২০১৫ বইমেলার বই। ইদানিং অনেক ভাল ভাল বই অনুবাদ হচ্ছে। এদের তালিকায় এই বইটিও আছে।

দারুণ লেগেছে বইটি। আইজ্যাক আসিমভের লেখা বই কেমন হবে তা আর এখন কাওকে বলে দিতে হয় না। লেখক হিসেবে তার নামের আগে এখন আর কোনো বিশেষণ ব্যবহার না করলেও চলে। তার নামটাই একটা বিশেষণ। “বিগিনিংস” নামের বইটা দৈবভাবে বইয়ের দোকানে ঘুরতে গিয়ে কিনে ফেলেছিলাম। দোকানী জানে আমি বিজ্ঞান পছন্দ করি, তাই এই বইটা সাজেস্ট করলো। প্রকাশনীর নাম দেখে মনে হল একদমই বাজে বই। কারণ এই প্রকাশনী থেকে একবারে ৫ টা বিজ্ঞানের বই কিনেছিলাম, আলী ইমামের। রাখঢাক না রেখে সত্য কথা বলতে গেলে বলতে হবে আলী ইমামের সবকটা বইই ফালতু হয়েছে। টাকাগুলোই লস। এই আফসোস থেকে আসিমভের অনুবাদ ভাল হবে না বলে মনে করেছিলাম।

তার উপর অনুবাদক হিসেবে দেখেছি একজন সাহিত্যিককে। উনি কখনো বিজ্ঞান লিখেন সেটা জানতাম না। আমি যেহেতু এখন পর্যন্ত এই লাইনে আছি, এবং জিরো টু ইনফিনিটিবিজ্ঞান ব্লগে যুক্ত থাকার কারণে বাংলায় বিজ্ঞান নিয়ে হালের খবরটিও আমার কানে আসে, তাই কেও বিজ্ঞান লেখালেখিতে ভাল কিছু করলে আমার চোখে পড়ে।

আসিমভের লেখা দেখে আর দোকানীর অনুরোধে কিনে ফেললাম। কবি সাহিত্যিক মানুষ অনুবাদ করেছেন তাই বেশি একটা উচ্চাশা করিনি। ভেবেছিলাম অনুবাদ তেমন ভাল হবে না। কিন্তু এনায়েত রসুলের অনুবাদে আমার মন ভরে গেছে। 🙂 অসাধারণ অনুবাদ করেছেন তিনি।

অনুবাদক অনেক যত্ন করে অনুবাদ করেছেন। দারুণ হয়েছে অনুবাদটা। দারুণ ভাল লেগেছে পড়তে।

বইটার সবিটাই বিজ্ঞানের নানা উৎপত্তিমূলক প্রশ্নের উত্তরে সাজানো হয়েছে। যেমন প্রাণের শুরু হল কখন থেকে, ব্যাকটেরিয়ার উৎপত্তি, ভাইরাস, মহাদেশ, পানি, নানা বর্গের প্রাণিবৈচিত্র্য, পৃথিবী, সৌরজগত, বিশ্বজগত ইত্যাদি। এসবের কীভাবে উৎপত্তি হল তা নিয়ে আলোচনা। বইটার মজার দিক হল একটা প্রশ্নের সমাধান হলে আরেকটা প্রশ্নের দেখা দেয়। সে প্রশ্নের উত্তর নিয়ে পরের অধ্যায়। এভাবে পরের অধ্যায়ের শেষেও এমন প্রশ্নের দেখা দেয় এবং সে প্রশ্ন নিয়ে আরও একটি অধ্যায়। এভাবে সমস্যার পিঠে সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে বইটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।

প্রজাতির সমস্যার সমাধান হলে, গণ; গণের হলে গোত্র; এভাবে গণ, রাজ্য সব। এরপর আসে প্রথম প্রাণ। ব্যাকটেরিয়া ভাইরাস। প্রাণের জন্য পানি। এরা কোথা থেকে আসলো। উন্নত প্রাণের জন্য অক্সিজেন? কীভাবে অক্সিজেনের শুরু হল, কেমন করে উৎপত্তি হল। ফসিল, সভ্যতা, জ্ঞানের ইতিহাস এমনকি ধর্মের কথাও আছে। বিজ্ঞান নিয়ে ধর্মীয় বিতর্ক সবই ঠাই পেয়েছে। বইটির বেশিরভাগ অংশ জুড়ে প্রাণ বা প্রাণীজগতের ইতিহাসই আলোচিত হয়েছে। শেষের দিকে এসে মহাদেশ, পানি, অক্সিজেন, প্রাণ-বান্ধব পরিবেশ ইত্যাদি আলোচনা করেছেন। তবে এই অংশটা অল্প। আর এটাই বেশি মজার।

এই বইয়ের মহাদেশ সম্পর্কিত অধ্যায়টা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। মহাদেশের হেঁটে চলা বা মহাদেশীয় সঞ্চরণ নিয়ে একসময় সামান্য লেখালেখি করেছিলাম, মনে মনে ভাবতাম এ নিয়ে আমি সামান্য কিছু জানি। বইয়ের এই অধ্যায় পড়ার পর মনে হল আমি কিছুই জানি না। আমাকে আরও জানতে হবে এবং জেনে তারপর লিখতে হবে।

