২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কথা, তখনকার সময়ে নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকার সাপ্তাহিক বিজ্ঞান পাতার মাঝে ঘুরাঘুরি করে বেড়াতাম। সেই সময়ে এমন একটা খবর বেরিয়েছিল যার কারণে সারা দুনিয়ায় হুলস্থূল পড়ে গিয়েছিল। খবরটি ছিল এরকম- “নিউট্রিনো ছোটে আলোর চেয়ে বেশি গতিতে”।

 

যারা বিজ্ঞানের হালচালের অল্প স্বল্প খোঁজখবর রাখে তাদের জন্য তো এটা অবাক করা ঘটনাই, পাশাপাশি যারা বিজ্ঞানের ছাত্র নয়, তাদেরও যেন অবাক করা অবস্থা। সাধারণ মানুষ বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্ব-সূত্র না জানলেও আইনস্টাইন যে একটা যুগান্তকারী কিছু করেছিলেন সেটা জানে। আইনস্টাইনের অত্ত্ব অনুসারে আলোর বেগের চেয়ে বেশি বেগ অর্জন সম্ভব নয়। সেই আইনস্টাইনের কথাকে যদি ভুল বলা হয় তাহলে অবাক হবারই কথা। কি হল কিনা? কি দেখা যায় কিনা? এসব কী শুনছি? সত্যি বলছে তো? কারণ এই তথ্য সঠিক হয়ে থাকলে বিজ্ঞানের অনেক সূত্রই লিখতে হবে নতুন করে। উচ্চ শ্রেণীর আইনস্টাইনীয় বিজ্ঞানের অনেক কিছুর সাথেই এই তথ্য বিরোধ অবস্থানে যায়। তার মানে আইনস্টাইন ভুল। কিন্তু এত নির্ভরযোগ্য স্বয়ং সার্নের বিজ্ঞানীরা দাবী করছে এই কথা, তাই ফেলেও দেয়া যায় না।

মনে হয় সম্ভবত সারা দুনিয়ার সকল পত্রিকাই এক খবরটা ফলাও করে ছাপিয়েছে। ছাপাবে না কেন? পুরো বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়েই টান দেয় যেন! পরে অবশ্য আরও সূক্ষ্ম পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে যে এটা আসলে ভুল ছিল, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পরীক্ষার ফলাফলেও সামান্য ত্রুটি ছিল। এই গবেষণাটি সার্নের একটি স্বতন্ত্র প্রজেক্টের আয়তাধীন ছিল। প্রজেক্টের নাম ‘অপেরা’। অপেরার অধীনেই এই পরীক্ষা করা হয় এবং ভুল ফলাফলের  জন্য জনগণের দাবির মুখে অপেরার প্রধানকে অপসারণও করা হয়। এই হুলস্থূল পাকানো জিনিসটি একটি কণা, নিউট্রিনো। এই কণাটি বিজ্ঞানীদের কাছে তার উপস্থিতি নিশ্চিত করার পর থেকেই এমনসব আচরণ করে যাচ্ছে, এমনসব ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে যার জন্য সকলে তাকে “ভূতুড়ে কণা” বলে ডাকে। তার কর্মেও দেখা যায় আসলেই সে একটি ভুতুড়ে কণা। নিউট্রিনো তাঁর আবিষ্কারের জন্মলগ্ন থেকেই অদ্ভুত আচরণ করে যাচ্ছে। এই নিউট্রিনোর সাথে সাথে এত সব কণা আবিষ্কার হয়েছে তাদের নাড়ি-নক্ষত্র সব জানা হয়েছে কিন্তু এই হতচ্ছাড়া নিউট্রিনো সম্বন্ধে তেমন ভাল কিছু জানা যায় নি এখনো। এ নিয়ে পদার্থবিদদের মাঝে যেন একটা স্থায়ী অসন্তোষ।

