Edvard Moser, John O'Keefe and May-Britt Moser

ছবি বাম থেকে ডানে যথাক্রমে এডভার্ট মোজার, জন ও’কেফে, মে-ব্রিট মোজার

স্মার্টফোনের কল্যাণে অনেকেই জিপিএস-ব্যবহার করেছেন। জিপিএস হলো পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকা কিছু স্যাটেলাইটের সাহায্য নিয়ে ভূমির স্থানিক তথ্য সুনির্দিষ্ট জানার একটি পদ্ধতি। কোন বস্তু ভূমির ঠিক কোথায় আছে সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেয় জিপিএস সিস্টেম। এই তথ্য আসলে স্থানাঙ্ক; অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশের হিসাব। জিপিএস-এর উপর ভিত্তি করে আধুনিক টেলিযোগাযোগ থেকে শুরু করে রকেট উড্ডয়ন প্রযুক্তি গড়ে ওঠেছে। জিপিএস মানেই হলো Global Positioning System, বৈশ্বিক অবস্থান নির্ণয় ব্যবস্থা।

চিন্তা করুন, কোন এক দুপুর বেলা আপনি ফার্মগেট থেকে শাহবাগ হয়ে চাঙ্খারপুল যাবেন নান্নার বিরিয়ানি খেতে। এজন্য স্মৃতি ও ইন্দ্রিয়ের তথ্য থেকে আপনি মনে মনে একটি ম্যাপ তৈরি করে ফেলতে পারেন। এখন এই ম্যাপের ঠিক কোন জায়গায় আপনি আছেন, তা যদি সময়ের সাথে সাথে বুঝে উঠতে না পারেন, তাহলে কোনদিনই আপনার চাঙ্খারপুল যাওয়াও হবে না, নান্নার বিরিয়ানিও খাওয়া হবে না। এই যে মস্তিষ্কে স্মৃতি ও চোখের পাওয়া তথ্য থেকে একটি ম্যাপ তৈরি করে সেখানে আপনার অবস্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে হালনাগাদ করার ক্ষমতা, এর জন্যেও কি কোন স্থানাঙ্ক-ব্যবস্থা আছে? এ বছর তিন বিজ্ঞানী, এডভার্ট মোজার, জন ও’কেফে, মে-ব্রিট মোজার, মস্তিষ্কের ভেতরে জিপিএস-এর মতোই এই স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা আবিষ্কারের জন্যই নোবেল পুরস্কার পেলেন।

এই গবেষণার শুরু ১৯৭১ সালে জন ও’কেফের হাত ধরে। আর এ গবেষণা চালিয়ে গেছেন বিজ্ঞানী-দম্পতি এডভার্ট ও মে-ব্রিট মোজার। গবেষণার লক্ষ্য খুব মৌলিক – মানুষ কি করে স্থানের এক জায়গা হতে অন্য জায়গায় নিজেদের পরিচালিত করে।

ও’কেফে প্রথম খেয়াল করেন গবেষণাগারে যখন কোন ইঁদুর একটি স্থানের মধ্যে চলাফেরা করে, তখন ইঁদুরটির মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস নামের এক অঞ্চলে কিছু নির্দিষ্ট স্নায়ু আলোড়িত হয়। স্নায়ুসমুহের এই আলোড়ন স্থান-নির্ভর; স্থান বদলানোর সাথে সাথে অন্য নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষ আলোড়িত হয়। ও’কেফে এই কোষগুলোর নাম দেন স্থানিক কোষ (place cells) যারা মস্তিষ্কে ওই রুমের একটা ম্যাপ তৈরি করছে। তিন দশক পর ইঁদুরের মস্তিষ্কে মোজার দম্পত্তি বের করেন সজ্জা-কোষ  (grid cells), যারা স্থানের মধ্যে অবস্থান নির্ণয় ও চলাফেরার জন্য স্থানাঙ্ক তৈরি করে। এই দুই আবিষ্কারের জন্যেই তাঁরা নোবেল পুরস্কারে মনোনীত হন।

নিচে ছবির সাহায্যে মোজার দম্পত্তির আবিস্কারটি ব্যাখ্যা করা হলো:

(ক) অবস্থানের অনুভূতি
মোজার দম্পত্তি ইঁদুর মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসে এন্টেরোহিনাল কর্টেক্স নামের একটা জায়গায় তাঁদের গবেষণাটি চালান।

(খ) ইঁদুর-দৌড়
মোজার দম্পত্তি ইঁদুরের এন্টেরোহিনাল কর্টেক্সে ইলেকট্রোড প্রবেশ করান। ইলেকট্রোড হচ্ছে এক ধরনের সূক্ষ্ম বিদ্যুত পরিবাহী তার, যা স্নায়ু থেকে সংকেত পরিমাপ করতে ব্যবহৃত হয়। তারপর ইঁদুরদের একটি বাক্সের মধ্যে সর্বত্র ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা করেন বাক্সের জায়গায় জায়গায় চকলেট বসিয়ে। এরপর প্রত্যেকটি গ্রিড কোষ থেকে তাঁরা সংকেত পরিমাপ ও লিপিবদ্ধ করেন বিজ্ঞানীদ্বয়।

(গ) স্নায়ু-ঝলসানো নকশা
দেখা গেল, ইঁদুর যখন বাক্স-মেঝের একটি নির্দিষ্ট বিন্দু অতিক্রম করে, তখন তার মস্তিষ্কে একটি নির্দিষ্ট গ্রিড কোষ আলোড়িত হয়ে ওঠে। দেখা গেল, যে এই বিন্দুসমূহ একটি মৌমাছির মৌচাকের মতো ষড়ভূজীয় নকশা গঠন করে।

(ঘ) স্থান-নির্ণয় ব্যবস্থা
ষড়ভূজীয় নকশার মধ্যে একটা জ্যামিতিক সৌন্দর্য আছে। ষড়ভূজীয় নকশায় সজ্জিত হলে সবচেয়ে কম কোষের সাহায্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক স্থানিক বিন্দুর অবস্থান নির্ণয় করা যায়। প্রতিটি কোষ পার্শ্ববর্তী কোষগুলোকে সাথে নিয়ে তার নিজস্ব গ্রিড তৈরি করে। এই সমপতিত নকশার ইঁদুরকে সহায়তা করে বাক্সের মধ্যে এর অবস্থান ও গতিমূখ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে।

মস্তিষ্কের এই স্থানিক-সচেতনতা ভালোভাবে বোঝা গেলে তা ভবিষ্যতে আলঝেইমার রোগ বোঝার জন্য সাহায্য করতে পারে। আলঝেইমার রোগে মানুষ ধীরে ধীরে স্মৃতি ভুলে যায়, বিশেষতঃ স্থানিক স্মৃতি হারিয়ে যায় এই রোগে।

ছবিসূত্রঃ নেচার
তথ্যসূত্রঃ Pinpointing brain’s inner GPS leads to Nobel Prize in medicine win, Justin Scuiletti, 6 October, 2014. http://www.pbs.org

[লেখাটি অনুসন্ধিৎসু চক্রের ওয়েবসাইটেও প্রকাশিত]

লিখেছেন আরাফাত রহমান

অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি শিক্ষার্থী। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই “মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন” (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও “প্রাণের বিজ্ঞান” (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।

আরাফাত রহমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 67 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. রুহশান আহমেদ Reply

    নোবেল সাইটের প্রেস রিলিজটা আগেই পড়া ছিলো, এখানে বাংলায় পড়ে ব্যপারটা ভালোভাবে বুঝা গেলো।

আপনার মতামত