[আগের লেখা: ‘মগজ-ঘরে বসত করে কয়জনা?’]

ফেব্রয়ারির বিকেলে একুশের বইমেলায় বাংলাএকাডেমি রাস্তার পাশে একদল আঁকিয়ে চেয়ার নিয়ে বসে থাকেন; তাদের সামনে গিয়ে বসলে আঁকিয়েরা আগ্রহীদের মুখায়ব চটপট এঁকে ফেলেন। আঁকিয়েদের মতোই যারা বাদ্যযন্ত্রে অচিন সুর তুলে ফেলেন কিংবা ঝরঝরে শব্দে নিটোল কবিতা লিখে ফেলেন – তাঁদের সৃজনের রহস্যময় ক্ষমতাকে মুগ্ধ আমজনতা সাধারণত খানিকটা সম্ভ্রমের দৃষ্টিতেই দেখি। এই সৃজনশীলতা নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই আমাদের। সৃজনশীল মানুষদের অন্যরকম বলেই মনে হয়। সৃজনশীলতা যেন ভোজবাজী, জাদুকর তার টুপি থেকে বের করে আনলেন একটা ধবধবে সাদা খরগোশ। এটা কি কোন জন্মগত ক্ষমতা যেটা সবার থাকে না? সৃজনশীল মানুষদের মস্তিষ্ক কি ভিন্নভাবে গঠিত? আসলেই কি সৃজনশীলতা কোনরকম অদ্ভুত মন্ত্রপূত জাদু, নাকি অজস্র স্নায়ুকোষের প্যাঁচালো গিট থেকে এর উদ্ভব?

মস্তিষ্ক ডান ও বাম দুই ভাগে বিভক্ত, এদেরকে হেমিস্ফিয়ার নামে ডাকা হয়। আপনি কি আগে কোথাও শুনেছেন যে বাম হেমিস্ফিয়ার হলো বাস্তববাদী, সুক্ষ্ম-বিশ্লেষক, কর্মতৎপর, কুশলী, গোছানো ও ভীষণ যুক্তিবাদী? আর মস্তিষ্কের ডান ভাগ দারুণ সৃজনশীল, আবেগী, রঙিন, কাব্যিক, উজ্জ্বল, সুরসিক আর ইন্দ্রিয়পরায়ণ? তাহলে হয়তো এটাও শুনে থাকবেন যে প্রতিটি মানুষের উভয় হেমিস্ফিয়ারের মাঝে একটা পক্ষপাত কাজ করে। কারো কারো ডান হেমিস্ফিয়ার তুলনামূলক শক্তিশালী হয় বলে তারা সৃজনশীল হয়; আর বাকিরা নাকি তেমন ভাগ্যবান নয়।

না, একেবারেই না। ধারণাটা ভুল, এটাও একটি সুপ্রচলিত বৈজ্ঞানিক কুসংস্কার, মিথ।

 

 

সৃজনশীলতা বাস ডান মস্তিষ্কে – ধারণাটা ভুল

 

সৃজনশীল কাজের সময় আসলে কি ঘটে করোটির অন্তরালে? অ্যানা আব্রাহাম, মার্ক বিম্যান, এডাম ব্রিস্টল, কলিনা ক্রিস্টফ, অ্যান্ড্রেস ফিঙ্ক, জেরেমি গ্রে, অ্যাডাম গ্রিন, রেক্স জাঙ, জন কোনিয়স, হিকারু তাকেউচি, ওসিন ভ্যারটানিয়ান, ডারিয়া জ্যাম্বলিঙ সহ আরো অনেক স্নায়ুবিজ্ঞানী এই রহস্য উদঘাটনের উদ্দেশ্যে কাজ করছেন। তাঁদের গবেষণার ফলাফল বদলে দিচ্ছে সৃজনশীলতার পেছনে স্নায়ুবিজ্ঞানের বিভিন্ন সমসাময়িক ধারণা। মস্তিষ্ক সৃজনশীল কাজ কিভাবে করে এটা বোঝার জন্যে ডান-মস্তিষ্ক/বাম-মস্তিষ্ক বিভেদ মোটেই কোন সঠিক উপায় নয়। স্নায়ুবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে সৃজনশীলতা আসলে কোন বিচ্ছিন্ন হেমিস্ফিয়ারে বসবাস করে না।

