বইটির দুইটি অংশ। মূল অংশটাকে গুছিয়ে আনতে প্রথম অংশটাকে লিখেছেন। প্রথম অংশটা পড়ে শেষ করে লেখককে খুব বড় মাপের বিজ্ঞান লেখক বলে মনে হল না। আমার অভিজিৎ রায়, ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীর লেখা পড়ে অভ্যাস, তাই সম্ভবত এমন মনে হচ্ছে। আমি আগে ভাগেই উঁচু মানের লেখা পড়ে অভ্যস্ত হয়ে আছি, তাই এই বইটা কিঞ্চিৎ অন্য রকম লাগছে। এর আগেও এই লেখকের একটা বই “আগামী প্রজন্মের বিজ্ঞান” নামের একটা বই পড়েছিলাম। একই অবস্থা, একটু পড়ার পর আর এগিয়ে যাওয়া যায় না।

বইটি মূলত মানুষ যখন থাকবে না, তখন মানুষের অনুপস্থিতিতে অন্যান্য প্রাণীদের কী ধরনের শারীরিক পরিবর্তন আসতে পারে তার কাল্পনিক বর্ণনা। তিনি প্রথম দিকে ভূমিকায় বলেছেন “…হোমো সেপিয়েন্সদের অবলুপ্তি ঘটবে পৃথিবী থেকে। নিশ্চিত।” তিনি কীভাবে সোজাসাপ্টা নিশ্চিতভাবে এমনটা বলতে পারেন? একজন সচেতন লেখক কখনোই এমন করে বলবে না যে, নিশ্চিত মানুষ মারা যাবে।

হ্যাঁ, সূর্য মারা যাবার সময় পৃথিবীকে সাথে নিয়ে মরবে। তখন মানুষ যদি পৃথিবীর বাইরে যেতে না পারে তাহলে অস্তিত্ব বিলোপ পাবে। কিন্তু তখন শুধু মানুষই মারা যাবে না, অন্যান্য সকল প্রাণীই মারা যাবে। আর বইটা লেখা হয়েছে মানুষের না থাকা অবস্থায় অন্যান্য প্রাণীর শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে। তাই যে অর্থে তিনি এই কথা বলেছেন তা একদমই অযৌক্তিক।

আরেকটা কারণ হতে পারে বরফ যুগ। এই সময়ে গণ অবলুপ্তি ঘটে। মানুষও সব বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। এখানে কিন্তু বলা হচ্ছে ‘যেতে পারে’, ‘বিলুপ্ত হয়ে যাবে। নিশ্চিত।‘ এমনটি নয়।
সাধারণত তারাই বিলুপ্ত হবে যারা ঐ পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে না। যারা খাপ খাওয়াতে পারবে তাঁরা ছাকনীতে টিকে যাবে।

প্রশ্ন হচ্ছে মানুষ খাপ খাওয়াতে পারবে কিনা। মানুষ খাপ খাওয়াতে পারুক না পারুক তার রয়েছে অন্য ধরনের এক ক্ষমতা। মানুষ পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে জানে। গরম লাগলে ফ্যান ছেঁড়ে দেয়, শীত লাগলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। চলার পথে পানি পড়লে নৌকা দিয়ে বা ব্রিজ বানিয়ে পার হয়ে যায়। রোগ হলে ওষুধ খেয়ে নেয়। তাই প্রকৃতি বিরূপ হয়ে গেলেও মানুষ পরিবেশে অবস্থান করতে পারবে। বরফযুগে অবস্থান করতে পারলেও খাবারের সমস্যা দেখে দিতে পারে। অন্য প্রাণীরা মারা যাওয়াতে এমন সংকট দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে কৃত্রিম মাংস, কৃত্রিম আমিষ, শর্করা ইত্যাদি গ্রহণ করতে পারে।

রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে তৈরি হবে মাংস, খাবার। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বলা যায় মানুষ তার মেধার গুণে বেঁচে যাবে। তারপরও যেহেতু এটা ভবিষ্যৎ তাই নিশ্চিত করে কিছুই বলা যায় না। কিন্তু এই বইয়ে লেখক বলেছেন কি মানুষের বিলুপ্তি ঘটবে নিশ্চিত। এতেই লেখকের ওজনটা প্রকাশ পেয়ে যায়।

লেখক সম্ভবত মরিস বা ডিক্সনের একটা ইলাস্ট্রেটেড বই থেকে ছবিগুলো দিয়ে একটা বই করে ফেলেছেন। এই বইতে যে ছবিগুলো আছে, একই ছবি দেখেছিলাম আলী ইমামের একটা রঙ্গিন বইতে। কাল্পনিক প্রাণী। এই বইতে ছবির পাশাপাশি লেখক হয়তো কিছু যোগ করেছেন। প্রায় সময়েই তা প্রসঙ্গের বাইরে চলে গেছে। মজা নষ্ট করে। একদমই আলোচনা করার দরকার নেই এমন লেখা লিখে বসেছেন, অহেতুক লম্বা করা, পৃষ্ঠা বাড়ানো। অথচ শুধু ছবিগুলোকে নিয়ে, নীচে একটু একটু চার পাঁচ লাইন বিবরণ, এমন হবার পেছনে যুক্তি উপস্থাপন করলেই কিন্তু সমালোচনাহীন একটা বই হয়ে যেতো। হাজার হোক বাংলায় বিজ্ঞানের বই কম।

