বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের মৃত্যুর পর, বিশ্বের সব পত্রিকায়ই একটি অগোছালো ডেস্কের ছবি ছাপা হয়। ডেস্কটি স্বয়ং আলবার্ট আইনস্টাইনের। ডেস্কের ছবির সাথে পত্রিকার শিরোনাম করা হয়, “The unfinished manuscript of the greatest work, of the greatest scientist of our time”। পুরো বিশ্বই তখন এই কিংবদন্তী বিজ্ঞানীর আলোচনায় মুখর। কিন্তু বিজ্ঞানে আগ্রহী যেকোনো লোকেরই কৌতূহল জাগবে, কি সেই অসমাপ্ত কাজ ? আর কেনই বা তার মত একজন কিংবদন্তী বিজ্ঞানী তা শেষ করে যেতে পারলেন না ? আইনস্টাইন তার জীবনের শেষ ৩৫ বছর এই অসমাপ্ত কাজ শেষ করার চেস্টা করে গেছেন, কিন্তু কোনভাবেই কুল-কিনারা করতে পারেন নি। সাধারন মানুষের কাছে তাই সবচেয়ে বড় ধাধা ছিল, কি এমন কাজ যা আইনস্টাইনের মত একজন বিজ্ঞানী তার জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত চেস্টা করেও সফল হতে পারলেন না !

আইনস্টাইন বেচে থাকতেই তার নামে অনেক মিথ প্রচলিত ছিল। বেশিরভাগ মানুষেরই ধারনা ছিল, তিনি মহাবিশ্ব সম্পর্কে এমন কিছু বুঝতে সক্ষম যা সাধারন মানুষ কখনই বুঝতে পারবে না। তার আপেক্ষিক তত্ত্ব নিয়েও অনেক কল্পকাহিনী প্রচলিত ছিল। তবে এটিও সত্য যে, সে সময়ে তার “আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব” বোঝার মত লোক খুব কমই ছিল।বিজ্ঞানী এডিংটন ছিলেন তার আপেক্ষিক তত্ত্বের একজন জোরালো সমর্থক। জনপ্রিয় বিজ্ঞান ও আপেক্ষিক তত্ত্বের বক্তৃতা দিয়ে ততদিনে তার বেশ সুনামও হয়ে গেছে। একদিন এডিংটনকে বলা হল, “ আপনি সহ মোট তিনজন ব্যক্তি আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব বুঝতে পারে ”। একথা বলার পর এডিংটন কিছুক্ষন কোন কথা বললেন না। তখন সবার মনে হয়েছিল, এডিংটন বুঝি বিনয় দেখিয়ে চুপচাপ আছে। বিষয়টি বুঝতে পেরে এডিংটন বলল, “ আসলে আমি ভেবে পাচ্ছিনা, তৃতীয় ব্যক্তিটি কে ? ” ।
image001
চিত্রঃ আলবার্ট আইনস্টাইনের ডেস্ক।

এডিংটনের পরবর্তী সময়ের কারো মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, কেমন সেই তত্ত্ব, আইনস্টাইনের মত লোকও যার সমাধান করতে চেয়ে কোন সুবিধা করতে পারেন নি ! তিনি যে তত্ত্বের জন্য তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করে গেছেন তার নাম , ইউনিফাইড ফিন্ড থিওরি(Unified Field Theory) বা “সমন্বিত ক্ষেত্র তত্ত্ব” । তিনি এমন একটি তত্ত্ব গঠন করতে চেয়েছিলেন, যা প্রকৃতির জানা সকল বল ও ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে পারে; এমন একটি সমীকরণ, যা দিয়ে প্রকৃতির সবকিছু বর্ণনা করা যায়। আইনস্টাইনের বিশ্বাস ছিল, এমন একটি তত্ত্ব অবশ্যই আছে, যা দিয়েই প্রকৃতির সবকিছু বর্ণনা করা যাবে। কিন্তু সে সময়ের বিজ্ঞানীরা তার এই চিন্তাকে তেমন একটা গুরুত্ব দেননি। তারা মনে করেছিল, এমন কোন তত্ত্বের সন্ধান করা সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই না।