শুরুর কথা:
অগ্রসরমান বিজ্ঞানের কল্যাণে আজ আমরা জানি প্রোটন ও নিউট্রন কোনো মৌলিক কণা নয়। এ দুটোই গঠিত কোয়ার্ক দিয়ে। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত ছিল যে পরমাণু বা মহাবিশ্বের সকল কিছু শুধু ইলেকট্রন, প্রোটন আর নিউট্রন দিয়ে গঠিত। তিরিশের দশকের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা নিউট্রন নিয়ে গবেষণা করতে করতে এক সময় একটি অজানা কণার ধারণা পান। তারা আঁচ করতে পারেন এই তিনটি কণা ছাড়াও একটি কণা থাকতে পারে। যদি কল্পনায় একটি কণাকে ধরে নেয়া না হয় তাহলে দেখা যায় ভরের ও শক্তির নিত্যতা সূত্র ভুল হয়ে যায়। পরমাণু থেকে নিউট্রনকে অবমুক্ত করে রাখলে দেখা যায় নিউট্রনটি আর নিউট্রন থাকছে না। সেটি ভেঙ্গে নিজেকে পাল্টে নিচ্ছে ইলেকট্রন ও প্রোটনে। এই পাল্টানোর সাথে সাথে তাঁর ভরেরও পরিবর্তন হয়। আদি অবস্থায় যে ভর ছিল তা থাকে না, কমে যায়। যদি কমেই যায় তবে সে গেল কই? ভর ও শক্তির নিত্যতা সূত্র অক্ষুণ্ণ রাখতে বাধ্য হয়েই ধরে নিতে হল একটি অজানা কণার অস্তিত্ব। তখনকার সময় পর্যন্ত বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে হয়তো তাদের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। পরের বছর পদার্থবিজ্ঞানের আরেক দিকপাল এনরিকো ফার্মি এই অজানা কণাটির নাম দেন নিউট্রিনো। এই গড়বড়ে অবস্থা দিয়েই নিউট্রিনোর শুরু।

আজব আজিব!
নিউট্রিনোর সবচে রহস্যময় জিনিসটা মনে হয় তাঁর গতি। শুধু গতি বললেই শেষ হবে না বলতে হবে দুর্দমনীয় গতি। এটি আলোর বেগে ছুটে চলে। সাধারণ কোনো আলোর কণা যখন ছুটে চলে তখন পথিমধ্যে কোনো অস্বচ্ছ বাধা/প্রতিবন্ধকতা পড়লে আলো আর তা ভেদ করে যেতে পারে না। সেখানেই ঘটে তাঁর যাত্রার সমাপ্তি। বড়জোর প্রতিফলিত হয়। কিন্তু নিউট্রিনো এমন এক আজব জিনিস যেটার সামনে হাজার প্রতিবন্ধকতা থাকলেও তা ভেদ করে অনায়াসে চলে যেতে পারে। পৃথিবীর মাটির ভেতর দিয়ে এক প্রান্ত থেকে কোনো নিউট্রিনোকে অপর প্রান্তে ছুড়ে মারলে তা এক সেকেন্ডের লক্ষ ভাগের এক ভাগেই অতিক্রম করে যাবে। পৃথিবী যে এত্ত বড় বাধা, প্রতিবন্ধকতা তাকে যেন বুড়ো আঙ্গুলই দেখিয়ে দেয়! শীতের কুয়াশার ভিতর দিয়ে একটু বুলেট যেমন অনায়াসেই তা পার হয়ে বনবন করে ছুটে যেতে পারে নিউট্রিনোও যেন তেমনই ভাবে পুরো পৃথিবীকে ভেদ করে যেতে পারে। আর সে নিউট্রিনো প্রতিনিয়ত পৃথিবীকে এরকম অতিক্রম করে যাচ্ছেই। বিরামহীন ভাবে।  আমরা যে পৃথিবীর মাটিতে হাঁটছি সে হাটার সময় আমাদের পায়ের পাতা দিয়ে যে কী বিশাল পরিমাণ নিউট্রিনো ছুটে যাচ্ছে তাঁর আনুমানিক সংখ্যাটা শুনলে বিশ্বাস হতে চায় না। পায়ের পাতা দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ট্রিলিয়ন পরিমাণ নিউট্রিনো ছুটে যাচ্ছে। আমরা বুঝতেও পারছি না, অথচ বিরামহীনভাবে আমাদের এফোঁড় ওফোঁড় করে চলছেই। এমনকি এই মুহূর্তে আমাদের হাতে ধরা কোনো বই বা ম্যাগাজিন কিংবা ধরে রাখা মোবাইলের ল্যাপটপের পর্দার মধ্যে দিয়েও ছুটে যাচ্ছে। ছুটে যাচ্ছে আলোর বেগে।

