….প্রথম পর্বের পর থেকে।

যে স্থানে ভূমিকম্প উৎপন্ন হয় সে স্থানটা ভূ-পৃষ্ঠের যত কাছাকাছি হবে ভূমিকম্পের ভয়াবহতা তত বেশি হবে। প্রতিনিয়ত কত শত ভূমিকম্পই তো হয়, তার মাঝখানে অল্পপরিমাণই মানুষের জন্য অভিশাপ রূপে আবির্ভূত হয়। তার মানে বেশিরভাগ ভূমিকম্পই হয় ভূমির বেশ নিচে। একদম শতশত কিলোমিটার নিচে। ৭০ কিলোমিটার থেকে ৭০০ কিলোমিটারের মাঝে বেশিরভাগ ভূমিকম্পের সূত্রপাত হয়ে থাকে। এমনিতে ভূমিকম্প সংঘটনের সীমা ধরা হয় ৫-১১০০ কিলোমিটার। তার মাঝে বেশি সবচে বেশি হয় ৭০-৩০০ কিলোমিটারের মাঝে।[২] সবচে বেশি হওয়ার এই সীমানাকে ধরা যেতে পারে মাঝারি দূরত্ব। এই মাঝারি দূরত্বের দূরত্বের মাঝে যেগুলো অপেক্ষাকৃত দূরে সংঘটিত হয় সেগুলোর তীব্রতা আমরা অনুভব করতে পারি না। যেগুলো কাছাকাছি অল্প গভীরতায় হয় সেগুলোর তীব্রতা অনুভব করা যায়। অন্যদিকে পৃথিবীর তিন চতুর্থাংশই সমুদ্র। সমুদ্রের তলদেশে হামেশাই ভূমিকম্প হচ্ছে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বলে আমরা সেগুলো টের পাচ্ছি না। মাঝে মাঝে যে কয়েকটা মানুষকে ছুঁয়ে যায় সেগুলোতেই তো ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা হয়ে যায়। সবগুলো মানুষকে ধরলে কী অবস্থার সৃষ্টি হতো! নিচের চিত্রে মাত্র ৩৫ বছরে ঘটে যাওয়া সাড়ে তিন লক্ষেরও বেশি ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র দেখা যাচ্ছে। এদের মাঝখানে বাংলাদেশটাকে ডটের ভিড়ে দেখাই যায় না। বাংলাদেশটা ভূমিকম্প প্রবণ এলাকায় অবস্থিত। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ভূমিকম্প আলোচনা করতে স্বতন্ত্র লেখা দাড়িয়ে যাবে একটি।


বৈশিষ্ট্য
ভূমিকম্পের ভয়াবহতার মূল কারণ তার তরঙ্গ। ভূমিকম্প উৎপত্তি হয়ে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গ আকারে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই তিন তরঙ্গের কেও পানির তরঙ্গের মত আবার কেও শব্দ তরঙ্গের মত। তরঙ্গ তিনটি হচ্ছে

১. প্রাইমারী তরঙ্গ বা P Wave
২. সেকেন্ডারী তরঙ্গ বা S Wave
৩. পৃষ্ঠ তরঙ্গ বা Surface wave

প্রাথমিক কম্পন বা প্রাইমারী তরঙ্গ শব্দ-তরঙ্গের মত সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমে এগিয়ে আসে। আর সেকেন্ডারী তরঙ্গ পানির ঢেউয়ের মত অনুপ্রস্থ তরঙ্গ আকারে এগিয়ে আসে। এখানে প্রাইমারী তরঙ্গের গতিবেগ সেকেন্ডারী তরঙ্গের থেকে বেশি। সেকেন্ডারী তরঙ্গ এগিয়ে আসার আগেই প্রাইমারী তরঙ্গ চলে আসে। প্রাইমারী তরঙ্গের গতিবেগ সেকেন্ডারী তরঙ্গের দ্বিগুণ। প্রাইমারী তরঙ্গ সামনে যেকোনো রকমের বাধা যেমন মহাসাগর ইত্যাদি পেরিয়ে সংকোচন প্রসারণে চলে আসতে পারে। গ্রানাইট পাথরের মধ্য দিয়ে প্রাইমারী তরঙ্গের গতিবেগ সেকেন্ডে 5000m/s বা প্রতি সেকেন্ডে পাঁচ কিলোমিটার , তরল মাধ্যমে 1450 m/s অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় দেড় কিলোমিটার। বায়বীয় মাধ্যমে এর গতিবেগ শব্দের গতিবেগের সমান। বাতাসে শব্দের বেগ 330 m/s । কিন্তু প্রাইমারী তরঙ্গের তেমন ধ্বংস ক্ষমতা নেই। অন্যদিকে সেকেন্ডারী তরঙ্গ মাঝ পথে মহাসাগর পড়লে সেটি পেরিয়ে আসতে পারে না। কিন্তু না পারলেও তার যে বিশাল ধ্বংসক্ষমতা তা দিয়েই একটি সভ্যতা ধ্বংস করে ফেলতে পারে। এ দুই ধরণের তরঙ্গ ছুটে চলে মাটির ভেতর দিয়ে। আরেক প্রকার তরঙ্গ আছে যেটি চলে শুধুমাত্র ভূপৃষ্ঠ দিয়ে। একে বলে পৃষ্ঠ তরঙ্গ। এই পৃষ্ঠ তরঙ্গ আবার দুই ধরণের হতে পারে, এক প্রকার মাটিকে উপরে নিচে কাপিয়ে কাপিয়ে চলে আরেক প্রকার মাটিকে ডানে বামে।


