[পূর্বের লেখা: মস্তিষ্কের কোথায় থাকো, সৃজনশীলতা?]

ক্যামেরা ও চোখ দুইই লেন্সের মাধ্যমে আলোক প্রক্ষেপন করে পেছনের পর্দায়। তাই ক্যামেরাকে অনেকবারই চোখের সাথে তুলনা করা হয়েছে তাদের গাঠনিক মিলের জন্যে। যদি বলি যে চোখ আসলে একটা এন্টেনা, তাহলে কি সেই রূপক মেনে নিতে কষ্ট হবে? এন্টেনা সাধারণত রেডিও কিংবা মোবাইল ফোনের যান্ত্রিক অনুষঙ্গ যা বেতার তরঙ্গ ধরার কাজে ব্যবহৃত হয়। চোখের কাজ তো সেরকম কিছু না, আমরা তো  চোখ দিয়ে বেতার তরঙ্গ নয়,  আলো ধরি। কিন্তু অন্যদিক দিয়ে যদি দেখি যে বেতার তরঙ্গ হোক, আলো হোক কিংবা রঞ্জন-রশ্মিই হোক – এরা সবাই আসলে তড়িৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ, এদের মাঝে পার্থক্য কেবল তরঙ্গদৈর্ঘ্যে। সেক্ষেত্রে এন্টেনা বা চোখের কাজ একই – তড়িৎ চৌম্বকিয় তরঙ্গকে ফাঁদে ফেলে প্রয়োজনীয় তথ্য বিশ্লেষণ করা।

কোন দৃশ্য হতে প্রতিফলিত আলোকের ফোটন কণাকে চোখের মাধ্যমে ধরে তারপর বোধগম্য বস্তু ও বৈশিষ্ট্যরূপে চেনার কাজটা করে মস্তিষ্ক। দর্শন, মানে দেখার কাজটিতে চোখের দায়িত্ব হলো ফোটনকণাকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তরিত করে স্নায়ুকোষের মাধ্যমে মস্তিষ্ককে তথ্য সরবরাহ করা। আর মস্তিষ্কের কাজ সে তথ্যের অথৈ সাগর সেঁচে দৃশ্যের পটভূমি (Background) থেকে পুরোভূমি (Foreground) আলাদা করে, বিভিন্ন দিকবরাবর অবস্থিত বস্তুগুলোকে চিহ্নিত করে, দৃশ্যপটের স্থানিক তথ্যের বোধগম্য ব্যাখ্য দেওয়া। মানুষের দৃশ্য-প্রতীতির (Visual Perception) পেছনে কিছু স্নায়বিক ক্রিয়াকৌশল মুখ্য ভূমিকা পালন করে। বলা বাহুল্য, খুব জটিল এই কাজটা ক্যামেরা সংযুক্ত পৃথিবীর সেরা সুপার কম্পিউটারেরও সাধ্যের অতীত।

 

চোখে ক্যামেরার মতোই লেন্স দিয়ে আলোক রশ্মিকে রেটিনায় কেন্দ্রীভূত করা হয়। দৃশ্য-প্রতীতির শুরু এখান থেকেই। রেটিনায় সজ্জিত আলোক-সংগ্রহী কোষের স্তর আলোক-কণাকে তড়িৎরাসায়নিক সংকেতে পরিণত করে। আমরা জানি, এই কোষ দু’রকমের, ‘রড’ আর ‘কোন’। অন্ধকারে দেখার জন্য কাজে লাগে ‘কোন’ কোষগুলো। এরা রেটিনা পর্দার প্রান্ত বরাবর অবস্থিত। তাই রাতে কোন মৃদু আলোর তারা দেখতে হলে তারাটি যেখানে থাকার কথা, তার আশেপাশে তাকালে তারাটি ধরা পড়ে।

