’’ধূমকেতু শব্দের মানে ধোঁয়ার নিশান। ওর চেহারা দেখে নামটার উৎপত্তি। গোল মুন্ড আর তার পিছনে উড়ছে উজ্জ্বল একটা লম্বা পুচ্ছ। এই পুচ্ছটা অতি সূক্ষ্ম বাষ্পের।’’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিশ্বপরিচয় গ্রন্থে ধূমকেতুর পরিচয় ঠিক এভাবেই তুলে ধরেছেন। ধূমকেতু সৌরজগতের আদি বস্তুসমূহের অন্যতম। যেসব বছর আকাশে ধূমকেতুর আবির্ভাব ঘটে সেবছরগুলো জ্যোতির্বিদ ও আকাশপ্রেমীদের জন্য থাকে খুব আনন্দের। বেশিরভাগ ধূমকেতুর আলো খালি চোখে দেখতে পাবার মতো তেমন উজ্জ্বল হয়না। এটি উজ্জ্বল না অনুজ্জ্বল দেখা যাবে তা নির্ভর করে সূর্য, পৃথিবী এবং এর নিজের দূরত্বের উপর। সেক্ষেত্রে আকাশে যে ধূমকেতু দেখা দিয়েছে তা সাধারণ লোকে জানতেও পারেনা। তাই আকাশে ধূমকেতু দেখতে পাওয়াটা এমনিতে বিরল সুযোগ। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাংলাদেশ থেকে যেসব ধূমকেতু পর্যবেক্ষণের কথা জানা গেছে এখানে তাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

হ্যালির ধূমকেতু (১৯৮৫-১৯৮৬)
হ্যালি একটি অতি পরিচিত ও বিখ্যাত ধূমকেতু। এডমন্ড হ্যালি নামে সতের-আঠার শতকের একজন ইংরেজ জ্যোতির্বিদের নামে এর নামকরণ। প্রতি ৭৫-৭৬ বছর পর পর এটি পৃথিবীর আকাশে দেখা দেয়। এজন্য একে বলা হয় প্রত্যাবর্তনশীল ধূমকেতু। ১৯৮৬ সালের ১১ এপ্রিল তারিখে এই ধূমকেতু পৃথিবীর কাছাকাছি অর্থাৎ ছকোটি কিলোমিটারের মধ্যে পৌছায়।
১৯৮৫ সালের নভেম্বর মাসের দিকে ঢাকার মেরুল বাড্ডা থেকে বিজ্ঞান সংগঠন অনুসন্ধিৎসু চক্রের সদস্যরা প্রথম হ্যালির ধূমকেতু সনাক্ত করেন। ধূমকেতুটি তখন তুলনামূলক অনুজ্জ্বল ছিলো। প্রায় দুইমাস চেষ্টার পরে তারা ধূমকেতুটি খুজে পান। অ.চক্রে তখন ছিলেন ড.এ.আর.খান, মো. শাহজাহান মৃধা বেনু, সিরাজুল ইসলাম সিজার, আজহারুল হক সেলিম, আতাউল হাকিম,আরকানউল্লাহ হারুনী ও রফিকুল্লা সেলিম। ধূমকেতুটি পর্যবেক্ষণের জন্য চক্রের উদ্দ্যোগে সেসময় একটি সাড়ে সাত ইঞ্চি টেলিস্কোপ তৈরি করা হয়। টেলিস্কোপটি তৈরিতে যে লেন্স ব্যবহার করা হয় সেটি ১৯৬৫ সালে ড.এ.আর.খান লন্ডনে যখন গবেষণার কাজে গিয়েছিলেন সেখানে একটি নিলামের দোকান থেকে একটি জার্মান ক্যামেরা কিনেছিলেন তা থেকে নেয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানীতে এই ক্যামেরাগুলো তৈরি হয়েছিলো আকাশ থেকে গোপন যুদ্ধক্ষেত্রে ছবি তোলার জন্য। যাই হোক, এই টেলিস্কোপে বাংলাদেশে প্রথম হ্যালির ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরে এটি ব্যবহার করে ধূমকেতুটির ছবি তোলা হয়। একই সময়ে অ.চক্রের সহযোগিতায় জাতীয় বিজ্ঞান জাদুঘর আট ইঞ্চি টেলিস্কোপ কিনে নিয়ে আসে। এই দুটি টেলিস্কোপ দিয়ে প্রতিদিন রাতে নিয়মিত ধূমকেতু দেখানো হত। ফলে দেশে হ্যালির ধূমকেতু দেখার উৎসাহ সৃষ্টি হয়। ১৯৮৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত টেলিস্কোপে হ্যালির ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ করা হয়। শেষের দিকে সূর্য উদয়ের পর পুবাকাশে খালি চোখেই হ্যালির ধূমকেতু দেখা যেতো। অনুসন্ধিৎসু চক্র ঢাকার তিতুমীর কলেজ, কাচপুর, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আটটি স্থানে হ্যালীর ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ ক্যাম্পের আয়োজন করে। জাতীয় বিজ্ঞান জাদুঘর কর্তৃপক্ষও ঢাকায় ক্যাম্প পরিচালনা করে। ক্যাম্প চলাকালীন সময় ড.এ.এফ.এম.এ. গনি হ্যালীর ধূমেকতুর ছবি তোলেন। এতে তিনি আট ইঞ্চি স্মিডট টেলিস্কোপের সহযোগিতা নেন।

