বৃষ্টি : মেঘ মাদলে ভরা বাদলে
দ্বিতীয় পর্বের পর থেকে। 


শিশির, কুয়াশা, তুষার:
বায়ুমণ্ডলের উপরে সৃষ্টি হওয়া মেঘ আমাদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে হলেও আমাদের হাতের কাছেই আছে মেঘের ছোট ভাই! কুয়াশা। বৃষ্টি, তুষার, কুয়াশা, শিশির এদেরকে আমরা আলাদা হিসেবে চিনলেও এরা আসলে একই জিনিস। এদের যেকোনো একটার ব্যাপারে জেনে গেলে সবগুলো সম্পর্কে জানা হয়ে যায়। আবহবিদগণ এই জিনিসটাকে বলেন Precipitation বাংলায় এর পরিভাষা হতে পারে বারিপাত। এই প্রেসিপিটেশনের কয়েকটা প্রকারভেদের মাঝে একটা হচ্ছে বৃষ্টি। আরেকটা কুয়াশা। শীতের সময়ে ভূমি তাপ বিকিরণ করে খুব দ্রুত ঠাণ্ডা হয়ে যায়। ভূমির কাছাকাছি যে বাতাস থাকে সেগুলোও ভূমির সাথে সাথে ঠাণ্ডা হয়। ঠাণ্ডা হলেই ঘনীভূত হবার প্রবণতা দেখা যায়। আর নিচের বায়ুস্তরে বীজ হিসেবে আঁকড়ে ধরার জন্য ধূলির তো আর কোনো অভাব নেই। ফলে সহজেই কুয়াশার সৃষ্টি হতে পারে। পরে যখন সূর্য ওঠে তখন বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত হয় এবং আস্তে আস্তে কুয়াশা বিলীন হয়ে যায়।


চিত্র: শীতকালে ভূমি ঠাণ্ডা হয়ে গেলে সৃষ্টি হয় কুয়াশা। 

বৃষ্টির পর বায়ুতে ভাসমান ধূলিবালি ধুয়ে নিচে চলে যায়। আর ধুলাবালি না থাকলে বাষ্পকণা একত্রে মিলে ঘনীভূত হতে পারে না। সেজন্য যে রাতে বৃষ্টি হয় সে সকালে কুয়াশা হতে দেখা যায় না।

এই কুয়াশাগুলোই যখন একটু একটু করে নিচে পড়ে তখন সেটি শিশির নাম ধারণ করে থাকে। বায়ুমণ্ডল অধিক পরিমাণ ঠাণ্ডা হয়ে গেলে তার জলীয় বাষ্প ধারণ করার ক্ষমতা কমে যায়।[৪] তাই সে ধারণ করা কুয়াশা অধিক পরিমাণ ঘনীভূত হয়ে শিশির রূপে নিচে পড়ে যায়। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দূর্বা ঘাসের ডগায় কয়েকটি শিশির লেগে আছে আর সূর্যের আলো সেখানে প্রতিসরিত হয়ে মুক্তোর মত আভা ছড়াচ্ছে এমন একটা দৃশ্যের মত সুন্দর দৃশ্য মনে হয় পৃথিবীতে কমই হয়। এজন্যই হয়তো সুন্দরের কবি রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন “একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু।”


চিত্র: ঘাসের ডগার উপর শিশির কণার সৌন্দর্য যেকোনো সৌন্দর্যপ্রিয় মানুষকে মুগ্ধ করার ক্ষমতা রাখে।

শীতের দেশে বছরের বেশিরভাগ সময়ের জন্যই আবহাওয়া শীতল থাকে। অধিক শীতলতার জন্য বৃষ্টি তরল হতে পারে না। সেটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বরফের কণা আঁকারে পড়ে। এটা তুষার বা স্নো। বৈশাখের মাসে যেমন শিমুল গাছ হতে তুলো ফেটে ফিয়ে উড়ে উড়ে বেড়ায় তেমনি পেঁজা তুলোর মত তুষার বয়ে বেড়ায় শীতের দেশগুলোতে। তুষারপাতের সময় যে একটা শুভ্র সাদা দৃশ্যের সৃষ্টি হয় তা আসলেই দেখার মত।


চিত্র: পেঁজা তুলোর মত ভাসমান তুষার। 

মেঘের কোল হতে তুষার তার যাত্রা শুরু করে মাঝ পথে যদি বাতাসের সংস্পর্শে গলে যাবার পর আবার নিচের ঠাণ্ডা বাতাসের সংস্পর্শে এসে বরফে পরিণত হয় তাহলে ভিন্ন ধরণের এক তুষারপাত হয়। এরা দানাদার ও ছোট ছোট আঁকারের হয়। এই ভিন্ন ধরণের বর্ষণকে বলে স্লিট।
তুষার কণাকে যদি মাইক্রোস্কোপের নিচে ধরা হয় তাহলে তাদের অত্যন্ত সুন্দর গঠন লক্ষ্য করা যায়। প্রত্যেকটা মৌলিক তুষারই ছয়টা দিকে প্রসারিত। প্রত্যেকটার মৌলিক গঠন ষড়ভুজের মত হলেও একটা তুষারের সাথে আরেকটা তুষারের কোনো মিল নেই।

