ছবি: আনন্দ ভার্মা

১.
একটা গুবরেপোকাকে জিন্দালাশ হতে দেখা বিস্ময়ের, বেদনারও। গুবরেপোকা সুক্ষ্ম জীব, স্বভাবটাও খাইখাই ধরনের। গুবরেপোকা তার জীবনে কয়েক হাজার এফিডপোকা সাবাড় করে ফেলে। শিকার খোঁজার জন্য গুবরেপোকা ওর এন্টেনা নাড়াচাড়া করে বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ সনাক্ত করার জন্য। গাছেরা এফিডের মতো তৃণভোজি পতঙ্গ দিয়ে আক্রান্ত হলে এই রাসায়নিকগুলো নিঃসৃত করে। একবার এই রাসায়নিকের সন্ধান পেলে গুবরেপোকা এমন সব অণু খুঁজতে থাকে যেগুলো শুধু এফিডরাই ছড়ায়। এসব অণু পেলেই গুবরেপোকা হামাগুড়ি দিয়ে এফিডদের আক্রমণ করে, খাঁজ কাটা চোয়াল দিয়ে চিরে ফেলে এফিডদের দেহ।

গুবরেপোকারা তাদের প্রায় সব শত্রু থেকে সুরক্ষিত। ওদের দেহের লাল-কালো গম্বুজাকৃতির বহিরাবরণ আমাদের চোখে সুন্দর লাগলেও আসলে সেটা প্রতিপক্ষ শিকারীদের জন্যে সতর্কবার্তা — “আখেরে কিন্তু ভালো হবে না”। যখন কোন পাখি কিংবা অন্য কোন প্রাণী আক্রমণ করে তখন গুবরেপোকার পায়ের সংযোগস্থল থেকে একরকম বিষাক্ত পদার্থ ঝরে পড়ে। আক্রমণকারী সেই তিক্ত স্বাদ পেয়ে মুখ থেকে পোকাটাকে ফেলে দেয়। এই দুর্ঘটনা আক্রমণকারীর জন্য পরবর্তীকালে একটা শিক্ষা হিসেবে কাজ করে — “লাল-কালো গম্বুজ-মতোন পোকাটা থেকে দুরে থাকতে হবে”।

গুবরেপোকা নিজেই শিকারী পোকা, যে কি না আবার অন্য শিকারী থেকে সুরক্ষিত। এ থেকে মনে হবে পোকাদের পক্ষে যত ভালোভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব, গুবরেপোকারা তত ভালোভাবেই বেঁচে থাকে। তবে জ্যান্ত-গুবরেপোকার দেহে ডিম পাড়া একরকম বোলতাদের কারণে গুবরেপোকারা সবসময় আদর্শ পোকার জীবন-যাপন করতে সক্ষম হয় না।

এরকম বোলতাদের মধ্যে একটি প্রজাতী হলো ডিনোক্যাম্প্যাস ককিনেলা (Dinocampus coccinellae)। এরা আকারে গুবরেপোকার চেয়েও ছোট। ডিম পাড়ার সময় হলে এরা উড়ন্ত অবস্থা থেকে নেমে কোন গুবরেপোকার কাছে যায়। তারপর  ক্ষিপ্রগতিতে গুবরেপোকার তলদেশে তীক্ষ্ম শুঢ় ঢুকিয়ে দেয়। বেচারা গুবরেপোকার দেহে সে একটি ডিমের সাথে সাথে কিছু রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে দেয়। তারপর সে ডিম ফুটে বেরুনো লার্ভা ওই গুবরেপোকার দেহগহ্বরের বিভিন্ন দ্রব্য-পদার্থ খেয়ে বেঁচে থাকে।

ভেতর থেকে গুবরেপোকা নিঃশেষিত হয়ে যেতে থাকলেও বাইরে থেকে একে দেখে মনে হবে কোন পরিবর্তনই হয় নি। গুবরেপোকা এফিড শিকার থেকে বিরত হয় না। তবে শিকার হজম করার পর যে পুষ্টি তৈরি হয় তার উপরই নির্ভর করে বেঁচে থাকে পরজীবি লার্ভা। কয়েক সপ্তাহ পর বোলতা লার্ভার সময় হয় জীবনচক্রের পরবর্তী দশায় বিকশিত হওয়ার। তখন সে গুবরেপোকার বহিঃকঙ্কাল, মানে দেহের বাইরের শক্ত আবরণ ভেদ করে বের হয়ে আসে।