হেল-বপ ধূমকেতু (১৯৯৬-১৯৯৭)
হেল-বপ ছিলো গত শতাব্দীর উজ্জ্বলতম ধূমকেতু। এলান হেল ও টমাস বপ ধূমকেতুটির আবিষ্কারক। ১৮ মাস ধরে এটি খালি চোখে দৃশ্যমান ছিলো। ১৯৯৬ সালের জুন মাসে সৌখিন জ্যোতির্বিদ সৈয়দ আশরাফউদ্দিন শুভ বাংলাদেশ থেকে প্রথম হেল-বপ ধূমকেতুটি খুঁজে পান। এসময় ড.এ.আর.খানের সহযোগিতায় ধূমকেতুটির একটি এফিমেরিস তৈরি করা হয়। এরপর ফেব্রুয়ারি,১৯৯৭ থেকে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনের সদস্যরা হেল-বপ ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ করেছে। পর্যবেক্ষণে বাইনোকুলার থেকে সর্বোচ্চ তিন ইঞ্চি প্রতিসরণ টেলিস্কোপ এবং একটি ৪.৫ ইঞ্চি প্রতিফলক টেলিস্কোপ ব্যবহার করা হয়।

হায়াকুতাকা ধূমকেতু (১৯৯৬)
জাপানের ইউজি হায়াকুতাকা ধূমকেতুটির আবিষ্কারক। বিগত দুইশত বছরের মধ্যে হায়াকুতাকা ধূমকেতুটির মতো আর কোন ধূমকেতু পৃথিবীর এতো নিকট দিয়ে অতিক্রম করেনি। বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর কর্তৃপক্ষ হায়াকুতাকা ধূমকেতু পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করে। বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনও ধানমন্ডি মাঠে এপ্রিল মাসে ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ ক্যাম্পের আয়োজন করে। জ্যোতির্বিদ ড.এ.আর.খান ২৪ মার্চ, ১৯৯৬ তারিখে হায়াকুতাকা ধূমকেতুর একটি ছবি তোলেন। তাঁর তোলা ছবি দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকায় ছাপা হয়।