 

সৃজনশীল প্রক্রিয়া
যেকোন সৃজনশীল কাজ আসলে একটা প্রক্রিয়ার ফলাফল। সৃজনশীল কাজ হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়ে না। এই প্রক্রিয়ার বেশ কিছু ধাপ রয়েছে; প্রস্তুতীপর্ব, সুপ্তাবস্থা, উদ্ভাসন ও পরীক্ষণ। প্রতিটি ধাপেই বিভিন্ন চিন্তন-প্রক্রিয়া ও ভাবাবেগের চারুকলা যুক্ত থাকে। একটি নির্দিষ্ট সময়ে কারো মাঝে সৃজনশীলতার কোন ধাপটি চলছে আর তিনি ঠিক কি সৃজন করার প্রচেষ্টায় রত তার উপর নির্ভর করবে মস্তিষ্কের কোন অঞ্চলসমূহ দায়িত্বটি পালনে নের্তৃত্ব দেবে।

নাচ-গান-কবিতা-ছবি ইত্যাদির মধ্যে ‘সৃজনশীলতা’ শব্দটাকে আটকে রাখাটা কি ঠিক হবে? বরং শব্দটার অর্থটা আরেকটু সম্প্রসারিত করা যাক। আমরা প্রতিদিনই তো কতরকম কাজ করি। এর মধ্যে অনেক কাজ করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি আগে থেকেই ঠিক করা থাকে। যেমন কিভাবে ছুটির জন্য প্রধান শিক্ষকের কাছে দরখাস্ত লিখবো তা নিয়ে তেমন একটা ভাবা লাগে না। তবে মাঝে মাঝে এমন সব সমস্যা চলে আসে যার জন্য আগে থেকে তৈরি কোন সমাধান জানা নেই। আবার মাঝে মাঝে পুরনো সমস্যাই নতুন চেহারা নিয়ে আসে। তাই তখন খুঁজতে হয় নতুন সমাধান, কিংবা পুরনো সমাধানটাই নতুন ভাবে প্রয়োগ করা লাগে। এটাকেই সৃজনশীলতা বলো আমরা। সে অর্থে প্রায় প্রতিদিনই আমাদের নতুন করে চিন্তা করতে হয় নিয়ত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে বুক ফুলিয়ে বেঁচে থাকতে।

আমরা সৃজনশীল প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলছি বলে এর বিভিন্ন ধাপসমূহ আরেকটু পরিষ্কার হওয়া দরকার। উপরে যে চারটি ধাপ উল্লেখ করা হলো সেগুলো বহু আগে গ্রাহাম ওয়ালিস নামের একজন বিজ্ঞানী প্রস্তাব করেছিলেন। কোন ব্যাক্তি যখন একটি সমস্যার সৃজনশীল সমাধান খুঁজতে থাকেন তখন প্রকৃতপক্ষে কি ঘটে তা বোঝার চেষ্টা করেছিলেন ওয়ালিস। গ্রাহামের মডেলের প্রথম ধাপটি হলো প্রস্তুতীপর্ব (Preperation)। এ সময় আমরা কোন সমস্যাকে সুচিহ্নিত করার চেষ্টা করি, তা সমাধানের জন্যে যে সব তথ্য জানা দরকার তা জানার তাগিদ অনুভব করি, তথ্যসমূহ খুঁজতে থাকি। একটা সমস্যা সমাধানের জন্যে বিভিন্ন উপায় থাকতে পারে। সব উপায় সমানভাবে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। তাই কি কি পূর্বশর্ত পূরণ হলে একটা সমাধান গ্রহণযোগ্য হবে তা নির্দিষ্ট করার চেষ্টা করি। যেমন মাথাব্যাথা থেকে বাঁচার একটা উপায় হতে পারে মাথাটা কেটে ফেলে দেয়া, কিন্তু এটা গ্রহণযোগ্য সমাধান কি না তা ঠিক করা হয় এই প্রথম ধাপেই।

