kornberg_postcard

রজার কর্নবার্গ একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “রসায়ন হল বিজ্ঞানের রাণী। পদার্থের নিয়মগুলো চারপাশের জগতে প্রয়োগ করতে গেলে রসায়নই  আমাদের পরম আশা দেখায়। এমন কোন বিষয়ের কথা যদি বলা হয় যা সম্পর্কে পৃথিবীর সকল শিক্ষিত ব্যক্তির জানাশোনা থাকা উচিত, তাহলে সেটি হবে রসায়ন।” ২০০৬ সালে কর্নবার্গ রসায়ন শাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান। জীব-কোষের ভেতরে ডিএনএ থেকে আরএনএ তৈরির সময় অনেকগুলো প্রোটিন অংশ নেয়। কর্নবার্গ এদের মধ্যে ডজন-খানেকেরও বেশি প্রোটিন চিহ্নিত করেন। তিনি প্রকৃত অর্থেই জানেন জীবনের পেছনে বিশ্বজনীন প্রক্রিয়াগুলোর বিস্তারিত উন্মোচন করার জন্যে রসায়ন কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

 

আমি তাই কর্নবার্গের সংলাপ-সূত্র ধরে এই প্রশ্নটি তুলি: বিজ্ঞানের জগতে কোন সমীকরণটিকে আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ  মনে করেন? বেশিরভাগ মানুষের জন্যে উত্তরটা সহজ : আইনস্টাইনের বিখ্যাত ভর-শক্তির রূপান্তর সূত্র, E = mc^2। কিংবা কেউ কেউ নিউটনের দেয়া মহাকর্ষের বিপরীত বর্গীয় সূত্রের উদাহরণ দেবেন। তবে মনে রাখা উচিত এই সূত্র দুইটি বেশিরভাগ গবেষণারত পদার্থবিজ্ঞানী, রসায়নবিদ কিংবা জীববিজ্ঞানীর কাছে বলতে গেলে অপ্রাসঙ্গিক। সাধারণ মানুষের কাছে এই সূত্র দুইটির পরিচিতির মূল কারণ হল উভয় সূত্রই বহুল প্রচারিত। তাছাড়া সূত্র-দুটির সাথে দু’জন বিখ্যাত বিজ্ঞানীর নাম জড়িত। বিশ্বজগতকে বোঝার জন্য আইনস্টাইন ও নিউটন দুইজনই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তবে দুর্ভাগ্যক্রমে উভয়ই বিজ্ঞানের অতি-সরলীকরণের সঙ্কীর্ণতার ভুক্তভোগী। নিত্যদিনের জৈব ও বস্তুজগতে পদার্থবিজ্ঞানের যে মূলনীতি কাজ করছে, তাকেই বাদ দিয়ে ফেলে এ সরলীকরণ।

 

যেমন আইনস্টাইনের সূত্রটির কথা ধরা যাক। নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়ায় নক্ষত্র কিংবা সুপারনোভার কামারশালায় বিভিন্ন মৌল তৈরি হয়। বলতে গেলে শুধু এ প্রক্রিয়ার জন্যই বেশিরভাগ পদার্থবিদের কাছে ভর-শক্তির রূপান্তর সূত্রটি গুরুত্ব রাখে। অন্যদিকে রসায়ন-বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন বিক্রিয়া নিয়ে কাজ করেন। এ বিক্রিয়াগুলো কোন নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া নয়, বরং ইলেকট্রন সজ্জার পরিবর্তন। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া আইনস্টাইন তাই নিত্যদিনের রাসায়নিক কিংবা জীব-বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় কোন উপযুক্ত পরিপ্রেক্ষিত পান না। একইভাবে নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রও এ পরিপ্রেক্ষিত থেকে বেশ দূরে। রাসায়নিক আকর্ষণ-বিকর্ষণ জনিত শক্তি নির্ভর করে আয়নের (charge) উপর। এ প্রক্রিয়াগুলো পরিচালিত হয় তড়িৎচৌম্বকীয় শক্তির মাধ্যমে। মহাকর্ষের  চেয়ে তড়িৎচৌম্বকীয় শক্তি ১০^৩৬ গুণ বেশি শক্তিশালী। ১০^৩৬  মানে ১ এর পর ৩৬টি শূন্য – এটা একটা অকল্পনীয় তুলনা! রসায়নবিদ ও জীববিজ্ঞানীদের নিত্যকার সমস্যা সমাধানে মহাকর্ষ শক্তি মাথা ঘামানোর জন্য অত্যন্ত দুর্বল। পরমাণু ও অণুর মিথষ্ক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করেন এমন অনেক পদার্থবিদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

