রাত হলেই রাস্তার পাশের ল্যাম্প পোস্ট, বাল্ব, টিউব লাইট অথবা খোলা স্থানে আগুন জ্বালালে সেগুলোকে কেন্দ্র করে ঝাঁকে ঝাঁকে পোকা-মাকড়, কীট-পতঙ্গদের উড়তে দেখা যায়। একটু ভালভাবে খেয়াল করলে দেখবেন যে, বিশেষ করে উইপোকা আগুনের খুব কাছাকাছি চলে যায়, এমনকি ঝাঁকে ঝাঁকে তাদের আগুনে ঝাপ দিতেও দেখা যায়। কিন্তু কেন? এর পিছনের বিজ্ঞান কি? এর পেছনের বিজ্ঞান বুঝতে হলে, পতঙ্গদের এই অদ্ভুত আচরণের ব্যাখ্যা জানতে হলে, আপনাকে প্রথমে বুঝতে হবে Phototaxis কি?

article-2401766-1B737135000005DC-639_634x415

পতঙ্গদের আলোকে কেন্দ্র করে ছুটে চলাকে বলে আলোক কেন্দ্রিক চলন যার ইংরেজি নাম Phototaxis. আলোক কেন্দ্রিক চলন দুই প্রকারের হয়, ঋণাত্মক আলোক কেন্দ্রিক চলন (Negative Phototaxis) এবং ধনাত্মক আলোক কেন্দ্রিক চলন (Positive Phototaxis). কোন কিছুর আলোর দিকে গমনকে বলা হয় ধনাত্মক আলোক কেন্দ্রিক চলন এবং আলো থেকে দূরে যাওয়াকে বলা হয় ঋণাত্মক আলোক কেন্দ্রিক চলন। অনেক পতঙ্গ আছে যারা ধনাত্মক বৈশিষ্ট্যের জন্য আলোর দিকে গমন করে এবং ঠিক এমনও কিছু প্রকারের পতঙ্গ আছে যারা আলো দেখলেই দূরে চলে যায়, লুকিয়ে যায়।

কোনও একটি দূরবর্তী আপাত আলোক উৎসের সাথে কৌণিক দূরত্ব বজায় রেখে কিছু পতঙ্গ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে, যাকে ট্রান্সভার্স অরিয়েন্টেশন (transverse orientation) বলে। এই সংজ্ঞা মতে, রাতের বেলা পতঙ্গরা চাঁদকে কেন্দ্র করে তাদের চলন পথ ঠিক করে। বেশীরভাগ পোকা-মাকড়,কীট-পতঙ্গ সাধারণত একটি নির্দিষ্ট পথে সবসময় যাতায়াত করতে অভ্যস্ত এবং তারা রাতের বেলা চলতে গেলে চাঁদের প্রতিফলিত আলোকে পথ চলার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।

তাদের চলন পথে এখন যদি কোন কৃত্রিম আলো কিংবা আগুন জ্বালানো হয় অথবা তাদের চলন পথের কাছাকাছি স্থানে যদি কৃত্রিম আলো জ্বলে তাহলে কীট-পতঙ্গ এবং পোকা-মাকড়েরা রাতের কৃত্রিম আলোর দ্বারা চলতে বাঁধাগ্রস্ত এবং আকৃষ্ট হয়। যখনই একটি পোকা কৃত্রিম আলোর কাছাকাছি আসে এটি সেই আলো বরাবর সোজা চলতে থাকে যেমনটি চাঁদের আলো বরাবর সে পথ চলতো। পতঙ্গরা সবসময় আলোকে কেন্দ্র করে উড়ে বেড়ায় না, একমাত্র সূর্য অস্ত যাওয়ার পর চাঁদ ও নক্ষত্রের আলো পৃথিবীর উপর যখন প্রতিফলিত হয় এবং কেবলমাত্র তখন তাদের সামনে কৃত্রিম আলো পড়লেই তারা এই ধরনের আচরণ প্রদর্শন করে।

রাতের বেলা যদি কোন স্থানে আলো জ্বালানো হয় এবং সেই আলো যদি ৩৬০ ডিগ্রী বরাবর আলো ছড়ায় তাহলে পোকা মাকড়েরা সেই আলোকে কেন্দ্র করে একটি বৃত্তাকার পথে আলোকিত অংশ অনবরত উড়তে থাকে। অনেক সময় পতঙ্গরা রাতের কৃত্রিম আলোকে দিনের আলোর সাথে তুলনা করে বসে এবং এই আলোক উৎসকে তারা বংশবিস্তার এবং পর্যাপ্ত খাবারের সন্ধানের উৎস হিসেবে বিবেচনা করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, রাতের বেলা উজ্জ্বল আলো পতঙ্গদের শিকারী অপর পতঙ্গকে চিনতে বাধাগ্রস্ত করে এবং তাদের শিকারিদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে।