নিউট্রিনোর এই বেগ নিয়েও একটা ধাঁধায় পড়তে হয় বিজ্ঞানীদের। যদি নিউট্রিনোর ভর থাকে তবে সে আলোর বেগে ছুটে কি করে? ভর থাকলে তো আলোর বেগে ছুটা সম্ভব নয়। কোনো কণার ভর যদি শূন্য হয় তবে তাকে অবশ্যই আলোর বেগে ছুটতে হবে, এ ছাড়া কোনো উপায় নেই। ঠিক এই কথাটাকেই উল্টে বলা যায় কোনো কিছু যদি আলোর বেগে ছুটতে চায় তবে তাকে অবশ্যই ভরশূন্য হতে হবে। রাজনীতিবিদরা যেমন মাঝে মাঝে নাকানি চুবানি খায় বিজ্ঞানীদেরও তেমন নাকানি চুবানি খেতে হল এই নিউট্রিনোর বদৌলতে। পরে অবশ্য এই সমস্যার সমাধান হয়েছে। কয়েক প্রকারের নিউট্রিনো আবিষ্কার হয়েছে। কারো কারো ভর আছে আবার কারো নেই।


সম্ভাবনা:

যোগাযোগ ব্যবস্থায় পৃথিবীকে দিন দিন ছোট করে ফেলাই যেন পৃথিবীর বিজ্ঞানী-প্রকৌশলীদের অন্যতম লক্ষ। সেকেন্ডের ভেতরেই তথ্য আদান প্রদান করা চাই। যেহেতু নিউট্রিনো এমন বাধাহীনভাবে চলে তাই এই নিউট্রিনোর মাঝে তথ্য দিয়ে তাকে প্রেরণ করা যেতে পারে না? ধরা যাক পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে কোনো বার্তা অপর প্রান্তে পাঠানো লাগবে, তাঁর জন্য যেটা করতে হবে সেটা হল স্যাটেলাইটের সাহায্য নেয়া, কিংবা তার অথবা সাবমেরিন ক্যাবলের সাহায্য নেয়া। মোটামুটি বেশি সময় না লাগলেও ভালই সময় লাগে তাতে। এখানে যদি নিউট্রিনো দিয়ে কাজটা করা যায় তবে কতই না সহজ হয়ে যায়। নিউট্রিনো মাটি ভেদ করে যেতে পারবে সেকেন্ডের লক্ষ ভাগের এক ভাগে। লাগবে না কোনো তাঁর। উপযোগী একটা ট্রান্সমিটার আর রিসিভার হলেই হল। ট্রান্সমিটার হতে তথ্য প্রেরণ করা হবে আর গ্রাহকের কাছে রিসিভারে সে তথ্য গ্রহণ করা হবে। আমরা যে টেলিফোন, মোবাইল ব্যাবহার করি সেখানেও তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের বদলে ব্যবহার করা যেতে পারে এই নিউট্রিনো প্রযুক্তি।

কিন্তু ওই যে বিজ্ঞানীদের নাকানি চুবানি খাওয়ানো কণা সে কি আর সহজে ধরা দিবে? এখানেও আছে ঝামেলা। নিউট্রিনো সে অনায়াসেই ভেদ করে যাবে রিসিভার। রিসিভারকে সাড়াই দিবে না। স্বয়ং পৃথিবীকে ভেদ করে চলে যায় আর এটা তো একটা রিসিভার মাত্র! কোনো একটা হিসেবে এমন সংখ্যাও দেখেছিলাম নিউট্রিনোর গতিকে থামাতে হলে একলক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল [তিন লক্ষ কিলোমিটার] লম্বা নিরেট ধাতব পাত দরকার! সামান্য একটা কণাকে ধরতে এত বিশাল আঁকারের ডিটেক্টর তৈরি করতে হয় যে সে ডিটেক্টরকেও মোটামুটি এক ভৌতিক কারখানা বলে মনে হয়।

চিত্র: নিউট্রিনোকে ধরার জন্য তৈরি করা বিশাল ডিটেক্টর।

তবে আমরা আশা করতেই পারি এবং এর জন্য অপেক্ষা করতেই পারি, একসময় সহজলভ্য এমন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হবে যা দিয়ে খুব সহজেই নিউট্রিনোকে বাগে আনা যাবে। এবং তার সাথে সাথে এটি দিয়ে জগতকেই পাল্টে ফেলা যাবে, মানুষের জীবনযাত্রার সহজতর হয়ে যাবে। যদি আমরা দৃশ্যমান আলোকের বিকিরণের বদলে নিউট্রিনোর বিকিরণে দেখি তাহলে রাতের অন্ধকারেও পৃথিবীকে দিনের মতই দেখা যাবে। সে জন্য দরকার উপযুক্ত প্রযুক্তি। সত্যি কথা বলতে কি নিউট্রিনোকে ব্যবহার করে যে কি পরিমাণ সুবিধা পাওয়া যেতে পারে সেটা আমরা ভাবতেই পারি না। অনেক অনেক সম্ভাবনাময় একটা জিনিস এই নিউট্রিনো।

