পাখি…ভাবলেই প্রথমে যেই কথাটা মনে হয় তা হলো উড়াউড়ি আর আকাশ। যুগে যুগে পাখি এবং তার উড়াউড়ি ভাবিয়েছে মানুষকে এবং এখনো ভাবায়। সেই লালনের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি…’ কিংবা শিরোনামহীনের ‘একা পাখি বসে আছে…’ পাখি নিয়ে কত কবিতা, কত গল্প, কত গান। আচ্ছা পোকারাও তো উড়ে, কিন্তু পোকাদের নিয়ে কি এত ভাবনা মানুষের ছিল? আমার মনে হয়, পাখিদের নিয়ে মানুষের ভালোলাগার কারন হল এর সৌন্দর্য। আর পাখির সৌন্দর্যের অত্যন্ত গুরত্বপূর্ন মাত্রা হল এর বর্ণবিন্যাস। এই লেখাটি পাখির রং নিয়ে সাম্প্রতিক একটা খবর নিয়ে। আকাশের সাথে পাখির মাখামাখি নিয়ে।

blue_bird
অনেকদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের জানা ছিলো, পাখিরা কিভাবে তাদের লালচে কিংবা হলদে রং ধারন করে। এর কারন পাখিদের খাবারের বিভিন্ন বর্ণকণিকা তথা পিগমেন্ট। তবে তাদের প্রশ্ন ছিল, কিভাবে নীল রংটা আসে তাহলে? তারা জেনেছিলেন এটা খাবার থেকে আসতে পারেনা। কারন একে তো প্রকৃতিতে নীল বর্ণকণিকা বেশ দূর্লভ আবার যেসব খাবারে থাকে যেমন ব্লু-বেরী সেগুলো হজমের সময়ই নষ্ট হয়ে যায়। তবে ইদানিং তারা একটা তত্ব দিয়েছেন, যে কারনে আকাশ নীল-একই কারনে পাখির পালক নীল! আকাশ কেন নীল? সূর্যের থেকে নানান বর্ণের আলো আসে, এর মধ্যে নীল বর্ণের আলোর তরংগদৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম, তাই বিক্ষেপন সবচেয়ে বেশি। তাই পরিষ্কার মেঘমুক্ত আকাশ নীল দেখায়।

রিচার্ড প্রাম, ইয়ালের একজন পক্ষীবিশারদ এবং তার দল শত শত নীল বর্ণের পাখিদের পালক নিয়ে গবেষনা করেন। তিনি দেখতে পান, নীল পালকের বিকাশের সাথে সাথে অসাধারন একটা ঘটনা ঘটে। পালকের কোষের ভেতরে সূত্রাকার কেরাটিন অণু পানি থেকে আলাদা হয়ে যায়, ঠিক যেন ভিনেগার থেকে তেল আলাদা হয়। কোষগুলো পরিণত হয়ে শুকিয়ে গেলে পানির অংশটা বাতাস দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়ে ক্ষুদ্রাকার বুদবুদ যুক্ত কেরাটিন প্রোটিনের গঠন তৈরি হয়। যা অনেকটা স্পঞ্জের মত। সাদা আলো যখন পালকে এসে পড়ে তখন কেরাটিনের বিন্যাস লাল এবং হলুদ আলোকে নাকচ করে দেয় কিন্তু বায়ুর বুদবুদ নীল আলোকে বিবর্ধিত করে প্রতিফলিত করে এবং আমরা নীল পালক দেখতে পাই। বিজ্ঞানীদের ভাষায় এই বুদবুদকে বলা হচ্ছে ন্যানোস্ট্রাকচার এয়ার পকেট। তাই বিজ্ঞানীরা এখানে নীলকে বলছেন স্ট্রাকচারাল কালার, যেখানে অন্যগুলো পিগমেন্টেড কালার কেননা এটা সৃষ্টি হচ্ছে পালকের ত্রিমাত্রিক গঠনের সাথে আলোর মিথস্ক্রিয়ার কারনে। এই বায়ুর বুদবুদের বিভিন্ন আকার-আকৃতির কারনে বিভিন্ন শেডের নীল রং তৈরি হয়।

এই ব্যাপারটা কাজে লাগিয়েই হার্ভার্ডের ভিনোথান মনোহরন চেষ্টা করছেন গঠনের বিন্যাসের বৈচিত্র্য এনে নীল ছাড়াও অন্যান্য রং তৈরি করতে। যা কিন্ডলের মত ব্যাকলিট ছাড়া রিফ্লেক্টিভ ডিসপ্লেতে ব্যাবহার করা যাবে।

বব ডিলান যথার্থই বলেছিলে, No one is free, even birds are chained to the sky. তবে আকাশ যে শুধু পাখিদের বেধেই রাখেনা, রঙ্গের বুদ্ধিও দেয় ভাবতেই আশ্চর্য লাগে।

তথ্যসূত্রঃ

১। Why Are Some Feathers Blue?, Helen Fields, Smithsonian Magazine.
২। Light trickery makes bird feathers blue but not red, New Scientist Magazine.

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

লিখেছেন রুহশান আহমেদ

আমি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক কনটেন্ট তৈরির একজন স্বাধীন স্বেচ্ছাসেবক। শাবিপ্রবি থেকে জিন প্রকৌশল ও জৈব প্রযুক্তি বিষয়ে একটি স্নাতক ডিগ্রি বাগানোর চেষ্টায় আছি।

রুহশান আহমেদ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 35 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

আপনার মতামত