roundestউপরের ছবিতে যেই গোলকটি দেখা যাচ্ছে এটা পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত গোলাকার বস্তু। সম্প্রতি প্রায় ১ মিলিয়ন ইউরো এবং হাজার হাজার কর্মঘন্টা খরচ করে এটা তৈরি করা হয়েছে। এই গোলকটির পুরোটাই সিলিকন-২৮ পরমানুর একটি মাত্র কৃষ্টাল থেকে তৈরি করা হয়েছে। এবং এর ভর পুরোপুরি ১ কেজি। ভরের নতুন স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে ব্যবহারের জন্য এটাকে তৈরি করা হয়েছে। এর আগে প্যারিসে অবস্থিত International Bureau of weigh and measure এর বিশেষ ভল্টে সংরক্ষিত একটি প্লাটিনাম ইরিডিয়ামের সংকর ধাতুর তৈরি সিলিন্ডারকে ভর পরিমাপের standard হিসেবে ধরা হত এবং এর মাধ্যমেই ভর পরিমাপের একক কিলোগ্রামের সংজ্ঞা দেওয়া হতো। কিন্তু যেহেতু ইতিমধ্যেই একটা standard বস্তু আছে তাহলে মিলিয়ন ইউরো খরচ করে নতুন আরেকটি স্ট্যান্ডার্ড বানানোর প্রয়োজন হলো কেন? এর উত্তর জানার জন্য আমাদের ইতিহাস ঘাটতে হবে।

এককের আন্তর্জাতিক পদ্ধতি তথা SI পদ্ধতিতে মেট্রিকপদ্ধতির এককগুলো আত্মীকরণ করা হয়েছে। মেট্রিক পদ্ধতিতে ভরের এককের নাম ছিলো ‘grave’। না কবর নয়, এর উচ্চরণ হলো ‘গ্রাভ’ যা এসেছে ফরাসি gravitas থেকে যার অর্থ ওজন। ১৭৯৩ সালে এটাকে ভরের আন্তর্জাতিক একক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই এককের প্রণেতা ফরাসি রসায়নবিদ এন্থনি ল্যাভয়সিয়ে। তিনি ১৭৯৩ সালে বরফের গলনাঙ্ক অর্থাৎ শুন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১ ডেসিমিটার দৈর্ঘ্য, ১ ডেসিমিটার প্রস্থ এবং ১ ডেসিমিটার উচ্চতার একটি স্থানের পানির ভরকে ১ grave হিসেবে ধরে এই একক প্রণয়ন করেন। পরবর্তীতে ফরাসি বিপ্লবের সময় ল্যাভয়সিয়েকে গ্রেফতার করা হয় এবং শিরচ্ছেদ করা হয় এবং তাঁর এককটিকে বদলে ফেলা হয়। না, ভরের একক প্রণয়নের জন্য তাঁর শিরচ্ছেদ করা হয় নি। তিনি ছিলেন পূববর্তী রাজার খাজনা আদায়কারী, রাজবন্দী হিসবে তাঁকে শিরচ্ছেদ করা হয়েছিলো। নতুন রিপাব্লিকান সরকার তাঁর প্রণীত এককটিকে বেশ বড় মনে করে এর একহাজার ভাগের একভাগকে একক হিসেবে গ্রহণ করে এবং নাম দেয় গ্রাম (gram)। Grave (গ্রাভ) শব্দটির উচ্চরণ পূর্ববর্তী রাজতন্ত্রের একটি বিশেষ কূতনৈতিক পদ Graf (যার অর্থ Kent বা Earl) এর সাথে মিলে যায় বলে শব্দটিকেও বদলে দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে নতুন গ্রাম এককটিকে খুব ছোট মনে হওয়ায় পুনরায় এর ১ হাজার গুণকে আদর্শ ধরা হয় এবং ‘কিলো’ অংশটি গ্রামের শুরুতে বসে যায়। এই কারনে মোট সাতটি মৌলিক এককের মধ্যে একমাত্র ভরের এককের আদর্শ মানেই কিলো উপসর্গটি যুক্ত আছে। ১৭৯৯ সালে বরফের গলনাঙ্কের বদলে পানির সবচেয়ে ঘন অবস্থার তাপমাত্রা ৪ ০সে এর মাধ্যমে কিলোগ্রামের সংজ্ঞা দেওয়া হয়।

কিন্তু পানি জিনিসটা ভর মাপার জন্য মোটেও সুবিধাজনক নয় এবং এটার ভর মাপতে মাপতেই বেশখানিকটা বাষ্পীভবনের মাধ্যমে পরিমানে কমে যেতে পারে তাই খুবই স্থিতিশীল ধাতু প্লাটিনামের একটি এক কিলোগ্রাম ভর বিশিষ্ট সিলিন্ডার তৈরি করা হয় এবং এটাকেই ভরের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