গুবরেপোকার দেহ এখন পরজীবি বোলতা-লার্ভা থেকে মুক্ত। কিন্তু পোকাটি যেন কোন এক রাসায়নিক যাদুর মোহে মুগ্ধ হয়ে থাকে। বোলতার লার্ভা একটি সিল্কের গুটি (কোকুন) তৈরি করে ফেলে। আর গুবরেপোকা ওই গুটির উপর বসে থাকে অবিচল হয়ে। যেন ধ্যানমগ্ন বুদ্ধ।

বোলতার দিক দিয়ে দেখলে বিষয়টা কিন্তু অত্যন্ত উপকারী। এই বোলতার (ডিনোক্যাম্প্যাস ককিনেলা) গুটি অত্যন্ত ভঙ্গুর। অন্যান্য কীটমাকড় খুব তৃপ্তির সাথে এই গুটি খেয়ে ফেলবে। কিন্তু এই খাদকেরা গুটির দিকে অগ্রসর হলে এর উপরে বসে থাকা গুবরেপোকা তার ধ্যান ভেঙে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঝাড়া দিয়ে উঠবে। তাতে গুটিখাদক কীটপতঙ্গরা ভয় পেয়ে ফেরত যাবে। তার মানে গুবরেপোকা আসলে বোলতা-গুটির দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করছে। বিশ্বস্ততার সাথে এই দায়িত্ব সে পালন করবে প্রায় এক সপ্তাহের মতো — যখন গুটি কেটে পূর্ণাঙ্গ বোলতা বের হয়ে আসবে, উড়াল দেবে আকাশে।

ঠিক তখনই বেশিরভাগ জিন্দালাশ -গুবরেপোকা মারা  যায়। গুবরেপোকা-মনের মহান পরজীবি-অধিপতির প্রতি তাদের কর্তব্যপালন শেষ হয়েছে যে।

 

২.
গুবরেপোকাদের জিন্দালাশ হয়ে বেঁচে থাকার দৃশ্য কোন ভৌতিক চলচিত্রের গল্পলেখকের উর্বর মস্তিষ্ক থেকে বের হয় নি। উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় বোলতারা সুন্দরী গুবরেপোকাদের জিন্দালাশ বানাচ্ছে অহরহ। এমন নয় যে শুধু গুবরেপোকারাই এই দূর্ভাগ্যের শিকার হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা পতঙ্গ, মাছ কিংবা স্তন্যপায়ীপ্রাণীর অজস্র প্রজাতীর মাঝে একই ঘটনা প্রত্যক্ষ করছেন। বেচারা পোষকেরা তাদের মাঝে ভর করা পরজীবিদের প্রতি নানারকমের কর্তব্যপালন করে থাকে — এমনকি যদি এ কর্তব্যপালন নিজেদেরকে মৃত্যুর মুখে ফেলে দেয় তবুও। তাই প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের জন্য একই প্রশ্ন বার বার উঠে আসে: কেন কোন প্রাণী পরজীবির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার বদলে নিজের পরজীবি-নিপীড়কের বেঁচেবর্তে থাকা নিশ্চিত করার জন্য দরকারী সব কিছু করে?