আসলে আইনস্টাইন ছিলেন তার সময়ের চেয়ে অনেক অগ্রগামী ।তার সময়ের বিজ্ঞানীরা সে সময় এমন একটি তত্ত্বের গুরুত্বই বুঝতে পারে নি। কিন্তু আইনস্টাইন মারা যাবার দশক দুয়েক পরেই বেশ কিছু বড়সর পরিবর্তন আসে। ষাটের দশকের শেষের দিকে বিজ্ঞানীরা এমন একটি তত্ত্বের প্রয়োজন অনুভব করেন। তখন নতুন নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে পরমানুর জগত ও মহাকাশের অনেক অজানা রহস্য উন্মোচিত হতে থাকে। এসময় তাদের প্রধান লক্ষ হয়ে দ্বারায় এমন একটি তত্ত্ব নির্মাণ করা, যা প্রকৃতির সবগুলো বলকে একিভূত করতে পারে। মূলধারার গবেষকরা বুঝতে পারেন, প্রকৃতিতে যে চারটি মৌলিক বল আছে তাদের একীভূত না করতে পারলে নতুন নতুন সমস্যার সমাধান করা সম্ভব না। আর প্রকৃতিকেও বোঝা সম্ভব না। আইনস্টাইনের স্বপ্নের “ ইউনিফাইড ফিন্ড থিওরি ” তখন বিজ্ঞানীদের বাস্তব প্রয়োজন হয়ে দ্বারায়।

রহস্যময় গুপ্ত পদার্থ ও রহস্যময় শক্তি

কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়, আমাদের মহাবিশ্বের সবকিছু কি দিয়ে গঠিত? তাহলে সবাই বলবে, কেন পরমাণু দিয়ে গঠিত! যারা বিজ্ঞান সম্পর্কে অল্পকিছু জানে তারা বলবে- ইলেকট্রন , প্রোটন আর নিউট্রন দিয়ে সকল পরমানু গঠিত, তাই সবকিছুই এই ইলেকট্রন-প্রোটন-নিউট্রন দিয়েই গঠিত। এতসব কথা আমরা জেনেছি সেটি কিন্তু খুব বেশি দিন আগে নয়। দার্শনিক এরিস্টটল(৩৮৪-৩২২ খ্রিঃপূঃ) মনে করতেন, আমাদের মহাবিশ্বে যা কিছু আছে তা সবই “মাটি”, “পানি”, “আগুন” আর “বাতাস” এই চারটি মৌলিক জিনিস দিয়ে গঠিত। তিনি এমনই প্রভাবশালী দার্শনিক ছিলেন যে, তার মৃত্যুর পরও প্রায় দুই হাজার বছর মানুষ এই কথাই মেনে নিয়েছিল। তবে ভিন্ন মত যে একেবারেই ছিলনা তা নয়।ডেমোক্রিটাস নামে এক গ্রিক মনে করতেন ব্যাপারটি এমন নয়। তিনি ভাবতেন, কোন পদার্থকে ভাঙ্গলে দেখা যাবে এরা খুব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কনা দিয়ে গঠিত *। তিনি আরও প্রস্তাব করেন যে, এসব কনাকে আর ভাঙ্গা যাবে না।তিনি এসব অবিভাজ্য কনার নাম দেন এটম বা পরমানু। কিন্তু এরিস্টটল বা ডেমোক্রিটাস কারও কথার পক্ষেই কোন প্রমান ছিল না।

১৯১১ সালে আর্নেস্ট রাদারফোর্ড নামে একজন পদার্থবিজ্ঞানী পরিক্ষা-নিরীক্ষা করে একটি পরমানু মডেল প্রস্তাব করেন ।পরবর্তীতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেই মডেলের উন্নতি করা হয়। আর একথাও প্রতিষ্ঠিত হয় যে, সকল পদার্থই পরমানু দিয়ে গঠিত; তবে এসব পরমানুও অবিভাজ্য নয়। পরমানুগুলো ইলেকট্রন, প্রোটন আর নিউট্রন নামে মৌলিক কনিকা দিয়ে গঠিত।

