মোবাইলে গুগোল সার্চ দিল।

ব্যাকটেরিয়া

আর্কিয়া

এই সময়ের মধ্যে বৃষ্টি থেমে গেল। রোদও উঠে গেছে।হাসান মামা বলল,

-এই দেখ বৃষ্টি থেমে গিয়েছে। আমি আজকে উঠি। একটা প্রাইভেটও পড়াতে হবে।
-আর বাকি অণুজীবদের কথা বলবা না?
-আজ না। আরেকদিন আসলে তখন বলব। যাই কেমন? বলে বিলুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে চলে গেল।

বিলুর মাথায় কেবল ব্যাকটেরিয়া আর আর্কিয়া ঘুরছে। বিলু মনে মনে বলল, ইস, হাসান মামাটা যে আবার কখন আসবে!

(চলবে)

তথ্যসূত্রঃ

*Microbiology an introduction by Tortora,Funk,Case

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

লিখেছেন সৈয়দ মনজুর মোর্শেদ

অজানাকে জানার চেষ্টা সবসময় রোমাঞ্চকর ও আনন্দের। সেই আনন্দ পাবার লোভে বিজ্ঞান নিয়ে একটু ঘাটাঘাটি করার চেষ্টা করি ।অণুজীববিজ্ঞান নিয়ে পড়ছি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। https://www.facebook.com/syedmonzur.morshed

সৈয়দ মনজুর মোর্শেদ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 21 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

আপনার মতামত