আইসন ও লাভজয় ধূমকেতু (২০১৩)
বিগত অনেক বছরের মধ্যে ও আগামী বহু বছরের মধ্যে দেখা যাওয়া উজ্জ্বল ধূমকেতুটির মধ্যে আইসনকে (ISON) অন্যতম ধরা হয়েছিলো। এই ধূমকেতু সৌরজগতের একেবারে শেষপ্রান্তে ওর্ট মেঘ অঞ্চল থেকে দশহাজার বছর আগে যাত্রা শুরু করে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে টেলিস্কোপে পৃথিবীর মানুষের চোখে ধরা পড়ে। ওর্ট মেঘ থেকে আগত বেশিরভাগ ধূমকেতুই পুনরায় আর ফিরে আসেনা। বাংলাদেশ থেকে ISON ধূমকেতুটি সনাক্তকরণ ও ছবি তুলতে সক্ষম হয় একমাত্র অনুসন্ধিৎসু চক্র। টেলিস্কোপ ব্যবহার করে প্রায় দেড় মাস চেষ্টার পর ধূমকেতুটি খুজে পায় সংগঠনের সদস্যরা। অনুসন্ধিৎসু চক্রের জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি মো.শাহজাহান মৃধার নেতৃত্বে প্রথম পর্যায়ে ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর রবিবার ভোর পাঁচটায় মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার শিমুলিয়া গ্রামে (অক্ষাংশ-৯০⁰১৮ মি. পূর্ব ও দ্রাঘিমাংশ-২৩⁰২৮মি. উত্তর বা কর্কটক্রান্তি রেখা) চক্র আয়োজিত আকাশ পর্যবেক্ষণ ক্যাম্প থেকে আইসন ধূমকেতু সনাক্ত করা হয় । ISON ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ দলে আরো ছিলেন অ.চক্রের আজীবন সদস্য আজহারুল হক, আরাফাত রহমান, নিয়াজ মোর্শেদ, জাহাঙ্গীর আলম দীপু ও আল ইমরান চৌধুরী । দ্বিতীয় পর্যায়ে, অ.চক্রের পর্যবেক্ষণ দলের কর্মীরা মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার খইরা গ্রামে রাতের বেলা পরবর্তী ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ ক্যাম্পে ৮ইঞ্চি মিড ক্যাসিগ্রেইন টেলিস্কোপ ও ক্যানন EOF 5D ক্যামেরা দিয়ে আইসন ধূমকেতুর ছবি তুলতে সক্ষম হন তারা। ছবির এক্সপোজার সময় ছিলো- ৩ মিনিট। আইসন ধূমকেতুটির বিষয়ে আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য উক্ত ছবিটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থার নিকট প্রেরণ করে নিশ্চিত করা হয়। সহযোগিতা করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত জ্যোতির্বিদ ড. দীপেন ভট্টাচার্য। আইসনের উজ্জ্বলতা সম্পর্কে বিভিন্ন মহল থেকে যেরকম ভবিষ্যদ্বাণী করা হচ্ছিলো, ধূমকেতুটি সে অনুপাতে উজ্জ্বল ছিলোনা। পর্যবেক্ষণকালে আইসনের উজ্জ্বলতা ছিলো ৭.৫।
পরে ঢাকা থেকেও আইসন ধুমকেতু দেখতে সক্ষম হয় অনুসন্ধিৎসু চক্রের জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগ। অনুসন্ধিৎসু চক্রের জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের সদস্যরা ১৬ নভেম্বর ,২০১৩ তারিখে ভোর সাড়ে চারটার দিকে কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়াম থেকে আকাশ পর্যবেক্ষণ ক্যাম্প থেকে ৮ ইঞ্চি প্রতিফলক টেলিস্কোপ ও ক্যানন ক্যামেরা দিয়ে আইসন ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ ও ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতে সক্ষম হয়। এরপরই দেশের আকাশ থেকে সর্বসাধারণকে আইসন ধূমকেতু পর্যবেক্ষণে সহযোগিতা করার জন্য নিয়মিত বিভিন্ন তথ্য ও ভ্রমণপথ বিষয়ে অবহিত করা হয় অনুসন্ধিৎসু চক্রের পক্ষ থেকে। জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন সংবাদ মাধ্যম সমূহ এ বিষয়ক খবর প্রকাশ করে।
২৮ নভেম্বর, ২০১৩ তারিখ ছিলো ধূমকেতু আইসনের সূর্যের সবচেয়ে কাছাকাছি ’অনুসূর’ বিন্দুতে থাকার দিন। সেমসয় আইসন সূর্য পৃষ্ঠের মাত্র ১১ লক্ষ কিলোমিটার কাছে ছিলো। সূর্যের এত কাছ দিয়ে যায় বলে এ ধরনের ধূমকেতুকে সূর্যস্পর্শী ধূমকেতু বলা হয়। আশা করা হচ্ছিল, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই খালি চোখে দেখতে পাওয়া যাবে ধূমকেতু আইসনকে। কিন্তু সূর্যের বেশী কাছে চলে যাওয়াতে পুড়ে ছাই হয়ে যায় তা ।

২০১৩ সালে আকাশে যখন ধূমকেতু আইসন তখন আরেকটি ধূমকেতু আলোড়ন তুলেছিলো আকাশমোদী মানুষের মাঝে। ধূমকেতুটির নাম লাভজয়। অস্ট্রেলিয়ান পর্যবেক্ষক টেরি লাভজয় ধূমকেতুটি আবিষ্কার করেন বলে নাম হয়েছে লাভজয়। অনুসন্ধিৎসু চক্রের ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ দলের সদস্যরা ১১ নভেম্বর,২০১৩ তারিখে ১২/এ, ইস্কাটন গার্ডেনের ১৯ তলা ভবনের ছাদ থেকে রাত দুইটার দিকে ৮ ইঞ্চি মিড প্রতিফলক দুরবিন দিয়ে ধূমকেতুটি খুঁজে পান। তারা সেই দুরবিন ও ক্যানন ক্যামেরা দিয়ে লাভজয় ধূমকেতুটির ছবি তোলেন। ছবির এক্সপোজার সময় ছিলো ১০ সেকেন্ড। ছবি তোলার সময় ধূমকেতুটি সিংহ তারামন্ডলের কাপ্পা লিওনিস তারার নিকটে অবস্থান করছিলো। ১৯ নভেম্বর,২০১৩ তারিখে ধূমকেতুটি পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে আসে। লাভজয় ধূমকেতুটির পরবর্তী অনুসূরের জন্য প্রায় ৭০০০ বছর অপেক্ষা করতে হবে।

তথ্যসূত্র: ১. তারা পরিচিতি, মোহাম্মদ আবদুল জব্বার; ২য় প্রকাশের ভূমিকা, ১৯৯৪;বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশন।
২. ৩০ আগস্ট, ২০০৩; দৈনিক জনকন্ঠ।
৩. ধানশালিকের দেশ (ধূমকেতু সংখ্যা); ২৫ বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা, ১৯৯৭; বাংলা একাডেমী।
সৌজন্যে: অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠন

আপনার মতামত