প্রকৃতিকে প্রথমে যতটা সহজ সরল বলে ভাবা হয়েছিল, দেখা গেল ব্যাপারটা মোটেই সেরকম না। বিজ্ঞানীরা দেখতে পেলেন, কোন সহজ উপায়েই পরমানুর ভেতরে থাকা অতি-পারমানবিক কনাদের আচরন ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। গবেষণা চলতেই থাকল। পরবর্তী গবেষণায় বেরিয়ে এল আরও আশ্চর্য তথ্য। প্রোটন, নিউট্রনকে আমরা যেমন অবিভাজ্য ও মৌলিক কনা বলে ভেবে এসেছি, সেগুলো আসলে অবিভাজ্য না। প্রোটন ও নিউট্রনগুলো “কোয়ার্ক” নামে এক ধরনের কনা দিয়ে গঠিত। তিনটি কোয়ার্ক মিলে তৈরি হয় একটি প্রোটন বা নিউট্রন। পার্টিক্যাল এক্সিলারেটরের ভিতর পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে ভেঙ্গে আরও অনেক অস্থায়ী অতিপারমানবিক কনিকার অস্তিত্ব পাওয়া গেল। তবে এরা সবাই কিন্তু পদার্থের কনিকা। এটুকু আমরা জানতে পারলাম, সকল প্রকার পদার্থ পরমাণু দিয়েই গঠিত আর এসব পরমাণু বিভিন্ন অতি-পারমানবিক কনা দিয়ে দিয়ে তৈরি।

ব্যাপারটি কিন্তু এমন না যে, শুধু আমাদের পৃথিবী বা অন্য গ্রহগুলো এই মৌলিক কনিকা দিয়ে গঠিত। বিজ্ঞানীরা দেখলেন আমাদের সৌরজগৎ, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি এমনকি মহাবিশ্বে যত নীহারিকা,ধুমকেতু বা মহাজাগতিক ধূলিকণা আছে তার সবকিছুই আমাদের চেনাজানা পদার্থ দিয়েই গঠিত। দূর মহাকাশের কোন নক্ষত্র থেকে আসা আলোর প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বলে দিতে পারেন সেই নক্ষত্রটিতে কি কি উপাদান আছে।তার মানে দাঁড়াচ্ছে, আমাদের মহাবিশ্বে যা কিছু আছে তা মুলত এই পরমাণু বা তার অতি-পারমাণবিক কনিকার সমন্বয়েই গঠিত।

সবকিছু ঠিকই ছিল। কিন্তু ১৯৭০-এর দশকের প্রথম দিকে, ভেরা রুবিন নামে একজন বিজ্ঞানী আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ঘূর্ণন নিয়ে গবেষণা করার সময়, একটি আশ্চর্য জিনিস দেখতে পেলেন। রুবিন দেখলেন, আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী নক্ষত্রগুলোর গতি যেমন হবার কথা, সেগুলোর গতি মোটেই সে রকম না। মূলত নিউটনের মহাকর্ষ সুত্র অনুসারে গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে যত দূরে যাবার কথা, নক্ষত্রগুলোর গতিও তত কমে যাওয়া উচিত। কারন কোন বস্তু থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, মহাকর্ষ বলের পরিমান ততই কমতে থাকে। তাই একটি নক্ষত্র গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে যত দূরে হবে, তার গতিবেগও তত কম হবে। আমাদের সৌরজগতের ক্ষেত্রে কিন্তু সেটাই ঘটে। আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্রে আছে সূর্য। আর যে গ্রহ সূর্য থেকে যত বেশি দূরে, তার গতিবেগও তত কম। তাই আমাদের গ্যালাক্সির ক্ষেত্রেও এমনই হবার কথা।কিন্তু রুবিনের পর্যবেক্ষণ থেকে দূরবর্তী নক্ষত্রগুলোর গতিবেগ তো কম পাওয়া গেলই না, বরং দেখা গেল একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের পর সব নক্ষত্রের বেগই প্রায় একই রকম। প্রথমে মনে করা হয়েছিল রুবিনের গননায় হয়ত কোন ভুল আছে। কিন্তু পরে দেখা গেল শুধু আমাদের মিল্কিওয়েই না, আমাদের পাশে এন্ড্রমিডা নামে যে সর্পিল গ্যালাক্সিটি আছে তার অবস্থাও একই রকম। এই রহস্যময় গতি লক্ষ্য করার পর বিজ্ঞানীরা এই বিষয়টি নিয়ে আরও অনেক অনুসন্ধান করতে থাকলেন। পরবর্তীতে গ্যালাক্সির ঘূর্ণন, এদের ছড়িয়ে পরার বেগ, গ্যালাক্সি ক্লাস্টার, মহাকর্ষীয় লেন্সিং , মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরন ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ করে বোঝা গেল, গ্যালাক্সির ভিতরে আমাদের চেনাজানা পদার্থের বাইরেও বিপুল পরিমাণ রহস্যময় কোন পদার্থ আছে। এদের নাম দেওয়া হল “ডার্ক ম্যাটার” বা গুপ্ত পদার্থ।