আলোর দিকে গমনের এই ধর্ম শুধু পতঙ্গরাই প্রদর্শন করেনা, অনেক গাছপালা, প্রাণী এই ধর্ম প্রদর্শন করে। জ্বলন্ত আগুনকে কেন্দ্র করে পোকা মাকড়দের আগুনে ঝাপ দেওয়া কিংবা কৃত্রিম আলোকে কেন্দ্র করে তাদের এই ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়ানোর বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করার জন্য অনেক তত্ত্ব রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেগুলোর মধ্যে একটিও ক্ষুদ্র কীট-পতঙ্গদের এই অদ্ভুত আচরণকে ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট নয় কেননা বেশীরভাগ তত্ত্বই ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত।

পতঙ্গদের এই ধরনের আচরণ ব্যাখ্যা করার জন্য কয়েক প্রকারের তত্ত্বের মধ্যে একটি হল- অনেক গবেষক মনে করেন যে, পতঙ্গদের চলার পথে কৃত্রিম আলো পড়লে তারা আলো দ্বারা আকর্ষিত হয়। অপরদিকে বেশকিছু গবেষকের মতে- পতঙ্গরা আলো দ্বারা বিভ্রান্ত হয় এবং সেকারণেই আলোক উৎসের চারপাশে ঘুরতে থাকে। বেশীর ভাগ পতঙ্গ নিশাচরী। কৃত্রিম আলো অনেক বেশী উজ্জ্বল হওয়ায় এটি ক্ষুদ্র পতঙ্গদের চলন পথে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। উদাহরণ স্বরূপ প্রজাপতির ন্যায় ক্ষুদ্র পতঙ্গরা তাদের চলন পথে যদি কোন কৃত্রিম আলো পায় তাহলে যে পাশে আলো আছে পতঙ্গদের সে পাশের চোখে এই কৃত্রিম আলো অপর চোখের তুলনায় বেশী উজ্জ্বল অনুভূত হয়। এর ফলে সেদিকে কেন্দ্র করে পতঙ্গরা দ্রুত ডানা ঝাপটিয়ে কাছে যেতে চায়। ফলস্বরূপ তারা বিভ্রান্ত হয়ে একটি গোলাকার পথে আলোর উৎসের দিকে অনবরত ভাবে উড়তে থাকে। গবেষকরা মতে, অনেক সময় কৃত্রিম আলো পোকা-মাকড়দের জনন প্রক্রিয়াকেও বাধাগ্রস্থ করে। পত্রিকায় প্রকাশিত এক গবেষণা পত্রে বলা হয় যে, প্রজাপতির ন্যায় ক্ষুদ্র পতঙ্গরা বিশেষ করে স্ত্রী প্রজাতি পুরুষ প্রজাতিকে আকর্ষিত করার জন্য জৈবিক পদার্থ নির্গমন কালে যে বিশেষ প্রকার তরঙ্গ উৎপন্ন করে সেটির তরঙ্গদৈর্ঘ্য মোমবাতি থেকে নির্গত আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের সমান। ফলে মোমবাতি জ্বালালে তা দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে পুরুষ প্রজাতি আলোকে কেন্দ্র করে উড়তে থাকে।

অনেক পতঙ্গ আছে যারা দিনের বেলা খাবার সংগ্রহ করে থাকে। রাতে এরা কোনভাবে কৃত্রিম আলোর সংস্পর্শে চলে আসলে সেই আলো দ্বারা আকর্ষিত হয়না ঠিক, কিন্তু এই আলো দ্বারা তারা বিভ্রান্ত হয়ে মনে করে যে এখনো দিনের আলো আছে। ‘ন্যাশনাল লাইব্রেরী অফ সিঙ্গাপুর’ পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয় যে, কৃত্রিম আলোর ফলে উৎপন্ন নীল এবং বেগুনী আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য প্রধানভাবে কীট পতঙ্গদের আকৃষ্ট করে। হলুদ এবং লাল আলো সবচেয় কম আকৃষ্ট করে। এক ব্যাখ্যায় তারা বলেন যে, পরাগায়ন ঘটানোর জন্য পতঙ্গদের আকৃষ্ট করার জন্য প্রাকৃতিকভাবে অনেক ফুল থেকে যে বিশেষ প্রকারের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি নির্গত হয় তার বৈশিষ্ট্য প্রধানত নীল এবং বেগুনী বর্ণের আলোর বৈশিষ্ট্যের সমান হয় এবং যেটি কিনা ফুলের উপর খাবার সংগ্রহকারী পোকা-মাকড়দের আকৃষ্ট করে। একই প্রকারের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি উৎপন্ন করে কৃত্রিম আলোক উৎস বা টিউব লাইট। শুধু যে আলো দেখলেই কাছে যাবে তেমনটি কিন্তু নয়। বেশ কিছু পতঙ্গ বিপরীত বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে এবং আলো দেখলেই দ্রুত লুকিয়ে গিয়ে আলো থেকে দূরে থাকতে চায়। খেয়াল করে দেখুন, যখন আপনি তেলাপোকার মাথায় আলো নিক্ষেপ করেন তখন কত দ্রুত তেলাপোকা পালিয়ে যায়।

