প্রথম পর্বের পর থেকে। 

বাতাসে ভাসমান পানির কণাগুলো যখন ঘনীভূত হবে তখন তার একটা আশ্রয় বা অবলম্বনের প্রয়োজন হয়। নিচের বায়ুমণ্ডলীয় স্তর থেকে পানির কণা সহজে ঘনীভূত হতে পারে কারণ সেখানে অবলম্বন হিসেবে সমুদ্র কিংবা অন্য কোনো আধার আছে। উপরের স্তরে সমুদ্র নেই, গাছপালা নেই, মাটি নেই, বাড়িঘরের পৃষ্ঠ নেই, কিছু নেই। সেখানে আধার হিসেবে কাজ করে বায়ুতে মিশে থাকে ধুলাবালি। বায়ুর তুলনায় ধুলাবালি আসলেই হিসেবের বাইরে নগণ্য একটা জিনিস। কিন্তু নগণ্য হলেও সেটাই বৃষ্টি সংঘটনের মূল হোতা। পানি চক্রের যে ধারা না থাকলে মানুষের পক্ষে জীবন ধারণ করা সম্ভব হতো না সে পানি চক্র এক নিমেষে শেষ হয়ে যেত এই নগণ্য ধুলাবালি না থাকলে।


চিত্র: বায়ুমণ্ডলে মিশে থাকা ধূলিকণাকে আশ্রয় করে ঘনীভূত হয় বাষ্প। ফলে সৃষ্টি হয় বৃষ্টি।

আপাত দৃষ্টিতে খুব অল্প মনে হলেও বাতাসে প্রচুর পরিমাণ ধুলা মিশ্রিত আছে। ইতস্তত উড়ে যাওয়া ভূ-পৃষ্ঠের ধুলা, যানবাহন কলকারখানার ধোঁয়া, সমুদ্রের লবণ কণা ইত্যাদি কণা মিলিয়ে বিশাল পরিবার ভেসে বেড়াচ্ছে।

ভূ-পৃষ্ঠের উপর দিয়ে যখন বাতাস বয়ে যায় তখন মাটি ও বালির ছোট ছোট কণা বাতাসে গিয়ে মিশে। কলকারখানার কয়লা, যানবাহনের তেল পুড়িয়ে যে ধোঁয়ার সৃষ্টি হয় তা গিয়ে মিশে বাতাসেই। আগ্নেয়গিরি হতে অগ্নুৎপাতের সময় প্রচুর পরিমাণে ধোঁয়া বাতাসে মিশছে। দাবানল উল্কাপাতের ফলে ধূলিকণা গিয়ে মিশে। আছে মহাজাগতিক সূক্ষ্ম কণা। মহাজাগতিক ক্ষুদ্র বস্তুগুলো পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার সময় বায়ুমণ্ডলে পুড়ে ধূলিকণা হিসেবেই তো থেকে যায়। সমুদ্র থেকে লবণ কণা গিয়ে মিশে। সমুদ্রের এদিক সেদিক ঢেউয়ের ফলে কিছু পানি ছিটকে বেরিয়ে আসে। এই সময় তাৎক্ষনিকভাবে সামান্য পরিমাণ পানির বাষ্পীভবন ঘটে। আর পানির সাথে ক্ষুদ্র পরিমাণে লবণের কণাও থাকে। এই শুকনো লবণের কণাও বাতাসে ভাসতে থাকে। পরিচলন প্রবাহে সেও আস্তে আস্তে উপরে ওঠে যায়। পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেছে প্রতি এক সেকেন্ডে প্রতি বর্গ সেন্টিমিটারে ১০০০ টি লবণের কণা বাতাসে মিশতে পারে। আণবিক লেভেলে এক হাজার যদিও ক্ষুদ্র একটি সংখ্যা তারপরেও এটি যথেষ্ট। এখানে যে অনেক কণা ক্ষয় হয়ে যায় সে হিসেবটাও ধরা হয়েছে। মানে ধরা যাক কিছু পরিমাণ ধূলিকণা তার দশার মধ্য অবস্থায় আছে। এমন সময়ে বৃষ্টি হলে বৃষ্টি সে কণাগুলোকেও সাথে নিয়ে ভূমিতে পতিত হবে। এই হিসেবে কিছুটা বেশি পরিমাণ ধূলিকণার দরকার আছে। আর সেটি কেটেকুটে গিয়ে যথেষ্ট পরিমাণে আছে।

