শতকরার বিষয়টি বেশ বিভ্রান্তিকর। স্কুলে পড়ার সময় এই বিষয়ক সমস্যাগুলোর অধিকাংশই ছিলো লাভ-ক্ষতি বিষয়ক। অধিকাংশ সময়ই আমি বুঝতে পারতাম না ক্রয়মূল্যকে ১০০ ধরতে হবে নাকি বিক্রয়মূল্যকে। এতে করে ফলাফল মেলানো অনেক সময় কষ্টসাধ্য হয়ে যেত। এখন স্কুলের সেই সমস্যাগুলোর চেয়েও বিভ্রান্তিকর কিছু শতকরা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করব। যেমন: এই সমস্যাটি দেখা যাক।

ধরা যাক, আপনি কোনো অফিসে নির্দিষ্ট বেতনে চাকরি করেন এবং কোনো এক সময় আপনার বেতন ১০% বৃদ্ধি করা হলো। কয়েকমাস এভাবে চলার পর কোম্পানির ব্যবসায় মন্দা যাওয়ায় আপনার বেতন পুনরায় ১০% ছেঁটে দেওয়া হলো। এখন কি আপনি আপনার শুরুর বেতনের সমান বেতন পাবেন?

এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে ’না’!

সংক্ষেপে এর সমাধান করে ফেলা যাক। ধরি, শুরুতে আপনার বেতন ছিলো ১০০০০ টাকা। ১০০০০ টাকার ১০% হবে ১০০০ টাকা। তাহলে ১০% বাড়ায় আপনি মাইনে পাবেন ১১০০০ টাকা। এভাবে কয়েকমাস চলার পর কোম্পানি আপনার বেতন ১০% ছাঁটার সিদ্ধান্ত নিল। ১১০০০ টাকার ১০% হবে ১১০০ টাকা। তাহলে আপনার পরিবর্তিত বেতন হবে (১১০০০-১১০০) টাকা বা ৯৯০০ টাকা। অর্থাৎ ১০% বৃদ্ধির পর আবার হ্রাস করায় মোটের উপর আপনার বেতন কমে যাচ্ছে!

এই পর্যায়ে আপনার মনে হতে পারে “শুরুতে বেতন বাড়ানোয়, বর্ধিত বেতনের শতকরা বেশি হওয়ায় বেতন কমে যাচ্ছে। কিন্তু যদি শুরুতে কমিয়ে পরে বাড়ানো হতো তাহলে মোটের উপর বেতন বেড়ে যেত।“ সত্যিই কি তাই? দেখা যাক হিসেব করে।

মূল বেতন ১০০০০ টাকা থেকে ১০% হ্রাস করা হলে পরিবর্তিত বেতন হবে (১০০০০-১০০০) টাকা বা ৯০০০ টাকা। এবার ৯০০০ টাকাকে ১০% বৃদ্ধি করলে হচ্ছে (৯০০০+৯০০) টাকা বা ৯৯০০ টাকা! অর্থাৎ বেতন আগে বৃদ্ধি করে পরে কমানো হোক কিংবা আগে কমিয়ে পরে বৃদ্ধি করা হোক না কেন প্রতি ক্ষেত্রেই মূল বেতনের চেয়ে পরিমানে তা কম হবে।
শতকরার এই ধরনের বিভ্রাট কাজে লাগিয়েই বিভিন্ন ধরনের বাজি ও লটারির আয়োজন করা হয়। দেখে-শুনে মনে হবে জেতাটা খুবই সহজ কিন্তু মোটের উপরে টাকা-পয়সা খুইয়েই ফিরতে হবে। এই ধরনেরই একটি ব্যবস্থার কথা এখন আলোচনা করব।

ধরা যাক, আপনাকে একটি খেলায় অংশ গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হলো। নিয়ম খুবই সোজা। আপনার সামনে ১০০ টি কার্ড উল্টিয়ে রাখা আছে যার ৫৫ টির নিচের পিঠে ‘জয়’ এবং ৪৫ টির পিঠে ‘পরাজয়’ লেখা আছে। আপনাকে একটি নির্দিষ্ট পরিমান টাকা নিয়ে খেলা শুরু করতে হবে এবং একেকবারে একটি করে কার্ড উল্টিয়ে দেখতে হবে। এবং প্রতিবারে আপনার কাছে যে পরিমান টাকা থাকবে তার অর্ধেকটা বাজি ধরতে হবে। যদি আপনি ‘জয়’ লেখা পান তাহলে বাজিতে জিতে যাবেন এবং বাজির সমপরিমান টাকা আপনাকে দেওয়া হবে আর যদি ‘পরাজয়’ লেখা পড়ে তাহলে যে টাকা বাজি ধরেছেন তা খোয়াতে হবে। আপনি যদি শুরুতে ১০০০০ টাকা নিয়ে নামেন তাহলে ১০০ বার কার্ড উল্টানোর পরে আপনি কি লাভের দিকে থাকবেন নাকি ক্ষতির দিকে?

