অধ্যায়-৪ : নিউক্লিয়াস
অনুচ্ছেদ-১: পরমাণু অনুসন্ধান (১ম খন্ড)

বিজ্ঞানীরা যখন সন্দেহ করতে শুরু করেছিলেন যে ইলেক্ট্রন পরমাণুর মধ্যেই অন্তুর্ভুক্ত থাকে তখন একটি সমস্যা দেখা দিল; ইলেক্ট্রন ঋনাত্মক চার্জ বহন করে কিন্তু পরমাণু মোটের উপর বিদ্যুৎ নিরপেক্ষ। তার মানে ইলেক্ট্রনের ঋনাত্মক চার্জের সমপরিমাণ ধনাত্মক চার্জ পরমাণুর মধ্যে থাকতে হবে যা ইলেক্ট্রনের চার্জের সাথে মিলে মোটের উপর পরমাণুকে নিরপেক্ষ করে রাখবে। যদি তা-ই তাহলে তাহলে পরমাণু থেকে ইলেক্ট্রন সরিয়ে দেওয়ার পর যা থাকবে তাকে অবশ্যই ধনাত্মক চার্জ বহন করতে হবে। আর একটি পরমাণুতে যদি বাড়তি ইলেক্ট্রন যোগ করা হয় তাহলে অতিরিক্ত ইলেক্ট্রনটির ঋনাত্মক চার্জের কারনে পরমাণুকে ঋনাত্মক চার্জযুক্ত হয়ে উঠতে হবে। এই ব্যাপারটিই ফ্যারাডে এবং আরহেনিয়াসের ধনাত্মক এবং ঋনাত্মক আয়ন সৃষ্টির কারন হওয়ার কথা।

এই পরিস্থিতিতে তড়িৎ চার্জকে আমলে নিয়ে একটি পরমাণু ব্যবস্থার কথা প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন জে. জে. থমসন ১৮৯৮ সালে। তিনি পরমাণুর ক্ষুদ্রত্ব এবং একে একটি নগন্য গোলক হিসেবে কল্পনাকৃত যে মতবাদ শতাব্দী ধরে চলছিলো তা অক্ষুন্ন রেখে বলেন যে সবই ঠিক আছে তবে পাশাপাশি এটি ধনাত্মক চার্জও ধারন করে। এই ধনাত্মক চার্জযুক্ত পরমাণুতে যথেষ্ট পরিমান ঋনাত্মক ইলেক্ট্রন প্রবিষ্ট থাকে (যেমনটি পায়েসের মধ্যে থাকে কিসমিস ও বাদাম) যা ধনাত্মক চার্জকে প্রশমিত করে দেয়।

থমসনের ধারনার পরেও পরমাণুকে কঠিন বস্তু হিসেবেই ধরা যায় এবং যদি অনেকগুলো পরমাণুকে এক লাইনে গাদাগাদি করে ডানে-বাঁয়ে, সমানে-পিছে এবং উপরে নিচে সাজানো হয় তাহলে তারা একটি কঠিন বস্তুই গঠন করবে। তারপরও ব্যপারটি এমন সোজা নয়। ১৯০৩ সালে লেনার্ড খেয়াল করলেন যে গতিময় ইলেক্ট্রনগুলো ক্যাথোড রশ্মি তৈরির মাধ্যমে পাতলা ধাতব পর্দার মধ্য দিয়ে পার হয়ে যেতে পারে, যা এই ধারনা দেয় যে পরমাণুর ভিতরে অন্তত কিছু ফাঁকা যায়গা আছে। লেনার্ড প্রস্তাব দিলেন পরমাণু ছোট ছোট কণিকার মেঘ দিয়ে তৈরি যার কিছু কিছু হচ্ছে ইলেক্ট্রন এবং কিছু কিছু একই আকৃতির ধনাত্মক চার্জ যুক্ত কণিকা। একটি ধনাত্মক এবং একটি ঋনাত্মক কণিকা পরস্পরের সাপেক্ষে ঘূর্ণায়মান থাকে যাতে তাদের একটি যুগল তৈরি হয় এবং একই ধরনের অনেক জোড়ার সমন্বয়ে পরমাণু সার্বিকভাবে বিদ্যুৎ নিরপেক্ষ হয়। কিন্তু এই জোড়াগুলোর ভিতরে এবং বাইরে প্রচুর ফাঁকা জায়গা আছে যার ভিতর দিয়ে একটি ক্ষুদ্র কণিকা যেমন গতিময় ইলেক্ট্রন সহজেই পার হয়ে যেতে পারে।

