ডি ময়ভার (Abraham De Moivre)। তিনি ছিলেন বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটনের বন্ধু। শুধু নিউটনের বন্ধুই নয় একসময়কার রাজকীয় গ্রিনিচ মান-মন্দিরের প্রধান এডমন্ড হ্যালিরও বন্ধু ছিলেন তিনি। তার এই দুই বন্ধুর অবদান প্রধানত বিজ্ঞানে আর তার অবদান গণিতে। অবশ্য তিনি জীবনের একটা সময় বিজ্ঞান চর্চা করে কাটিয়েছিলেন।

১৬৬৭ সালের ২৬শে মে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মূলত জটিল সংখ্যা ও ত্রিকোণমিতির উপর তার দেয়া উপপাদ্যের জন্য বিখ্যাত। তিনি এক সূত্রে ত্রিকোণমিতি আর কাল্পনিক সংখ্যার জগতকে এক সুতায় বেধে ফেলেছিলেন। তাছাড়াও সম্ভাব্যতা তত্ত্ব, সাধারণ বণ্টন সহ কয়েকটি ক্ষেত্রে তার অবদান আছে। তার ত্রিকোণমিতি ও জটিল সংখ্যা বিষয়ক কাজ করার আগেই তিনি সম্ভাব্যতার তত্ত্ব নিয়ে দুইটি গবেষণা প্রকাশ করেন। তিনি সম্ভাব্যতা তত্ত্বের উপর একটি বইও লিখেন- নাম ‘দ্যা ডকট্রিন অব চান্সেস’। তার এই বইটিই ছিল সম্ভাব্যতা তত্ত্বের দ্বিতীয় [কারো কারো মতে প্রথম] পাঠ্য বই। তিনি তার বইতে ‘নরমাল ডিস্ট্রিবিউশন’ ‘বাইনোমিয়াল ডিস্ট্রিবিউশন’ ‘সেন্ট্রাল লিমিট থিওরি’ আলোচনা করেন। তিনিই সর্ব প্রথম ফিবোনাচ্চি রাশিমালার বাইনেস্ট ফর্মুলা [Binet’s formula] আবিষ্কার করেন। যেটি সোনালী অনুপাতের সাথে সম্পর্কযুক্ত।

চিত্র: ‘দ্য ডকট্রিন অব চান্সেস’ এর প্রথম সংস্করণের সম্মুখপট। যেটি প্রথম ১৭১৮ সালে প্রকাশিত হয় এবং পরে অনেকগুলো সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

প্রাথমিক জীবন

আব্রাহাম ময়ভারের বাবা ড্যানিয়েল ডি ময়ভার ছিলেন একজন শল্য-চিকিৎসক। বাবা তার ছেলেকে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে দেন। যখন তার বয়স মাত্র এগারো বছর তখনি তার বাবা তাকে সেদানের প্রোটেস্টেন্ট একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দেন। এই প্রতিষ্ঠানে তিনি টানা চার বছর গ্রীক ভাষা শিক্ষা নেন। গ্রীক ভাষাটা পরবর্তীতে তার গণিত চর্চায় কাজে লাগে। ১৬৮২ সালে প্রোটেস্টেন্ট একাডেমি ভেঙ্গে যায় এবং ময়ভার তার পর থেকে যুক্তিবিদ্যা শেখায় মনোনিবেশ করেন। তখন পর্যন্ত তিনি গণিতের ধারে কাছে নেই। কারণ তার লেখাপড়ার বিষয়বস্তু গণিত নয়। অনেকটা কাকতালীয় ভাবেই যেন তিনি একটা গণিতের বই পড়া শুরু করেন। একজন ধর্মগুরু বা ফাদার কর্তৃক লিখিত গণিতের উপর একটি বই তার হস্তগত হয়। পরে এটি পড়া শুরু করেন। এরপর থেকে পড়েনই পড়েন। তার পড়াশুনার বিষয়ের মাঝে গণিত না থাকা সত্বেও তিনি গণিত চর্চা করে যেতে থাকেন।