চিত্র: তুষারের আণুবীক্ষণিক গঠন। তুষারের কেলাসগুলোর প্রত্যেকটিই ছয় দিকে প্রসারিত- কিন্তু একটির সাথে আরেকটির কোনো মিল নেই।

অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, মরুভূমি:
একটা এলাকায় যদি বছরের অধিকাংশ সময়টাতেই বৃষ্টি হয় তবে সে বৃষ্টিকে ধরা হবে ‘অতিবৃষ্টি’ নামে। তখন সে এলাকাটাকে অতিবৃষ্টিবহুল এলাকা বলা হয়। দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন অঞ্চলে প্রায় প্রত্যেকদিনই বৃষ্টি হয়। আর এমন প্রচুর বৃষ্টির ফলে সেখানকায় জন্ম নিয়েছে বিশাল বনাঞ্চল। যে এলাকায় অধিক পরিমাণ বৃষ্টি হয় সে এলাকায় ভাল ফসল হয় না। মাটির উর্বরতা থাকে না। বৃষ্টির পানির সাথে ধুয়ে ধুয়ে চলে যায়।

আবার কোনো এলাকায় দিনের পর দিন বৃষ্টি না হলে সে এলাকার মাটির সাথে মিশে থাকা পানি বাষ্পীভূত হয়ে যায়। সূর্যের তাপে আস্তে আস্তে সমস্ত পানিই বাষ্পীভূত হয়ে চলে যায়। সারা বছরে মাঝে মাঝে দুয়েকবার বৃষ্টি হলেও পানির যে অভাব থেকে যায় সে অভাব সামান্য বৃষ্টিতে পূরণ হয় না। মাঠ ঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যায়। দেখা দেয় খরা। এমন চলতে থাকলে সে এলাকা আস্তে আস্তে মরুভূমিতে পরিণত হয়।


চিত্র: বছরের বেশিরভাগ সময় যদি কোনো এলাকা বৃষ্টিহীন থাকে তাহলে সে এলাকায় খরা দেখা দেয়। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে একসময় মরুভূমিতে পরিণত হয়।

খরা চলাকালীন সময়ে আস্তে আস্তে তৃণভূমি বিলীন হয়ে যায়। বাস্তুসংস্থানের অমোঘ নীতির কারণে সেখানকার মানুষজনেরা খাদ্যের অভাবে ভোগে। অনাহারে দিন কাটাতে হয়। সৃষ্টি হয় দুর্ভিক্ষ। বিশাল মরুভূমি সাহারা আফ্রিকাতে অবস্থিত। আর আফ্রিকাতেই সাহারার আশ পাশের অঞ্চলের মানুষদের মাঝে দুর্ভিক্ষ দেখা যায়। প্রাকৃতিক বিপর্যয় এত সহজে পার পাবার নয়। অতিবৃষ্টি অনাবৃষ্টি উভয়ই মানুষের জন্য ক্ষতিকর।

কৃত্রিম বৃষ্টি:
একটা সময় প্রকৃতির প্রত্যেকটা আচরণই মানুষকে মেনে নিতে হত। সকল ক্ষেত্রেই প্রকৃতি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতো। আস্তে আস্তে মানুষ প্রকৃতিকে বশে আনতে পেরেছে। তেমনি বৃষ্টিও এসে গেছে মানুষের হাতের নাগালে। চাইলেই এখন মানুষ বৃষ্টি তৈরি করতে পারে। বের্গেরসন-ফিনডাইসন প্রক্রিয়া থেকে দেখা যায়, ঘনীভূত মেঘের মধ্যে বরফকণা রেখে দিলে সেখানে বৃষ্টির সৃষ্টি হয়। মাঝে মাঝে এমন দেখা যায় আকাশে অনেক অনেক মেঘ আছে কিন্তু দিনের পর দিন বৃষ্টি হবার নামে নাম নেই। এমনটা হবার কারণ ঐ প্রভাবক-রূপে যার দরকার সেই অতিশীতল বরফ কণার অনুপস্থিতি। এমন অবস্থায় যদি কৃত্রিম ভাবে সেখানে বরফকণা ছিটিয়ে দেয়া যায় তাহলে সেখানে বৃষ্টি নামানো সম্ভব। বরফ কণা তো আর এমন করে সরাসরি আসমানে ছুড়ে দেয়া যায়না। বরফ ছিটিয়ে দেয়া না গেলেও অন্য কোনো শীতল কণা ছিটিয়ে দিলেও কাজটা হয়ে যায়। তবে এখানে সামান্য একটু সমস্যা আছে। যেকোনো ধরণের পদার্থ দিলেই পানি এসে জমাট বাধবে না। যে সকল পদার্থ পানি-প্রেমী বা হাইগ্রোস্কোপিক (hygroscopic) তাদের গায়েই পানির কণা লেগে লেগে জমাট বাধে। এরকম পদার্থ আছে সিলভার আয়োডাইড, ড্রাই আইস, তরল প্রোপেন ইত্যাদি। এর মধ্যে ড্রাই আইস হচ্ছে কঠিনিত কার্বন ডাই-অক্সাইড। বরফের শুকনো অবস্থা বলে মনে করলে দারুণ ভুল হবে! কার্বন ডাই-অক্সাইড হচ্ছে গ্যাসীয় পদার্থ। একে প্রচণ্ড চাপে কঠিন অবস্থায় রূপান্তর করা যায়। ড্রাই আইসের তাপমাত্রা হয়ে থাকে হিমাংকের নিচে ৭০ ডিগ্রী সেলসিয়াস।