ডার্ক ম্যাটার শুধু নামেই ডার্ক না, এরা আসলেই পুরোপুরি অদৃশ্য। কোন ভাবেই এদের পর্যবেক্ষণ করার কোন উপায় নেই।তাদের উপস্থিতি জানার একমাত্র উপায় হল তাদের মহাকর্ষ বল। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে যে পরিমাণ ডার্ক ম্যাটার আছে তাদের মহাকর্ষ বল এতো বেশি যে, আমাদের গ্যালাক্সির সমস্ত গ্রহ নক্ষত্র মিলিয়ে তার দশ ভাগের এক ভাগও না(৯৫% ডার্ক ম্যাটার, ৫% পদার্থ)। তাহলে বোঝা যাচ্ছে কি বিশাল পরিমাণ ডার্ক ম্যাটার লুকিয়ে আছে আমাদের মহাবিশ্বে। বিজ্ঞানীদের বর্তমান গবেষণা বলছে আমাদের মহাবিশ্বের মোট শক্তি ও পদার্থের ২৩% ই হল এই ধরনের ডার্ক ম্যাটার। বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে গ্যালাক্সির মধ্যে কোথায় কোথায় এই ডার্ক ম্যাটার আছে তার একটি ত্রিমাত্রিক মানচিত্রও তৈরি করে ফেলেছেন।
image002
চিত্রঃ ডার্ক ম্যাটারের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র ।

যদিও বিজ্ঞানীদের গননা অনুসারে বর্তমান মহাবিশ্বের মোট ভরের প্রায় ২৩% এই রহস্যময় গুপ্ত পদার্থ, কিন্তু তারা এটাও ধারনা করছেন- মহাবিশ্ব সৃষ্টির শুরুর সময়গুলোতে এই ডার্ক ম্যাটারের পরিমাণই ছিল বেশি, প্রায় ৮০ থেকে ৯০ ভাগ। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে মহাবিশ্ব সৃষ্টির শুরুর দিকের সবকিছু ভাল মত বোঝার জন্য এই রহস্যময় জড় পদার্থগুলোর আচরন বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।