800px-CGKilogram

প্লাটিনাম-ইরিডিয়ামের তৈরি ভর পরিমাপের আদর্শ সিলিন্ডার। পাশের রুলারটি রাখা হয়েছে আকার বোঝানোর জন্য।

১৮৮৯ সালে একটি নতুন সিলিন্ডার তৈরি করা হয় প্লাটিনাম-ইরিডিয়াম সংকর ধাতু থেকে এবং এটাকেই ভরের আদর্শ ধরা হয়। শুধু তাই নয় কিলোগ্রামের সংজ্ঞাই পরিবর্তন করে এই সিলিন্ডারের নামে দেওয়া হয়। অর্থাৎ কিলোগ্রামের নতুন সংজ্ঞা হয় এমন:

“প্যারিসের ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্যুরো অফ ওয়েট এন্ড মেজার’ এর স্থাপিত প্লাটিনাম-ইরিডিয়ামের তৈরি সিলিন্ডারটির ভরকে এক কিলোগ্রাম বলা হয়।“ এই সিলিন্ডারটিকে অফিসিয়ালি International Prototype of Kilogram এবং সংক্ষেপে Big K নামে ডাকা হয়। এটাকে তিনটি বেল জারের নিচে স্থাপন করে এবং পাশাপাশি আরো একই ভরের ছয়টি সিলিন্ডার সহ ব্যুরো অফ ওয়েট এন্ড মেজার এর আবহাওয়া নিয়ন্ত্রিত ভল্টের মধ্যে বিশেষ সুরক্ষিত পরিবেশে এবং কড়া নিরাপত্তার মধ্যে রাখা হয়েছে। এবং এর আরো ৪০ টি রেপ্লিকা তৈরি করে বিভিন্ন দেশে ভর পরিমাপের আদর্শ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য পাঠানো হয়েছে। অবশ্য Big K ছাড়া বাকী সিলিন্ডারগুলোর ভর পুরোপুরি ১ কিলোগ্রাম করা যায় নি বরং প্রতিটিতে কিছু সূক্ষ পার্থক্য তৈরি হয়ছে এবং সেই পার্থক্য রেকর্ড করে রাখা হয়েছে।

কিন্তু এই সিলিন্ডার আদর্শ ব্যবস্থার কিছু সমস্যা আছে। প্রথমে ছোটোখাটো সমস্যার কথা বলি। কেউ যদি এই ভল্টের নিরাপত্তা লঙ্ঘন করে সিলিন্ডাগুলোতে পরিবর্তন করে দিয়ে আসে তখন কী হবে? কিংবা আরো বড় সমস্যা, যদি কোনো প্রক্রিয়ায় এই সাতটি সিলান্ডারের ভর পরিবর্তনের সম্মুখীন হয় তাহলে সারা পৃথিবীতে ভর নির্নয়ের যথার্থতা লংঘিত হবে। এবং দ্বিতীয় আশংকাটি সত্যিই অমূলক ছিল না। ১৯৪৮ সালে সারা পৃথিবী থেকে Big K এর ৪০ টি রেপ্লিকাকে ফেরত আনা হয় পুনরায় পরিমাপ করার জন্য এবং তাদের মধ্যে ভরের তারতম্য ধরা পড়ে। যদিও কেন এদের ভরের পরিবর্তন হলো সেই কারন জানা যায় নি, ধরে নেওয়া হয় সিলিন্ডারগুলোর মধ্যে কোনো ভৌত পরিবর্তনের ফলে এদের ভরের তারতম্য ঘটেছে। সমস্যা আরো প্রকট হলো যখন ১৯৯০ সালে পুনরায় এদের একত্রীকরণ করা হলো এবং ওজনের আরো বেশী তারতম্য ধরা পড়ল।

এই ঘটনা খুবই আশঙ্কাজনক কেননা এই ওজনের তারতম্যের প্রভাব শুধুমাত্র ভর গণনার উপরেই পড়বে না বরং বল, শক্তি, ক্ষমতা এই ধরনের লব্ধ একক গুলো বাদ দিলেও সাতটি মৌলিক এককের মধ্যে আরো তিনটি একক সরাসরি ভরের এককের উপর নির্ভরশীল। যেমন: পদার্থের পরিমান মোলের সংজ্ঞা দেওয়া হয় অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যা থেকে যার পরিমাপ আবার ভরের উপর নির্ভরশীল। যদি ভরের আদর্শ পরিবর্তিত হয়ে যায় তাহলে অন্য রাশিগুলোর গণনাতেও তার প্রভাব পড়বে যার পরিণাম হতে পারে ভয়াবহ। আর এখানেই আমাদের এই নতুন গোলকটির স্বাতন্ত্র্য।