আর ‘কোন’ কোষেরা রেটিনার মাঝ বারবর জায়গায় জড়ো হয়ে থাকে। বই পড়া কিংবা রঙিন দুনিয়া দেখার মতো কাজে সুতীক্ষ্ম অনুভূতির প্রয়োজন হয়। রেটিনায় প্রক্ষিপিত আলো থেকে এ ধরণের তীক্ষ্ম অনুভূতির বিস্তারিত তর্জমা করে ‘কোন’ কোষেরা। এরা আবার তিন রকমের হয়। লাল, সবুজ বা নীল রঙের আলোর প্রতি সংবেদনশীলতা অনুসারে এদের কর্মবিভাজন হয়। ‘কোন’ কোষের ত্রিদলীয় ঐক্যজোটের সেবায় আমরা বাস্তবতার একটা রঙিন অনুবাদ দেখি। অবশ্য সব প্রাণী আমাদের মতো ভাগ্যবান না। যেমন কুকুর সহ বেশিরভাগ স্তন্যপায়ী প্রাণীদের কেবল দুই ধরনের ‘কোন’ কোষ আছে। তারা নীল ও হলুদ রঙ আলাদা করতে পারলেও লাল-সবুজ আলাদা করে চিনতে পারে না।

 

যে কোষগুলো আমাদের রঙ দেখতে সাহায্য করে

আলোক সংবেদী কোষ থেকে তড়িৎ-রাসায়নিক সংকেত রেটিনার দ্বিতীয় একটি আন্তঃস্নায়ুজালিকা স্তরের মধ্য হয়ে গ্যাঙলিয়ন (একধরনের স্নায়ু) কোষ দিয়ে তৈরি তৃতীয় একটি স্তরে যায়। রেটিনার এই দুইস্তর একটি সুগ্রাহী ক্ষেত্র তৈরি করে। প্রক্ষিপ্ত বিম্বে আলোকের তারতম্য পরিবর্তন (কনট্রাস্ট) বোঝার জন্য এই ক্ষেত্রটি সহায়তা করে। আলোক তারতম্য বলতে বোঝানো হচ্ছে ছবিতে থাকা বিভিন্ন বস্তুর কিনারার ধার কিংবা আলোছায়ার পরিবর্তনকে। আর গ্যাঙলিয়ন কোষের কাজ হলো এই তথ্যগুলোকে অন্যান্য তথ্যের সাথে সমন্বিত করে অপটিক স্নায়ুরজ্জুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রেরণ করা।

অপটিক স্নায়ুরজ্জু এই তথ্যগুলো থ্যালামাসের মধ্য দিয়ে সেরেব্রাল কর্টেক্সে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। সেরেব্রাল কর্টেক্সেই মূলত দৃশ্য-প্রতীতির কাজ হয়। তবে অপটিক স্নায়ুরজ্জু দৃশ্য কর্টেক্স ছাড়াও মস্তিষ্কের আদিম অংশ,  ব্রেনস্টেমের কাছেও কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য সরবরাহ করে। ব্রেনস্টেমের এই অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রিটেকটাম নামক একদলা কোষ। এদের কাজ হচ্ছে আলোক-তীব্রতা বুঝে চোখের পিউপিলের ছিদ্র বড়-ছোট করা। যখন বাহিরের আলো বেশ তীব্র, তখন ছোট ব্যাসার্ধের ছিদ্র আর যখন বাইরের আলো মৃদু, তখন বড় ব্যাসার্ধের ছিদ্র তৈরি করাই এর কাজ। ঠিক যেন ক্যামেরার এক্সপোজার নিয়ন্ত্রনের মতো। দেখার কাজে আরো কিছু কারিগরী বিষয় আছে। কোন তুলনামুলক স্থির চিত্র দেখার জন্য আমাদের চোখ আপনা-আপনি দ্রুত নড়াচড়া করে পুরো দৃশ্যপটটি চষে যায়। সাথে সাথে এই ছবিগুলোকে জোড়া লাগিয়ে একটি মাত্র সমন্বিত ছবি তৈরি করে মস্তিষ্কে। এই কাজটা অনেকটা প্যানারোমিক ফটোগ্রাফীর অনেকগুলো ছবি জোড়া দেয়া বা স্টিচিঙের মতো। তবে একটা পার্থক্য হলো প্যানারোমিক ফটোগ্রাফীর সময় লক্ষ্য থাকে দুই চোখে চারপাশের যতটুকু কৌনিক দূরত্বের ছবি আমরা দেখি তার চাইতে বিস্তৃত কৌনিক দূরত্বের ছবি তৈরি। বিপরীতক্রমে চোখের এই দ্রুত নড়াচড়ার মাধ্যমে ছবি জোড় দেয়ার কাজের লক্ষ্য  ভিন্ন। একটা দৃশ্যর মধ্য দিয়ে একপাশ থেকে অন্য দিকে তাকানোর সময় যে মসৃণ ছবি তৈরি সম্ভব হয় এই দ্রুত নড়াচাড়ার কারণে। একে বলা হয় চোখের সাক্কাড (Saccade)। চোখের সাক্কাডিয় নড়াচড়া না থাকলে আমাদের দৃশ্যপট ঘোলা হয়ে যেতো। কেউ যখন কোন ঘরের একদিক থেকে অন্যদিকে তাকাচ্ছে, তখন তার চোখের দিকে খেয়াল করলে আপনি এই সাক্কাডীয় নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।

