১০ নভেম্বর বিশ্ব বিজ্ঞান দিবসে এক বৈঠকে পড়ে শেষ করে ফেললাম ‘ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী’র বই “কোয়ান্টাম ও তরঙ্গ”। আকৃতিতে ছোট সাইজের এই বইটি একটি ট্রেন ভ্রমণেই শেষ হয়ে গেল। ‘কোয়ান্টাম ও তরঙ্গ’ নামের বইটি হচ্ছে সলিড স্টেট সিরিজের দ্বিতীয় বই। আগের বইটির চেয়ে এই বইটি অনেক সাবলীলে পড়ে শেষ করতে পেরেছি। আগের বইটি আর এই বইটি ধাঁচের দিক থেকে একই, কিন্তু তারপরেও এই বইটিকে আমি উপরে রাখবো। তার কারণ মনে হয় প্রথম বইটি পড়ার সময় ধরে নিয়েছিলাম এটি পপুলার সায়েন্স জাতীয় বই। কিন্তু আদতে এটি কিছুটা টেক্সট, কিছুটা পপুলার ধাঁচের বই। বলা যায় ‘সেমি-টেক্সট’ বই। মানসিক ব্যাপার স্যাপার অনেক বড় জিনিস। মানসিক ব্যাপার স্যাপারের কারণে একই বই একজনের কাছে অমৃতের মত লাগে আরেকজনের কাছে কঠিন লাগে। কোয়ান্টাম ও তরঙ্গ পড়ার সময় আমি ধরেই নিয়েছিলাম এটি সেমি-টেক্সট জাতীয় বই, তাই পড়েও আরাম পেয়েছি বেশ।

বইটির আলোচনার প্রধান বিষয় কোয়ান্টাম মেকানিক্স। ৬৮ পৃষ্ঠার এই বইটিতে চারটি অধ্যায়ের মাধ্যমে কোয়ান্টাম মেকানিক্স তথা ক্ষুদ্র জগতের ধারণা দেয়া হয়েছে। বলে নেয়া ভাল এটা কোনো আকর গ্রন্থ নয়। পড়ে আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে বস্তুর পরিবহণ তথা বৈদ্যুতিক গুনাগুণ সম্বন্ধে আগ্রহী পাঠকদের একটা প্রাথমিক ধারণা তৈরি করতে পারে এই বই। পরিবহণ ও কোয়ান্টাম মেকানিক্সে আগ্রহী হলে এই বিষয়ের উচ্চতর বই পড়ার সোপান হিসেবে কাজ করবে এটি।

cover

 ছোট বইটিকে মোট তিনটি অংশে ভাগ করা যেতে পারে। মূল বই তথা মূল প্রবন্ধ, নোট এবং পরিশিষ্ট।

মূল প্রবন্ধগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের উপযুক্ত ভাষায় কোয়ান্টাম মেকানিক্স তথা কঠিন পদার্থের গুণাবলী আলোচনা করা হয়েছে। মূল লেখার সাথে প্রাসঙ্গিক কিছু আলোচনা যেগুলোয় কিছুটা জটিলতা আছে সেগুলোকে আলাদাভাবে ‘নোটস’ অংশে আলোচনা করা হয়েছে। মূলত প্রবন্ধগুলো পড়ার সময় কেও আগ্রহী হয়ে সামান্য একটু বেশি জানতে চাইলে তার জন্য এই অংশটা কাজে দিবে। ‘নোট’ অংশটা সমীকরণ আশ্রয়ী

আর পরিশিষ্ট অংশটা এর থেকেও সামান্য একটু উঁচু স্তরের আলোচনা। এই অংশটা মূলত গণিত আশ্রয়ী। গণিতের ব্যাপারটার অবশ্য প্রয়োজনীয়তা আছে। বইয়ের ভূমিকাতেই লেখক বলেছেন “…দুঃখের বিষয় খুব সহজ বাংলায় কোয়ান্টাম মেকানিক্সের চমকপ্রদ বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। কারণ এটা অত্যন্ত গণিতাশ্রয়ী।”

