অধ্যায়-৪ : নিউক্লিয়াস
অনুচ্ছেদ-১: পরমাণু অনুসন্ধান (২য় খন্ড)

তিনি সহসাই উপলব্ধি করলেন যে, পটাশিয়াম ইউরেনাইল সালফেট হতে যে বিকিরণ উৎপন্ন হয় তার উৎস হচ্ছে এর মধ্যস্থিত ইউরেনিয়াম। কেননা ইউরেনিয়ামযুক্ত অন্যান্য যৌগসমূহও একই ধরনের বিকিরন দেয় এমনকি যারা ফ্লোরোসেন্স প্রদর্শন করে না তারাও। ১৮৯৮ সালে পোলিশ-ফরাসি পদার্থবিদ মেরি কুরি (Marie Curie, ১৮৬৭-১৯৩৪) দেখালেন যে অন্য আরেকটি ধাতু থোরিয়ামও বিকিরন প্রদর্শন করে। তিনি এই দুটি মৌলের আচরণকে যথাক্রমে ইউরেনিয়াম বিকিরন এবং রেডিয়াম তেজষ্ক্রিয়তা হিসেবে অভিহিতে করলেন। বেকরেল এবং কুরি উভয়ই ধারনা করেছিলেন এই দুই পদার্থের বিকিরণ ভিন্ন ভিন্ন ধরনের।

মেরি কুরি

১৮৯৯ সালে নিউজিল্যান্ড বংশদ্ভুত পদার্থবিদ আর্নেস্ট রাদারফোর্ড (Ernest Rutherford, ১৮৭১-১৯৩৭) অ্যালুমিনিয়াম ধাতুর পাতের মধ্য দিয়ে ছেদ করে যাওয়া তেজষ্ক্রিয় বিকিরনের আচরণ নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তিনি দেখলেন কিছু বিকিরণ ১/৫০০ সেন্টিমিটার পুরু অ্যালুমিনিয়ামের পাতেই আটকে যায় আবার অন্য এক ধরনের বিকিরনকে থামানোর জন্য যথেষ্ট পরিমাণ পুরু পাতের প্রয়োজন হয়। গ্রীক বর্ণমালার প্রথম বর্ণ অনুযায়ী রাদারফোর্ড প্রথমোক্ত বিকিরনকে আলফা রশ্মি নাম দিলেন আর অন্যধরনের বিকিরনটিকে গ্রীক দ্বিতীয় বর্ণ অনুযায়ী বিটা রশ্মি নাম দিলেন। ১৯০০ সালে ফরাসি পদার্থবিদ পল উলরিখ ভিলার্ড তৃতীয় আরেক ধরনের রশ্মি আবিষ্কার করলেন যার ভেদন ক্ষমতা আরো অনেক বেশি, যার নাম দেওয়া হলো গামা রশ্মি; গ্রীক বর্ণমালার তৃতীয় বর্ণ অনুসারে।

Ernest Rutherford cropped.jpg

আর্নেস্ট রাদারফোর্ড

প্রথমবার আবিষ্কারের পর বিভিন্ন ধরনের বিকিরন পরিমাপ করতে এরপর বেশি সময় লাগেনি। বিটা রশ্মি চৌম্বক ক্ষেত্র দ্বারা এমন ভাবে বিচ্যূত হয় যে এই ঘটনা থেকে তারা যে ঋনাত্মক চার্জগ্রস্থ সেটি স্পষ্ট হয়ে যায়। ১৯০০ সালে বেকরেল এই কণিকাগুলোর ভর এবং চার্জের আকার পরিমাপ করলেন এবং এটি বোঝা গেলো যে বিটা রশ্মি ক্যাথোড রশ্মির মতোই উচ্চ গতির ইলেক্ট্রন দিয়ে গঠিত। এই কারনে একটি উচ্চগতির ইলেক্ট্রনকে অনেক সময় বিটা কণিকা বলা হয়।