পরজীবি গুটির দেহরক্ষী হওয়া তাদের পোষকের জন্য অজস্র সাম্ভাব্য দায়িত্বের মধ্যে একটিমাত্র উদাহরণ। যেমন ভ্রমরকে সংক্রমিত করার মাধ্যমে এক ধরনের মাছি পোষক-ভ্রমরদের দিয়ে শরৎকালে মাটির মাঝে গর্ত করায়। বছরের ওই সময়টা ঠিক তখনই যখন আর কিছুদিন পরেই মাছিটি গুটিপোকা তৈরি করবে। মাটির মধ্যে গর্তে গুটিপোকা যে শুধুমাত্র সাম্ভাব্য শিকারীদের হাত থেকেই বাঁচে তাই নয়; রক্ষা পায় শীতের হিম থেকে। কোস্টারিকায় লিউকাজে আর্গইরা (Leucauge argyra) নামের একধরনের পেটমোটা মাকড়শা হাইমেনোএপিমেসিস আর্গিরাফ্যাগা (Hymenoepimecis argyraphaga) নামের অন্যধরনের বোলতা-পরজীবির চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে আরো অসংযত হয়ে পড়ে। বোলতা প্রথমে এর ডিম মাকড়শার দেহে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দেয়। ডিম থেকে লার্ভা বের হলে তা মাকড়শার তলদেশে কয়েকটি ছিদ্র করে আর সেই ছিদ্র দিয়ে বেচারা মাকড়শার রক্তচুষে খায়। দুই সপ্তাহের মধ্যে যখন লার্ভা যথেষ্ট বড় হয়ে যায়, তখন মাকড়শাটা নিজেই নিজের জাল চিরে ফেলে। উড়ন্ত পতঙ্গ ধরার জন্য গোলাকার জাল বোনার বদলে মাকড়শা একেবারেই ভিন্ন নকশার জাল তৈরি করে। নতুন জালটিতে কয়েকটি মোটা সুতা একটি কেন্দ্রে এসে মিলিত হয়। অন্যদিকে পোষক মাকড়শার দেহ চুষে শেষ করে লার্ভা এবার গুটি (কোকুন) তৈরি শুরু করে। গুটি ঝুলতে থাকে নতুন বোনা জালের কেন্দ্র বরাবর। বাতাসে ঝুলতে থাকা এ ভবিষ্যত-বোলতা এভাবে সাম্ভাব্য শিকারীর হাতের নাগালের বাইরে রয়ে যায়।

পরজীবী লার্ভা আক্রান্ত মাকড়শা। কার্টুনিস্ট সারা লিটল

 

পরজীবিরা পোষেকের ভেতরে থাকার সাথে সাথে নিজেদের রক্ষা করার জন্য পোষকদের মনমেজাজ বদলে দেয় নানাভাবে। যেমন মানুষের দেহে ঢোকার আগে ম্যালেরিয়া রোগের জন্য দায়ী প্লাজমোডিয়াম (Plasmodium) নামের এক প্রোটোজোয়াকে অবশ্যই মশার দেহের ভেতর জীবনচক্রের প্রথম ধাপগুলো সম্পন্ন করতে হবে। আবার বেঁচে থাকার জন্য মশাকে অবশ্যই রক্ত খেতে হবে। কিন্তু এই আচরণ মশার দেহের ভেতরে অবস্থিত প্লাজমোডিয়ামের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ পোষক মশা রক্ত খেতে গিয়ে বিরক্ত মানুষের হাতে বাড়ি খেয়ে মারা যেতে পারে। তখন তো প্লাজমোডিয়াম জীবনচক্রের পরবর্তী ধাপে যেতে পারবে না। এই ঝুঁকি কমানোর জন্য প্লাজমোডিয়াম মশার দেহের ধাপগুলো সম্পন্ন করা অবস্থায় পোষক মশাকে কিঞ্চিৎ লাজুক করে তোলে! এ অবস্থায় মশাটি রক্ত খাওয়ার জন্য প্রতিরাতে কম সংখ্যক মানুষ খোঁজে। আর যদি রক্ত পাওয়া নাই যায় তাহলে মশাটি রক্তের খোঁজ ছেড়ে দেয় তাড়াতাড়ি , কিছুটা হতাশ হয়েই!

কিন্তু যখনই প্লাজমোডিয়াম ওর মশার মধ্যে বৃদ্ধি পেয়ে পরিপক্ব হয়ে যায়, তখন সে পোষক মশার আচরণ নিজের স্বার্থ অনুযায়ী উল্টোদিকে বদলানো শুরু করে। ফলে মশা খুব তৃষ্ণার্ত হয়ে গোঁয়ারের মতো দুঃসাহস দেখাতে শুরু করে। প্রতিরাতেই আগের চেয়ে বেশি মানুষের সন্ধান করতে থাকে মশাটি। আর পেট ভরে গেলেও বারবার মানুষকে কামড়াতে থাকে। মশাটি যদি তখন বিরক্ত মানুষের হাতের বাড়ি খেয়ে মারাও যায়, প্লাজমোডিয়ামের তখন হারানোর কিছুই নেই! কারণ এর আগেই প্লাজমোডিয়াম মানুষের রক্তপ্রবাহে অনুপ্রবেশ করে ফেলেছে।