দ্বিতীয় ধাপটি হলো সুপ্তাবস্থা (Incubation)। এই ধাপে আমরা সমস্যা থেকে এক পা পেছনে সরে এসে মনকে ছেড়ে দেই অবচেতনে বিষয়টা বিভিন্ন দিক থেকে ঘুরে-ফিরে দেখতে। অবচেতন মন নিজের মতো করে কাজ করতে থাকে। প্রস্তুতীপর্বের মত সুপ্তাবস্থাতেও সময় লাগতে পারে কয়েক মিনিট, সপ্তাহ কিংবা মাস খানেক অথবা সমগ্র বছর। সৃজনশীল প্রক্রিয়ার তৃতীয় ধাপটি হলো উদ্ভাসন (Illumination)। সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় এই ধাপটিতে ভেতর থেকে এক বা একাধিক আইডিয়া ঝলসে ওঠে। এই আইডিয়াগুলো সমস্যা সমাধানের একটি গাঠনিক অংশ হতে পারে; অথবা আইডিয়াটা নিজেই হতে পারে পুরো সমাধান। এই ধাপটি এক দিক দিয়ে অন্যদের চেয়ে বিপরীত, এটা কয়েক মিনিট থেকে সর্বোচ্চ কয়েক ঘন্টায় স্থায়ী হয়, প্রচন্ড বেগে অন্তর্দৃষ্টি এই সংক্ষিপ্ত সময়ে আমাদের উদ্ভাসিত করে তোলে। এটাই আর্কিমিডিসের সেই ‘ইউরেকা!” মুহূর্ত।

চতুর্থ ও সর্বশেষ ধাপটি হলো পরীক্ষণ (Verification)। এই ধাপে সচেতনতা ও সতর্কতার সাথে উদ্ভাসন ধাপে যেসব আইডিয়া সমাধান হিসেবে আমাদের সামনে এসেছে তাদেকে প্রস্তুতীপর্বের প্রয়োজন ও পূর্বশর্তের আলোকে যাচাই-বাছাই করে থাকি।

আপনি কি সৃজনশীল প্রক্রিয়ার কোন উদাহরণ দিতে পারবেন নিজের জীবন থেকে?

 

স্নায়ুজালিকাজটের কবলে সৃজনশীলতা!
সৃজনশীলতার বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে না হয় জানা গেল। এবার এই প্রক্রিয়াগুলো করোটির অন্তরালে কোন হাতিয়ার ব্যাবহার করে কিভাবে কাজ করে সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো আমরা। সে জন্যে আমাদের খুলির আরেকটু গভীরের রাস্তাগুলো চিনে আসতে হবে।

বিজ্ঞানে একটা বিশেষ পরিভাষা আছে, কগনিশন, যার বাংলা অর্থ হতে পারে চেতনা বা প্রতীতি। বাংলায় চেতনা বলতে আমরা যাই বুঝি না কেন, বিজ্ঞানে কগনিশন বলতে একদল মানসিক-স্নায়বিক প্রক্রিয়া (যেমন মনোযোগ ও স্মরণ-প্রক্রিয়া) ব্যবহার করে ভাষা হৃদয়াঙ্গম করা, কোন কিছু শেখা, যুক্তি দিয়ে ভাবা, কোন সমস্যার সমাধান কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণ পদ্ধতি বোঝানো হয়। এই লেখাটিতে প্রতীতি শব্দটি ব্যবহার করবো কগনিশনের বাংলা রূপান্তর হিসেবে।