 

বরং বেশিরভাগ পদার্থবিদ ও জীববিজ্ঞানীর নিত্যদিনের গবেষণায় প্রাসঙ্গিক এমন  দুইটি সমীকরণের কথা বলা যাক। এই সমীকরণ দুইটি পদার্থ ও রসায়নের সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে। আর এ দুটি সমীকরণই বিজ্ঞানের এমন একটি ক্ষেত্র থেকে নেয়া হয়েছে যার ভিত্তি একেবারেই মৌলিক। আইনস্টাইন পর্যন্ত ভাবতেন কখনোই এই সূত্রগুলোর পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে না। এই বিজ্ঞান হল তাপগতিবিদ্যা। আর যে সূত্র নিয়ে আমরা কথা বলছি, তাতে তাপগতিবিদ্যার সবচেয়ে প্রাথমিক চলক (variables) বর্তমান। যেসব গুরুত্বপূর্ণ ভৌত কিংবা রাসায়নিক প্রক্রিয়ার কথা আপনি চিন্তা করতে পারেন, কোন ব্যতিক্রম ছাড়াই এ সূত্র সেখানে সংশ্লিষ্ট থাকবে। এই সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যাবে গাছ ও সৌরবিদ্যুত কোষের মাধ্যমে সৌরশক্তি বন্দী করা থেকে ট্রাক ও মানবদেহে জ্বালানী পোড়ানো কিংবা শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলন প্রক্রিয়ায়।

 

অণু সমূহের আচরণ (প্রকারান্তরে মহাবিশ্বের যাবতীয় বস্তুর আচরণ) শাসন করে দুইটি তাপগতীয় রাশি। একটি হল এনথালপি যাকে  H দিয়ে লেখা হয়। এনথালপি বলতে বিভিন্ন অণু-পরমাণুর মধ্যকার পারস্পারিক আকর্ষণ ও রাসায়নিক বন্ধনের শক্তির পরিমাণ এবং প্রাবল্য বোঝায়। অন্যটি হল এনট্রপি যাকে S দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। এনট্রপি বলতে কোন ব্যবস্থার মধ্যে শক্তির প্রকৃতি ও বিশৃঙ্খলা বোঝায়। এনথালপি ও এনট্রপি মিলে তৈরি করে মুক্ত-শক্তি, যাকে  G দিয়ে মাপা হয়। কোন জৈব বা ভৌত ব্যবস্থা থেকে যে ব্যবহার-যোগ্য শক্তি নিষ্কাষিত করা সম্ভব তাই হচ্ছে ওই ব্যবস্থার মুক্ত শক্তি। বাস্তবে কোন ব্যবস্থার এনথালপি, এনট্রপি ও মুক্ত-শক্তির প্রকৃত মাপ হিসাব করার চেয়ে বিজ্ঞানীরা এই তিনটি রাশির পরিবর্তন নিয়েই বেশি আগ্রহী থাকেন। তাই এ তিনটি রাশির প্রতীকের আগে সাধারণত গ্রীক অক্ষর ∆ (ডেল্টা) যুক্ত করে পরিবর্তনকে বোঝানো হয়। তাপগতিবিদ্যার প্রসিদ্ধ দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী কোন ব্যবস্থার এনট্রপি প্রতিনিয়ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেড়ে চলছে। এই বিশৃঙ্খলার সূত্রটি প্রাণের অন্যতম সত্য। তবে এ লেখায় বিশৃঙ্খলার সূত্রটি অপ্রাসঙ্গিক।

 