চিত্র: প্রাইমারী, সেকেন্ডারী ও পৃষ্ঠ তরঙ্গ। উভমুখী তীর দিয়ে মাটির প্রবাহ চিহ্নিত করা হয়েছে আর মোটা তীর প্রতিনিধিত্ব করছে সামগ্রিক ফলাফল বা ভূমিকম্প প্রাবাহের দিক।

তারমানে দেখা যাচ্ছে এমন কোনো দিক বাকি নেই যেদিকে সে নড়াচড়া করে না। ডান বাম চারটা দিক, উপর-নিচ, সংকোচন-প্রসারণ, ঢেও এমন সব তরঙ্গের হিসেব করলে দেখা যাচ্ছে ভূমিকম্পের মাঝে কম্পনের “কুটির শিল্প” বসে গেছে! এতসব কম্পনে ধ্বংস হওয়াটাই স্বাভাবিক।

ফলাফল
সামান্য মাত্রার ছোটখাটো ভূমিকম্পে হয়তো আমাদের তেমন কিছুই হয় না কিন্তু বড় মাত্রার ভূমিকম্পে যে কি ক্ষতি হতে পারে সেটা আর বলার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। ২০১১ সালের মার্চে জাপানের উত্তর উপকুলের অদূরে একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয় এবং এর ফলে সুনামির সৃষ্টি হয়। এই সুনামির আঘাতে মারা যায় ষোল হাজার মানুষ, ক্ষয়ক্ষতি হয় কয়েক হাজার কোটি ডলারের চেয়ে বেশি। লক্ষ লক্ষ শিশু বাস্তু হারা হয়েছে। আপনজন হারানো কিংবা অন্যান্য মানবিক দিক তো আর মেপে নির্ধারণ করা যাবে না। জাপানে পারমানবিক শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। পারমানবিক শক্তি ব্যবহারের এই দিকটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। ভূমিকম্পের ফলে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আরও একটি বিশাল দুর্যোগ ঘটার সম্ভাবনা দেখা দেয়। জাপান উন্নত দেশ, তাদের পক্ষে এমন দুর্যোগ কাটিয়ে উঠা তেমন কঠিন কিছু নয়। এত্ত বড় মারাত্মক দুর্যোগ তারা অল্পতেই সামলে নিতে পেরেছিল। কিন্তু আমাদের মত দেশে ছোট খাট কোনো ভূমিকম্প আঘাত হানলে সেটি কাটিয়ে উঠার মত অবকাঠামো নেই। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধ্বসের সময় আমরা দেখতে পেয়েছি মাত্র একটি ধ্বসে যাওয়া ভবন থেকে লোকজন উদ্ধার করার মত যন্ত্রপাতি সরকারের নেই। বিভিন্ন বেসরকারি উদ্যোগে এই কাজ সেই করার যন্ত্রপাতি দিয়ে উদ্ধার করা হয়েছে। যাহোক সেসব কথা আজ আর এখানে নয়।


চিত্র: ২০১১ সালে জাপানে সংঘটিত ৯ মাত্রার ভূমিকম্প পরবর্তী বিশাল সুনামি।

ইতিহাসের পাতায় আমরা অহরহ দেখেছি ভূমিকম্পের ধ্বংসলীলা। এক মুহূর্তেই বড় বড় শহর কিংবা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। মাটিতে মিশে যেতে পারে চোখের পলকে। এমন অবস্থা হতে পারে যেখানে ভূমিকম্পের আগে নদী ছিল কিন্তু ভূমিকম্পের পরে সেটি বিরান মাঠ হয়ে গেছে। আবার এমন হতে পারে ভূমিকম্পের পরে বিরান মাঠে নদীর প্রবাহ সৃষ্টি হয়েছে। যেমন আমাদের কাছের উদাহরণই দেখা যাক না, ১৭৮৭ সালে আসামের এক ভূমিকম্পের ফলে ব্রহ্মপুত্র নদের তলদেশের মাটি উপরে উঠে যায় এবং পরবর্তীতে সেটি তার গতিপথ পাল্টে নিয়ে বর্তমান যমুনা নদী দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। ধ্বসে যেতে পারে পাহার, বিশাল এলাকা নিয়ে নদীভাঙ্গনের সৃষ্টি হতে পারে। ফ্লাইওভার মাঝ বরাবর ভেঙ্গে যেতে পারে কিংবা গোরা সহ উপড়ে যেতে পারে। স্থলভূমি সমুদ্রের তলদেশে হারিয়ে যেতে পারে আবার সমুদ্র হতে স্থলভূমির উদ্ভব হতে পারে। প্রকৃতির এই সামান্য একটা জিনিস যে কত শক্তিশালী তা আমরা ভাবতেও পারি না।