কোন কাজ করার জন্যে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চল দলগতভাবে কাজ করে। দলগতভাবে কাজ করার সময় মস্তিষ্কে এই অঞ্চলগুলো বিভিন্ন স্নায়ুবিক রাস্তা ব্যাবহার করে। এই রাস্তাগুলো মস্তিষ্কের বিভন্ন অঞ্চলের মাঝে সংযোগ-বর্তনী হিসেবে কাজ করে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা থেকে ক্রমেই দেখা যাচ্ছে যে প্রতীতি গড়ে ওঠে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের গতিশীল যোগাযোগের মাধ্যমে। মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চল কোন কাজ সম্পন্ন করতে এইসব যোগাযোগ করার জন্যে গড়ে তোলে একটি পারস্পারিক নেটওয়ার্ক যার মাধ্যমে তারা বিভিন্ন তথ্য ও সংকেত আদান-প্রদান করতে পারে।

কাজের রকমফের অনুযায়ী মস্তিষ্কে ভিন্ন ভিন্ন নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়ে ওঠে। ধরুন গাড়ির পেছনে লাগেজ ওঠাবেন আপনি। কিভাবে লাগেজটাকে রাখলে তা গাড়ির পেছন ঠিক মতো জায়গা করে নেবে এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনাকে। এজন্যে লাগেজের ছবিকে মনে মনে ঘুরাতে হবে সঠিক জায়গাটা খুঁজে বের করার জন্যে। এই সময়ে মস্তিষ্কের দৃশ্য সম্পর্কিত ভিজুয়োস্প্যশিয়াল নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়ে উঠবে। এই নেটওয়ার্ক মস্তিষ্কের পেছনদিককার প্যারাইটাল কর্টেক্স ও সম্মুখ অক্ষি-ক্ষেত্রের মধ্যকার যোগাযোগে অংশ নেয়।

কিংবা যদি আপনার দায়িত্ব সম্পাদনে ভাষার ব্যাবহার অধিক মনোযোগ দাবী করে, তখন মস্তিষ্কের ব্রোকা এবং ওয়ের্নিক নামের অঞ্চল দুইটি কোমর-বেধে কাজে নেমে পড়বে।

ভিজুয়োস্প্যাশিয়াল (Visuospatial) নেটওয়ার্ক

ভাষার নেটওয়ার্ক

 

ভাষা কিংবা দৃশ্য-সম্পর্কিত সমস্যার মত সৃজনশীল প্রতীতির (Creative Cognition) ক্ষেত্রে অনুরূপ ঘটনা ঘটে কি? সৃজনশীলতার স্নায়ুবিজ্ঞান বুঝতে গেলে মস্তিষ্কব্যাপী তিনটি নেটওয়ার্কের কার্যক্রম জেনে নেয়া দরকার। চলুন একপলকে এই স্নায়ু-নেটওয়ার্ক তিনটিকে দেখে নেয়া যাক।

 

ক) মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক
প্রচুর সমস্যা আছে যাদের সমাধান খুঁজতে আমাদের একাগ্র হয়ে নিবিষ্ট মনে চিন্তাভাবনা করতে হয়। এ ধরনের সংহত মনোযোগের দরকার পড়লে মস্তিষ্কে মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়। গণিতের কঠিন সমস্যা সমাধান করা, প্রোগ্রামিঙ করা, স্ট্র্যাটেজিক গেম খেলা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোন বক্তৃতা বোঝার জন্য সচেতন প্রয়াস চালানো – সকল ক্ষেত্রেই কার্যকরী স্মৃতির ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়। মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের বাইরের অংশ এবং প্যারাইটাল লোবের পেছনের অংশ এ সময় স্নায়বিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সক্রিয় ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ বজায় রাখে।

 