ভেবে দেখুন, দুইটি অণু যখন পরস্পর সংস্পর্শে আসে তখন কি হয়। দুইটি অণুর মধ্যে কোন রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটতেই হবে এমন কোন কথা  নেই — কোন শক্তিশালী বা দুর্বল বল দিয়ে এদের পারস্পারিক আকর্ষণও হতে পারে। উভয় অণুর সংস্পর্শে আসার সম্পর্কটিকে সাম্য-ধ্রুবক  (Ke) দিয়ে প্রকাশ করা যায়। কোন প্রক্রিয়ার সাম্য ধ্রুবক ওই প্রক্রিয়ার উৎপাদের ঘনত্ব ও বিক্রিয়কের ঘনত্বের অনুপাত ছাড়া আর কিছুই নয়। সাম্য-ধ্রুবক বড় হওয়ার অর্থ হল ওই প্রক্রিয়ায় বেশি পরিমাণে উৎপাদ তৈরি হবে। তার মানে একটি প্রক্রিয়ার কতটুকু সম্পন্ন হয়েছে, কিংবা কতটুকু বিক্রিয়ক উৎপাদে পরিণত হয়েছে Ke আমাদের এই সংবাদ দেয়।  প্রথম মহা-গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণটি আমাদের খবর দেয় কোন প্রক্রিয়ার সাম্যাবস্থা ধ্রুবক কিভাবে মুক্ত-শক্তির পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত:

∆G0 = -RT ln Ke
কিছু গাণিতিক সরলীকরণের পর এর চেহারা দাঁড়ায়,
Ke = e^(-∆G0/RT)

এখানে ln হল প্রাকৃতিক লগারিদম যার ভিত্তি e।  R-কে বলা হয় গ্যাস ধ্রুবক, রসায়নশাস্ত্রের অন্যতম মৌলিক ধ্রুবক হল  R।  T  হল পরিপার্শ্বের তাপমাত্রা। আর ∆G0 হল প্রমাণ-অবস্থায় মুক্ত-শক্তির পরিবর্তন। এই সূত্রটি আমাদেরকে দুইটি বড় আর একটি ছোট বিষয় জানায়। ছোট বিষয়টি হল তাপমাত্রা বাড়িয়ে কোন নির্দিষ্ট দিকে রাসায়নিক বিক্রিয়াটি (বা প্রক্রিয়াটি) সূচকীয় হারে ছোটানো যাবে (এই নির্দিষ্ট দিকে ছোটানোকে আবার বিক্রিয়ার গতিবৃদ্ধির সাথে মিলিয়ে ফেলা যাবে না। গতিবৃদ্ধির বিষয়টি রাসায়নিক গতিবিদ্যার সাথে সম্পর্কিত, তাপগতিবিদ্যার সঙ্গে নয়)। তবে বড় বিষয় দুইটিই খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এই সূত্রটি বলছে, একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়ায় অনুকূল ও ধনাত্মক সাম্যাবস্থা-ধ্রুবক বিদ্যমান থাকলে সেখানে মুক্ত শক্তির পরিবর্তন হবে ঋণাত্মক — যত ঋণাত্মক, তত ভালো। এই প্রপঞ্চটিই ঘুরেফিরে দেখা যায় সর্বত্র। প্রাণের অস্তিত্ব নির্ধারণ করে এমন অনেক জৈব বিক্রিয়ার মুক্ত-শক্তি ঋণাত্মক। এধরনের বিক্রিয়ার মধ্যে আছে জৈব অণুদের সাথে  ATP (কোষের মাঝে শক্তি-বিনিময় করার মুদ্রা) সংযোজন; ক্লোরোফিল কর্তৃক ইলেকট্রন স্থানান্তর কিংবা গ্লুকোজ-অণুর জারণের মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন। যেসব জৈব বিক্রিয়ায় মুক্ত-শক্তির পরিবর্তন ধনাত্মক, তাদের সংঘটন সম্ভব করার জন্য ঋণাত্মক মুক্ত-শক্তির পরিবর্তন হয় এমন বিক্রিয়ার সাথে কোষের অভ্যন্তরে সংযোজিত হয়। যুগপৎ-ভাবে দুধরনের বিক্রিয়া একই জায়গায় সংঘটিত হওয়ার মাধ্যমে মুক্ত-শক্তি তাই মোটা দাগে অনুকূলেই থাকে।