বেশীরভাগ পতঙ্গ বিজ্ঞানী পতঙ্গদের এই ধরণের আচরণ ব্যাখ্যা করার জন্য আলো দ্বারা বিভ্রান্ত হওয়া এবং আকৃষ্ট হওয়া উভয় মতবাদে বিশ্বাসী। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কেলি এর পতঙ্গ বিশেষজ্ঞ জেরি পাওয়েল (Jerry Powell) বলেন যে, “The thinking is that they become dazzled by the light and are somehow attracted”

কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রচলিত এই তত্ত্বগুলোর কিছু ত্রুটি রয়েছে। বিবর্তনবাদের স্কেলে তড়িৎ শক্তি দ্বারা উৎপন্ন লাইট বাল্ব নতুন হতে পারে ঠিকই কিন্তু প্রাকৃতিকভাবেই খোলা স্থানে আগুন জ্বলা সেই চার লক্ষ বছর ধরেই চলে আসছে। পতঙ্গদের আলো দ্বারা আকৃষ্ট এবং দিক বিভ্রান্তের এই তত্ত্ব পুরোপুরি সত্য হলে বিবর্তনের এই দীর্ঘ সময়ে প্রাকৃতিক নির্বাচন মতবাদ (Natural Selection) অনুসারে যে সব পতঙ্গ আগুনে আকর্ষিত হয়ে কাছে আসে এবং আগুনে পুরে এতদিনে তাদের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কথা! অথচ প্রাকৃতিক ভাবেই তারা কীভাবে দিব্যি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বেঁচে আছে? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।

তথ্য সুত্র:
১. http://www.iflscience.com/plants-and-animals/why-are-bugs-attracted-light

২. http://www.livescience.com/33156-moths-drawn-artificial-lights.html

৩. http://animals.pawnation.com/bugs-attracted-light-night-7765.html

লিখেছেন স্বপ্নচূর আকাশচারী

বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে ভালো লাগে। নতুন নতুন তথ্য জানতে ভালো লাগে আর ভালো লাগে রাতের আকাশ ভরা তারকা দেখতে এবং তারকা রাজ্যে হারিয়ে যেতে। পড়তে হয় বলেই, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই তে পড়াশুনা করছি।

স্বপ্নচূর আকাশচারী বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 2 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. bengalensis Reply

    চমৎকার একটি বিষয় নিয়ে চমৎকার ভাবে লিখেছেন। অভিনন্দন।

  2. আরাফাত রহমান Reply

    লেখা আর লেখার বিষয় — দুটাই মজাদার। লেখাটা ভালো লেগেছে। একটা খটকা ছিলো। এক জায়গায় বলেছো, ”… তত্ত্বই ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত”। এখানে তত্ত্ব বলতে কি থিউরি বোঝাচ্ছো? সাধারণত বিজ্ঞানে থিউরি পরীক্ষামূলক গবেষণা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটা বিষয় বোঝায়। আর এর উল্টোটা হলো হাইপোথিসিস। এখানে দেখ:

    ”A hypothesis is an attempt to explain phenomena. It is a proposa l- -a guess used to understand and/or predict something. A theory is the result of testing a hypothesis and developing an explanation that is assumed to be true about a phenomena. A theory replaces the hypothesis after testing confirms the hypothesis.

    So, a person might make an observation and immediately form a hypothesis about why something happens the way it does. He or she then tests the hypothesis and eventually develops a theory. The hypothesis might be modified as testing occurs. A hypothesis can be right or wrong, but a theory is supposed to be true based upon the scientific method. So, when a hypothesis has been verified to be true, it becomes a theory.”

    রেফারেন্স: http://carm.org/difference-hypothesis-theory

    • স্বপ্নচূর আকাশচারী Reply

      ধন্যবাদ আরাফাত ভাই। 😀
      তত্ত্বই ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত কথাটা বললে আসলেই ভুল হবে।সম্পূর্ণ কথাটা একটু বেশী জটিল করে ফেলেছি মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে সেগুলোর মধ্যে একটিও ক্ষুদ্র কীট-পতঙ্গদের এই অদ্ভুত আচরণকে ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট নয় কেননা বেশীরভাগ তত্ত্বই ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। আমি আসলে বুঝাতে চেয়েছিলাম যে,এই পর্যন্ত এই বিষয়ের উপর যতগুলো তত্ত্ব রয়েছে সেগুলো বেশীর ভাগই ধারনার উপর প্রতিষ্ঠিত।হয়তোবা এই খানে তত্ত্ব বলাটা আমার ঠিক হয়নাই,কিন্তু বেশ কিছু আর্টিকেলে দেখলাম উনারা তত্ত্বই বলেছেন।

আপনার মতামত