প্লাজমোডিয়াম ওর পোষকদের নিয়মিত আচরণের কিঞ্চিত-পরিবর্তন করে জীবনচক্রের পরবর্তী ধাপে পৌঁছায়। অন্যান্য পরজীবীরা এর চেয়েও আমূল পরিবর্তন আনতে পারে পোষকদের আচরণে। যেমন কিলফিশ নামে একধরনের মাছ আছে যারা উড়ন্ত পাখির শিকার হওয়া থেকে বাঁচার জন্য পানির উপরিতল থেকে দূরে থাকে। কিন্তু এই মাছেরা ফ্লুক নামে পরিচিত একধরনের চ্যাপ্টাকৃমি খেয়ে ফেললে গভীর জলের বদলে পানির উপরিতলেই বেশি সময় কাটাতে আরম্ভ করে। এমনকি মাঝে মাঝে এরা গোত্তা খেয়ে নিজেদের রূপালী পেট উপরে নিয়ে যায়, যেখানে আলো প্রতিফলিত হয়ে ঝিলিক মারে। এই আক্রান্ত মাছরা খাবার হিসেবে সুস্থ মাছেদের চেয়ে বেশি হারে পাখিদের অন্ত্রে গিয়ে পৌঁছায়। বোঝাই যাচ্ছে, পাখির অন্ত্রই হলো সেই আকাঙ্খিত জায়গা যেখানে গিয়ে ফ্লুকেরা পরিপক্ব হয়ে বংশবৃদ্ধি করে।

চ্যাপ্টাকৃমি ফ্লুক যেভাবে মাছ থেকে পাখির পেটে জায়গা করে নেয়। কার্টুনিস্ট সারা লিটল।

 

একটি পরজীবি যেভাবে পানি থেকে একেবারে হাওয়ায় গিয়ে মাছ ও পাখির মধ্য নিজেদের জায়গা করে নেয় তা ভেবে যদি অবাক হন, তাহলে আরো আশ্চর্য অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। মন-শাসকদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত পরজীবি এরকম কারিশমা দেখায় স্তন্যপায়ীদের মধ্যে। প্লাজমোডিয়ামের আত্মীয় এককোষী প্রোটোজোয়া টক্সোপ্লাজমা গন্ডি  (Toxoplasma gondii)  বিড়াল কিংবা ইঁদুরকে আক্রান্ত করতে পারে। এই পরজীবি ওর পোষকের মস্তিষ্কে হাজারখানেক সিস্ট তৈরি করে বসবাস করতে পারে। কিন্তু জীবনচক্রের পরবর্তী ধাপে যেতে হলে টক্সোপ্লাজমা গন্ডিকে অবশ্যই বিড়ালের পেটে গিয়ে পৌঁছাতে হবে। টক্সোপ্লাজমা গন্ডি অবশ্য ইঁদুরের মস্তিষ্ক থেকে বিড়ালের অন্ত্রে নিজে নিজে হেঁটে যেতে পারে না। তবে বাহক ইঁদুরটি যদি বিড়ালের খাবার হয়, তাহলে টক্সোপ্লাজমা ওর পেটে গিয়ে বংশবিস্তার করতে পারবে। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন টক্সোপ্লাজমা গন্ডি আক্রান্ত ইঁদুরের মন থেকে বিড়ালের  ভয়-ডর সব উবে যায়। দেখা গেছে কিছু কিছু আক্রান্ত ইঁদুর বিড়ালের মূত্রের প্রতি ভীষণ কৌতুহলী হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে আক্রান্ত ইঁদুর হয়ে পড়ে বিড়ালের সহজ-শিকার। বেড়ে যায় টক্সোপ্লাজমা গন্ডীর জীবনচক্রের পরবর্তীধাপে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা।

 

৩.
পরিব্যক্তি (মিউটেশন) ও প্রাকৃতিক নির্বাচন কিভাবে পরজীবীদের এরকম অদ্ভূত ক্ষমতা দেয় তা বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানীদের কাছে ঔৎসুক্য জাগানিয়া। এ বিষয়টা বোঝার জন্য বিখ্যাত বই দ্য সেলফিশ জিন-এর লেখক রিচার্ড ডকিন্সের স্বার্থপর জিনের ধারণা সাহায্য করবে।