এত গেল রহস্যময় গুপ্ত পদার্থের কথা। কিন্তু সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা আরও এক ধরনের রহস্যময় বিষয় আবিষ্কার করেছেন। আইনস্টাইনের দেওয়া সুত্র অনুযায়ী বিজ্ঞানীরা জানেন যে, মহাকর্ষ বল ক্রিয়াশীল থাকলে আমাদের মহাবিশ্বের প্রসারনের তীব্রতা এক সময় কমে আসবে। এই প্রসারন কতটা দ্রুত বাড়ছে বা কমছে তার উপরই নির্ভর করছে আমাদের মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ। ১৯৯৮ সালে বিজ্ঞানীদের দুটি ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ, সুপার নোভা বিস্ফোরণ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তাদের গবেষণায় এক আশ্চর্য বিষয় বেরিয়ে আসল। তারা লক্ষ্য করলেন আমাদের মহাবিশ্বের প্রসারনের হার তো কমছেই না বরং দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে ! মহাকর্ষ বল সবসময়ই আকর্ষনধর্মী। আর সে কারনেই মহাকাশের ছড়িয়ে থাকা হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম তাদের নিজেদের মধ্যে আকর্ষণের কারনে নিজেদের উপরই চুপসে পড়ে। এভাবে চুপসে যাবার ফলে তাদের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, ফলে তাপমাত্রাও বাড়তে থাকে। এই তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে যখন নিউক্লীয় বিক্রিয়া হবার মত উপযোগী তাপমাত্রায় পৌছায়, তখনই জন্ম নেয় নক্ষত্র। আমাদের সূর্যও ঠিক এভাবেই মহাকাশের জমে থাকা হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের ধূলিকণা থেকে জন্ম নিয়ে এখন একটি সাম্যাবস্থায় আছে।এর হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের মহাকর্ষ শক্তির প্রভাবে নিজের ভিতরে চুপসে যাচ্ছে, আর ভিতরের ঘটতে থাকা নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া, সব কিছুকে বাইরের দিকে ঠেলে একে সাম্যাবস্থায় রেখেছে। নিউক্লীয় বিক্রিয়ার ভর ক্ষয় হতে হতে যখন মহাকর্ষের টান কমে যাবে, তখন ভিতরের নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার ফলে তৈরি হওয়া শক্তির পরিমাণ যাবে অনেক বেড়ে। তাই সে তখন আর সাম্যাবস্থায় থাকবে না। সুপার নোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে তার জ্বলজ্বলে জীবন শেষ করে ফেলবে।

আবার কোন বস্তুকে পৃথিবী থেকে উপরে ছুরে দিলে দেখা যায়, ধীরে ধীরে তার বেগ কমে আসছে। বস্তুটির উপর মহাকর্ষ বল কাজ করে বলেই তার বেগ কমতে থাকে। আমাদের মহাবিশ্বের সব বস্তুগুলোও একটি বিস্ফোরণের ফলে চারদিকে ছুটে যেতে শুরু করেছিল। আর এই মহাকর্ষের কারনেই মহাবিশ্বের প্রসারণে হারও ধীরে ধীরে কমে আসা উচিত। কিন্তু বিজ্ঞানীরা দেখলেন ব্যাপারটি আসলে তেমন ঘটছে না। কোন এক রহস্যময় শক্তির প্রভাবে মহাকর্ষের আকর্ষণ কাটিয়ে, মহাবিশ্ব তার প্রসারণের হার বাড়িয়েই চলেছে। পরবর্তীতে আরও পর্যবেক্ষণ ও পরিক্ষা করে বিজ্ঞানীরা এই রহস্যময় শক্তির ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন। এই রহস্যময় শক্তির নাম দেওয়া হয়েছে “ডার্ক এনার্জি” । সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হল, কোন ভাবেই এই “ডার্ক এনার্জি” বা গুপ্ত শক্তির প্রকৃতি ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। আরও অবাক করা তথ্য হল, আমাদের মহাবিশ্বের ৭৩% ই গঠিত এই ডার্ক এনার্জি দিয়ে !

image003
চিত্রঃ ডার্ক এনার্জির কারনে মহাবিশ্বের প্রসারণের হার দিন দিন বাড়ছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি মহাবিশ্বের ২৩% “ডার্ক ম্যাটার” আর ৭৩% “ডার্ক এনার্জি” হয় তাহলে পদার্থের পরিমাণ কতটুকু ?
বিজ্ঞানীদের বর্তমান পর্যবেক্ষণ ও গননা অনুযায়ী মহাবিশ্বের মোট পদার্থ ও শক্তির ৭৩% ই হল “ডার্ক এনার্জি”, ২৩% “ডার্ক ম্যাটার”, ৩.৬% মুক্ত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম(মহাজাগতিক ধূলিকণা) ও ০.৪% পদার্থ(যা দিয়ে উপগ্রহ,গ্রহ, নক্ষত্র,ধুমকেতু ইত্যাদি গঠিত )।