ভূমি থেকে কামান দেগে কিংবা বিমানে করে উপরে মেঘের কাছে গিয়ে ড্রাই আইস বা অন্যান্য পানি প্রেমী অতিশীতল কণা ছিটিয়ে দিলে মেঘ জমাট বেধে বৃষ্টির সৃষ্টি করে। সে কী ঝমাঝম বৃষ্টি! এই প্রক্রিয়ায় সিলভার আয়োডাইডের ব্যবহার বেশি জনপ্রিয়।


চিত্র: ড্রাই আইসের টুকরো। 

১৯৪৬ সালে সর্বপ্রথম বিজ্ঞানী ল্যাংমুর ও শেইফার কৃত্রিম ভাবে বৃষ্টি তৈরি করতে সক্ষম হন। শেইফার বার্কশায়ার পাহারের উপর থেকে ড্রাই আইসের গুড়ো ছিটিয়ে দিয়ে প্রথম বৃষ্টি তৈরি করতে সক্ষম হন। সেজন্য তাকে কৃত্রিম বৃষ্টির জনক বলা হয়। এই প্রযুক্তির আধুনিক রূপের কথাও শুনা যায়। যেমন এখন চেষ্টা করা হচ্ছে লেজারের সাহায্যে কামান জাতীয় কোনো কিছু কিংবা বিমানের সাহায্য ছাড়াই ভূমিতে বসে বৃষ্টি নামানো। মাঝে মাঝে আন্তর্জাতিক অনেক খেলাই ভেস্তে যায় বৃষ্টির কারণে। কিন্তু এই কৃত্রিম বৃষ্টিপাত প্রয়োগ করে খেলার আগে ভাগেই বৃষ্টি নামিয়ে ফেলে মাঠকে বৃষ্টির আশংকামুক্ত করে ফেলা যায়। বর্তমান কালে FIFA, Olympic গেমস সহ অন্যান্য বড় বড় ইভেন্টে এটি প্রয়োগ করা হয়। ফলে খেলা চলারত অবস্থায় বৃষ্টি নামে না, মাঝপথে খেলা বন্ধ করে দিতে হয়না। তবে এই কৃত্রিম বৃষ্টি নামানো কতটা পরিবেশ বান্ধব কিংবা এই রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার কতটা স্বাস্থ্যকর সেই প্রশ্নও তোলা হয়। মানুষের চেষ্টায় প্রকৃতি থেকে বৃষ্টি নামিয়ে নিলে সেটা বাস্তুসংস্থানের জন্য কতটা আঘাতহানী সেটাও ভেবে দেখার অবকাশ থেকে যায়।


চিত্র: কৃত্রিম বৃষ্টি নামানোর কৌশল। 

[বৃষ্টির পরিমাপ ও কৃত্রিম বৃষ্টি নিয়ে আরও দেখুন পরবর্তী কোনো ব্লগে।]

 

দ্রষ্টব্য:
বাকি অংশ চতুর্থ পর্বে

লিখেছেন সিরাজাম মুনির শ্রাবণ

আমি শ্রাবণ, পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। মাসিক বিজ্ঞান সাময়িকী জিরো টু ইনফিনিটিতে বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। বিজ্ঞান পড়তে ভালো লাগে, বিজ্ঞান বিষয়ক ভাবনা চিন্তা করে আনন্দ পাই।

সিরাজাম মুনির শ্রাবণ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 48 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. Pingback: বৃষ্টির পেছনের বিজ্ঞান [৪] (শেষ পর্ব) | বিজ্ঞান ব্লগ

আপনার মতামত