জিনের বিবর্তন হয়েছে তাদের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য  — এই বলে ডকিন্স যুক্তি দেখান ওই বইয়ে। আমাদের দেহ আমাদের নিজেদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের জিনের দিক দিয়ে চিন্তা করলে আমাদের দেহ আসলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ওই জিনগুলো ছড়িয়ে দেয়ার বাহন মাত্র। আপনার বা আমার দেহে যতগুলো জিন আছে তার সমষ্টিকে বলা হয় জেনোটাইপ। আর এই জিনগুলোতে লেখা সংকেত প্রকাশিত হয়ে যেসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তৈরি করে কিংবা অন্যান্য কার্যসাধন করে তার সমষ্টিকে বলে ফিনোটাইপ।

ডকিন্স ভাবলেন আমাদের দেহের সীমার মধ্যেই যে ফিনোটাইপকে সীমাবদ্ধ করতে হবে এমন কোন কথা নেই। আমাদের আচরণও জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সুতরাং আচরণকেও ফিনোটাইপের মধ্যে ধরা যায়। বীভারের জিন এর অস্থি, পেশি ও লোমের ধরন নিয়ন্ত্রণ করে। এর বাইরেও তো বীভারের জিন মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্নায়ুবর্তনীর কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করে, যার ফলে বিভার গাছ কেটে বাঁধ বানায়। বাঁধ বানানোর জন্যে যে পুকুর তৈরি হয় সেখান থেকে বীভার নানাভাবে উপকৃত হয়। যেমন আশেপাশের গভীর পানির জন্য বীভারের শত্রুরা সহজে ওর বাসায় আক্রমণ করতে পারে না। যদি কোন জিনে পরিব্যক্তির কারণে বীভার আগের তুলনায় ভালো বাঁধ তৈরি করতে পারে তাহলে ওই ফিনোটাইপ বহনকারী বীভারের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। ফলে ওই বীভারের গড়পড়তা বাচ্চা দেয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। ফলশ্রুতিতে বহু প্রজন্ম পরে বীভারদের ওই বিশেষ পরিব্যক্তি ধারণ করার গাণিতিক হারও বেড়ে যায় বীভার-জনপুঞ্জে। বিবর্তনীয় পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী বীভারের তৈরি ওই বাঁধ – এমনকি ওই পুকুরকেও বীভারের দেহের মতোই ওর জিনের সম্প্রসারিত অংশ (extended phenotype) হিসেবে ধরা যায়।

ডকিন্স যুক্তি দিলেন, যদি জিনের কার্যকারিতা বহির্জগতের কোন বস্তুগত নিয়ন্ত্রণ বা পরিবর্তন করা পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা যায়, তাহলে সেটাকে অন্য একটি প্রাণীর আচরণ নিয়ন্ত্রণ বা পরিবর্তন করার জন্য সম্প্রসারিত করা যাবে না কেন? ডকিন্স বললেন যে এই সম্প্রসারণ অবশ্যই সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে তিনি পরজীবিদের প্রসঙ্গ টানলেন। পোষকের দেহে বসবাস করে পোষকের আচরণ ও কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পরজীবির জিনের মধ্যে লেখা থাকে। যদি এরকম কোন জিনে পরিব্যাক্তি দেখা দেয় তাহলে পোষকের আচরণেও পরিবর্তন আসবে।