আগেই বলা হয়েছে এই গোলকটি সিলিকনের একটি একক ক্রিস্টাল থেকে তৈরি করা হয়েছে এবং একটি ক্রিষ্টালে প্রতিটি পরমানু নির্দিষ্ট সজ্জায় সজ্জিত থাকে। যদি একক ক্রিষ্টাল না হতো তাহলে এই গোলকের মধ্যবর্তী ক্রিষ্টালগুলোর মধ্যে অনেক ফাঁক-ফোঁকর থাকত, সেগুলোতে বাইরে থেকে অন্যান্য পরমানু ঢুকে যেতে পারত কিংবা কিছু সিলিকন পরমানুর স্থানচ্যুতি ঘটতে পারত। (চিত্র দ্রষ্টব্য। বামপাশের ছবিতে একক ক্রিস্টাল আর ডানপাশের ছবিতে বহু কৃস্টাল পরমানুর সজ্জা দেখানো হলো।) ফলে গোলকের আয়তনে তার প্রভাব compareপড়ত। এখানে সে্ই সুযোগ একেবারেই নেই। তাছাড়া এই কৃষ্টালটি শুধুমাত্র একধরনের সিলকন আইসোটোপ দিয়ে তৈরি আর সেটা হচ্ছে সিলিকন-২৮। একই ভরের আইসোটোপ দিয়ে তৈরি হওয়ায় আমরা এই গোলকের আয়তন থেকে তার মধ্যকার পরমানুর সংখ্যা হিসাব করে ফেলতে পারি। গোলকের আয়তন বের করা যায় এর ব্যাস থেকে। এই গোলকটির ব্যাস নিখুঁত ভাবে বের করা হয় লেজার প্রযুক্তির মাধ্যমে এবং ব্যাস থেকে সহজেই ব্যাসার্ধ বের করে এর আয়তন নির্ণয় করা যায়। এবার সিলিকনের ঘনত্ব যদি আমাদের জানা থাকে, তাহলে ঘনত্বকে আয়তন দিয়ে ভাগ করে খুব সহজেই আমরা গোলকের ভর বের করে ফেলতে পারি এবং যেহেতু প্রতিটি সিলিকন-২৮ পরমানুর ভর আমরা জানি, গোলকের ভরকে প্রতিটি সিলিকন-২৮ পরমানুর সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে আমরা মোট পরমানুর সংখ্যা পেয়ে যাই। যার পরিমান হচ্ছে ২.১৫X১০^২৫। এই নতুন আদর্শ থেকে আমরা এভোগেড্রোর সংখ্যাকেও নতুন ভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি। আগে ১২ গ্রাম কার্বন-১২ পরমানুর ভর থেকে অভোগেড্রোর সংখ্যা হিসেব করা হত কিন্তু এখন আমরা সিলিকন-২৮ এর ভর থেকে তা বের করতে পারি। যেহেতু এই গোলকটি আগের প্লাটিনাম-ইরিডিয়াম সংকরের চেয়ে অনেক নির্ভর যোগ্য তাই আমরা আরো সঠিকভাবে ভর নির্ণয়ের মাধ্যমে অ্যাভোগেড্রোর সংখ্যা তথা মোলের পরিমাণ বের করতে পারি।

তবে এতসব সতর্কতা সত্ত্বেও যদি কখনো গোলকের ভর পরিবর্তিত হয়ে যায় তাহলেও কোনো সমস্যা নেই। কেননা এখানে গোলকটিকে কিলোগ্রাম এককের আদর্শ ধরা হচ্ছে না, বরং গোলকটি কীভাবে তৈরি করতে হবে সেই নির্দেশনাই হচ্ছে এই ক্ষেত্রে আদর্শ! অর্থাৎ কখনো যদি আমাদের মুল গোলকটি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয় তাহলে আমরা গোলক তৈরির যে আদর্শ ধরা হয়েছে সেই আদর্শ অনুযায়ী গোলক তৈরি করে ফেলতে পারব। যদি একই ব্যাস বিশিষ্ট গোলক তৈরি করতে নাও পারি তাতেও সমস্যা নেই কেননা কত ব্যসের জন্য কতগুলো পরমানু থাকার কথা সেটা মূল গোলক থেকে ইতিমধ্যে হিসেব হয়ে গেছে এবং সেই অনুযায়ী আমরা নতুন গোলকের ভর হিসেব করে ফেলতে পারব একেবারেই সঠিকভাবে।

লিখেছেন bengalensis

পোস্টডক্টরাল গবেষক: Green Nanomaterials Research Center Kyungpook National University Republic of Korea.

bengalensis বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 70 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. সৈয়দ মনজুর মোর্শেদ Reply

    লেখাটি খুবই ভালো লেগেছে। ল্যাভয়সিয়ের শিরচ্ছেদ করা হয়েছিল জানতাম না!! তাহলে ভরের নতুন স্ট্যান্ডার্ড কবে চালু হতে যাচ্ছে?

আপনার মতামত