বইয়ের প্রথম দিকে এক জায়গায় কন্টিনেন্টাল ড্রিফট প্রসঙ্গে বলেছেন- মহাদেশীয় সঞ্চরণ হয় ভূমিকম্প আর আহ্নিক গতির ফলে। এই কথা পড়ার পর বইয়ের পাতার মাঝেই লিখে ফেলেছিলাম “WTF”। আলফ্রেড ভেগনার যখন মহাদেশীয় সঞ্চরণ থিওরি দেন তখন পৃথিবীর ঘূর্ণন দিয়ে এর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তার তত্ত্ব সঠিক ছিল, কিন্তু ব্যাখ্যা ভুল ছিল। যার কারণে তার জীবিত অবস্থায় সে কারো কাছে কোনো দাম পায়নি। তার কথা সত্য বলে মেনে নিয়েছে তার মৃত্যুর অনেক পরে। কন্টিনেন্টাল ড্রিফট নিয়ে সঠিকটা জানতে জিরো টু ইনফিনিটির জানুয়ারি ২০১৪ সংখ্যাটা দেখা যেতে পারে। এই লেখাটা বিজ্ঞান ব্লগেও আছে। এটাকে ওজনের মনে না হলে আইজ্যাক আসিমভের ‘বিগিনিংস’ বইটা দেখে নেয়া যেতে পারে।

ভবিষ্যতের প্রাণীদের গঠন নিয়ে যারা কাজ করেছেন তাঁরা কিছুটা যুক্তি দিয়েই করেছেন। যেহেতু ভবিষ্যতের বিবর্তন তাই এ নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। এই বিতর্কের ব্যাপারে তিনি বলেছেন “মেনে নিলেও দোষ নেই।” কেন? দেখা নাই জানা নাই অগামীর অদ্ভুত প্রাণীদের মেনে নিলে দোষ থাকবে না কেন? বরঞ্চ মেনে নিলেই তো দোষ হবার কথা।

বিবর্তন প্রসঙ্গে বলেছেন- “(হাত হাত আছে লেজ আছে) বানরের পা নেই। দরকার নেই তাই নেই।” এটা কেমনতরো কথা হল? বিবর্তন নিয়ে লেখক বই লিখছেন আর সেই বিবর্তনের লেখকই কিনা বলেন “দরকার নেই তাই নেই।” আমি যদি লেখকের চাইতে বয়সে বড়ো হতাম তাহলে বলতাম আগে বিবর্তন পড়ে শিখে তারপর বিবর্তনের উপর আস্ত একটা বই লিখো। এই একটু আগে মাত্র শেষ রাতে একটা লেখা লিখলাম “পুরুষের কেন স্তন আছে” এখানে ছেলেদের স্তনের কিন্তু কোনো দরকার নেই। কোনো কাজে আসে না। কিন্তু তারপরেও এটা আছে। কেন আছে? এখানেই বিবর্তনের দারুণ একটা খেলা। একটা জিনিষের দরকার না থাকলেই যে তা থাকবে না এমন কোনো কথা নেই। খুব অবাক হলাম বিবর্তনের বইয়ের লেখক কীভাবে এমন লাইন লিখতে পারেন।

ডারউইনের বিবর্তনবাদে ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা হিসেবে বলেছেন এটি জীবনের শুরু (প্রাণের উৎপত্তি) আর ভবিষ্যতের প্রাণী সম্পর্কে কিছু বলতে পারে না। উল্লেখ্য এই দুইটি ব্যাপারের কোনটি দেখার দায়িত্বই বিবর্তনবাদ দেখে না। যাহোক এটা ছোটখাটো ব্যাপার। যেমন ছোটখাটো ব্যাপার বিবর্তনবাদকে আবিষ্কার না বলে উদ্ভাবন বলেছেন।

অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা প্রচুর করেছেন, এমনটা না করে বইটাকে ছোট রাখলে ভাল হতো। একটা জায়গায় দেখলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ব্যবহার করেছেন। এই প্রজন্মের বিজ্ঞান লেখকেরা সাধারণত প্রায় লেখাতেই অমুক কবি তমুক কবির লাইন ব্যবহার করে। বিজ্ঞান লেখার শুরুতে প্রয়োজন ছাড়া এমন সাহিত্য সম্পদ ব্যবহার করাকে আমার পছন্দ হয় না। কিন্তু কথা হচ্ছে কবিতার লাইনেও ভুল লিখে বসে আছেন! লিখেছেন-

যখন থাকবে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে।
যখন বাইব না,মোর খেয়াতরী এই ঘাটে।

এটা কিন্তু হবে,

“যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে ।
আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে।”