গামা রশ্মি চৌম্বক ক্ষেত্র দ্বারা বিচ্যূত হলো না এবং এই পর্যবেক্ষন হতে বোঝা গেলো তারা কোনো বৈদ্যুতিক চার্জ বহন করে না। রাদারফোর্ড সন্দেহ করলেন গামা রশ্মির প্রকৃতি তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের ন্যায় এবং তা সত্যি কিনা দেখার জন্য কিছু পরিমান এই ধরনের রশ্মিকে ক্রিষ্টালের মধ্য দিয়ে পাঠালেন। একটি ব্যতিচার প্যাটার্ণ পাওয়ায় বোঝা গেলো যে এরা এক্স রে এর খুব কাছাকাছি কোনো বিকিরন তবে আরো ক্ষূদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্য নিয়ে গঠিত।

আলফা রশ্মির ক্ষেত্রে দেখা গেলো তারা চুম্বক দ্বারা এমনভাবে বিচ্যূত হয় যে তারা ধনাত্মক চার্জ বিশিষ্ট বলে প্রতীয়মান হয়। তবে শুধু চার্জের দিক থেকে নয় বরং অন্যান্য দিক থেকেও আলফা রশ্মি ইলেক্ট্রনের চেয়ে ব্যতিক্রম ছিলো। ১৯০৬ সালে রাদারফোর্ড দেখালেন যে আলফা কণিকা একটি ইলেক্ট্রনের চেয়ে অনেক বেশি ভারী। আমরা এখন জানি যে এটি ইলেক্ট্রনের চেয়ে ৭৩৪৪ গুণ বেশি ভারী।

যখনই রাদারফোর্ড বুঝলেন যে আলফা কণিকাগুলো প্রচন্ডরকমের ভারী তখনই তাঁর ধারনা হলো এটিই সেই বস্তু যা দিয়ে পরমাণুর অভ্যন্তরে অনুসন্ধান কাজ চালানো যায়। একঝাঁক আলফা কণিকাকে যদি পাতলা ধাতব পর্দার মধ্যে সংঘর্ষ ঘটানো যায় তাহলে তারা পর্দাটিকে ভেদ করে যাওয়ার কথা এবং এই ভেদ করার প্রকৃতি থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সুযোগ আছে। রাদারফোর্ড একটুকরো তেজষ্ক্রিয় বস্তুকে একটি সীসার বাক্সে স্থাপন করলেন এবং এর সামনে একটি ছিদ্র রাখলেন। বিকিরণ যদিও সীসার দেয়াল ভেদ করতে পারবে না তবে সামনে ছিদ্র রাখায় সরু একগুচ্ছ বিকিরণ ছিদ্র দিয়ে নিঃসৃত হবে এবং বাইরে বেরিয়ে এসে একটি পাতলা সোনার তৈরি পর্দায় আঘাত করতে পারবে। সোনার পর্দার পেছনে একটি আলোক সংবেদী পর্দা রাখা থাকবে যা কোনো আলফা কনিকা যদি সোনার পাত ভেদ করে চলে আসে তার প্রভাবে ঝাপসা হবে।

সোনার পাতটি এতোই পাতলা ছিলো যে এটিকে প্রায় অর্ধস্বচ্ছ দেখা গেলো কিন্তু একই ভাবে পরমাণু নিজেই এতই ক্ষূদ্র যে এধরনের কিছু পাতলা সোনার পাতের পুরুত্ব ছিলো ২০০০০টি পরমাণুর ব্যসের সমান। এমনকি এরপরও আলফা কণিকা পাতের ভিতর দিয়ে এমনভাবে গলে গেলো যেন এই ২০০০০ টি পরমাণুর কোনো অস্তিত্ত্বই নেই। তারা আলোক সংবেদী প্লেটটিকে এমনভাবে ঝাপসা করলো যে পরিমান ঝাপসা করতে পারত তাদের গমন পথে কোনো সোনার পাত না রাখা হলেও।