 

দেখার প্রক্রিয়ার সাথে মস্তিষ্কের অনেকগুলো অংশ জড়িত

তো, রেটিনা থেকে অপটিক স্নায়ুরজ্জুর মধ্য দিয়ে যাতায়াত করার সময় বেশিরভাগ তথ্যই মস্তিষ্কের গভীর কেন্দ্রে, থ্যালামাসের একটি অংশে পৌঁছায়। এই অঞ্চলকে বলে ল্যাটেরাল জেনিকুলেট নিউক্লিয়াস। এই অঞ্চল তথ্যস্রোতকে দুইটি ভাগে ভাগ করে, বিভক্ত এক ধারা বহন করে রঙ ও বিম্বের সুক্ষ্ম অংশগুলো সম্পর্কিত তথ্য। অন্য ধারা বহন করে আলোক তারতম্য ও গতি বিষয়ক তথ্য। তথ্যগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করা হয় ল্যাটেরাল জেনিকুলেট নিউক্লিয়াসেরই দুইটি জায়গায়। এরা যথাক্রমে পারভোসেলুলার ও ম্যাগনোসেলুলার নামে পরিচিত।

ম্যাগনোসেলুলার ও পার্ভোসেলুলার স্তরের কোষগুলো প্রক্রিয়াজাত তথ্যকে মস্তিষ্কের পেছনে প্রাথমিক দৃশ্য কর্টেক্সে (V1) পাঠিয়ে দেয়। এই প্রাথমিক দৃশ্য কর্টেক্সের কোষগুলো যেনতেন ভাবে নয়, খুব সুনির্দিষ্টভাবে সাজানো থাকে। এই সুনির্দিষ্ট সাজের কারণেই মস্তিষ্কের দৃশ্য-ব্যবস্থা হিসেব করতে পারে অক্ষির সামনের স্থানে বিভিন্ন বস্তু আসলে কিভাবে সাজানো আছে। প্রথমত,  V1 কোষগুলো রেটিনা-কোষীয় বিন্যাস অনুযায়ী সাজানো থাকে। রেটিনা-কোষীয় বিন্যাসের অর্থ কি? এর মানে হলো, রেটিনাপর্দায় প্রতিটি বিন্দুর জন্য প্রাথমিক দৃশ্য কর্টেক্সে একটি অনুরূপ বিন্দু আছে। রেটিনার কোন বিন্দুতে আলো হতে পাওয়া তথ্য ওই বিন্দুর প্রাথমিক দৃশ্য কর্টেক্সের অনুরূপ বিন্দুতে সঞ্চারিত হয়। ঠিক তেমনি রেটিনার ওই বিন্দুর আশেপাশের বিন্দুগুলো প্রাথমিক দৃশ্যকর্টেক্সের ওই বিন্দুর আশেপাশের অনুরূপ বিন্দুতেও সঞ্চারিত হয়। এর মাধ্যমে প্রাথমিক দৃশ্য কর্টেক্স বা V1 দৃশ্যপটের একটি দ্বিমাত্রিক ছবি তৈরি করতে সক্ষম হয়। দৃশ্যপটের গভীরতা দুইটি চোখের রেটিনা থেকে আসা তড়িৎ-রাসায়নিক সংকেত তুলনা করে প্রাথমিক দৃশ্য কর্টেক্সেই স্থাপিত হয়। এসব সংকেত ওকুলার-ডমিনেন্স-কলাম বা চাক্ষুস-প্রাধান্য-স্তম্ভ নামক একসারি কোষের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এরা আবার দাবার ছকের মতো একের পর এক, একটি ছকে ডান চোখ হতে আসা সংযোগ, অন্যটিতে বাম চোখ থেকে আসা সংযোগে সংযুক্ত।  তারমানে, দৃশ্য কর্টেক্সের কোষগুলোই ‘দেখে’, দেখার অনুভূতি ‘পায়’। কোন বস্তুর দুই রেটিনা থেকে আসা স্থানিক তথ্য পরস্পর তুলনা থেকে পাওয়া সামান্য অমিল দিয়েই দৃশ্যপটের বিভিন্নবস্তুর তুলনামূলক গভীরতা বের করা হয় ত্রিকোণমিতিক হিসাবনিকাশ করে।