এই যে বলা হয়েছে গণিতাশ্রয়ী সেই গণিতেরই কিছুটা আভাস দেয়া হয়েছে এই পরিশিষ্ট অংশে। মূল লেখাগুলো পড়ার পর যারা গণিতের মাধ্যমে ব্যাপারটার আরও গভীরে প্রবেশ করতে চাইবে তাদের জন্য এই অংশটা কাজের হবে।

মূল অংশে চারটি প্রবন্ধ বা অধ্যায় রয়েছে। তাদের শিরোনামগুলো লক্ষ্য করি-

  • কণা, কোয়ান্টাম ও তরঙ্গ
  • কোয়ান্টাম মেকানিক্স
  • ব্যান্ড স্ট্রাকচার
  • বিদ্যুতের পরিবহণ

প্রথম অধ্যায়ে ব্যতিচার ও ওয়েভ ফাংশন নিয়ে কিছু কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি কোয়ান্টাম মেকানিক্স তথা বস্তুর ক্ষুদ্র জগতের গুণাবলী সম্বন্ধে কেন জানা জরুরি তা বলা হয়েছে। “কঠিন বস্তুর প্রয়োগে নতুন ও কার্যকর ডিভাইস নির্মাণে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার খুঁটিনাটি জানা অত্যাবশ্যক। সত্যি বলতে কি, কোয়ান্টাম মেকানিক্স না এলে কঠিন বস্তুর পদার্থবিজ্ঞান (সলিড স্টেট ফিজিক্স) সম্ভব হতো না, সলিড স্টেট ফিজিক্স না থাকলে ট্রানজিস্টর সম্ভব হতো না, ট্রানজিস্টর এবং আইসি বিপ্লব না এলে আজকের তথ্যপ্রযুক্তি এবং আইসিটির যুগ তো সুদূর পরাহত।” (পৃষ্ঠা: ১১)

এই বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়টা গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যায়ের নামই কোয়ান্টাম মেকানিক্স। অতিক্ষুদ্র জগতে ক্ষুদ্র কণিকাগুলো আমাদের বস্তুজগতের নিয়ম না মেনে কেন যুক্তিহীন আচরণ করে তার কিছুটা আলোকপাত দেখা যাবে এখানে। কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা তথা সমগ্র পদার্থবিদ্যায় বোর, হাইজেনবার্গ, ব্রগলি, শ্রোডিঙ্গারের অবদানগুলো এখানে ওঠে এসেছে। পদার্থবিজ্ঞানের সবচে সুন্দর সমীকরণ ‘শ্রোডিঙ্গার ইকুয়েশন’টির আলোচনা এখানেই শুরু হয়েছে। আর সবচে ব্যতিক্রমী বিজ্ঞানী পল ডিরাকের অবদানের কথা তো রয়েছেই।

ব্যান্ড তত্ত্বের খুঁটিনাটি আলোচনা করা হয়েছে তৃতীয় অধ্যায়ে। যে তত্ত্ব কঠিন পদার্থের গুণাবলী অনেক সফলভাবে ব্যাখ্যা করে। ইলেকট্রনের শক্তিস্তর, সেই প্রেক্ষিতে পরিবহণ, পরিবাহিতা আলোচিত হয়েছে। পরিবহণের ক্ষেত্রে তাপের গভীর সম্পর্কের ব্যাপারটাও এখানেই বলা হয়েছে। তৃতীয় অধ্যায় শেষে ঐ আলোচনার পর যে আলোচনা প্রত্যাশিতভাবে চলে আসে তাই আলোচনা করা হয়েছে চতুর্থ অধ্যায় ‘বিদ্যুতের পরিবহণ’ অংশে। এটাও গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায়।