equation

প্রাণ যে কত আশ্চর্যজনক একটি বিষয়, এ সমীকরণের দ্বিতীয় বড় বিষয়টি তার একটি সাক্ষ্য। এ দ্বিতীয় বড় বিষয়টি সবসময় আমাকে বিস্মিত করে। বিজ্ঞানী ও গবেষকরা যাকে বলেন বিবর্তনের “সূক্ষ্ম-সমন্বয়”, যার মাধ্যমে বিবর্তন প্রাণের আবশ্যিক প্রক্রিয়াগুলোর অন্তর্নিহিত ত্রুটিগুলোকে ক্ষুদ্র একটি মাত্রায় নিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে;  প্রাণের ক্রিয়াকান্ডগুলোকে একটি সীমিত গণ্ডীর মধ্যে পরিচালনা করার রাশ টেনে। সমীকরণের দিকে আবারো তাকানো যাক। সমীকরণটি বলছে মুক্ত-শক্তির পরিবর্তন (∆G0) সাম্যাবস্থা ধ্রুবকের (Ke) সাথে সরলরৈখিক ভাবে নয়, বরং সূচকীয় হারে সম্পর্কিত। এই সম্পর্ক কিন্তু খুব ভয়ঙ্কর একটি প্রস্তাবনা। কারণ সূচকীয় হারের কারণে মুক্ত-শক্তির খুব ক্ষুদ্র পরিবর্তনের সাথে সাম্য-ধ্রুবকের বড়সড় পরিবর্তন সম্পর্কিত। “খুব ক্ষুদ্র” মানে কতটুকু ছোট?  প্রতি মোলে ৩ কিলো-ক্যালোরির বেশি নয়।

এই সংখ্যাটা যে কতটুকু ছোট তা বোঝার জন্য মূল আলোচনা থেকে একটু সরে আসি। রসায়নবিদ্যায় শক্তিকে সাধারণত “কিলো-ক্যালরি/মোল” এককে হিসাব করা হয়। দুইটি কার্বন পরমাণুর মাঝে বন্ধনীর শক্তি ৮০ কিলো-ক্যালরি/মোল। দুইটি নাইট্রোজেন পরমাণুর মধ্যে বন্ধনীর শক্তি ২২৬ কিলো-ক্যালরি/মোল। তারমানে নাইট্রোজেন ভেঙে অ্যামোনিয়ায় পরিণত করতে হলে অতি উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে প্রভাবকের উপস্থিতি না হলে নয়। ডিএনএ ও প্রোটিন অণুদের পাশাপাশি আঠার মতো ধরে রাখে যে দুর্বল হাইড্রোজেন বন্ধনী, তার শক্তি ২ থেকে ১০ কিলো-ক্যালরি/মোলের মাঝামাঝি।

৩ কিলো-ক্যালরি/মোল তাই সাধারণ বন্ধনী-শক্তির সামান্য ভগ্নাংশ মাত্র। অল্প একটু ঝাঁকি দিলেই এই শক্তি-বাঁধ অতিক্রম করা যায়। আপনি যদি একজন রসায়নবিদকে কোন বিক্রিয়াকে এই পরিসরের মধ্যে নিয়ে আসতে বলেন তাহলে তিনি অস্বস্তির মধ্যে পড়ে যাবেন। ∆G0-এর উপর  Ke-এর সূচকীয় সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল; মুক্ত-শক্তির পরিবর্তন ০ থেকে ৩ কিলো-ক্যালরি/মোল হওয়ার মানে হচ্ছে সাম্য-ধ্রুবক ১:৯৯.৯৮ অনুপাত থেকে ৯৯.৯৮:১ অনুপাতে রূপান্তরিত হবে। আগের অনুপাতটি উৎপাদের অনুকূলে থাকলেও পরের অনুপাতটি বিক্রিয়কের অনুকূলে (সাম্য-ধ্রুবক আসলে একটি অনুপাত)। এ পরিবর্তনটি এমনকি রাসায়নিকও নয়, বরং সহজ গাণিতিক সত্য। তাই মুক্ত-শক্তির সামান্য পরিবর্তন একটি বিক্রিয়াকে উৎপাদের অনুকূলে থাকার বদলে বিক্রিয়কের অনুকূলে পরিবর্তিত করে দিতে পারে। বোঝাই যাচ্ছে এটা খুব একটা সুখবর নয়, বিশেষ করে যখন একটি বিক্রিয়ার উৎপাদ পরবর্তী বিক্রিয়ার বিক্রিয়ক হিসেবে কাজ করছে। মুক্ত-শক্তির সামান্য পরিবর্তন তাই জীব-কোষের মধ্যে অজস্র বিক্রিয়ার মাধ্যমে বস্তু ও শক্তির প্রবাহে (flux) আমূল-পরিবর্তন ঘটিয়ে দিতে পারে। সুখবর হল এরকমটা কখনোই হয় না। বিবর্তন প্রাণের অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়ায় এমন সূক্ষ্ম-সমন্বয় করেছে যাতে প্রাণের যাবতীয় প্রক্রিয়াগুলো ৩ কিলো-ক্যালরি/মোল শক্তি-সীমার মধ্যেই থাকে। এ সমন্বয় চলে আসছে ২৫০ কোটি বছরেরও পূর্ব থেকে। প্রক্রিয়াগুলোর সমন্বয়ের হাত-ফসকে ছুটে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়; কিন্তু এরকমটা কখনোই হয় না। প্রতিটি জীবের লক্ষ-কোটি কোষের মধ্যে লক্ষ-কোটি রাসায়নিক লেন-দেনের মধ্যে এ সূক্ষ্ম-সমন্বয় কখনোই ব্যর্থ হয় না।