image004

চিত্রঃ মহাবিশ্বের কেবন শতকরা ৪% ভাগ আমাদের চেনাজানা পদার্থ দিয়ে গঠিত। আর বাদবাকি সবই, “ডার্ক ম্যাটার” ও “ডার্ক এনার্জি” ।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমরা যাকে পদার্থ বলি তা মহাবিশ্বের মাত্র ৪ শতাংশ। আর বাদবাকি ৯৬% শতাংশই রহস্যময় গুপ্ত পদার্থ আর গুপ্ত শক্তি দিয়ে ভর্তি। আসলে আমরা মহাবিশ্বের দিকে তাকিয়ে যেসব জায়গাকে শুন্য বলে ভাবছি সেগুলো আসলে আক্ষরিক অর্থেই শুন্য না। আমাদের চেনা জানা পদার্থ দিয়ে তৈরি গ্রহ-নক্ষত্রগুলোই বরং এই অজানা বস্তুগুলোর মধ্যে ছোট্ট দ্বিপের মত নগন্য কিছু !

কারো কৌতূহলী মনে যদি প্রশ্ন জাগে ডার্ক ম্যাটার আসলে কেমন ? কেমন এই রহস্যময় শক্তি ? তাহলে উত্তর দেওয়াটি কিন্তু একটু কঠিন হবে। কারন গতানুগতিক পদার্থবিদ্যার সাহায্যে এর উত্তর দেওয়া মুশকিল।পদার্থবিজ্ঞান এতদিন শুধু আমাদের চেনাজানা পদার্থ নিয়েই কাজ করে এসেছে। তাই আমাদের এমন একটি তত্ত্ব প্রয়োজন, যা আইনস্টাইনের “ইউনিফাইড ফিন্ড থিওরির” মত এই মহাবিশ্বের সকল পদার্থ ও শক্তির ব্যাখ্যা করতে পারে। । পদার্থবিজ্ঞান যে এসব গুপ্ত পদার্থ ও শক্তির ব্যাখ্যা দিতে চেস্টা করছে না এমন নয়, কিন্তু গতানুগতিক তত্ত্ব দিয়ে এসব পদার্থের ব্যাখ্যাগুলো মোটেই আশানুরূপ নয়।

আইনস্টাইন তার আপেক্ষিক তত্ত্বের সফলতা নিয়ে খুশি ছিলেন না। তার ইচ্ছা ছিল প্রকৃতিকে আরও গভীর ভাবে বুঝতে পারা। প্রায় সময়ই বলতেন, তিনি ঈশ্বরের মন বুঝতে চান। তার সময়ে জানা দুটি মৌলিক বলকে ব্যাখ্যা করার জন্য দুটি তত্ত্ব ছিল। তড়িৎ-চুম্বক বলকে ব্যাখ্যা করার জন্য ছিল ম্যাক্সওয়েল তড়িৎ-চুম্বক তত্ত্বের সমীকরন। এই সমীকরণগুলো স্থানের যেকোনো বিন্দুতে এই বলের প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করতে পারত। আর মহাকর্ষ বল ও স্থান-কালের প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করার জন্য ছিল আইনস্টাইনের নিজের “আপেক্ষিকতার সাধারন তত্ত্ব”। কিন্তু এই দুটি তত্ত্বকে কোনভাবেই একটির সাথে অন্যটিকে সমন্বিত করা যাচ্ছিল না। দুটি তত্ত্বই পৃথকভাবে খুবই সফল, কিন্তু দুটিকে এক করার কোন উপায় তিনি খুজে পাচ্ছিলেন না। আইনস্টাইনের বিশ্বাস ছিল এই দুটি তত্ত্বকে এক করতে পারলে আমরা আরও মৌলিক কোন তত্ত্ব পাব।যার সাহায্যে প্রকৃতির আরও গভীরের প্রবেশ করা যাবে। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, সেই তথাকথিত “ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরি” গঠন করা সম্ভব হলে তিনি ঈশ্বরের মন বুঝতে পারবেন। আমরা পরে জানব তার সময়ে এটি কোনভাবেই সম্ভব ছিল না।

