ধরুন আপনার বয়স ৪০ বছর। ঘটনাবহুল জীবনে আপনি নানা ধরণের অবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন। আর সবই সংরক্ষিত হয়ে আসছে আপনার ঘাড়ের উপরের যন্ত্রটিতে! কিন্তু ঠিক ৪০ বছর ১৩ দিন ২৫ মিনিট ১২ সেকেন্ডে আপনার মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা পূর্ণ হয়ে গেল। মানে এরপর থেকে আপনি কিছুই মনে রাখতে পারছেন না কারণ আপনার মস্তিষ্কের হার্ড ডিস্ক পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। বিন্দুমাত্র জায়গা খালি নেই! ফলে আপনার জীবন হয়ে গিয়েছে স্থবির!

উপরের কল্পনাটি কেবলই কল্পনা! আজ পর্যন্ত কারোও সাথে এমনটি হয় নি। কিন্তু আসলেই কি এমনটা হওয়া সম্ভব। এখন আপনি যদি বলেন একটা মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতা হচ্ছে x পরিমাণ। তাহলে ‘x’ পরিমাণ তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার পর মস্তিষ্ক পূর্ণ হয়ে যাবে। ফলে সেই পরিমাণ তথ্য সংযুক্তির পর এ ধরণের ঘটনা সম্ভব! আমরা কিন্তু অনেকেই মজা করে বলি ‘পড়তে পড়তে মেমরি ফুল হয়ে গেসে, আর কিছুই ঢুকে না মাথায়’ এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কথাটার কি আসলেই কোন যৌক্তিকতা আছে?!!

মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা আসলে কতটুকু?!

সম্প্রতি এই বিষয়টির উপর একটা লেখা পড়েছি সাইন্টিফিক আমেরিকানে। লেখাটি বেশ মজার! লেখাটিতে J. Hawes নামের একজন ব্যাক্তি ঠিক আমাদের মতই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছেন। উত্তর দিয়েছেন Paul Reber । তিনি নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক। Paul এর উত্তরটা এরকমঃ

‘মিস্টার Osborne, আমাকে কি ক্ষমা করা যায়? আমার মস্তিষ্ক পূর্ণ হয়ে গিয়েছে’। Gary Larson এর ক্লাসিক বই ‘Far side comic’ এ একটা ছোট মাথাওয়ালা ছাত্র তার ক্লাস টিচারকে এ প্রশ্ন করেছিল। আমরা যদি মজা করে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই তাহলে বলতে পারি ‘ নিঃসন্দেহে তোমার মস্তিষ্ক প্রায় পূর্ণ বলা যায়, তাই বলে পুরোটা নয়’ আমরা কি পরিমাণ তথ্য মস্তিস্কে ধারণ করতে পারি তার একটা পরিমাণ নিশ্চয়ই আছে কিন্তু সেই পরিমাণটা অত্যন্ত বিশাল! তাই আমাদের জীবনকালে মস্তিষ্ক পূর্ণ হয়ে যাবে কিনা এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কোন দরকার নেই।

মানুষের মস্তিস্কে প্রায় এক বিলিয়ন নিউরন আছে। আবার একটা নিউরন অন্যান্য নিউরনের সাথে প্রায় ১০০০ টি সংযোগ তৈরি করে। তাহলে মোট সংযোগ দাঁড়ায় ১ ট্রিলিয়ন! যদি একটি নিউরন কেবল একটি স্মৃতি ধারণ করে তাহলেও আমাদের মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা পূর্ণ করাটা একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে! ধরুন আপনার মস্তিষ্কে আইপড কিংবা ইউ এস বি ফ্ল্যাশ ড্রাইভের মত কয়েক গিগাবাইট জায়গা আছে! এখন আপনার মস্তিষ্কের নিউরন এতটাই সংযুক্ত যে প্রতিটা নিউরন একই সময়ে কয়েকটা স্মৃতি নিয়ে কাজ করে। ফলে আপনার সেই কয়েক গিগাবাইটের মস্তিষ্কের ক্ষমতা বেড়ে গিয়ে হয়ে যাবে প্রায় ২.৫ পেটাবাইট (১ মিলিয়ন গিগাবাইট) সেক্ষেত্রে আপনার মস্তিষ্ক যদি টেলিভিশনের ভিডিও রেকর্ডার হত সেটি তিন মিলিয়ন ঘণ্টার টিভি শো ধারণ করতে পারত। তার মানে ভিডিও রেকর্ডারটি পূর্ণ করতে আপনাকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে তিনশ বছর টিভি চালিয়ে রাখতে হবে।( পুরো ব্যাপারটি কিন্তু আপনার মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা কয়েক গিগাবাইট হলে যা হত তা!)