খ) ‘কল্পনা নেটওয়ার্ক’
কল্পনা বা ইমাজিনেশন নেটওয়ার্কের কাজ বেশ মজার। একেক সময় আসে যখন আমরা মনে মনে পরিচালক হয়ে সিনেমা বানানোর মজার খেলায় মেতে উঠি। কল্পনা নেটওয়ার্ক এ ধরনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থাকে। এ সময় ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতায় জমে থাকা স্মৃতি, ভবিষ্যত সম্পর্কে ভাবনা-চিন্তা এবং বর্তমানকে ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত কিংবা দৃশ্যপট থেকে দেখার মাধ্যমে বাস্তবতার একটি গতিশীল মনকল্পনা তৈরি করি আমরা। ভিন্ন সামাজিক সম্পর্ক অনুযায়ী দৈনন্দিন ঘটনাগুলোকে আমরা সাধারণত বিভিন্ন ধরনের লেন্স দিয়ে দেখতে অভ্যস্থ। ‘কল্পনা নেটওয়ার্ক’ এই সামাজিক কল্পমূর্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও যুক্ত থাকে। যেমন ধরুন যখন আপনি চিন্তা করছেন কেউ আপনাকে নিয়ে কি ভাবতে পারে, তখন এই কল্পনা নেটওয়ার্ক সক্রিয় ভাবে কাজ করছে। মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স এবং টেম্পোরাল লোবের গভীর ভেতরের অঞ্চল প্যারাইটাল লোবের ভেতর-বাহিরের বিভিন্ন অংশের সাথে যোগাযোগ রাখার মাধ্যমে ইমাজিনেশন নেটওয়ার্ক কাজ করে।

 

সবুজ = মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক লাল = কল্পনা নেটওয়ার্ক

 

 

গ) প্রাধান্য আরোপ নেটওয়ার্ক
রিলে রেস খেলেছেন? রিলে দৌড়ের মূল চ্যালেঞ্জ সমন্বয় – হাতের বাটন বা লাঠি একজন দৌড় প্রতিযোগী কত দ্রুত তার দলের পরের জনকে পৌঁছে দিতে পারে। মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ ও কল্পনা দুইটি নেটওয়ার্ক অনেকটা রিলে রেসের মতো কাজ করে, এদের মাঝে সমন্বয় হওয়াটা জরুরী। কখনো একটি, কখনো অন্য নেটওয়ার্ক বাটন হাতে কর্তৃত্ব গ্রহণ করে সৃজনশীল-দৌড় প্রতিযোগিতার। এই বাটন হস্তান্তরের কাজটি নিয়ন্ত্রণ করে প্রাধান্য আরোপ নেটওয়ার্ক। প্রাধান্য আরোপ নেটওয়ার্ককে আমরা মনোযোগ-নমনীয়তা বা অ্যাটেনশনাল ফ্লেক্সিবিলিটি নেটওয়ার্ক নামেও ডাকতে পারি। এই নেটওয়ার্ক চেতন-জগতে বাহির ও ভেতরের ঘটনাসমূহকে প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। চেতনার বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের তথ্য অনুসারে সে সিদ্ধান্ত নেয় রিলে রেসে কোন নেটওয়ার্কের হাতে বাটন তুলে দিতে হবে। এসব ঘটনাপ্রবাহে বাইরের ঘটনাও যেমন আছে, তেমনি আছে আপনমনে তৈরি হওয়া বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন চিন্তা। এই বিশৃঙ্খল চেতনার সবচেয়ে লক্ষ্যনীয় তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে সে অনুসারে মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ কিংবা কল্পনা নেটওয়ার্ক সক্রিয় করে প্রাধান্য আরোপ নেটওয়ার্ক। মস্তিষ্কের ডর্সাল এওর্টাল কর্টিকস ও এন্টেরিওর ইনসুলার বলে পরিচিত দাঁতভাঙা নামের অঞ্চলে এই নেটওয়ার্কের কারখানা।

প্রাধান্য আরোপ নেটওয়ার্ক

 

 