এর কিছুদিন পর ময়ভারের মনে হল যেন প্রকৃতি কিভাবে চলছে তার বিদ্যে শেখা দরকার। প্রকৃতির নানা কারণ, বিধি এসব আলোচনা করা হয় পদার্থবিদ্যায়। কিছুদিন পর ১৬৮৪ সালে তিনি পদার্থবিদ্যা শেখার জন্য চলে যান প্যারিসে। ততদিনে আইজ্যাক নিউটনের পৃথিবী পাল্টে দেয়া “প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা” প্রকাশিত হয়ে গেছে [১৬৬৪ সালে] । কয়েক বছর পর ১৬৮৮ সালে তিনি তখনকার শ্রেষ্ঠ বিদ্যার পীঠস্থান লন্ডনে পাড়ি জমান। লন্ডনে যাবার পর নিউটন আর এডমন্ড হ্যালির সাথে বন্ধুত্ব সম্পন্ন হয়।

যখন তিনি লন্ডনে যান ততদিনে তিনি গণিতের অনেক ধরণের ভাল ভাল টেক্সট বই পড়ে পড়ে পাক্কা গণিতবিদ হয়ে গেছেন। লন্ডনে অবস্থানকালীন সময়ে তার থাকা খাওয়ার জন্য যে অর্থের দরকার হত তার যোগান দিতেন টিউটর হিসেবে ছাত্র পড়িয়ে। শিক্ষার্থীর বাসায় গিয়ে কিংবা কোনো সময় কফি হাউসের কোনো একটা টেবিলে বসে বসে পড়াতেন।

তার প্রথম দিকের গণিত-চর্চার এক সময় তিনি একটি নতুন বই দেখতে পান ‘প্রিন্সিপিয়া’ যার গায়ে লেখক হিসেবে লেখা আছে ‘নিউটন’। তিনি এটি নেড়েচেড়ে দেখলেন এবং বুঝতে পারলেন এই বইটির কথাগুলো তার আগের পড়া অন্য সকল বইয়ের কথা থেকে গভীর ভাব সম্পন্ন এবং কিছুটা জটিল। এটা খুবই স্বাভাবিক যে একজন ব্যক্তির বেশিরভাগ পড়া বই গণিতের হলে পদার্থবিদ্যার একটা বই তার কাছে কিছুটা ভিন্ন মনে হবে। আর তাছাড়া পদার্থবিদ্যার বইতে একদম বাস্তব, চোখের সামনে ঘটা জিনিসপত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়। এটাও হতে পারে গণিতবিদকে আকর্ষণের একটা কারণ। প্রিন্সিপিয়া বইটি নেড়েচেড়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তাকে এই বইয়ের মর্মার্থ বুঝতেই হবে। তখনকায় তার এমন একটা সময় কাটছিল যেখানে তাকে দিনের বেশিরভাগ সময়ই কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত থাকতে হত। হাটাহাটির মাঝে থাকতে হত। তিনি তাতেও দমে যাননি। হাটার সময় প্রিন্সিপিয়ার পাতা কেটে পকেটে রাখতেন। সুযোগ পেলে পড়তেন।

চিত্র: প্রিন্সিপিয়ার একটি কপি।

মূলত এর সুবাদেই তিনি একসময় নিউটন আর হ্যালির বন্ধু হতে পেরেছিলেন। বস্তু সম্বন্ধে তিনি আস্তে আস্তে এত পারদর্শী হয়ে ওঠেন যে নিউটন অন্যর কোনো জিজ্ঞাসায় তার কাছে পাঠিয়ে দিতেন আর বলতেন “জনাব ডি ময়ভারের কাছে যাও, বস্তু সমন্ধে আমার চেয়ে উনি ঢের ভাল জানেন।”

১৬৯২ সালের দিকে তিনি এডমন্ড হ্যালির সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেন। অন্যদিকে হ্যালির কাছের মানুষ ছিলেন নিউটন। এই দিক থেকে বা অন্য কোনো ভাবে নিউটনের সাথেও তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। ১৬৯৫ সালে ময়ভার গণিতের উপর তার প্রথম গবেষণা পেপার প্রকাশ করেন। যেটি প্রিন্সিপিয়া হতে নির্যাসিত। তিনি নিউটনের সূত্রের উন্নয়ন করেন। গণিতের প্রজ্ঞা ও মেধার দ্বারা এর দুই বছর পরেই ১৬৯৭ সালে বিজ্ঞান চর্চার রাজকীয় প্রতিষ্ঠান রয়েল সোসাইটির নজর কাড়েন। রয়াল সোসাইটি তার দুই মাস পরেই তাকে সোসাইটির একজন সদস্য হিসেবে গ্রহণ করে নেয়।