 

কোথা থেকে আসে এরা:

নিউট্রিনোর সবচে বড় আঁধার বলা যায় সকল নক্ষত্রকে। তাঁর মাঝে আমাদের সূর্যও তো একটা নক্ষত্র। এই সূর্যেও প্রতিনিয়ত অসংখ্য নিউট্রিনো তৈরি হচ্ছে। সূর্যে প্রতিনিয়ত আগুন জ্বলছে আর সে আগুনে কোনো প্রকার অক্সিজেন লাগে না। যেটা হয় সেখানে তা হল নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া। নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ায় অসংখ্য নিউট্রন মুক্ত হচ্ছে, আর নিউট্রন থেকেই তৈরি হয় নিউট্রিনো। প্রতিনিয়ত সেই নিউট্রিনো ছুটে আসছে আমাদের দিকেও। একেকটা সুপারনোভা বিস্ফোরণে কি পরিমাণ নিউট্রিনো অবমুক্ত হয় তার সংখ্যা কল্পনা করে নেয়াও সাধ্যের অতীত। কথায় বললে মোটামুটি এরকম দাড়ায় একশ বিলিয়ন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন…। আমাদের পৃথিবীর মাঝে যে নিউক্লিয়ার বোমা ফাটানো হয় তাতেও তৈরি হয় অনেক নিউট্রিনো। পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট থেকেও নিউট্রিনো উৎপন্ন হয়। তাছাড়াও কণা নিক্ষেপকে [Particle Accelerator] একাধিক কণার পারস্পরিক সংঘর্ষের মাধ্যমেও তৈরি হয় নিউট্রিনো। প্রত্যেকটা নক্ষত্রের মৃত্যুতে অবমুক্ত হয় অসংখ্য নিউট্রিনো। সুপার-নোভার বিস্ফোরণে বের হয় নিউট্রিনো। মহাবিশ্বের সেই জন্মলগ্ন থেকেই নানান মহাজাগতিক ঘটনার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে সে। সেই আদি মহাবিশ্বের [Baby universe] সাক্ষীরূপে পাওয়া যায় এই নিউট্রিনোকে। কত কাল কত বছর ধরে তারা ছুটেই চলছে এবং চলতে চলতে একসময় কোনো কোনোটি আমাদের পৃথিবীর মাঝে দিয়েও যাচ্ছে। যেটা পটভূমি বিকিরণ [Background Radiation] নামে পরিচিত। মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় তার বয়স যখন খুব অল্প ছিল তখন প্রোটন, ইলেক্ট্রন, নিউট্রিনো একসাথে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় ছিল। সময়টা বিগ ব্যাং এর এক সেকেন্ডের একশো ভাগের এক ভাগ পরের কথা। মহাবিশ্বের বয়স যখন এক সেকেন্ডের একশো ভাগের এক ভাগ থেকে দশ ভাগের এক ভাগে এসে পড়ে তখন এই কণাগুলোর মাঝে থাকা দুর্বল মিথস্ক্রিয়া কমে যেতে থাকে। আর এর ফলে নিউট্রিনোগুলো মুক্ত হয়ে ছড়িয়ে যেতে লাগলো মহাবিশ্বের চারিদিকে। এই ছড়িয়ে পড়া নিউট্রিনোগুলোই ভেদ করে যাচ্ছে আমাদেরকে। এর চেয়ে অবাক করা জিনিস আর কিই বা হতে পারে যে আমরা এমন একটা জিনিসের সংস্পর্শে আসতে পারছি যা কিনা সৃষ্টির শুরুর প্রতিনিধিত্ব করে।

 

নিউট্রিনো কী:

আমরা আগেই দেখেছি প্রোটন ও নিউট্রন কোনো মৌলিক কণা নয়। যে তিনটি কণা ইলেকট্রন, প্রোটন, ও নিউট্রন নিয়ে মহাবিশ্বের সকল কিছু গঠিত বলে ধরা হত তাঁর মাঝে ইলেকট্রনই শুধু আজ পর্যন্ত মৌলিক কণা হিসেবে টিকে আছে। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের প্রমিত মডেল বা স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুসারে মহাবিশ্ব গঠিত হয়েছে তিন শ্রেণীর কণা দিয়ে। সেগুলো হচ্ছে-