সৃজনশীল-প্রতীতির স্নায়ুবিজ্ঞান: একটি প্রাথমিক ধারণা
মস্তিষ্ক-জুড়ে বিভিন্ন স্নায়বিক-নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বিচ্ছিন্নভাবে জানলেই কিন্তু সৃজনশীলতার নিউরোবিজ্ঞান সম্পর্কিত ধারণা পরিস্কার হয় না। সৃজনশীলতা মেঘহীন আকাশ থেকে হঠাৎ বৃষ্টি পড়ার মতো কিছু নয়, বরং একটি প্রক্রিয়া এ তথ্য লেখার শুরুতেই আমরা জেনেছি। এই প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে স্নায়বিক-নেটওয়ার্কগুলো কখনো সক্রিয় হয়, কখনো নিষ্ক্রিয় হয়। সৃজনশীল-প্রক্রিয়ার সাথে বিভিন্ন স্নায়বিক নেটওয়ার্ক যে নির্দিষ্ট ছন্দে ব্যস্ত কিংবা শান্ত হয়ে ওঠে, তা সনাক্ত করতে পারাটাই সৃজনশীলতার নিউরোবিজ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য। কখনো একাধিক নেটওয়ার্ক একসাথে কাজ করতে পারলে পুরো প্রক্রিয়া সার্থক হয়ে ওঠে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে হয়তো এধরনের পারস্পরিক সহযোগিতা উল্টো সৃজনশীল-প্রক্রিয়াটাকেই বাধাগ্রস্থ করে দিতে পারে।

সম্প্রতি বিজ্ঞানী রেক্স জাঙ ও সহযোগীবৃন্দ সৃজনশীল-প্রতীতিকে মস্তিষ্কের বিভিন্ন নেটওয়ার্কের সাথে সংশ্লিষ্ট করে একটি প্রাথমিক ব্যাখ্যা দাঁড় করার চেষ্টা করেছেন। সৃজনশীল প্রক্রিয়ার একটি পর্যায়ে আমরা কল্পনার উপর বন্ধন ছেড়ে দিয়ে মনকে মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াতে দেই বিভিন্ন মজার মজার বুদ্ধি চেখে দেখতে, কোন নতুন সুযোগ সন্ধানে আকাশ কুসুম কল্পনায় গা ভাসিয়ে দিতে আর নিজের সমালোচক কন্ঠকে আপাতত চুপ করিয়ে দিতে। রেক্স জাঙের গবেষণা বলছে এ সময় মস্তিষ্কের মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্কের সক্রিয়তা কমিয়ে দিয়ে কল্পনা ও প্রাধান্য আরোপ নেটওয়ার্কের কার্যক্রম বাড়িয়ে দেয়াটা বেশ ফলপ্রসু। জ্যাজ ও র্যাপ সংগীতশিল্পীরা একসাথে বাজনা বাজিয়ে জ্যাম করার সময় একটি মানসিক গতি অনুভব করেন। এই জ্যামিঙ নতুন সংগীত তৈরি কিংবা তার উন্নয়নে খুব গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে। এ সময় দেখা গেছে তাদের মস্তিষ্কে ঠিক এই ঘটনাই ঘটে থাকে, একটি নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ কমে, বাকিরা সক্রিয় হয়ে ওঠে।

তবে কখনো কখনো মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ককে সৃজনশীল প্রক্রিয়ার নের্তৃত্বে এনে গভীর পর্যালোচনার দৃষ্টিতে সৃজনশীল চিন্তাকর্মকে যাচাই করতে হয়। তা না হলে হয়তো নিচের ছবির মতো হাবিজাবি কিছু তৈরি হতে পারে:

 

সৃজনশীল কাজ আবার যেন আগডুম-বাগডুম-ঘোড়াডুম-সাজ না হয়ে দাঁড়ায়

 