 

ছকের মতো সজ্জিত স্তম্ভাকার স্নায়ুকোষ

আবার, V1-এর কোষেরা সারিসারি কোষ দিয়ে ওরিয়েন্টেশন-কলাম বা দিক-স্তম্ভ গড়ে তোলে। এই কোষের সারিরা আবার নির্দিষ্ট লাইনের দিক অনুযায়ী সক্রিয় হয়। দিক-স্তম্ভের এই সক্রিয়তার কারণে V1 কোষেরা দৃশ্যজগতের বিভিন্ন বস্তুর কিনারা সনাক্ত করতে পারে। চোখের সামনে থাকা দৃশ্যপটের বিভিন্ন বস্তুকে সনাক্ত করা থেকেই দৃশ্য-প্রতীতির শুরু হয়। প্রাথমিক দৃশ্য কর্টেক্সের একটি বিশেষত্ব হলো সারি সারি কোষের স্তম্ভাকার  গঠন। এটা কিন্তু কোন সামান্য কিছু নয়, এই গঠন আবিষ্কার করেই ১৯৮১ সালে ডেভিড হাবেল ও টর্স্টেন উইজেল নোবেল পুরস্কার পান।

মজার ব্যাপার হলো, শিশুর জন্মের পরে প্রাথমিক দৃশ্য কর্টেক্সে দাবার-ছকের মতো সাজানো স্তম্ভাকার গঠন খুব অস্পষ্ট, অনির্দিষ্ট থাকে। নবজাতকের দৃশ্য কর্টেক্স প্রচুর অসংলগ্ন ও এলোমেলো স্নায়ুসংযোগ দিয়ে গঠিত। এই অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া সংযোগসমূহ পরবর্তীতে নবজাতকের দৃশ্য-অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ছাঁটাই (Pruned) করে ফেলা হয়। স্নায়ুসংযোগ ছাঁটাইয়ের পরে V1 স্তম্ভাকার গঠন পায়। তারমানে বিষয়টা দাঁড়াচ্ছে যে, স্নায়ুসংযোগের কমে যাওয়ার কারণেই শিশু আকার-আকৃতি ও প্যাটার্ন চিনে দৃশ্যপটের সুক্ষ্ম বিষয়গুলো ধরে ফেলতে পারে।

 