যাহোক এটাও ছোটখাটো ব্যাপার। বিজ্ঞানের বইয়ে কবিতা টবিতা ধর্তব্যের বিষয় না। সাধারণত এমন সাহিত্যের ধাঁচের লেখকেরা এই ধরনের ভুল করেন না। এতগুলো সমালোচনা করলাম কারণ এখন আর সেই দিন নেই যখন একটা বিজ্ঞান বই কেমন হল কী হল এসব না দেখে উৎসাহ দিয়ে বিজ্ঞান লেখালেখিকে চালিয়ে রাখতে উৎসাহ দেয়া হতো। এখন অনেকেই লিখছেন, সময় হয়েছে ভুল জিনিষের সমালোচনা করার।

আরও একটা বিষয়, আমি বইটা সবটা পড়িনি। ৬০-৬৫ পৃষ্ঠা পড়েছিলাম কষ্টে সৃষ্টে। আমার গায়ে এত এলার্জি নেই যে দুই আড়াইশো পৃষ্ঠা কষ্ট করে পড়ে যাবো, যেখানে আমার সামনে অনেক ভাল ভাল বই পড়ে আছে। ভুলভাল, জোড়াতালি, উদ্ভট বিজ্ঞানের বই আর নয়। হ্যাপি সায়েন্স রিডিং।

লিখেছেন সিরাজাম মুনির শ্রাবণ

আমি শ্রাবণ, পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। মাসিক বিজ্ঞান সাময়িকী জিরো টু ইনফিনিটিতে বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। বিজ্ঞান পড়তে ভালো লাগে, বিজ্ঞান বিষয়ক ভাবনা চিন্তা করে আনন্দ পাই।

সিরাজাম মুনির শ্রাবণ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 48 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    ভবেশ রায়ের একটা বই এর আগেও পড়েছিলাম। কতগুলো বিচ্ছিন্ন লেখার সংকলন মনে হয়েছিলো। তবে উনি যখন লিখতেন, তখন বিজ্ঞানের লেখকের একটা আকাল ছিলো। নাই মামার চেয়ে তাই কানা মামা ভালো মনে হয়েছিলো। উল্লেখ্য, আলী ইমামও কিন্তু এ ধরনের বিচ্ছিন্ন লেখার সংকলন করে বই আকারে ছেড়ে দেন।

    • সিরাজাম মুনির শ্রাবণ Reply

      হ্যাঁ ভাইয়া উনি অনেক আগে থেকে লিখতেন, অনেক পুরাতন।
      সংকলনের ব্যাপারটা, একটা বই কতগুলো লেখার সংকলন হলে সমস্যার কিছু আছে বলে মনে করিনা। সংকলন করলে বইয়ের মান হয়তো ভাল হবে না, কিন্তু স্বতন্ত্রভাবে প্রতিটি লেখা তো ভাল হবে। যারা এই পত্রিকা ঐ পত্রিকায় বিচ্ছিন্নভাবে লিখে তাঁরা সংকলন করতে পারে। যেমন ফারসীম মান্নানের “মানুষ মহাবিশ্ব ও ভবিষ্যৎ” , “নক্ষত্র নিউরন ও ন্যানো” ইত্যাদি।
      ভবেশ রায়ের বইয়ের ব্যাপারে, উনি বিষয়ভিত্তিকই লিখেছিলেন। একদমই ভাল মানের হয়নি। আর কিছুটা যা বুঝলাম উনি খুব তাড়াহুড়া করে বইটা করেছেন। এতদিন ধরে লেখালেখির মাঝে থাকার পরেও এই বইটাতে এমন ত্রুটি একদমই কাম্য নয়।

  2. দীপেন ভট্টাচার্য Reply

    রিভিউটা পড়ে ভাল লাগল। বিজ্ঞানভিত্তিক আলাদা লেখাগুলোকে সংকলন করলে ভাল এডিটিংয়ের দরকার। এছাড়া বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে মতামত নেয়া প্রয়োজন এবং ভূমিকায় সেই মতামতটা যে নেয়া হয়েছে লেখা দরকার, নইলে সেই বিজ্ঞানের কোনো দাম নেই। তাড়াহুড়ো করা যাবে না একেবারেই। এখানে লেখক ও প্রকাশকের উভয়ের দায়িত্ব সমান।

    • সিরাজাম মুনির শ্রাবণ Reply

      ধন্যবাদ স্যার। রিভিউটা পোস্ট করার পর ভাবছিলাম কাজটা কি ভাল হল বাকি মন্দ হল। আপনার মতামতে কিছুটা সমর্থন পেলাম। অনেক ধন্যবাদ।

  3. রুহশান আহমেদ Reply

    ছোটবেলায় ওনার ‘বিশ্বজয়ের কথা’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। মেরু অভিযান, মহাদেশ আবিষ্কারের কাহিনী এসব নিয়েই লেখা ছিলো বইটি।

    যাই হোক, আপনার অবজার্ভেশন আসলেই ভালো।

    • সিরাজাম মুনির শ্রাবণ Reply

      ধন্যবাদ ভাইয়া। উনার “শত মনিষীর জীবনী” বইগুলোও অসাধারণ। ৫/৬ খণ্ডে সমাপ্ত বইগুলো। এটাই সম্ভবত উনার সেরা কাজ। উনার কিছু কিছু বই আছে আসলেই ভাল।

আপনার মতামত