চিত্র: ভূমিকম্পের ফলে একটি শহরের যে অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে তার কাল্পনিক চিত্র।

মাপামাপি/মাপজোখ
একটি ভূমিকম্প কত পরিমাণ তীব্র সেটা মাপা হয় সিসমোমিটার নামক যন্ত্রের সাহায্যে। এই সিসমোমিটার যন্ত্রে ভূমিকম্পের যে রেকর্ড হয় তাকে বলে সিসমোগ্রাম। সিসমোমিটার যন্ত্রটি প্রধান দুটি অংশ নিয়ে সজ্জিত। একটি অংশ ভূমির সাথে দৃঢ়ভাবে লাগানো থাকে আরেকটি অংশ স্প্রিংয়ের সাহায্যে পেন্ডুলামের মত উপর থেকে ঝুলে থাকে। পেন্ডুলামের শেষে যে অংশে ছোট বব থাকে সিসমোমিটারের ক্ষেত্রে সে জায়গায় থাকে ভারী বস্তু। ভারী বস্তুর শেষপ্রান্তে থাকে কলমের মত অগ্রভাগ। কলমের অগ্রভাগ আবার ছোয়ানো থেকে একটি ঘূর্ণনশীল সিলিন্ডারের সাথে। সিলিন্ডারের উপর ভূমিকম্পের গ্রাফ রেকর্ড হতে থাকে। সিলিন্ডারের মত এই অংশটিকে বলা হয় ঘূর্ণনশীল ড্রাম বা রোটেটিং ড্রাম (Rotating Drum)।

চিত্র: একটি সিসমোমিটার। 

ভূমিকম্পের ফলে মাটি যখন কেপে উঠে তখন যন্ত্রের নিচের অংশও ভূমির সাথে সাথে কাপে। কিন্তু উপরের স্প্রিঙে ঝুলে থাকা ওজন ভূমির সাথে সাথে কেপে উঠে না। এটা হয় গতি জড়তার কারণে। কোনো বাস যাত্রী তার সিটে বসে থাকার সময় হঠাৎ করে বাস চলা শুরু করলে যাত্রীর শরীরের নিচের অংশ বাসের সাথে সাথে যেতে চাইলেও উপরের অংশ বাসের সাথে সাথে যেতে চায় না। সে কারণেই বাস চলা শুরু হলে মাথা পেছন দিকে হেলে পড়ে। এখানেও এই ব্যাপারটাই ঘটে। সিসমোমিটার নিচের অংশ এদিক সেদিক নড়াচড়া করলে ওজনের অগ্রভাগে লাগানো কলমে সেখানে দাগ পড়ে। এই দাগের তীব্রতা দেখেই বোঝা যায় ভূমিকম্প কত তীব্র ছিল। ভূমিকম্প যত বেশি তীব্র হবে সিসমোমিটারের দাগ তত বেশি উঁচুনিচু হবে। নিচের চিত্রে সিসমোমিটার কর্তৃক মাপা একটি গ্রাফে ভূমিকম্পের দশা দেখা যাচ্ছে। সময়ের সাপেক্ষে প্রথম দিকের সময়ে (বাম দিকে) গ্রাফের উঠানামা একদম নেই। এটা স্বাভাবিক শান্তশিষ্ট সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে। আর শেষের দিকে (ডানে) উঠানামার পরিমাণ বেশি যা ভীষণ কম্পনের সংকেত বহন করে।

চিত্র: একটি সিসমোগ্রাফ। 

চিত্রে দেখা যাচ্ছে সময়ের সাপেক্ষে প্রাইমারী তরঙ্গ (P wave) এসে আঘাত হানে সবার আগে। P তরঙ্গের পরপর আসে সেকেন্ডারী তরঙ্গ(S wave) সবার শেষে আসে পৃষ্ঠ তরঙ্গ। এবং তীব্রতার দিক থেকে পৃষ্ঠ তরঙ্গ সবার উপরে।

দ্রষ্টব্য:
লেখাটির বাকি অংশ দেখুন তৃতীয় পর্বে

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

লিখেছেন সিরাজাম মুনির শ্রাবণ

আমি শ্রাবণ, পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। বিজ্ঞান পড়তে ভালো লাগে, বিজ্ঞান বিষয়ক ভাবনা চিন্তা করে আনন্দ পাই।

সিরাজাম মুনির শ্রাবণ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 51 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. Pingback: ভূমিকম্প – কম্পনের কুটির শিল্প [১] | বিজ্ঞান ব্লগ

  2. Pingback: ভূমিকম্প – কম্পনের কুটির শিল্প [৩] | বিজ্ঞান ব্লগ

আপনার মতামত