পরিব্যাক্তি ডিএনএ-র কোথায় কিভাবে হলো তার উপর নির্ভর করে সেটা পরজীবির জন্য ভালো করবে না ক্ষতিকর হবে। যদি কোন ফ্লু ভাইরাসে পরিব্যক্তি হয়ে ভাইরাসটি এতই ভয়ানক হয় যে আক্রান্ত রোগী চলাফেরা বন্ধ করে দিয়ে দ্রুত মারা যায়, তাহলে ওই ভাইরাসটির পক্ষে অন্য পোষক দেহে সংক্রমণের সম্ভাবনা অনেক কম। সেক্ষেত্রে ফ্লু ভাইরাসের জনপুঞ্জ থেকে ওই ভয়ানক পরিব্যাক্তিধারী ভাইরাসরা উধাও হয়ে যাবে। যদি পরজীবির কোন পরিব্যক্তি ওর বাহকের আচরণ ভালোর দিকে প্রভাবিত করে তাহলে সেই পরিব্যক্তিধারী পরজীবি সহজেই ছড়িয়ে পড়বে। ঠিক তেমনি বোলতা যদি এমন কোন পরিব্যক্তি অর্জন করে যার ফলে আক্রান্ত  গুবরেপোকা গুটির দেহরক্ষী হয়ে থাকতে বাধ্য হয়, তাহলে বোলতার ওই পরিব্যক্তিধারী বংশধরেরা জনপুঞ্জে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। কারণ বোলতার বংশধরদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকই তখন সাম্ভাব্য শত্রুর আক্রমণে মারা যাবে।

১৯৮২ সালে “দ্য এক্সটেন্ডেড ফেনোটাইপ” বইটিতে ডকিন্স প্রথম এই ভাবনাগুলো উত্থাপন করেন। অনেক দিক দিয়েই এই বইটি তাঁর সময়ের চেয়ে বহুদূর এগিয়ে ছিলো। ১৯৮০-র দশকে বিজ্ঞানীরা অল্প কয়েকটি পরজীবি নিয়ে কাজ করেছিলেন যারা তাদের পোষকের আচরণ বদলে দেয়। কিন্তু ডকিন্সের এই অনুকল্প (হাইপোথিসিস) সত্য হলে পরজীবিদের মাঝে অবশ্যই এমন কোন জিন থাকতে হবে যা  তাদের পোষকদের  জিনগুলোর কার্যক্রম তুরুপের তাসের মতো বদলে দেয়।

অবশেষে বত্রিশ বছর পর সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা পরজীবির এই মন-নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার রহস্য উন্মোচন করতে শুরু করেছেন। যেমন ইস্রায়েলের বেন-গুইরন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক লিবারস্যাট ও তাঁর সহকর্মীরা জুয়েল বোলতা আম্পুলেক্স কমপ্রেসা (Ampulex compressa) কিভাবে তেলাপোকার উপর অশুভ আক্রমন চালিয়ে একে জিন্দালাশে পরিণত করে বের করেছেন। বোলতাটা তেলাপোকাকে এর হুল দিয়ে দংশন করে অসাড়, নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। তারপর বোলতা তেলপোকার এন্টেনা ধরে টেনে নিয়ে আনে কোন গর্তে। তেলাপোকা কিন্তু নড়তে-চড়তে সক্ষম। তবে ওই দংশনের পর নিজ থেকে নড়াচড়ার যাবতীয় উদ্দীপনা সে হারিয়ে ফেলে। এরকম অবস্থায় বোলতা তেলাপোকার নিচের দিকে ডিম পাড়ে। তেলপোকা সে অবস্থাতেই দাঁড়িয়ে থাকে। একসময় ডিম ফুটে বোলতার লার্ভা বের হয় আর তেলাপোকার তলদেশ কেটে ঢুকে পড়ে।

বোলতা ঠিক কি জাদু করে ওই তেলাপোকাকে? লিবারস্যাট গবেষণায় দেখলেন বোলতাটি তার হুল তেলাপোকার মস্তিষ্কের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। হুল ঢুকিয়ে সে তেলাপোকা মস্তিষ্কের যে অংশটি নড়াচড়া শুরু করার সংকেত দেয়, সেখানকার স্নায়ুকোষগুলোতে একগাদা নিউরোট্রান্সমিটার ঢেলে দেয়। লিবারস্যাটের পরীক্ষা অনুযায়ী তেলাপোকা মস্তিষ্কের এ অংশটিই বিপদের সময় লুকিয়ে পড়ার নির্দেশ পাঠায়।

 