চিত্র: হ্যালি ও নিউটন

রয়াল সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হবার পর হ্যালি তাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে মনোনিবেশের চেষ্টা করেন। হ্যালি নিজে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেছেন এবং তিনি ছিলেন গ্রিনিচ অবজারবেটরির প্রধান- তাই হয়তো গণিতবিদ বন্ধুকে কিছুটা জ্যোতির্বিজ্ঞানে আগ্রহী করে তুলতে চেয়েছিলেন। ১৭০৫ সালে ময়ভার গ্রহদের গতি ত্রিকোণমিতির সাথে বেধে একটি সূত্র আবিষ্কার করেন। যে সূত্রটি পরবর্তীতে ১৭১০ সালে আরেক গণিতবিদ জোহান বারনৌলি কর্তৃক প্রমাণিত হয়।

গণিতবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি। সবদিক থেকে এমন সাফল্যের পরেও তিনি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের শিক্ষক হিসেবে জীবনের কিছুটা সময় কাটাতে পারেন নি। তার একটা কারণ হতে পারে তখনকার সময়ে ইংল্যান্ডে [লন্ডনে] ফ্রান্সের প্রতি বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করা হত। আর তিনি ছিলেন ফ্রান্সে জন্মগ্রহণকারী লোক। তখনকার সময়ে ব্রিটিশদের বিশাল উপনিবেশ ছিল, অন্যদিকে ফ্রান্সেরও উপনিবেশ ছিল। ফ্রান্স ইংল্যান্ডের প্রতিযোগী ছিল বলেই হয়তো ব্যক্তি জীবনে এর এমন প্রভাব পড়েছিল। তাকে টিউটর হিসেবে দিনাতিপাত করতে হয়েছে। এক কথায় তিনি গরীব ছিলেন। জীবিকার সন্ধানে কাজ করে করে দিনে সময় পেতেন খুব অল্প। ছাত্র পড়ানোর সাথে সাথে শেয়ার, বন্ড, বীমা করে উপার্জন করতেন। এও শোনা যায় তিনি জুয়া খেলতেন। এবং সে খেলায় লাভও করতেন! গণিতবিদ বলে হয়তো মারপ্যাঁচ বুঝে যেতেন তাড়াতাড়ি!

তারপরও তিনি জীবনে ভাল ভাল সম্মান পেয়েছেন। ১৬৯৭ সালের নভেম্বরে তিনি রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। এমন সময়ে নিউটন আর লিবনিজের মাঝে বিরোধ বাধে ক্যালকুলাসের আবিষ্কার নিয়ে। নিউটন বলেন ক্যালকুলাস তিনি আবিষ্কার করেছেন, লিবনিজ তার ফর্মুলা চুরি করেছেন। অন্যদিকে লিবনিজ বলেন ক্যালকুলাস তার নিজের আবিষ্কার, নিউটন তার কাছ থেকে চুরি করেছেন। গণিত-বিজ্ঞানের অন্য অনেক আবিষ্কারের মাঝেই আবিষ্কারক নিয়ে ছোটখাটো তর্ক বিতর্ক থেকে থাকে। সেগুলো ছোট পরিসরে শেষও হয়ে যায়। কিন্তু নিউটন-লিবনিজের বিরোধ ছোট পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকলো না। অবস্থা এমনই হয়ে গেল যে রীতিমত রয়্যাল সোসাইটির মাঝে বোর্ড গঠন করে এর সুরাহা করতে হয়েছে। এই বিশাল যজ্ঞে বিচারক রূপে যারা ছিলেন তার মাঝে আব্রাহাম ডি ময়ভার একজন। একসময় তিনি “বার্লিন একাডেমি” ও “প্যারিস একাডেমির” সদস্য নির্বাচিত হন।

