জিরো টু ইনফিনিটির সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মাহমুদের তৃতীয় বই। বইটির সবচে দারুণ দিক হচ্ছে এর প্রকাশনার মিষ্টতা। ৮০ পৃষ্ঠার বই কিনতে গেলে ১২০ টাকা গুনতে হয়। আজকালকার বইয়ে প্রতি পৃষ্ঠার দাম পড়ে দেড় টাকা থেকে দুই টাকা। নিয়মিত পাঠকদের জন্য এটা একটা মোটা দাগের সমস্যা। কিন্তু এই বই মাত্র ৫০ টাকা। এখানেই শেষ নয়। এর পৃষ্ঠাগুলো দিয়েছে গ্লসি পেপারে। খুবই মূল্যবান কিছু গ্লসিতে ছাপানো হয় এবং তা হয় অনেক খরচবহুল। কিন্তু প্রকাশনী হিসেবে জিরো টু ইনফিনিটি খুবই অল্প মুনাফা করছে, বা যতটুকু সম্ভব কম দাম রাখছে। আর এই বই বিক্রি হয়েছে, হচ্ছে ফুটপাতের দোকান হতে অভিজাত লাইব্রেরীতে। যে বই অভিজাত লাইব্রেরীতে বিক্রি হয় সে বই ফুটপাতে চলে না, যে ফুটপাতে চলে সে বই অভিজাত লাইব্রেরীতে তোলে না। জিরো টু ইনফিনিটি প্রকাশনা সব একত্র করে নিয়েছে। মূলত পত্রিকার সার্কুলেশন থাকাতে এমন পরিবেশ আগে থেকেই তৈরি ছিল। বই বিক্রি হয়েছে পত্রিকার সাথে। স্বভাবতই গড়পড়তা হিসেবে বই যেমন বিক্রি হয় তার তুলনায় এটি বিক্রি হয়েছিল অনেক বেশি। নিঃসন্দেহে বেস্ট সেলার। অল্প কয়েকদিনের মাথায়ই রিপ্রিন্ট করতে হয়েছিল।

বইয়ের অংশে-
বইটি মূলত তিনটি অংশে বিভক্ত। ভাল করে বললে সাড়ে-তিনটি (মানে চারটি) অংশে বিভক্ত। ১. আমাদের বিশ্বজগত, ২. পরমাণুবাদ, ৩. পরমাণুর জগতে, এবং ৪. এ. এম. হারুন অর রশিদ। বইটির সবচে আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে তৃতীয় অংশটা। এবং লেখার মানে এই অংশটাই সবচে সেরা। কেও যদি বইটির প্রথম দিকের কয়েক পাতা পড়ে কিছুটা ক্লান্তিবোধ করে তাহলে বলব একছোটে তিন নম্বর অধ্যায়ে চলে যেতে। এখানে গেলে পড়তে কোনো সমস্যা হবে না। বইটি যে নামে প্রকাশিত হয়েছে সে হিসেবে এটিই আসল অংশ। আইনস্টাইন, রাদারফোর্ড, বোর, হাইজেনবার্গ সহ কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অনেক রথী মহারথীর কাজের বিবরণ। বিজ্ঞানীর নাম নিচ্ছি বলে ব্যাপারটা এমন নয় যে  লেখাগুলো বিজ্ঞানীর জীবনীকেন্দ্রিক, লেখাগুলো অনেক টেকনিক্যাল, তথ্যে পরিপূর্ণ ও সাবলীল। পরমাণুর আধুনিক ইতিহাস, পরমাণুর গভীরে ডুব দিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। তৃতীয় অধ্যায়ের চারটা স্বতন্ত্র লেখা। লেখাগুলোও অন্য লেখার তুলনায় সাম্প্রতিক। আর সাম্প্রতিক কালের লেখকের লেখার মান প্রশ্নাতীত। হাজার হোক দুটি পত্রিকার সম্পাদক। যত লেখাই আসুক, যে লেখকই লিখুক সবার আগে তাকেই পড়তে হয়। অল্পতেই বোঝা যায় কেমন হবে তার লেখা। তবে অবশ্য এটাই ঠিক যে সম্পাদনার মান ও পড়াশুনার পরিমাণের উপর লেখার মান ভাল বা খারাপ হওয়া নির্ভর করে না। অনেক ভাল সম্পাদক লেখক হিসেবে বাজে হতে পারে আবার হোমরা চোমরা সম্পাদক ভাল লিখতে পারেন।