১. কোয়ার্ক
২. বোসন
৩. লেপটন

এর মাঝে তিন নম্বর শ্রেনী লেপটন আবার দুই প্রকার। এক প্রকার ইলেকট্রন আরেক প্রকার নিউট্রিনো। নিউট্রিনোর কোনো চার্জ নেই। যেহেতু কোনো চার্জ নেই তাই সে কোনো প্রকার চুম্বক ক্ষেত্র, বিদ্যুৎ ক্ষেত্র দ্বারাও প্রভাবিত হয় না। আর সেজন্য এই নিউট্রিনো নিয়ে গবেষণা করতে বিজ্ঞানীদের নানান হ্যাপা পোহাতে হয়। চার্জহীন বলেই তাঁর এরকম নাম। নিউট্রিনো নামটার সরল বাংলা তর্জমা করলে এরকম দাঁড়ায় চার্জহীন অতিক্ষুদ্র কণা। এই কণাটিকে প্রকাশ করা হয় গ্রীক বর্ণ ν (নিউ) দিয়ে। এই কণা কারো সাথে বিক্রিয়াও করে না। এই মুহূর্তে এই অযথা(!) বকবকানি যার দ্বারা পড়া হচ্ছে তাঁর শরীরের ভেতর দিয়েও সেকেন্ডে হাজার কোটি নিউট্রিনো পার হয়ে যাচ্ছে। কই? কেও কি টের পাচ্ছে? একদিকে বিদ্যুৎ-চুম্বক ক্ষেত্র দ্বারা প্রভাবিত হয় না আরেক দিকে কোনো ধরণের বিক্রিয়াও করে না, তাই এটা নিয়ে কাজ করতে গেলে বিজ্ঞানীদের সমস্যা হবারই কথা!

 

নিউট্রিনো তিন প্রকার। হিসেবের মাঝে তিন প্রকার নিউট্রিনোর দরকার পড়ে তিন প্রকার ইলেকট্রনের জন্য।
১. ইলেকট্রন-ইলেকট্রন। যাকে বলে “ইলেকট্রন” (সত্যিকারের ‘আসল’ ইলেকট্রন)
২. মিউ-ইলেকট্রন। যাকে বলে “মিউওন”
৩. টাউ-ইলেকট্রন। যাকে বলে “টাউওন”

এই প্রতিটি কণার সাথে আছে একটি করে নিউট্রিনো।
১. ইলেকট্রন নিউট্রিনো
২. মিউ নিউট্রিনো
৩. টাউ নিউট্রিনো

 

এক পলকে নিউট্রিনোর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস:

১৯৩১- বিজ্ঞানী উলফগ্যাং পাউলি নিউট্রিনোর অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা করেন ও ভবিষ্যদ্বাণী করেন। ইলেকট্রনের ভর, শক্তি, ভরবেগ ইত্যাদির হিসাব মিলাতে গিয়ে তিনি এটি লক্ষ করেন।
১৯৩২- এনরিকো ফার্মি এর নাম দেন নিউট্রিনো।

১৯৩৪- এনরিকো ফার্মি নিউট্রিনোকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি তত্ত্ব দাড় করান।
১৯৫৬- পরীক্ষার মাধ্যমে সর্বপ্রথম নিউট্রিনো আবিষ্কার করা হয়।

১৯৬২- নিউট্রিনোর অন্য একটি প্রকারভেদ ‘মিউ নিউট্রিনো’ আবিষ্কার।
১৯৬৮- সূর্য থেকে আগত নিউট্রিনো খুঁজে পেতে বিজ্ঞানীরা প্রথম কোনো পরীক্ষা চালায়।

১৯৭৮- স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার নিক্ষেপকে টাউ লেপটন আবিষ্কৃত হয়। তাতে টাউ নিউট্রিনোর অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা করা হয়। এবং তাতে সে কণার ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়।
১৯৮৫- নিউট্রিনোর ভর শূন্য নয় এমন ফলাফল প্রকাশ করা হয়। গবেষণায় ছিল আই.বি.এম. ও রাশিয়ান টিম।

১৯৮৭- ক্যামিওক্যান্ড ও রাশিয়ান টিম সুপারনোভা থেকে আগত নিউট্রিনো শনাক্ত করে।
১৯৮৮- ৬২ সালের নিউট্রিনোর একটি প্রকারভেদ আবিষ্কারের জন্য বিজ্ঞানীদের নোবেল পুরস্কার প্রদান।

