(বলা হয় বিজ্ঞানকে তাড়া দেয়া যায়না। যদিও নিবন্ধ প্রকাশের প্রতিযোগিতা বা ফান্ডিং এর সুযোগ এই ব্যাপারটাকে ঠিক সাহায্য করেনা। কিন্তু কিছু কিছু বিজ্ঞানের পরীক্ষাকে চাইলেও তাড়া দেয়া যায়না। যেমন মানুষের জীবন-দৈর্ঘ্য নিয়ে গবেষণা বা মহাজাগতিক পরীক্ষা। এদের জন্য সময় দিতে হয়। এমনই দীর্ঘ সময় ধরে চলা কিছু পরীক্ষা নিয়ে এই সিরিজ। দ্বিতীয় পর্ব)

 

গত ৪০০ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা সূর্যের পৃষ্ঠদেশে দাগ, মানে সৌর-কলঙ্ক গুণছেন! অর্থাৎ যখন প্রথম গ্যালিলিও দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন তখন থেকেই। গ্যালিলিও এমনকি সূর্যের গায়ের দাগগুলি ছবি এঁকে লিপিবদ্ধ করে রেখে গেছেন। নিচের ছবিতে দেখুন গ্যালিলিওর নিজের হাতে আঁকা সৌর-কলঙ্ক। গ্যালিলিও থেকে নাসা- সূর্যের কলঙ্ক গোণা এটাই সম্ভবত পৃথিবীর দীর্ঘতম পরীক্ষা।

 

গ্যালিলিওর আঁকা সৌর-কলঙ্ক

 

প্রথম দিকে বিজ্ঞানীরা দাগগুলি লক্ষ্য করলেও তাদের ধারনাই ছিলনা যে আসলে দাগগুলি তৈরি হয়েছে চৌম্বক ক্ষেত্র বা ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরির ফলে। তাঁদের যাই ধারনা ছিল সেটা পরিবর্তন হতে শুরু করলো ১৮৪৮ সাল থেকে, যখন সুইস জোতির্বিদ রুডল্ফ উল্ফ লিপিবদ্ধ করা শুরু করলেন একটি নিয়ন্ত্রিত উপায়ে। এমনকি তিনি একটি সূত্রও আবিষ্কার করেছিলেন সূর্যের দাগ গোণার যা আজও ব্যবহ্রত হয়। সূত্রটির নাম ‘উল্ফ নাম্বার’, এটা সূর্যের ক্রিয়া সময়ের সাথে কিভাবে পরিবর্তন হচ্ছে সেটার হিসেব খুঁজে বের করে।

২০১১ সালে ফ্রেডেরিখ ক্লেট্টে Solar Influences Data Analysis এর পরিচালক পদে যোগ দিলেন যেটা বেলজিয়ামের Royal Observatory’র অংশ। এই সংগঠনটি আলোকচিত্র দেখে সূর্যের দাগ গোণে এবং এখানে ১৭০০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত হাঁতে আঁকা ৫০০’র ও বেশি সূর্যের উপরিভাগের ছবি আছে। গত ১১ বছর ধরে এইসব সূর্যক্রিয়াগুলি কখনও বেড়েছে, কখনও কমেছে; আর যেসব চার্জড অণু সূর্যের দাগগুলি ছড়িয়ে দেয় মহাকাশে- সেগুলি আমাদের স্যাটেলাইল এবং তড়িৎযন্ত্রগুলিকে প্রভাবিত করতে পারে। বিস্তারিত লিপিবদ্ধ তথ্য সাইকেলগুলিকে বুঝতে সাহায্য করে, এবং কোন প্রবল ক্রিয়াকে অনুমান করতে সাহায্য করে। ‘যত দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের তথ্য লিপিবদ্ধ থাকে তত ভালভাবে আমরা আমাদের তত্ত্বকে বুঝতে পারি’, বলছেন স্ভ্যালগার্ড। বছরে প্রায় ২০০ নিবন্ধ সূর্যের দাগগুলিকে নিয়ে আলোচনা করে; এই গবেষণার বিস্তার সৌরবিদ্যা থেকে ছাড়িয়ে ভূমিচৌম্বক বিদ্যা, আবহাওয়া বিজ্ঞান এবং জলবায়ু পরিবর্তন পর্যন্ত।

কিন্তু সূর্য-দাগ গবেষণা চলছে মূলতঃ সেচ্ছাসেবকদের দিয়ে। প্রতি মাসে বেলজিয়ার গবেষণাগারে দাগগুলি গুনছে প্রায় ৯০ জন পর্যবেক্ষক, যারা মূলতঃ এই কাজে নতুন বা এমেচার। আর তারা ব্যবহারও করছে এমন সরল দূরবীক্ষণ যন্ত্র যেটা ২০০ বছর আগে পাওয়া যেত। আবার, যদিও এটা World Data Centre এবং প্যারিসের International Council for Sciecne দ্বারা স্বীকৃত তারপরও এরা পরবর্তী সংগঠনটি থেকে গবেষণার জন্য কোন ফান্ড বা অর্থ পায়না। তথ্য মজুদের জন্য ক্লেট্টে কাজ করেন আরেকজন পার্ট-টাইম কর্মীর সঙ্গে। কাজটি তিনি করছেন তার ‘রাত্রীকালীণ চাকরি’র পাশাপাশি, রাত্রীকালীণ চাকরিটা হল বেলজিয়ামের Royal Observatory এ জোতির্বিদ হিসেবে কাজ।

ক্লেট্টে বলছেন- তারপরও শতাধিক বছরের আগের সময় থেকে সহকর্মীদের সাথে কাজ করতে পারাটা দারুণ! যেমন, যদিও গ্যালিলিওর ছবিটা বেশি পরিষ্কার ছিলনা, কারন তিনি ‘গ্রহ এবং অন্যান্য জিনিস নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন (!!)’, তারপরও সূর্যের দাগগুলির চৌম্বক গঠন এবং নক্ষত্রের আকার এবং অক্ষকোণ সম্পর্কে তথ্য বের করার মত বিস্তারিত কাজ ছিল তাঁর ছবিগুলি! ক্লেট্টে বলছেন, ‘এমনকি আপনি এখনকার কোন ছবি থেকে যে তথ্য পারেন তার সবটুকুই পেতে পারবেন গ্যালিলিও’র আঁকা ছবি থেকে’।

 

গ্যালিলিও ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর এই ছবিগুলি ভবিষ্যতে কাজে আসবে। অসামান্য বুদ্ধিমত্তা প্রয়োজন এমন অনুমানের জন্য। তাইতো তিনি এবং তাঁর পরবর্তীরা হাতে এঁকে লিপিবদ্ধ করে রেখে গেছেন তাঁদের পর্যবেক্ষণগুলি। ক্লেট্টে বলছেন ‘এটাই বিজ্ঞানের মূল কথা, শেষ ফলাফল কি হবে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করা!’

 

অক্টোবর, ১৬১১ সালে আঁকা সৌর-কলঙ্ক নিয়ে গবেষণার ছবি। বইয়ের নাম Tres Epistolae de Maculis Solaribus Scriptae ad Marcum Welserum (Three Letters on Solar Spots written to Marc Welser)। লেখক- Christoph Scheiner।

 

 

সূত্রঃ
1. Nature 495, 300-303; 2013

2. http://galileo.rice.edu/sci/observations/sunspots.html

 

 প্রথম পর্ব

লিখেছেন খান ওসমান

আমি জীববিজ্ঞানের ছাত্র। বর্তমানে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আছি। https://www.facebook.com/khan.osman.1

খান ওসমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 30 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

আপনার মতামত