অভিজ্ঞতার ব্যাপারটিও এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্ক কোন পরিবর্তনহীন অচলায়তন নয় যেখানে আগে থেকে সব কিছু ঠিক করা থাকে। বরং মস্তিষ্ক অত্যন্ত গতিশীল, অভিজ্ঞতার যোগান অনুসারে স্নায়ুসংযোগগুলো নিজেকে বদলিয়ে নেয়। V1-এর মতো এই অভিজ্ঞতা-নির্ভর স্নায়ুসংযোগ-পরিমার্জন ঘটতে দেখা যায় সমগ্র সেরেব্রাল কর্টেক্স জুড়েই। শিশুর প্রাথমিক দৃশ্য কর্টেক্স যখন কোন বস্তুর প্রান্ত ও নানা রকম রেখা চিনতে আরম্ভ করছে, গৌণ দৃশ্য কর্টেক্স (Secondary Visual Cortex বা V2) একই সাথে সাথে তার রঙ বিশ্লেষণের ক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এই V2 অঞ্চল কিন্তু রঙের নিত্যতা নামের প্রপঞ্চের জন্য দায়ী। দিনের ফকফকা আলো হোক, বিকেলের কনে দেখা ক্ষণ হোক, নিয়নের কোমল রঙিন আলো হোক – নানান রোশনাইয়ের মাঝে একটা লাল গোলাপকে সবসময়ই কিন্তু আমরা লালই মনে হয়। শুনতে পানিভাত মনে হলেও বিষয়টা আসলে তত সরল নয়। রঙিন চশমার মধ্য দিয়ে দেখলে যেমন সবকিছুর রঙ বদলে যায়, তেমনি ভিন্ন ভিন্ন আলোর রোশনাইয়ে কোন বস্তুর রঙ বদলে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের দৃশ্য-প্রতীতির রঙের নিত্যতা নামক প্রপঞ্চ আছে বলেই ভিন্ন ভিন্ন আলোতে আমরা সবকিছুর রঙ মোটামুটি একই দেখি। কি হয় আসলে এই প্রপঞ্চে? ধারণা করা হয়, V2 কোন বস্তু এবং বস্তুটি পরিবেষ্টন করে থাকা আলো তুলনা করতে পারে। সেই তুলনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যোগবিয়োগ করে V2 হিসাব করে নেয় বস্তুটি কোন রঙে উদ্ভাসিত। অবশ্য এই ‘হিসেব’ করাটা অনেকাংশে নির্ভর করে দর্শক কোন রঙে বস্তুটিকে দেখবার আশা করেন।  রঙের বিষয়টা তাই সম্পূর্ণ বস্তুগত নয়, ব্যক্তির ঝোঁকের উপরও নির্ভরশীল।

 

দৃশ্যবিভ্রম। নীল রঙের গোল দাগগুলো স্থির হলেও আমাদের মস্তিষ্ক এদের পরস্পর নড়াচাড়া করার অনুভূতিটি আরোপ করছে।

বস্তুত, চাক্ষুস-দর্শনের মাধ্যমে দৃশ্যপটের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য আমরা কি রূপে ‘দেখবো’ তা আমাদের অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা প্রত্যাশার উপর নির্ভর করে। প্রত্যাশা অনুযায়ী কি দেখবো তা আরোপিত হয় মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলে। যেমন চোখের সামনে বিভিন্ন বস্তুর রঙ ও গঠন চেনার ক্ষেত্রে V1, V2, V3 ও V4  অঞ্চলে। আর চেহারা ও বস্তু চিনতে পারার ক্ষেত্রে গড়ে ওঠে নিম্ন-টেম্পোরাল লোবে; গতি আর স্থান বিষয়ক সচেতনতার ক্ষেত্রে হয় প্যারাইটাল লোবে। এ ধরনের প্রভাব বিস্তার অনেক ক্ষেত্রে চোখ-থেকে-আসা তথ্যের নৈরাজ্যকর বিশ্লেষণ করে, যেমনটা হয় বিভিন্ন বিভ্রমের ক্ষেত্রে। তবুও এ অভিজ্ঞতা-নির্ভর-প্রত্যাশা প্রভাব আছে বলেই আমরা বিভিন্ন চোখে দেখে ঘটনা অনুযায়ী খুব দ্রুত সাড়া দিতে পারি। রেটিনার স্নায়ু কোষে ‘আলো’ ধরা থেকে শুরু করে প্রাথমিক দৃশ্য কর্টেক্সে রেখা ও বস্তুর কিনারা দেখে উচ্চতর দৃশ্য কর্টেক্সে আঁখিপটের সামনে থাকা বিভিন্ন বস্তু চিনে তাদের পারস্পারিক স্থানিক অবস্থান বোঝা কাজটি মানব মস্তিষ্কের দর্শন-ব্যাবস্থা খুব দক্ষতা ও দ্রুততার সাথে করে। আমাদের প্রজাতীর টিকে থাকার সংগ্রামে এই নৈপুন্যর অবদান কম নয়।

এখন প্রশ্ন প্রিয় পাঠকের কাছে, আমরা কি দিয়ে দেখি? চোখ, নাকি মস্তিষ্ক দিয়ে?