১৯৮৯- ক্যামিওক্যান্ড আরেকটি গবেষণায় সূর্য থেকে আগত নিউট্রিনো পরিমাপ করে এবং দেখতে পায় সূর্য থেকে যে পরিমাণ নিউট্রিনো ছুটে আসার কথা সে পরিমাণ আসে না। কম আসে। তিন ভাগের এক ভাগ।

১৯৯০- আই.বি.এম. সূর্যের আগত তিন ভাগের এক ভাগ নিউট্রিনো বিষয়ক সমস্যার সঠিক কারণ খুঁজে পায়।
১৯৯৮- এই সময়ে বিজ্ঞানীরা একেবারে নিশ্চিত হয়ে ঘোষণা করলেন যে নিউট্রিনোর ভর আছে।
২০০০- ভবিষ্যদ্বাণী করা টাউ নিওট্রিনোকে খুঁজে পাওয়া যায়।

২০০২- সূর্যের নিউট্রিনো সমস্যার সমাধানের জন্য বিজ্ঞানীদের নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয়।
২০১৫- নিউট্রিনোরা যে নিজেদের সত্ত্বা পরিবর্তন করে, মানে এক প্রকার নিউট্রিনো থেকে আরেক প্রকার নিউট্রিনোতে পালটে যেতে পারে এই ব্যাপারটা আবিষ্কারের জন্য তাকাকি কাজিতা ও আর্থার ম্যাকডোনাল্ডকে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়।

 

এবার ২০১৫ সালেও পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার নিউট্রিনোর উপর গেলো। এই একটি মৌলিক কণার উপর চার চারটি নোবেল গিয়েছে- ১৯৮৮, ১৯৯৫, ২০০২ ও ২০১৫। অন্য কণার উপর এত পরিমাণ নোবেল কমই গিয়েছে। ফোটন আর ইলেকট্রন বাদে। এত পরিমাণ নোবেল পুরষ্কার এই কণা নিয়ে গবেষণার উপর গিয়েছে তার একমাত্র কারণ কণাটির রহস্যময়তা। অনায়াসেই বলা যায় ভবিষ্যতেও এর উপরে নোবেল যাবে। এই কণাটি নিয়ে একটি রহস্যের কিনারা হয়, তো আরো দশটি রহস্যের সূচনা হয়। একটি প্রশ্নের সমাধান হয় তো, পরে ঐ সমাধানের হাত ধরে আরো দশটি প্রশ্নের উদয় হয়।

একেকটি রহস্যের সমাধানের সাথে পদার্থবিজ্ঞানের, মহাকাশ বিজ্ঞানের অনেক অজানা রহস্যের সমাধান হয়। এই কারণেই এই কণার উপর গবেষণা খুব মূল্যবান হিসেবে দেখা হয়।

[আপডেটঃ ৬ অক্টোবর, ২০১৫]

 

তথ্যসূত্র:
1. Ghost of the Universe;  Frank Close
2. Neutrino Experiments Light the Way to New Physics;  Martin Hirsch
3. অপ্রকাশলোকের সন্ধানে : ড. এ. এম. হারুন অর রশীদ
4. বিজ্ঞান প্রজন্ম : প্রথম আলো
5. Wikipedia : Neutrino
6. আরও একটুখানি বিজ্ঞান: মুহম্মদ জাফর ইকবাল
7. Neutrinos not faster than light : Nature Magazine
8. নোবেল প্রাইজ.অর্গ
9. http://www.nobelprize.org/nobel_prizes/physics/laureates/

 

দ্রষ্টব্য:
এই লেখাটি মাসিক বিজ্ঞান সাময়িকী জিরো টু ইনফিনিটির  নভেম্বর ২০১৩ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।

[যারা কপি পেস্ট করতে ওস্তাদ তাদের বলছি- অনলাইনে দেবার পর থেকে লেখাটি এখন পর্যন্ত অসংখ্য বার কপি-পেস্ট হয়েছে, নতুন করে কপি পেস্ট করার মতো কিছু নেই।]

লিখেছেন সিরাজাম মুনির শ্রাবণ

আমি শ্রাবণ, পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। মাসিক বিজ্ঞান সাময়িকী জিরো টু ইনফিনিটিতে বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। বিজ্ঞান পড়তে ভালো লাগে, বিজ্ঞান বিষয়ক ভাবনা চিন্তা করে আনন্দ পাই।

সিরাজাম মুনির শ্রাবণ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 48 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

আপনার মতামত