৪.
জুয়েল বোলতা তেলাপোকার মগজে যে অস্ত্রোপচার করে তার বিস্তারিত প্রক্রিয়া বিজ্ঞানীরা বের করতে পেরেছেন। তবে রহস্য উন্মোচনের বাকি আছে অনেক। বোলতা তেলাপোকা মস্তিষ্কে হুল দিয়ে নানা রকম রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে। এদের মধ্যে ঠিক কোন রাসায়নিক কিভাবে তেলাপোকার আচরণ বদলে দেয় লিবারস্যাট সেটা এখনো বের করতে পারেন নি। তবে রিচার্ড ডকিন্সের সম্প্রসারিত ফেনোটাইপ তত্ত্বের সাথে এই গবেষণার ফলাফল সংগতিপূর্ণ। বোলতার জিনে যে রাসায়নিক তৈরির প্রক্রিয়া সংকেতবদ্ধ আছে তা কোনভাবে তেলাপোকার দেহকে বোলতা-বাচ্চার জন্য আদর্শ আঁতুরঘর বানিয়ে ফেলে।

অন্য কিছু গবেষণায় বিজ্ঞানীরা পোষকদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পরজীবীদের যে জিন দায়ী সেগুলোকে সনাক্ত করতে পেরেছেন। তবে এরকম গবেষণায় সাফল্য হাতে গোনা যায়। যেমন ব্যাকুলো ভাইরাসদের কথা বলা যাক। ব্যাকুলো ভাইরাসরা সাধারণত কীটপতঙ্গদের আক্রমণ করে। এসব পোকার মধ্যে আছে বিভিন্ন মথ ও প্রজাপতির শুঁয়োপোকা।  ব্যাকুলো ভাইরাস এর পোষককে সংক্রমিত করে আরো নতুন ব্যাকুলো ভাইরাস তৈরি করে। বাহির থেকে শুঁয়োপোকাদের স্বাভাবিকই মনে হয়। আক্রান্ত শুঁয়োপোকারা আগের মতোই পাতা খেয়ে যায়। তবে যে খাবার খায় তা দিয়ে শুঁয়োপোকার দেহের কোন বৃদ্ধি হয় না। বরং তা থেকে তৈরি হয় আরো নতুন ব্যাকুলো ভাইরাস।

ভাইরাসদের যখন পোষকদেহ ছাড়ার সময় হয় তখন শুঁয়োপোকাদের আচরণে আমূল পরিবর্তন আসে। তারা প্রচন্ড তোলপাড় শুরু করে দেয়। আর কোন বিরাম ছাড়াই খেতে থাকে অনবরত। তারপর উঠতে থাকে। শত্রুদের নজর থেকে লুকানোর চেষ্টা না করে গাছ বেয়ে ওঠতে থাকে দিনের আলোতেই।

ব্যাকুলো ভাইরাস বেশকিছু এনজাইম বা উৎসেচকের জন্য জিন বহন করে। উৎসেচক বিভিন্ন জৈববিক্রিয়ায় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। পোষকদেহ ছাড়ার সময় হলে ব্যাকুলো ভাইরাসের বেশ কিছু জিন সক্রিয় হয়ে ওঠে। হঠাৎ সক্রিয় এ জিনগুলো বেশ কিছু উৎসেচক তৈরি করে যারা পোষকের দেহকে গলিয়ে ফেলে। অজস্র ভাইরাস বহনকারী শুঁয়োপোকার অর্ধতরল গলিত দেহ  অভিকর্ষের টানে ঝড়ে পড়ে নিচের পাতাসমূহে। অন্য শুঁয়োপোকা সে পাতা খেয়ে ফেললে সে আক্রান্ত হয় ব্যকুলো ভাইরাস দিয়ে। এভাবেই চলতে থাকে ব্যাকুলো ভাইরাসের জীবনচক্র।

যুক্তরাষ্ট্রের পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কেলি হোভার ও ডেভিড হিউজের শুঁয়োপোকার এই গাছ বেয়ে উপরে ওঠার আচরণ সম্প্রসারিত ফেনোটাইপের এক অনবদ্য উদাহরণ হিসেবে মনে করেন। পোষকদের গাছ বেয়ে উপরে উঠিয়ে ব্যকুলো ভাইরাসরা আসলে নিচের দিকে নতুন শুঁয়োপোকাকে আক্রমণ করার সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে। ডকিন্সের তত্ত্ব পরীক্ষা করার জন্য ঐ বিজ্ঞানীরা ব্যাকুলো ভাইরাসের জিন নিয়ে গবেষণা করলেন – খুঁজে বের করার চেষ্টা করলেন এমন কোন জিন ব্যাকুলো ভাইরাসের আছে কি না যেটা শুঁয়োপোকার উপরে ওঠার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে।