কিন্তু যদি এমনই হয় তাহলে একটি পরমাণু উভয় ধরনের কণিকাই হারানো কথা। যদি আলোর উপস্থিতিতে একটি ধাতব খন্ড থেকে ঋনাত্মক ইলেক্ট্রন নিষ্ক্রান্ত হতে পারে তাহলে ধনাত্মক চার্জযুক্ত কণিকা কেন বের হতে পারবে না, অন্ততঃ আগে-পরে হলেও? আবার একটি ক্যাথোড থেকে উচ্চ গতির ইলেক্ট্রন নির্গত হয়, কিন্তু কেন একটি অ্যানেড থেকে ধনাত্মক কণিকা নির্গত হয় না? স্পষ্টতই, যদি ধনাত্মক চার্জযুক্ত কণিকা থেকেই থাকে তাহলে তাদের প্রকৃতি অবশ্যই ইলেক্ট্রনের চেয়ে ভিন্ন হবে। কোন এক বিশেষ কারনে ধনাত্মক কণিকাগুলো ইলেক্ট্রনের চেয়ে অনড় হবে।

১৯০৪ সালে জাপানী পদার্থবিদ হান্তারো নাগাওকা (Hantaro Nagaoka, ১৮৬৫-১৯৫০) প্রস্তাব করলেন যে থমসনের ধারনার মতো ধনাত্মক কণিকা আসলে সম্পূর্ণ জায়গা দখল করে না আর লেনার্ডের প্রস্তাবিত ধারনা অনুযায়ী তারা ইলেক্ট্রনের সমপরিমান স্থানও দখল করে না। নাগাওকা একধরনের আপোষ-রফার প্রস্তাব করলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন ধনাত্মক চার্জযুক্ত অংশটি পরমাণুর কেন্দ্রে অবস্থিত এবং সমগ্র পরমাণুর তুলনায় আকারে ছোট। এটি ঘুর্ণায়মান ইলেক্ট্রন দ্বারা পরিবেষ্টিত যা তড়িৎচৌম্বক আকর্ষনের মাধ্যমে স্থিতিশীল থাকে যেমনটি সৌরজগতে সূর্যের চারপাশে অন্যগ্রহগুলো মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে স্থিতিশীল থাকে।

Hantaro Nagaoka.jpg

হান্তারো নাগাওকা

নাগাওকার মডেল মেনে নিলে আমরা একটি নিরপেক্ষ পরামানু পাই যা ধনাত্মক এবং ঋনাত্মক আয়ন উৎপন্ন করতে পারে এবং উচ্চ গতির ইলেক্ট্রনকে এর মধ্য দিয়ে পার হয়ে যেতে দেয়। একই সাথে এটি ব্যাখ্যা করে কেন ইলেক্ট্রনকে সহজেই পরমাণু থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় কিন্তু ধনাত্মক চার্জযুক্ত কণিকাকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। সবমিলিয়ে ইলেক্ট্রনগুলো পরমাণুর বাইরের দিকে থাকে আর ধনাত্মক চার্জযুক্ত অংশ কেন্দ্রের সুরক্ষিত এলাকায় থাকে।

অদ্যাবধি এই প্রস্তাবনাগুলোর কোনোটিই গ্রহনযোগ্যতা পায় নি। এগুলো অনুমানধর্মী এবং চিত্তাকর্ষক নয়। এই মুহূর্তে যা দরকার তা হচ্ছে সরাসরি আলামত যা পরমাণুর আভ্যন্তরীন গঠন ব্যাখ্যা করবে। অবস্থা দেখে মনে হলো এই ধরনের আলামত খুঁজে পাওয়া খুব সহজ কিছু নয়। আর তাছাড়া কেমন করেই বা পরমাণুর মতো এত ক্ষুদ্র একটি বস্তুর একেবারে অভ্যন্তরে তদন্ত চালনো সম্ভব? তবে তারপরও থমসন, লেনার্ড এবং নাগাওকা যখন তাঁদের প্রস্তাবনাগুলো নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন সেই সময়েও একটি কৌশল বিদ্যমান ছিলো যা পরমাণুর গভীরে অনুসন্ধান চালাতে পারে। এটি আবিষ্কারের গল্প হচ্ছে এমন:

যে মুহূর্তে বিজ্ঞানী রন্টজেন এক্স রে আবিষ্কার করলেন সেই সময় থেকে অন্যান্য বিজ্ঞানীরা এই বিকিরণ নিয়ে গবেষনায় আবদ্ধ হয়ে গেলেন এবং ভাবতে থাকলেন এটিকে অন্য কোথাও পাওয়া সম্ভব কিনা যেখানে এর আগে কেউ খুঁজে দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি বলেই পায় নি।