আবদুল্লাহ আল মাহমুদ

তৃতীয় অধ্যায়ের পরে দেখবো দ্বিতীয় অধ্যায়। এটার সবটাই মূলত প্রাচীন ইতিহাস। দুটি অধ্যায়। তৃতীয় অধ্যায়কে যদি মূল বই ধরে নেই তাহলে এটা হবে তৃতীয় অধ্যায়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত একটা ছোট অধ্যায়। এই অধ্যায়ের লেখাগুলো মানের দিক থেকে একটু নীচের সারিতে পড়ে যায়। সাবলীলে পড়তে বেগ পেতে হয়। মূলত এগুলো আগের লেখা। অনেক আগে  জিরো টু ইনফিনিটিতে প্রকাশিত হয়েছিল। জিরো টু ইনফিনিটির একদম শুরুর দিক থেকেই আমি এর পাঠক। একদম প্রথম দিকে ২০১২ সালের প্রথম সংখ্যা থেকে আমি এই ম্যাগাজিন পড়ছি। সেজন্য স্মৃতি থেকে এমন বিচার করতে পারছি এবং বলতে পারছি লেখক তখন নবীন ছিলেন তাই লেখার মানে সামান্য কমতি ছিল।

এরপরে আসে প্রথম অধ্যায়টা, এই অধ্যায়ের ব্যাপারে আমি বেশিরভাগই নেতিবাচক। বইটি যে বিষয়  ‘বস্তু’র উপর লেখা হয়েছে তার থেকে ভিন্ন টপিকের আলোচনা। বিশ্বজগত, মহাবিশ্বের মডেল, প্রাচীন বিজ্ঞানীর চিন্তা, সমস্যা, বিরোধ ইত্যাদি। এসব তো বস্তুর আলোচনা নয়। তবে হ্যাঁ এই বিশ্বজগৎ যেহেতু বস্তু দিয়ে গঠিত হয়েছে এবং প্রথম অধ্যায়ে বস্তুর কথাও এখানে ওখানে কয়েক বাক্য বলা হয়েছে তাই বলা যেতে পারে এই অধ্যায়ের লেখাগুলো অপ্রাসঙ্গিক নয়। তবে হয়তো যুক্তি দিয়ে প্রাসঙ্গিকতা ও অপ্রাসঙ্গিকতা আনা যাবে কিন্তু বইয়ের সৌন্দর্যে যে খুত দেখা দিয়েছে সেটা থেকেই যাবে। প্রথম অধ্যায়ের লেখাগুলো দার্শনিক চিন্তাভাবনায় ভরা। এবং অবশ্যই মৌলিক লেখা। দ্বিতীয় অধ্যায়ের মতো আগেকার লেখা।

এই বইয়ের সবটা  আবদুল্লাহ আল মাহমুদ নিজে লিখেন নি। পৃষ্ঠাসংখ্যা হিসেব করে দেখেছি ৭০% লিখেছেন তিনি। বাকি ৩০% লিখেছেন ‘মোঃ কুতুব উদ্দিন’ নামের একজন। বইয়ের শেষের দিকে একজন বাংলাদেশী পদার্থবিজ্ঞানীর জীবনী। সম্মানিত অধ্যাপক এ. এম. হারুন অর রশিদ। বইটির নাম যে বিষয়ে সে টপিকে অবশ্যই এই জীবনী প্রসঙ্গের বাইরে বলে বিবেচিত হবে। তবে প্রসঙ্গের বাইরে হোক আর ভিতরে হোক, বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের নিয়ে এই প্রয়াসটা আমার কাছে দারুণ লেগেছে। উল্লেখ্য বইটি উৎসর্গও করা হয়েছে এ. এম. হারুন অর রশিদকে। পেছনের মলাটে তার ছবিও দেয়া হয়েছে। নিজেদের বিজ্ঞানীকে সম্মান দেয়াতে ব্যাপারটা খুবই সুন্দর হয়েছে। তবে পৃষ্ঠার প্রশ্নে কয়েক পৃষ্ঠা খরচ করে প্রসঙ্গের বাইরে কোনো বিজ্ঞানীর জীবনী আলোচনা করা যেতে পারে, তাই বলে ৩০% পৃষ্ঠা এই বিষয়ে চলে গেলে ভাল না দেখাতেই পারে।