জাঙ ও তার সহকর্মীবৃন্দ সতর্কতার সাথেই উল্লেখ করেছেন সৃজনশীল-প্রতীতির এই স্নায়ু-নেটওয়ার্ক মডেল একটি প্রাথমিক ধারণামাত্র। মস্তিষ্কব্যাপী স্নায়ু-নেটওয়ার্ক মডেল সৃজনশীলতার ডান-বাম হেমিস্ফিয়ার ভিত্তিক ব্যাখ্যার তুলনায় বেশী গ্রহণযোগ্য। সৃজনশীলতাকে ডান-বাম হেমিস্ফিয়ারের তুলনামূলক সক্ষমতা দিয়ে যাচাই করা সম্ভব নয়। কারণ সৃজনশীলতায় মস্তিষ্কব্যাপী একাধিক স্নায়ু-নেটওয়ার্কের গতিশীল যোগাযোগ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই নেটওয়ার্ক ছাড়াও দিবাস্বপ্ন দেখা, ভবিষ্যত কল্পনা করা, খুব ব্যাক্তিগত স্মৃতি স্মরণ, গঠনমূলক চিন্তন, কোন কিছুর অর্থ খোঁজা ও সামাজিক চেতনা মস্তিষ্কের বিভিন্ন বিশেষায়িত অঞ্চল সৃজনশীল প্রক্রিয়ায়র সময় নিযুক্ত হয়। এ বিষয়ে অবশ্য আরো বিস্তারিত গবেষণা করা প্রয়োজন। তবে এটা পরিস্কার, সৃজনশীলতার স্নায়ুবিজ্ঞান এখন বেশ উত্তেজনাময় সময় পার করছে।

 

মন্তব্য:
১) মূল লেখাটির লেখক স্কট কাউফম্যান রেক্স জাঙ ও তাঁর সহকর্মীদের গবেষণাপত্রের একজন রিভিউয়ার ছিলেন।
২) সৃজনশীলতার বাম/ডান মস্তিষ্ক বিভাজনের পেছনে কিছু বাস্তব পর্যবেক্ষণ যে নেই তা নয়। যেমন দেখা গেছে, অবস্থান সংক্রান্ত যুক্তি-চিন্তা মস্তিষ্কের ডান হেমিস্ফিয়ারের কাঠামো বেশি ব্যাবহার করে। ভাষা প্রক্রিয়াজাত করার কাজটি বাম হেমিস্ফিয়ারের কাঠামো অধিক ব্যাবহার করে। এছড়াও জন কৌনিওস এবং মার্ক বিম্যানের মনোগ্রাহী কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে সেই ‘ইউরেকা!’-র মুহুর্ত যখন কেউ আপাত অসম্পর্কিত শব্দের মধ্যে সুক্ষ্ম যোগাযোগ আবিষ্কার করেন, তখন ডান এন্টেরিওর সুপেরিয়র টেম্পোরাল গাইরাস বেশি উদ্দীপিত হয়। তবে এই পর্যবেক্ষণের কোনটাই অস্বীকার করে না যে সৃজনশীল প্রক্রিয়া মস্তিষ্কের পুরোটাই ব্যাবহার করে।

এই ভাবানুবাদের অনুমতি মূল লেখক স্কট কাউফম্যান থেকে নেয়া হয়েছে; তাঁকে ধন্যবাদ!

সর্বস্বত্ত্ব স্কট কাউফম্যান কর্তৃক সংরক্ষিত।

মূল লেখা: The Real Neuroscience of Creativity, Scientific American Blog: Beutiful Minds

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

লিখেছেন আরাফাত রহমান

অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি শিক্ষার্থী। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।

আরাফাত রহমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 69 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. সৈয়দ মনজুর মোর্শেদ Reply

    দারুণ লেখা! পড়ে মন ভালো হয়ে গেলো!

    এখন পরবর্তী লেখার অপেক্ষা!

  2. eklotan Reply

    এত্ত বড় লেখা!!! পইড়া আবার কমেন্ট করুম নি 😛

  3. Ruhshan Ahmed Abir Reply

    মগজের মেকানিজম পড়তে, জানতে ভালোই লাগে।
    এই লেখাটি পড়েও ভালো লাগলো।

  4. নীললোহিত Reply

    নিজে যা জানেন সেটা অন্যকে জানানোর প্রয়াস করেছেন…সে জন্য ধুইন্না পাতা। ধন্যবাদ আরকি 😀

    • আরাফাত রহমান Reply

      তোমাকেও অনেক ধইন্যাপাতা 🙂 … কোন কিছু জানার ভালো উপায় হচ্ছে সেটা নিয়ে একটা লেখা লিখে ফেলা। তাই নিজে জানার খাতিরেই লিখছি আর কি 🙂 🙂

আপনার মতামত