এই ধূলিকণাগুলো পানি প্রেমী বা হাইগ্রোস্কোপিক ধরণের হয়ে থাকে। এই ধূলিকণাগুলোকে কেন্দ্র করে, ভিত্তি ধরে পানির কণাগুলো ঘনীভূত হয়। পানি প্রেমের দিক থেকে লবণের কণা অনেক এগিয়ে! বর্ষা কালে তো লবণ খোলা পাত্রে রাখাই যায় না। খোলা পাত্রে রাখলে লবণ আশপাশ হতে পানির সংযুক্তি ঘটিয়ে গলে যায়। ধূলোবালি, লবণ ইত্যাদি কণাগুলোর গঠনই এরকম যেন তার কেলাসের মাঝে জলীয় বাষ্প আকরে ধরে লেগে থাকতে পারে। এই কণাগুলোকে কেন্দ্র করে মেঘ ঘনীভূত হয় তাই এই কণাদের বলা হয় “নিউক্লিয়াস”। বাংলায় বলা যেতে পারে কেন্দ্র বা ধুলিবীজ।


চিত্র: সবচে ক্ষুদ্র কণাগুলো হচ্ছে ধূলিবীজ যেগুলোকে কেন্দ্র করে মেঘ গড়ে ওঠে। এই ক্ষুদ্র আঁকারের তুলনায় নিচে একটি দুই মিলিমিটারের বৃষ্টির ফোটার অংশ। পরিধির একটা ছোট অংশই এ তুলনায় অনেক অনেক বিশাল।

অতিশীতল বরফকণার আশে পাশে শীতল জলকণা থাকলে সে জলকণার গা হতে পানি বাষ্পীভূত হয়ে ধীরে ধীরে বরফের গায়ে লেগে জমাট বাধতে শুরু করে। ১৯২২ সালের দিকে বিজ্ঞানী বের্গেরসন ও ফিনডাইসন পরীক্ষা করে এমনটাই দেখতে পান। বাতাসে অসংখ্য বরফ কণা ভেসে বেড়ায়। বিমান চালনার সময় আগের সময়ে বিমানের পাখাগুলোয় বরফ লেগে অসুবিধার সৃষ্টি করত। এখন অবশ্য এই অসুবিধা কাটিয়ে ওঠা হয়েছে, প্রযুক্তি অনেক আধুনিকায়িত হয়েছে।

বরফের গায়ে এমন করে পানির কণা লেগে লেগে একসময় ভারী একটা কণার সৃষ্টি করে। এবং একসময় সে ভারটা পর্যাপ্ত পরিমাণ হয় এবং অভিকর্ষের টানে নিচে নেমে আসে। তার মানে হচ্ছে আমরা বৃষ্টি রূপে যে তরল পানির দেখা পাই সেটা আসলে সৃষ্টির সময় বরফ আকারেই সৃষ্টি হয়।

বরফের অংশটা যখন বেগ ধারণ করে নিচের দিকে পড়তে শুরু করে তখন বায়ুমণ্ডলের বাতাসের সাথে ঘর্ষণে লিপ্ত হয়। ঘর্ষণ হলে তাপ উৎপন্ন হয়। বাতাসের ঘর্ষণে যে তাপ হয় সে তাপে গলে যায় বরফ। আমরা পাই তরল বৃষ্টি। যে এলাকায় বৃষ্টি হয় সে এলাকার বাতাসের চাপ যদি অনেক কম হয় সাথে সাথে তাপমাত্রাও থাকে খুব অল্প তাহলে সেখানকায় এটা শিলাবৃষ্টি আঁকারে ঝড়ে পড়বে।


চিত্র: পানি রূপে আমরা যে বৃষ্টি দেখি তার জন্ম হয় তুষার বা বরফ আঁকারে।  

 

পানি চক্রের কারিগর
পৃথিবীতে মানুষের জীবনধারণ অসম্ভব হয়ে যাবে যদি পানিচক্র না থাকে। এই পানি চক্রকে সচল রাখার প্রধান ভূমিকাটা পালন করে বৃষ্টি। ডাঙ্গা থেকে যে পরিমাণ পানি বাষ্প হয়ে বায়ুমণ্ডলে যাচ্ছে তার চেয়ে বেশি পরিমাণ পানি বৃষ্টি হয়ে ঝরছে। সমুদ্র থেকেই পানি বাষ্পীভূত হয় বেশি। প্রতি বছর ডাঙ্গা ও সমুদ্র থেকে ১২৪,০০০ ঘন মাইল পানি বাষ্পীভূত হচ্ছে। ১০৯,০০০ ঘন মাইল যাচ্ছে সমুদ্র পৃষ্ঠ হতে আর বাকি ১৫,০০০ ঘন মাইল পানি যাচ্ছে ডাঙ্গা হতে। পানি যখন ফেরত আসে তখন ৯৮, ০০০ ঘন মাইল পড়ে সমুদ্রে আর ২৬,০০০ ঘন মাইল পড়ে ডাঙ্গায়। এই দিক থেকে ডাঙ্গায় পানি বেশি আসছে ১১,০০০ ঘন মাইল[৫] ! এটা মানবজাতি সহ অন্যান্য প্রাণীর জন্য বিশাল আশীর্বাদ। আবার ডাঙ্গায় পড়া পানি কোনো না কোনো একভাবে সমুদ্রে পৌছাতে হয়। নইলে পানিচক্র রক্ষা হবে না। এই পানি নদীনালা হয়ে কিংবা মাটি কর্তৃক শোষিত হয়ে ঠিকই সাগরে মিলিত হয়।