এখন প্রশ্ন হল, আমাদের হাতে কি এমন কোন একক তত্ত্ব নেই যা ডার্ক ম্যাটারের মত অজানা বস্তু সহ সকল প্রকার পদার্থ ও শক্তির ব্যাখ্যা দিতে পারে? উত্তর হল হ্যাঁ। আমাদের কাছে এমন একটি তত্ত্ব আছে; আর সেটিই হল- স্ট্রিং থিওরি(String Theory) বা তার তত্ত্ব। স্ট্রিং থিওরিই একমাত্র তত্ত্ব যা প্রকৃতির সকল বস্তুকনার আচরণ ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি প্রকৃতিতে বিদ্যমান চারটি মৌলিক বলকেও একীভূত করতে পারে।
এই তত্ত্ব শুধু সকল প্রকার পদার্থ ও শক্তিকে বর্ণনাই করে না, পাশাপাশি এই মহাবিশ্ব কেন আছে তারও উত্তর দেয়। আরেকভাবে বললে বলা যায়, স্ট্রিং থিওরি আমাদের “বিগ ব্যাঙ” বা মহাবিশ্ব সৃষ্টিরও আগে নিয়ে যায়। এই তত্ত্ব সেইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে চায়, হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ যার খোজ করে যাচ্ছে। কেন এই মহাবিশ্ব ? কেন কোনকিছু না থাকার বদলে কিছু আছে? এই সিরিজে আমি দেখানোর চেস্টা করব স্ট্রিং থিওরির এমন সব বৈশিষ্ট্য আছে যাতে এটি নিজেকে সবকিছুর তত্ত্ব বা “Theory of Everything” বলে দাবি করতে পারে। আর এটিও বলতে পারে কেন এই মহাবিশ্ব ?
*ডেমোক্রিটাস ছাড়াও ভারতীয় দার্শনিক কনাদ মনে করতেন, প্রকৃতির সব বস্তুকনিকাই অবিভাজ্য কণিকা দ্বারা গঠিত।

বিঃ দ্রঃ এই লিখাটি মূলত স্ট্রিং থিওরি নিয়ে একটি বইয়ের জন্য লিখা। বইটি ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হবে। পরবর্তী পোস্টগুলো সিরিজ আকারে এখানে দেওয়া হবে।

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

লিখেছেন হিমাংশু কর

আমি হিমাংশু কর, বিজ্ঞান ভালবাসি। জনপ্রিয় বিজ্ঞান ও প্রাচীন সভ্যতা নিয়ে লেখালেখি করি। ফেসবুকে পাবেন এখানে, https://www.facebook.com/himangsu.kar ।

হিমাংশু কর বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 2 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. হিমাংশু কর Reply

    আপনার আগ্রহের জন্য ধন্যবাদ। 🙂 বইটি মূলত স্ট্রিং থিওরি নিয়ে। তবে স্ট্রিং থিওরি যেহেতু একটি ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরির মত- তাই এখানে একটি সমন্বিত ক্ষেত্রে তত্ত্ব বিজ্ঞানীদের কেন দরকার, সে বিষয়েও অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর এই তত্ত্ব, কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও আপেক্ষিক তত্ত্বের বিরোধ মিটিয়ে মহাকর্ষের জন্য একটি কোয়ান্টাম তত্ত্ব গঠন করতে পারে যা এই সময়ের পদার্থবিজ্ঞানের হলি গ্রেইল। স্ট্রিং তত্ত্ব বর্ণনা করার আগে এখানে- আপেক্ষিক তত্ত্ব, কালাজু ক্লেইন তত্ত্ব, কোয়ান্টাম মেকানিক্স সহ পদার্থবিজ্ঞানের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। বইটির নাম- স্ট্রিং তত্তঃ আপেক্ষিক তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সমন্বয়কারী তত্ত্ব ।

  2. হিমাংশু কর Reply

    হ্যাঁ বইমেলাতে তাম্রলিপির স্টলে পাওয়া যাবে। স্টল নংঃ ২৯৯-৩০১ ।

  3. qeem37 Reply

    ডার্কম্যাটারের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র!!!

আপনার মতামত