ফরাসী পদার্থবিদ এন্টনি হেনরি বেকরেল (Antoine Henri Becquerel, ১৮৫২-১৯০৮) বিশেষভাবে দীপ্তিমান (fluorescent) যৌগসমূহের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন, সেসব বস্তুসমূহ যেগুলো সূর্যালোক (কিংবা অন্যান্য শক্তির উৎস) শোষন করে এবং বিশেষ কিছু বিচ্ছিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো হিসেবে সেই শক্তি বিকিরণ করে। ফ্লোরোসেন্ট পদার্থগুলো ফরফোরোসেন্ট পদার্থের মতোই, তবে এদের ক্ষেত্রে বিকিরণ ততক্ষণই থাকে যতক্ষণ এরা শক্তি শোষন করতে থাকতে। শক্তির উৎস সরিয়ে ফেললে এদের দীপ্তিও শেষ হয়ে যায়। অপরদিকে ফসফোরেসেন্ট বস্তুগুলো শক্তি শোষন করার পর বেশ দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে সই শক্তি বিকিরণ করে।

Portrait of Antoine-Henri Becquerel.jpg

Antoine Henri Becquerel

বেকরেল এই ভেবে চমৎকৃত হলেন যে দীপ্তিমান বস্তুগুলো দৃশ্যমান আলোর পাশাপাশি এক্স রে ও বিকিরণ করে কিনা। এই বিষযটি পরীক্ষা করে দেখার জন্য একটি আলোক সংবেদী প্লেটকে কালো কাগজ দিয়ে মোড়ালেন এবং এই ব্যবস্থাটিকে সূর্যালোকে উন্মুক্ত রাখলেন যার মধ্যে একটি দীপ্তিমান বস্তুর কৃষ্টালও ছিলো। সূর্যালোক কালো কাগজ ভেদ করতে পারবে না এবং দীপ্তিমান বস্তুর কৃষ্টালটিও যে বিকিরণ উৎপন্ন করবে তা-ও কালো কাগল ভেদ করে যাবে না। কিন্তু যদি দীপ্তিমান বস্তুটি বিকিরণ হিসেবে কোনো এক্স রে উৎপন্ন করে তাহলে তা কালো কাগজ ভেদ করে গিয়ে আলোক সংবেদী প্লেটে পড়ে সেটিকে ঝাপসা করে তুলবে।

যেই দীপ্তিমান বস্তুটি তিনি ব্যবহার করেছিলেন সেটির নাম পটাশিয়াম ইউরেনাইল সালফেট, একটি প্রসিদ্ধ দীপ্তিমান বস্তু। এই যৌগটির প্রতিটি অণু একটি ইউরেনিয়াম পরমাণু ধারন করে। ১৮৯৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারিতে বেকরেল তাঁর পরীক্ষাটি করলেন এবং যথেষ্ট নিশ্চয়তার সাথে দেখা গেলো আলোকসংবেদী প্লেটটি ঝাপসা হয়েছে। তিনি সিদ্ধান্তে আসলেন দীপ্তিমান বস্তুর ক্রিস্টালটি এক্স রে উৎপন্ন করছে এবং তিনি পরীক্ষাটি আরেকবার করে নিশ্চিত হতে চাইলেন। অবশ্য, তার পরের কয়েকটি দিন মেঘাচ্ছন্ন কাটল। বেকরেল তার কালো কাগজে মোড়ানো আলোক সংবেদী প্লেটটি ক্রিস্টাল সমেত ড্রয়ারে রেখে দিলেন এবং সূর্যালোকের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।

মার্চের এক তারিখ নাগাদ বেকরেল অস্থির হয়ে উঠলেন। নিজেকে কোনো একটি কাজে ব্যস্ত রাখার জন্য তিনি ড্রয়ারে আলোর অনুপস্থিতিতে রাখা আলোক সংবেদী প্লেটটি ডেভেলপ করার উদ্যোগ নিলেন এটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে অন্ধকারের মধ্যে প্লেটটির মধ্যে কিছুই এসে পৌঁছাচ্ছে না। বিস্ময়াভিভূত হয়ে তিনি দেখলেন কিছু একটা প্রবেশ করছে এবং তা যথেষ্ট পরিমানে। প্লেটটি প্রবলভাবে ঝাপসা হয়ে আছে। আলোর অনুপস্থিতিতেও ক্রিস্টালের টুকরোটি এক্স রে বিকিরণ করেছে এবং এই ঘটনা আলোর উপস্থিতি কিংবা ফ্লোরোসেন্স প্রদর্শনের উপর নির্ভরশীল নয়। সূর্যের কথা ভুলে গিয়ে বেকরেল বিকিরণ নিয়ে গবেষনা করতে শুরু করলেন।
(সবগুলো পর্ব একত্রে)

লিখেছেন bengalensis

পোস্টডক্টরাল গবেষক: Green Nanomaterials Research Center Kyungpook National University Republic of Korea.

bengalensis বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 70 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

আপনার মতামত