শুরুতেই যা ভাবছেন তা হচ্ছে ‘পরাজয়’এর চেয়ে তো ‘জয়’ হচ্ছে ১০ বার বেশি। “তারমানে আমি যদি ১০০ বার খেলি তাহলে মোটের উপর দশবার বেশি জিতছি অর্থাৎ কোনো ভাবেই আমার ক্ষতি হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। নিশ্চিতভাবেই আমি যা বিনিয়োগ করব তার চেয়ে বেশি টাকা উঠে আসবে।“ অনুমান না করে হিসেব করেই দেখা যাক:

আপনি যদি ১০০০০ টাকা নিয়ে শুরু করেন তাহলে ধরি প্রথম রাউন্ডে আপনি ‘জয়’ কার্ডটি পেলেন। অর্থাৎ, অর্ধেক সমপরিমান ৫০০০ টাকা বাজি ধরে আপনি ৫০০০ টাকা লাভ করলেন। মোট হলো ১৫০০০ টাকা। দ্বিতীয়বারে আপনি যদি ‘পরাজয়’ পান তাহলে ৭৫০০ টাকা গচ্চা দিতে হবে। আপনার হাতে থাকবে ৭৫০০ টাকা। অর্থাৎ একজোড়া জয়-পরাজয়ে আপনাকে একচতুর্থাংশ গচ্চা দিতে হচ্ছে এবং আপনার হাতে থাকছে বিনিয়োগের ৩/৪ ভাগ। এখন এই ঘটনাক্রমটি যদি বিপরীত হয় তাহলে কি হবে? অর্থাৎ প্রথমবার পরাজিত হলে আর দ্বিতীয়বারে জয় হলে কি ফলাফল উল্টে যাবে? দেখা যাক: প্রথমবারে পরাজিত হওয়ায় হাতে থাকবে ৫০০০ টাকা। দ্বিতীয়বারে এর অর্ধেকটা বাজি ধরায় যদি জয় হয় তাহলে পাওয়া যাবে ২৫০০ টাকা। মোট থাকল সেই ৭৫০০ টাকাই। আমাদের আলোচ্য প্রথম সমস্যাটিতে যেমনটি পাওয়া গিয়েছিলো এই ক্ষেত্রেও তেমনটিই পাওয়া যাবে। অর্থাৎ জয়-পরাজয়ের ক্রম যা-ই হোক না কেন একজোড়া জয়-পরাজয়ের জন্য আপনার অবশিষ্ট থাকবে মূলধনের ৩/৪ ভাগ পরিমান টাকা। তাহলে মোট ৪৫ জোড়া জয়-পরাজয়ের শেষে আপনার কাছে থাকবে ১০০০০ X (৩/৪)^৪৫ টাকা। আর অবশিষ্ট দশবার আপনি জয় লাভ করবেন এবং প্রতিবার জয় লাভের শেষে আপনার হাতে টাকা থাকবে দেড়গুন বা ৩/২ ভাগ। তাহলে এই অতিরিক্ত দশবারের জয়লাভে আপনার মূলধন হচ্ছে ১০০০০ X (৩/২)^১০ টাকা। সবমিলিয়ে মোট ১০০ রাউন্ড শেষে আপনার হাতে টাকা থাকছে,

১০০০০ X (৩/৪)^৪৫ X (৩/২)^১০

এই হিসেবটি করলে উত্তর কত হবে ধারনা করতে পারছেন? ১.৩৮ (প্রায়)
অর্থাৎ ১০০০০ টাকা বিনিয়োগ করে ১০০ রাউন্ড খেলার পর আপনার হাতে থাকবে ১ টাকা ৩৮ পয়সা! খুবই হতাশাজনক চিত্র তাই না?

সূত্র:

Math Wonders to Inspire Teachers and Students, by Alfred S.Posamentier, Association for Supervision and Curriculum Development,Alexandria, Virginia USA, 2003.

লিখেছেন bengalensis

পোস্টডক্টরাল গবেষক: Green Nanomaterials Research Center Kyungpook National University Republic of Korea.

bengalensis বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 70 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

আপনার মতামত