তারা ব্যাকুলো ভাইরাসের  egt নামের একটি জিনের কার্যকর হওয়ার পথ বন্ধ করলেন। দেখা গেলো ব্যাকুলো ভাইরাস আগের মতোই শুঁয়োপোকাদের আক্রমণ করে তাদের দেহে বংশবৃদ্ধি করছে। এমনকি একসময় শুঁয়োপোকা মরে গিয়ে গলে যাচ্ছে। কিন্তু আক্রান্ত শুঁয়োপোকারা আর গাছ বেয়ে উপরে উঠছে না। তারমানে ব্যাকুলো ভাইরাসের egt জিনটি এর পোষকদের গাছে ওঠার আচরণ কোন না কোন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।

 

৫.
ডিনোক্যাম্প্যাস ককিনেলা আর ওর দুর্ভাগা গুবরেপোকার কি হলো শেষ পর্যন্ত? কানাডার মন্ট্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যানি মুরির নের্তৃত্বে এক গবেষকদল এক চমকপ্রদ তথ্য আবিষ্কার করেছেন। গুবরেপোকাকে তার বাচ্চার দেহরক্ষী বানানোর মাধ্যমে ওই বোলতা সম্ভবত অন্য একটি ভাইরাসের সম্প্রসারিত ফেনোটাইপ হিসেবে কাজ করছে! গবেষকরা দেখেছেন বোলতাটি গুবরেপোকার দেহে ডিম ঢুকিয়ে দেয়ার সময় অনেকগুলো রাসায়নিকসহ একটি মিশ্রনও ঢুকিয়ে দেয়। এ মিশ্রণের মধ্যে একটি ভাইরাসও থাকে যেটি কি না বোলতার ডিম্বাশয়ের মধ্যে বংশবৃদ্ধি করে। গবেষণালব্ধ কিছু উপাত্ত বলছে এই ভাইরাসটিই গুবরেপোকাটাকে বোলতার গুটির দেহরক্ষাকারী জিন্দালাশ বানিয়ে দেয়।

ওই ভাইরাস আর বোলতার বিবর্তনীয় আগ্রহ একই জায়গায়। গুবরেপোকাকে গুটির দেহরক্ষী বানাতে পারলে বোলতার সংখ্যাও বাড়বে। বোলতার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে ভাইরাসের সংখ্যাও বেড়ে যাবে। তাই গুবরেপোকাকে পুতুল বানানোর জন্য তাদের জিন একসাথে কাজ করে। তবে পুতুল-নাচের সুতো বোলতার নিয়ন্ত্রণে আছে বলে মনে হলেও আসলে সুতো নাড়াচ্ছে এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা পাপেটমাস্টার।

মূল লেখা: Mindsuckers. Meet Nature’s Nightmare. By Carl Zimmer. National Geographic Magazine. November 2014
নোট: সম্প্রতি একটা গবেষণায় দেখা গেছে ঐ ভাইরাসটি গুবরেপোকার মস্তিষ্কে গিয়ে বংশবৃদ্ধি করে। বিস্তারিত জানতে পারবেন কার্ল জিমারের The Loom ব্লগে।

লেখাটি জিরো টু ইনফিনিটি পত্রিকার ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সংখ্যায় প্রকাশিত।

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

লিখেছেন আরাফাত রহমান

অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি শিক্ষার্থী। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।

আরাফাত রহমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 74 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. Shihab Khan Reply

    অসাধারন লিখেছেন। ধন্যবাদ।
    অনেক কিছু জানলাম। পোষক আর তার দেহে বেড়ে ওঠা জীবের এধরনের কার্যক্রম সম্পর্কে সল্প ধারনা ছিল দু-একটি উদাহরনে।
    বেশ কয়েকটি বিস্তারিত উদাহরন আর ‘সেলফিশ জীন’ এর কয়েকটি ব্যাপারে ধারনা থেকে আরো কিছু জানলাম।
    জীনোটাইপ আরে ফেনোটাইপ এর ব্যাপারটা মোটামুটি নতুন শিখলাম।

আপনার মতামত