তথ্যসূত্র: How Vision Works? by  www.positscience.com

[এই সিরিজে আমরা দেখছি কোন কাজ করার জন্য মস্তিষ্ক বিভিন্ন অঞ্চলে সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে বিভক্ত। তবুও, মস্তিষ্ক অত্যন্ত নমনীয় একটা অঙ্গ। অভিজ্ঞতার ছাঁচ অনুযায়ী সে নিজেকে গড়েপিটে নিতে পারে। মস্তিষ্কের এই বৈশিষ্ট্যের উপর আলো ফেলা হবে আগামী লেখায়]

পরবর্তী লেখা: মস্তিষ্ক যেভাবে বদলায়

 

লিখেছেন আরাফাত রহমান

অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি শিক্ষার্থী। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।

আরাফাত রহমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 67 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. Dr. Prabir Acharjee Nayan Reply

    প্রচুর বিশ্লেষণ ও তথ্যসমৃদ্ধ একটি লেখা। খুব ভালো লাগলো। বিশেষ করে অভিজ্ঞতার ব্যাপারটি এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্ক কোন পরিবর্তনহীন অচলায়তন নয় যেখানে আগে থেকে সব কিছু ঠিক করা থাকে। বরং মস্তিষ্ক অত্যন্ত গতিশীল, অভিজ্ঞতার যোগান অনুসারে স্নায়ুসংযোগগুলো নিজেকে বদলিয়ে নেয় অংশটি।

  2. TECH TUNES Reply

    আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যেই, সকল বিজ্ঞানের মূল বিজ্ঞান নিহীত . . . .

  3. রুহশান আহমেদ Reply

    ভালো লাগলো লেখাটি, আমার মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে-
    ধরা যাক নীল রং, সবাই আমরা চিনি। কিন্ত, চোখের কোষে যে ধরনের সিগন্যালিং এর কারনে, যে অনুভূতির কারনে আমি নীল রং চিনি…সবার ক্ষেত্রে কি তাই হয়? নাকি রংআনুভূতি প্রত্যেকের ভিন্ন।

    • আরাফাত রহমান Reply

      এক হওয়ারই কথা, কারণ বিবর্তন সাধারণত নতুন জিনিস উদ্ভাবন করতে যায় না, পুরোনো কিছু থাকলে সেটাকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করে। তবে নাও হতে পারে। একই প্রয়োজনে দুই জায়গায় দুই প্রজাতী একই সমাধান ভিন্ন ভিন্ন উপায়েও বের করতে পারে।

  4. সৈয়দ মনজুর মোর্শেদ Reply

    আরাফাত ভাই, লেখাটি পড়তে দেরি হয়ে গেল কারণ মাঝখানে আমার ল্যাপটপখান নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

    যাই হোক, লেখাটি পড়তে ভালো লেগেছে। আমাদের চোখ ‘এন্টেনার মত’ ব্যাপারটা দারুণ লেগেছে। আর শেষ প্রশ্নটির উত্তর দিতে গেলে তো বলতে হয় আমরা মস্তিষ্ক দিয়ে দেখি, তাই না?!

    আপনার আরেকটা লেখা পড়া বাকি রয়ে গিয়েছে ‘মস্তিষ্ক যেভাবে বদলায়’। লেখাটা পড়ার অপেক্ষায় আছি।

    • আরাফাত রহমান Reply

      ধন্যবাদ মনজুর পড়া ও মন্তব্যের জন্য :)। আসলে সবকিছু চিন্তা করলে আমরা মস্তিষ্ক দিয়ে দেখি কথাটাই সঠিক বলে মনে হয়। আর এন্টেনার তুলনাটা আসলে চুরি করা, কোথ্থেকে চুরি করেছি বলা যাবে না ;)।

আপনার মতামত