SugarOxidation_bn

হাত-ফসকে না যাওয়ার পেছনে একটি কারণ আছে। যদি জৈবরাসায়নিক বিক্রিয়ার মুক্ত-শক্তির পরিবর্তন বড় হতো, তাহলে কোষসমূহকে তার দরকারি বিক্রিয়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বহু ধকল সহ্য করতে হতো। প্রতিমূহুর্তে ১০ কিলো-ক্যালরি/মোল মুক্ত-শক্তির পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে গিয়ে জীবন তখন একটা মৃত্যুকূপের মধ্যে পতিত হতো। জীব-কোষের মধ্যে সবসময়ই অজস্র বন্ধনী ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা আগে দেখেছি এই বন্ধনীর শক্তি এক থেকে কয়েক ডজনও হতে পারে। কিন্তু এ বন্ধনী সংবলিত বিক্রিয়ক বা উৎপাদসমূহের জড়ো হওয়ার ঝোঁক নিয়ন্ত্রিত হয় মুক্ত-শক্তির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবর্তনের মাধ্যমে। এ ক্ষুদ্র মুক্ত-শক্তির পরিবর্তন জৈববিক্রিয়াকে এক বা অন্যদিকে ধাক্কা দেয়। অন্যভাবে বলা যায়, জীবন বড় সংখ্যার পরিবর্তনের জন্য (বন্ধনী শক্তি) অনেকগুলো ছোট ছোট পরিবর্তনের (মুক্ত-শক্তি) মধ্যে সমন্বয় করে আসছে। বিষয়টি অনেকটা খাড়া পর্বতগাত্রের কিনারায় ভারসাম্য রক্ষার প্রক্রিয়ার মতো — জীবন যে ভারসাম্য রক্ষায় শতকোটি বছর ধরে সফল হয়ে আসছে।

তাই আমরা, ৩ কিলো-ক্যালরি/মোল শক্তি-সীমার সুবিধাভোগীরা, মধুস্বরে গুণগুণ করি খুব সহজে, প্রাণবন্ত হয়ে; একটি সূচকীয় শক্তির পর্বতগায়ে তাপগতিবিদ্যার সূক্ষ্ম-সমন্বয়ের চতুর-ছলে। কারণ Ke = e^(-∆G0/RT)।

 

মূল লেখা:  The only two equations that you should know: Part 1 by  Ashutosh Jogalekar. The Curious Wavefunction. Scientific American. November 20, 2013.

ধন্যবাদ ইমতিয়াজ আহমেদ-কে অনুবাদটি দেখে দেয়ার জন্য। লেখাটি মাসিক বিজ্ঞান পত্রিকা জিরো টু ইনফিনিটি-র ফেব্রুয়ারি ২০১৫-তে প্রকাশিত।

লিখেছেন আরাফাত রহমান

অণুজীববিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইড-এ পিএইচডি শিক্ষার্থী। যুক্ত আছি বায়ো-বায়ো-১ ও অনুসন্ধিৎসু চক্র বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে। আমার প্রকাশিত বই "মস্তিষ্ক, ঘুম ও স্বপ্ন" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৫) ও "প্রাণের বিজ্ঞান" (প্রকৃতি পরিচয়, ২০১৭)।

আরাফাত রহমান বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 67 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

    • আরাফাত রহমান Reply

      ধন্যবাদ। প্রাণের যে বৈশিষ্ট্য আমাকে বিস্মিত করে তা হলো জৈবঅণুগুলোকে অবশ্যই পদার্থ ও রসায়নবিজ্ঞানের কিছু মৌলিক নিয়ম মেনে চলতে হবে। পদার্থ ও রসায়নই একটা লেভেলে এসে জীবন হয়ে যায়!

আপনার মতামত