তবে পুরোপুরি নয়। রাদারফোর্ড লক্ষ্য করলেন সামান্য কিছু আলফা কণিকা বিচ্যূত হচ্ছে। আলফা কণিকাগুলো আলোক সংবেদী প্লেটের যেখানে পড়ার কথা তার চারপাশের এলাকাও খুব হালকাভাবে ঝাপসা হচ্ছে। দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে এই ঝাপসা এলাকা ক্রমশঃ মিলিয়ে যায় তবে একেবারে পুরোপুরি মেলায় না। প্রায় প্রতি ৮০০০ আলফা কণিকার একটি নব্বই ডিগ্রি কিংবা তারচেয়ে বেশি কোণে বিচ্যূত হয়। প্রকৃতপক্ষে, সময় সময় কোনো কোনো আলফা কণিকা পাতের কোথাও আঘাত পেয়ে একবারে সরাসরি উল্টো দিকে চলে আসছে বলেও মনে হয়।

এই বিষয়টি ব্যাখ্যার জন্য ১৯১১ রাদারফোর্ড তার পরমাণুর গঠনের ধারনা নিয়ে এগোলেন। তিনি বললেন পরমাণুর প্রায় সবটুকু ভর একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও ধনাত্মক চার্জযুক্ত এলাকায় ঘনীভুত অবস্থায় থাকে যা এটির একেবারে কেন্দ্রে অবস্থান করে। যদি আলফা কণিকাগুলো এই কেন্দ্রের কাছাকাছি আসে তাহলে তারা বিচ্যূত হয় (আলফা কণিকা নিজেও ধনাত্মক চার্জ বিশিষ্ট)। বিচ্যূতির অনুপাত থেকে রাদারফোর্ড নিউক্লিয়াস আকারও নির্নয় করতে পারেন। ইতিপূর্বে নাগাওকার কাছে এই ধরনের কোনো আলামত ছিলো না।

ফলে রাদারফোর্ডই এই আবিষ্কারের পূর্ণ স্বীকৃতি পেলেন। ছোট কেন্দ্রীয় অংশটুকুকে নাম দেওয়া হলো নিউক্লিয়াস যা একটি গ্রীক শব্দ থেকে আগত যার অর্থ ছোট বাদাম, কেননা এটি একটি বিশাল জায়গাবহুলো পারমাণবিক খোলসের মধ্যে একটি ছোট বাদামের মতোই অবস্থান করে। যেহেতু জীববিজ্ঞানে জীবকোষেও একটি কেন্দ্রীয় বস্তুকে নিউক্লিয়াস নামে অভিহিত করা হয় তাই পরমাণুর ভিতরের নিউক্লিয়াসটিকে অনেক সময় পারমাণবিক নিউক্লিয়াস বলে সুস্পষ্ট করা হয়। তবে এই বইয়ের আলোচনায় সুস্পষ্টকারী ‘পারমানবিক’ শব্দটিকে ব্যবহার করা হয় নি।

রাদারফোর্ডের পরমাণুর চিত্রটি বেশ সন্তোষজনক বলে প্রতীয়মান হলো যদিও অনেক বিস্তারিত বিষয়াদি আবিষ্কৃত হয়েছিলো এর আরো এক শতাব্দীর তিন-চতুর্থাংশ সময় পরে। এই বিষয়টি এবং অন্যান্য কাজের জন্য রাদারফোর্ড ১৯০৮ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন (রাদারফোর্ড পুরষ্কারটি পেয়েছিলেন রসায়ন ক্যাটাগরিতে, যে কারনে তিনি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন কেননা তিনি নিজেকে পদার্থবিদ ভাবতেন)।
(সবগুলো পর্ব একত্রে)

লিখেছেন bengalensis

পোস্টডক্টরাল গবেষক: Green Nanomaterials Research Center Kyungpook National University Republic of Korea.

bengalensis বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 70 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

আপনার মতামত