চিত্র: পানি চক্র। 

এভাবে ওভাবে ব্যবহারের ফলে পানি আস্তে আস্তে নোংরা হয়ে যায়। বৃষ্টি আমাদের সে নোংরার হাত থেকে বাঁচায় নতুন পানি সরবরাহের মাধ্যমে। গাছপালা ফসল ফলাদি ফলানোর জন্য বৃষ্টি যে কত পরিমাণ বন্ধুর পরিচয় দেয় তা কি বলে শেষ করা যাবে? বৃষ্টি আসলেই মানুষের জন্য বড় এক আশীর্বাদ।

বৃষ্টির ফোঁটা
বৃষ্টি যেভাবে গঠিত হয় এবং যেভাবে পতিত হয় সে হিসাব করলে বৃষ্টির ফোঁটা অনেক বড় হবার কথা। কিন্তু বাস্তবে একটা সীমার চেয়ে বড় ফোঁটা হয় না। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির চেয়ে ছোট হতে পারে যেটা গুড়িগুড়ি বৃষ্টি নামে পরিচিত। কিংবা এমনও হতে পারে একই বৃষ্টির মাঝে ফোঁটাও আছে গুড়িও আছে। বৃষ্টির ফোঁটা বেশি বড় না হতে পারার পেছনে কাজ করে যে নিয়ম সেটি পৃষ্ঠটান বা সারফেস টেনশন। তরলের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সবসময় সে চেষ্টা করবে স্বল্প ক্ষেত্রফলে অধিক পরিমাণ আয়তন দখল করতে। এই দিক থেকে অন্য যেকোনো আকৃতির চেয়ে গোলাকার আকৃতি সবচে কম ক্ষেত্রফল রচনা করে। সেজন্য বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গোলাকার হয়ে থাকে। এখানে আরেকটা জিনিস খেয়াল করার মত- ধরা যাক বড় একটি ফুটবল আকৃতির বৃষ্টির ফোঁটা আছে। এখন সে বড় ফোঁটা ভেঙ্গে গিয়ে অনেকগুলো ছোট ছোট ফোঁটার সৃষ্টি করল। তাহলে ছোট ছোট সবগুলো ফোঁটা মিলে যে আয়তন হবে সেটা বড় ফোঁটার আয়তনের সমান। কিন্তু এখানে আয়তন সমান হলেও ক্ষেত্রফল সমান হয় না। বড় ফোঁটার যে ক্ষেত্রফল তার চেয়ে কম ক্ষেত্রফল হয় ছোট ফোঁটার। আর তরলের ধর্মও হচ্ছে স্বল্প ক্ষেত্রফলে অধিক আয়তন দখল করা। তাই অল্পতেই বড় ফোঁটাগুলো ছোট ছোট ফোঁটায় পরিণত হয়ে যায়। জলের ফোঁটাগুলোর ব্যাস তিন মিলিমিটারের বেশি হলেই সেটি ভেঙ্গে পড়ার প্রবণতা দেখায়। আরও একটি কারণ আছে- যখন একটি বৃষ্টির ফোঁটা নিচে নামতে শুরু করে তখন তার মাঝে বাতাসের বাধা এসে উপস্থিত হয়। বড় ফোঁটার মাঝেও পৃষ্ঠটান আছে। কিন্তু বড় ফোঁটার জন্য বাতাসের যে বাধা সে পরিমাণ টান পানি-পৃষ্ঠে নেই। তাই ফলস্বরূপ না পেরে খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায়।

চিত্র: পানির ফোঁটা আঁকারে বড় হলেই বাতাসের বাধায় তার মাঝে ভেঙ্গে পড়ার প্রবণতা দেখা দেয়।

এই ব্যাপারটা আমরা হাতের কাছেই দেখতে পাই। মগ বা জগ ভর্তি করে পানি উপরের দিকে ছুড়ে মারলে সেই পানিগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোলাকৃতির টুকরোয় বিভক্ত হয়ে যায়।

 

…পরের অংশ তৃতীয় পর্বে

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

লিখেছেন সিরাজাম মুনির শ্রাবণ

আমি শ্রাবণ, পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। বিজ্ঞান পড়তে ভালো লাগে, বিজ্ঞান বিষয়ক ভাবনা চিন্তা করে আনন্দ পাই।

সিরাজাম মুনির শ্রাবণ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 51 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. Pingback: বৃষ্টির পেছনের বিজ্ঞান [১] | বিজ্ঞান ব্লগ

  2. Pingback: বৃষ্টির পেছনের বিজ্ঞান [৩] | বিজ্ঞান ব্লগ

আপনার মতামত