এবার কিছু সমালোচনা। বইটিতে যে চিত্রগুলো ব্যবহার করা হয়েছে তাদের প্রায়গুলোই ফালতু মানের হয়েছে। আর বেশিরভাগ চিত্রের ক্ষেত্রে বড়সড় যে সমস্যাটা রয়ে গেছে তা হল চিত্রগুলো ইংরেজিতে রেখে দেয়া হয়েছে। একে তো ইংরেজি তার উপর ইংরেজি লেখাগুলো পড়তে গেলে মাইক্রোস্কোপ নিয়ে বসতে হয়। অতিছোট হবার কারণে ইংরেজি লেখাগুলো পড়া যায়না। আর এমনিতে ইংরেজি চিত্র বাংলা করে ফেলা খুব একটা কঠিন কিছু না। প্রকাশের আগে সামান্য একটু সময় হাতে রাখলেই সেগুলোকে বাংলা করে ফেলা যায়। এই অংশটায় দায়িত্বের ঘাটতির পরিচয় পাওয়া যায়। তারপর মূল প্রচ্ছদপটে বইয়ের নাম লেখা আছে “কোয়ান্টাম ও তরঙ্গ” এবং একইসাথে বাধাইয়ের সরু অংশে নাম লেখা আছে “কণা ও কোয়ান্টাম”। কীভাবে কি?

এমন ভুল হলে চলে? ৩২ পৃষ্ঠার বারো নম্বর লাইনে গড়বড় হয়ে গেছে সংখ্যা ও লেখা। এক ইনভার্সের স্থলে ধনাত্মক সূচক চলে এসেছে। আর কিছু বানানে সমস্যা রয়েছে। অবশ্য একটা বই পড়ার সময় এরকম কিছু হতেই পারে। ছোটখাটো ত্রুটি থাকবেই, এগুলো মানিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু চিত্র আর নামের সমস্যা বিশাল সমস্যা। এগুলো কোনোভাবেই স্কিপ করা যায়না।

পরিশেষে একটি কথা। কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালও একটা বই লিখেছিলেন। আমি সেটা পড়েছিলাম। সে বইটা একদমই সাদামাটা, ঐ বইটা পড়া থাকলে শীঘ্রই এই বইটা পড়ে ফেলা উচিৎ সবার। জাফর ইকবালের বইটা একটা বিশেষ বয়সের পাঠকের কথা বিবেচনা করে লেখা। সেদিক থেকে ঐ বইটি অনেকটা সফল। কিন্তু একটু সিরিয়াস হতে গেলে ঐ গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এর জন্য কিছুটা সাহায্য করতে পারে “কোয়ান্টাম ও তরঙ্গ” নামের বইটি।

বইটি ‘সলিড স্টেট সিরিজে’র দ্বিতীয় বই। পরবর্তী তৃতীয় বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি করে এটি শেষ হল। এর পরের সিরিজ “অর্ধপরিবাহীর কথা” প্রকাশিত হবে ২০১৫ বইমেলায়। বইটির অপেক্ষায় রইলাম।

 

 

_____________________________________________________________________

_____________________________________________________________________

নাম: কোয়ান্টাম ও তরঙ্গ  || লেখক : ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী  ||  প্রকাশক : শুদ্ধস্বর || প্রকাশকাল :February 2014

ISBN : 9789849030430
Hard Cover
Page : 68

লিখেছেন সিরাজাম মুনির শ্রাবণ

আমি শ্রাবণ, পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। মাসিক বিজ্ঞান সাময়িকী জিরো টু ইনফিনিটিতে বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। বিজ্ঞান পড়তে ভালো লাগে, বিজ্ঞান বিষয়ক ভাবনা চিন্তা করে আনন্দ পাই।

সিরাজাম মুনির শ্রাবণ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 48 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    এমনিতে আমার মনে হয়েছে স্যারের এই উদ্যোগটা ইতিবাচক। দেশে অনেক শিক্ষকই আছেন যাঁরা তাদের শিক্ষাদানের বিষয়টা নিপুনভাবেই ক্লাসরুমে করে থাকেন। তবে তাঁদের মধ্যে বাংলায় বিজ্ঞানের এইসব উচ্চতর বিষয় নিয়ে সহজ করে বই লেখার প্রবণতা দেখা যায় না। সেক্ষেত্রে স্যারের এই সিরিজটা একটা মাইলফলক হয়ে থাকবে। অন্যান্য বিষয়ে এরকম টেকনিক্যাল বই লিখতে অনেকেই অনুপ্রাণিত হবেন আশা করা যায়।

আপনার মতামত