Back Cover

এই বইয়েরই ভূমিকায় লেখক বলেছেন স্বল্প পরিসরে বস্তুর পুরো ইতিহাসটুকু তুলে আনতে পারেন নি। বাকি ইতিহাস পাওয়া যাবে এই সিরিজের পরবর্তী বইয়ে। এই ক্ষেত্রে আমার মন্তব্য হল, প্রথম ও শেষ অধ্যায় ফেলে দিয়ে সেগুলোকে বস্তুকেন্দ্রিক লেখা দিয়ে পূরণ করলেই তো স্বয়ংসম্পূর্ণ একটা বই হয়ে যায়। একটি মাত্র বইয়েই পুরোটা বলে ফেলা যায়, পরবর্তী বইয়ের জন্য লেজুর রাখার দরকার হয়না। পরমাণু নিয়ে অবশ্যই অনেক অনেক বই হবে, তবে সবগুলোই থাকতে পারে নিজে নিজে স্বতন্ত্র।

খুব সম্ভবত এটা বাণিজ্যিক কারণ। পাঁচ ফর্মা (৮০ পৃষ্ঠা) পূরণ করার জন্য হয়তো এই লেখাটা দিতে হয়েছিল। উল্লেখ্য পরমাণু বিষয়ে লেখকের আর কোনো লেখা নেই বলে আমি জানি। জিরো টু ইনফিনিটির সবগুলো সংখ্যা পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে এবং লেখকের সাথে ব্যক্তিগত চলাফেরা থাকার কারণে এই কথা বলতে পারছি। বই প্রকাশের ক্ষেত্রে এই সমস্যার খুব সহজ একটি সমাধান আছে- লেখা না থাকলে লিখে ফেলা। কিন্তু বললেই কি আর হয়! আমার এক  ফেসবুক পোস্টে মজা করে বলেছিলাম “পৃষ্ঠা ভরার জন্য অন্য জনের কাছ থেকে প্রসঙ্গ বহির্ভূত লেখা ধার করে এনেছেন। সম্পাদক হিসেবে চটপটে হলেও লেখক হিসেবে উনি খুব অলস তো! :D 😀 ৩০% লেখাই উনি প্রসঙ্গের বাইরে অতিরিক্ত যোগ করেছেন। Abdullah Al Mahmud​ ভাইয়ের জন্য শুভকামনা। চিয়ার্স!”

একেবারে শেষে বলতে গেলে- এমন বই কমই হয়। যারা জনপ্রিয় বিজ্ঞান লিখেন তাঁদের প্রায়ই গল্পের ছলে সাহিত্য মানের লেখা লিখে দায়িত্ব শেষ করে ফেলেন। আবদুল্লাহ আল মাহমুদের এই ধরণের প্রচেষ্টাই সিরিয়াস বিজ্ঞানের চর্চায় আমাদের এগিয়ে নিবে। জাওভাত খেয়ে খেয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেলে দাঁত ও জিহ্বার অবস্থা আজীবন শিশুই থেকে যাবে। বিজ্ঞানের মননে বাড়তে হলে শক্ত ও ঝাল কিছু দরকার। এই বইটি এই ক্যাটাগরির। শুভকামনা লেখককে, এরকম আরও বই উপহার যেন আমাদের দেয়। আর শুভকামনা এমন প্রকাশনীর। পেপারব্যাক, খুব ভাল কাগজ, ভাল ছাপা, স্বল্প দাম, সব জায়গায় সহজলভ্যতা সব সুবিধাই দিয়েছে এই প্রকাশনী। এই ধারা যেন চলতে থাকে আর অন্যান্য প্রকাশনীরাও যেন এটি দেখে উৎসাহিত হয়।