চিত্র: আব্রাহাম ডি ময়ভারের জীবন ও কর্মের উপর লেখা বই।

শেষ জীবন

তিনি জীবনের শেষ দিনগুলোতেও গণিত চর্চায় মগ্ন থাকতেন। ১৭৫৪ সালে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সম্ভাব্যতা নিয়ে পড়াশুনা করে গিয়েছেন। তার মৃত্যুর পরেও গণিতের উপর কয়েকটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। জীবনের শেষ দিককার সময়ে তিনি প্রচুর ঘুমকাতুরে হয়ে পড়েন। প্রয়োজনীয় ঘুমের পরেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুমাতেন। তিনি হিসেব করে তার মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তিনি একদিন পরপর ১৫ মিনিট করে বেশি ঘুমাতেন। তিনি বলেছিলেন, ১৫ মিনিট করে করে যখন মোট ঘুমের পরিমাণ ২৪ ঘণ্টা হবে তখন তার মরণ হবে। তার কথা সত্যি করে দিয়ে ১৭৫৪ সালের ২৭ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

অবদান

তিনি তার দেয়া “ময়ভারের উপপাদ্যে”র জন্যই বিখ্যাত, যেটি ত্রিকোণমিতি আর জটিল[কাল্পনিক] সংখ্যাকে একত্র করেছে। তিনিই প্রথম কোনো গণিতবিদ যিনি ত্রিকোণমিতিতে কাল্পনিক সংখ্যার সংযোগ ঘটান। তার বিখ্যাত উপপাদ্যটি হল- n যেকোনো বাস্তব সংখ্যা হলে (cosθ+ i sinθ)^n এর মান হবে (cosnθ + i sin nθ) । যদি একাধিক মান হয় তবে অন্তত একটি মান (cosnθ + i sin nθ) হবে। এটাকে লেখা যায় এভাবে…

তিনিই প্রথম সম্ভাব্যতা রেখা বা প্রোবাবিলিটি কার্ভ আবিষ্কার করেন। যে আবিষ্কারের কৃতিত্ব প্রায় সময়েই ভুল করে অনেকে কার্ল ফ্রেডরিখ গাউসকে দিয়ে থাকেন। তার কাজের অনেকগুলো আছে ফিলোসফিকাল ট্রাঞ্জেকশন বইতে। বীমা সম্পর্কীয় গণিতেও তার অবদান আছে। বীমার অংকের উপর লেখা তার বই Annuities on Lives প্রকাশিত হয় ১৭২৪ সালে।

চিত্র: Annuities on Lives বইয়ের সম্মুখপট।

যদি সবকিছু ঠিকঠাক মত হয়ে থাকে এই লেখাটা প্রকাশিত হবে তখন মে মাস। আর মে মাসে এই স্বল্প প্রচারিত কিন্তু দারুণ মেধাবী এই গণিতবিদের জন্মদিন। জন্মদিনে তার জন্য রইল শুভেচ্ছা।

 

তথ্যসূত্র:
1. Wikipedia : Abraham_de_Moivre
2. গণিতের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র : হারুন উর রশিদ
3. http://famous-mathematicians.com/abraham-de-moivre
4. Wikipedia : De_Moivre’s_formula
5. Wikipedia : The_Doctrine_of_Chances
6. ফান্ডামেন্টালস অব ম্যাথম্যাটিকস : এম. এফ. রহমান

লিখেছেন সিরাজাম মুনির শ্রাবণ

আমি শ্রাবণ, পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। মাসিক বিজ্ঞান সাময়িকী জিরো টু ইনফিনিটিতে বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। বিজ্ঞান পড়তে ভালো লাগে, বিজ্ঞান বিষয়ক ভাবনা চিন্তা করে আনন্দ পাই।

সিরাজাম মুনির শ্রাবণ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 48 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    বিশাল লেখা। সব পড়া গেলো না। কিন্তু এই লোক বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বেঁচে ছিলো? 😮
    সালগুলো ঠিক করে দাও: ১৯৯২, ১৯৯৫, ১৯৯৭

আপনার মতামত