ইংরেজি টার্মগুলোর শতভাগ সঠিক অনুবাদ না হলেও অনেক কাছাকাছি চলে আসতে পেরেছেন। বুঝা যায় অনুবাদক অনুবাদের সময় অনেক যত্নশীল ছিলেন। কিছু কিছু শব্দ কলেজে যে যে বাংলা হরফে পড়েছিলাম এই বইতে সেরকম নেই অনেক জায়গায়। মূলত শব্দগুলো ইংরেজি না হওয়াতে এই সমস্যাটা হয়েছে। এমন সময় সাবলীলে পড়ে যেতে সমস্যা হয়। কিছু কিছু ইংরেজি হরফের গ্রিক বা ল্যাটিন শব্দগুলোতে এমনটা হয়েছে বেশি। বাংলাটা পড়ে গেলে বোঝারই উপায় নেই কিসের কথা বলা হচ্ছে। ইন্টারমিয়িডিয়েটে প্রাণিবিদ্যা বইটা বেশ ভালোভাবে (অন্য বইয়ের তুলনায় সবচে ভালোভাবে) পড়েছিলাম বলে এই টার্মগুলো দিয়ে কাদের বোঝানো হচ্ছে বুঝতে পেরেছিলাম। শব্দগুলো মার্ক করে রাখিনি তাই এখানে তুলে দিতে পারলাম না।

প্রথম দিকে ভুল ধরার মনোভাব নিয়ে পড়া শুরু করেছিলাম! কয়েকটা চ্যাপ্টারের পর বইটিতে বুদ হয়ে গিয়েছিলাম। বেশ সাবলীল অনুবাদ করেছেন তিনি। রেটিং ৫/৫। প্রচ্ছদটা খুব একটা ভাল হয়নি। মোটামুটি খারাপই হয়েছে।

এবারের বইমেলায় প্রকাশিত বিজ্ঞান বই এবং দুই মাসের ভিতরেই বইটির রিভিউ দিয়ে দিতে পেরেছি দেখে ভাল লাগছে, কারণ যারা বিজ্ঞান নিয়ে বই লিখছে তাঁদের উৎসাহ দিয়া কিংবা ভাল একটা বই উপহার দেবার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা হচ্ছে রিভিউ দেয়া। তাই এই দিক থেকে সামান্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পেরে ভাল লাগছে।

 

নামঃ বিগিনিংস: দ্য স্টোরি অফ অরিজিনস- অফ ম্যানকাইন্ড, লাইফ, দ্য আর্থ, দ্য ইউনিভার্স
মূল লেখকঃ আইজ্যাক আসিমভ; অনুবাদকঃ এনায়েত রসুল
প্রথম প্রকাশঃ বইমেলা ২০১৫
প্রকাশকঃ সৃজনী

লিখেছেন সিরাজাম মুনির শ্রাবণ

আমি শ্রাবণ, পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। মাসিক বিজ্ঞান সাময়িকী জিরো টু ইনফিনিটিতে বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। বিজ্ঞান পড়তে ভালো লাগে, বিজ্ঞান বিষয়ক ভাবনা চিন্তা করে আনন্দ পাই।

সিরাজাম মুনির শ্রাবণ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 48 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. Shamsul Arefin Prince Reply

    এনায়েত রসুল বিজ্ঞান বিষয়ক লেখায় নতুন নন। ছোটোবেলায় আবিষ্কার নিয়ে তাঁর কিছু বই প’ড়ে সত্যিই অনেক অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। তিনি আজিমভের বইয়ের এতো ভালো অনুবাদ করেছেন একথা জেনে অনেক খুশি হলাম। বইটি পড়ার ইচ্ছে রইলো,কারণ আমার বাল্যকালের অন্যতম প্রিয় একটি বইয়ের(নামটি সম্ভবত ছিলো ‘আবিষ্কার আর আবিষ্কার’?) লেখক এই অনুবাদক।

  2. আরাফাত রহমান Reply

    প্রিন্স যেমন বলেছেন, এনায়েত রসূল নতুন বিজ্ঞান লেখক নন। এছাড়াও এই বইটি এর আগে ২০০৫ সালে অনুবাদিত হয়েছিলো “সূচনা” নামে [১]। আমার প্রিয় একটা বই, আসিমভের বিজ্ঞানের ইতিহাস ঘুরে আসার ভঙ্গিমাটা আমার কাছে আকর্ষণীয় লাগে।

    [১] আইজ্যাক আসিমভ, সূচনা, ভাষান্তর পলাশ বরণ পাল ও শেখর গুহ, বুক ক্লাব ঢাকা, ২০০৫

  3. Pingback: বইঃ প্রাণীজগতের বিবর্তন, মানুষ যখন থাকবে না | বিজ্ঞান ব্লগ

Leave a Reply to Shamsul Arefin Prince Cancel reply