 

নামঃ বস্তুর গভীরে  (জিরো টু ইনফিনিটি পদার্থবিজ্ঞান সিরিজের প্রথম বই)
লেখকঃ আবদুল্লাহ আল মাহমুদ
প্রথম প্রকাশঃ জানুয়ারি, ২০১৫
প্রকাশকঃ জিরো টু ইনফিনিটি
পৃষ্ঠাঃ ৮০ মূল্যঃ ৫০ টাকা

লিখেছেন সিরাজাম মুনির শ্রাবণ

আমি শ্রাবণ, পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। মাসিক বিজ্ঞান সাময়িকী জিরো টু ইনফিনিটিতে বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। বিজ্ঞান পড়তে ভালো লাগে, বিজ্ঞান বিষয়ক ভাবনা চিন্তা করে আনন্দ পাই।

সিরাজাম মুনির শ্রাবণ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 48 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    কম দামে এই ধরনের বইয়ের মডেলটা ইন্টারেস্টিং। পৃষ্ঠা সংখ্যা ইংরেজিতে দেয়া চোখে লেগেছে। আর বইয়ের শেষ অংশটুকু মোটেই ভালো লাগে নি। ছোটো একটা বইয়ের এক তৃতীয়াংশ অন্য কারো লেখা নিয়ে আনতে হয়, সেক্ষেত্রে তার নামও দেয়া উচিত সহলেখক হিসেবে।

    • সিরাজাম মুনির শ্রাবণ Reply

      হ্যা ভাইয়া, বইয়ের বিষয়ের সাথে শেষের অংশটা একদমই যায় না। আমি ইঙ্গিত দিয়েছিলাম, বাণিজ্যিক কারণ, পৃষ্ঠা পূরণ।
      আর পৃষ্ঠাগুলো কেন ইংরেজিতে সেটা বলি। লেখায় আমি ওটা বলতে পারতাম, বলিনি। ব্যাপার হচ্ছে জিরো টু নিফিনিটির ম্যাগাজিন ও বইগুলো ইউনিকোডে ছাপানো হয়। সকল প্রেসেই ছাপানোর ক্ষেত্রে “কোয়ার্ক এক্সপ্রেস” ব্যবহার করে। কিন্তু তাতে সমস্যা হচ্ছে কোয়ার্কে ইউনিকোড সাপোর্ট করে না। আর জিরোর সব লেখাই আসে ইউনিকোডে। মেইক আপ টেইক আপ সব মাইক্রোসফট ওয়ার্ডে করা হয়। অটোমেটিক পৃষ্ঠার নাম্বার বসাতে গেলে সেটা ইংরেজিতে চলে আসে। ‘footer’ এ আপাতত বাংলা আসে না। আমি উনি দুইজিনেই অনেক দিন ট্রাই করেছি পারা যায় না বাংলায় নাম্বারিং করতে।

      তবে আবেগের প্রশ্নে বলতে গেলে ম্যাগাজিনে না হয় বাদ দেয়া গেল অন্তত বইতে বাংলা চাই। সেজন্য আলাদা আলাদা করে ৮০ টি পৃষ্ঠাতে ৮০ বার বাংলায় নাম্বারিং করলেই হয়ে যাবে। খুব একটা কষ্টের বিষয় না। বলতে হবে উনাকে।

  2. মাসউদ Reply

    ইউনিকোডে বই ছাপানো হয়েছে! কীভাবে সম্ভব হলো!!

    • Sirajam Munir Shraban Reply

      😀 খুব একটা কঠিন কিছু নয়। প্রযুক্তির এই দিক ঐ দিক আর কয়েকটা সফটওয়ারের ব্যবহার ভালোমতো জানলেই করা সম্ভব। এ সম্বন্ধীয় এটা ওটা শব্দ দিয়ে গুগল করলেও জানা যায়।

আপনার মতামত