মস্তিষ্কের সঠিক ধারণক্ষমতা বের করা আসলেই কঠিন। এর প্রথম কারণ হলো আমরা জানি না কিভাবে মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতার হিসেব করতে হয়। দ্বিতীয়ত, কিছু স্মৃতির খুব বেশি বর্ণনা দরকার হয় ফলে তা বেশি জায়গা নেয়, আর কিছু স্মৃতি আমরা ভুলে যাই ফলে তাতে জায়গা খালি হয়। আবার কিছু স্মৃতি প্রথমবারে মনে করা যায় না। ( হয়তো অতটা দরকারি নয় বলে)

বলা যেতে পারে মস্তিষ্কের এ ব্যাপারগুলো আমাদের জন্যে ভালো খবর । কারণ এইসব কারণে মস্তিষ্ক আমাদের অর্জিত নিত্য নতুন অভিজ্ঞতার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। এখন আমাদের আয়ুস্কাল যদি অসম্ভব পরিমাণে বৃদ্ধি করা হয় তাহলে কি মস্তিষ্কের ধারণ ক্ষমতা পূর্ণ করা সম্ভব হবে? আমি জানি না। আরও একশ বছর পরে জিজ্ঞেস করলে উত্তর পেলেও পেতে পার!

সাইন্টফিক আমেরিকানের লেখাটি – (http://www.scientificamerican.com/article.cfm?id=what-is-the-memory-capacity)

ছবিসুত্রঃ

http://4.bp.blogspot.com/-9ms4Sc-riDc/UTeCwNySWzI/AAAAAAAADG0/xafVVYfb93o/s400/human-brain-zones-colorful-graphic.jpg

লিখেছেন সৈয়দ মনজুর মোর্শেদ

অজানাকে জানার চেষ্টা সবসময় রোমাঞ্চকর ও আনন্দের। সেই আনন্দ পাবার লোভে বিজ্ঞান নিয়ে একটু ঘাটাঘাটি করার চেষ্টা করি ।অণুজীববিজ্ঞান নিয়ে পড়ছি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে।

https://www.facebook.com/syedmonzur.morshed

সৈয়দ মনজুর মোর্শেদ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 19 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    বেশ ইন্টারেস্টিঙ। আমরা আসলেই এখনো ঠিকমতো জানি না মস্তিষ্কে কিভাবে তথ্য যুক্ত হয়, স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে। বেশকিছু গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে প্রতি রাতে আমরা যখন ঘুমাই, তখন মস্তিষ্কে দিনে তৈরি হওয়া অনেক সংযোগ ছাটাই হয়, প্রুনিং হয়, যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা বাদ দিয়ে। মস্তিষ্কের স্নায়ু সংযোগের কাজ তো শুধু তথ্য সংরক্ষণ না, তাকে তো শরীরে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, বাইরের তথ্য বিশ্লেষণ করতে হয়, চিন্তা করতে হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো হিসেব করলে হয়তো স্মৃতির জন্যে সংরক্ষিত জায়গা কমে যাবে।

    • সৈয়দ মনজুর মোর্শেদ Reply

      আমি লেখাটি লেখার সময়ও এ ব্যাপারটি মাথায় এসেছিল যে ‘মস্তিষ্ক তো শুধু তথ্য সংরক্ষণের কাজ করে না’!

      মন্তব্যের জন্যে ধন্যবাদ 🙂

আপনার মতামত