‘অনুমান’ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। অনুমানের মাধ্যমে আমরা বৈজ্ঞানিক গবেষণা শৃঙ্খলায়িত করে নিতে পারি। একটি গবেষণার ফলাফল কেমন হতে পারে বা কি ধরনে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করলে একটি কোনো একটি গবেষণা থেকে কাঙ্খিত ফলাফল আসতে পারে তা অনেকসময় পুর্ববর্তী জ্ঞান ও গবেষণাসমূহ হতে বেশ নির্ভুলভাবে অনুমান করা যেতে পারে। এতে অনেক মূল্যবান সময়, অর্থ, শ্রম ইত্যাদি বেঁচে যেতে পারে। কতটা নির্ভুল ভাবে অনুমান করা যাবে তা নির্ভর করে কী পরিমান তথ্য নিয়ে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে এবং সেই তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা কত তার উপর। একজন দক্ষ বিজ্ঞানী, শুধু বিজ্ঞানী বলছি কেন, বিভিন্ন পেশার মানুষ নিজ নিজ ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করতে পারলে অনেক সময় বিভিন্ন ঘটনা তথ্য-উপাত্ত থেকে সঠিকভাবে ভবিষ্যতের ঘটনাপঞ্জী আঁচ করতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী কর্মপন্থা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। একজন দক্ষ রাজনৈতিক নেতা তাঁর অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান থেকে ভবিষ্যতে দৃষ্টি দিতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। একজন ব্যাবসায়ী হয়তো অনুমান করতে পারেন কী পরিমান পণ্য কতটা উৎপাদন করলে তা পুরোপুরি বিক্রি করতে পারবেন। এভাবেই অন্যান্য পেশায়ও অনুমান খুব গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে।

এখন বিষয়টিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যাক। এই অনুমানকে কতটা সূক্ষ পর্যায়ে যথযথ করা সম্ভব? একজন মানুষ সুউচ্চ ভবন থেকে লাফিয়ে পড়লে আমরা যথাযথভাবেই অনুমান করতে পারি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সে মৃত্যুবরণ করবে, প্রাণঘাতী রোগ হলে আমরা বলতে পারি কয়েক মাসের মধ্যে তার মৃত্যু হবে। এভাবে কোনো মানুষ সম্বন্ধে আরেকটু বিস্তারিত তথ্য পেলে আমরা তাকে নিয়ে আরেকটু বিস্তারিত ভবিষ্যৎবানী করতে পারি। যেমন: এসএসসি পরীক্ষার্থী একজন ছাত্র বা ছাত্রীর ক্লাস, পরীক্ষার সূচী, তার বিগত পরীক্ষার ফলাফল ইত্যাদি জানতে পারলে আমরা আবছাভাবে ধারনা করতে পারব আগামী কয়েকমাস তাকে কখন কোথায় পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। এভাবে কোনো মানুষের জন্ম থেকে আজ অবধি সব তথ্য পেলে কি আমরা তার সম্বন্ধে আরো নিশ্চিত আরো কিছুটা বিস্তারিত অনুমান করতে পারব না? তার তার প্রতিটি কোষ, প্রতিটি ঘটনার তথ্য জানা থাকলে কি আমরা বলতে পারব না সে কখন ঘুম থেকে উঠবে, কখন নাস্তা করবে, আজ ক্লাসে যাবে কিনা, কাউকে গালাগাল করবে কিনা ইত্যাদি? ইদানিং খেলাধূলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কিছু কিছু কম্পিউটার প্রোগ্রাম ব্যাবহারের চেষ্টা চলছে যাদের মধ্যে বিভিন্ন দল ও খেলোয়ার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়ে থাকে যেন প্রোগ্রামটি সেসব তথ্য বিশ্লেষণ করে কোনো ম্যাচ সংঘটিত হওয়ার পূর্বের একটি অনুমিত এবং একই সাথে যথাযথ ফলাফল দিতে পারে। এগুলো কর্মপদ্ধতি এখনো আশাপ্রদ নয় তবে হয়তো ভবিষ্যতে প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে এরা আরো যথার্থতার দিকে এগিয়ে যাবে। এই ধারায় আমরা যদি আরেকটু বিস্তারিত অবস্থায় যাই, আমরা যদি এই মহাবিশ্বের প্রতিটি পরমাণু, তাদের অভ্যন্তরীন প্রতিটি মৌলিক কণিকা এবং তাদের বিভিন্ন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে জেনে যাই তাহলে কী এর প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি খুঁটিনাটি সম্বন্ধে ভবিষ্যৎবানী করতে পারব না? অদ্যাবধি পদার্থবিজ্ঞানের ধারনা অনুযায়ী মোট ১২ টি মৌলিক কণিকা (হিগসসহ ১৩ টি) এবং তাদের মধ্যে চার ধরনের মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে এই সমগ্র মহাবিশ্ব তৈরি। এদের প্রতিটির সম্বন্ধে বিস্তারিত তথ্য পেলে তো আমাদের সব খুঁটিনাটি সম্বন্ধে ভবিষ্যতবানী করতে পারার কথা!

কিন্তু না! মূল ব্যাপারটি এত সহজ নয়, বিশেষ করে আমরা যদি কোয়ান্টাম মোকানিক্সের আলোকে চিন্তা করি। সাব-এটমিক পর্যায়ের কণাগুলো স্থুল দৃশ্যমান জগতের বস্তুগুলোর মতো আচরণ করে না। এবং তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট গতিপ্রকৃতি বা অবস্থানও থাকে না। বরং এই পর্যায়ের কণাগুলোকে ব্যাখ্যা করতে হয় সম্ভাব্যতার আলোকে। হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা তত্ত্ব আমাদের অনেকেরই জানা আছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী একই সময় কোনো কণিকার গতি এবং অবস্থান যথার্থভাবে নির্ণয় করা যাবে না। যদি আমরা কোনো কণার অবস্থান সুস্পষ্ট ভাবে নির্ণয় করতে সক্ষম হই তাহলে তার গতি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে ফলে আমরা কণাটির পরবর্তী অবস্থান সম্বন্ধে সুনিশ্চিত হতে পারব না আবার আমরা যদি কণাটির গতি যথার্থভাবে নির্ণয় করে ফেলতে পারি তাহলে কণাটির সেই মুহূর্তের অবস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

একটি কণা একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোন অবস্থানে থাকবে সেটি সুস্পষ্টভাবে নির্ণয় করা যাবে না বরং একটি নির্দিষ্ট স্থান জুড়ে কণাটির অবস্থানের একটি সম্ভাব্যতা থাকবে এবং এই স্থানের কোথাও কণাটি থাকার সম্ভাবনা কতটুকু থাকবে তা আমরা হিসেব করতে পারি কিন্তু সেটি সেখানে সুনিশ্চিতভাবে থাকবে কিনা তা আমরা কোনো ভাবেই আগে থেকে পরিমাপ করতে পারি না। আমরা পরিমাপ করতে পারি কেবল মাত্র তখনই যখন আমরা কণাটিকে সেই অবস্থানে পর্যবেক্ষণ করব এবং আরো অদ্ভুৎ ভাবে আমরা কণাটিকে পর্যবেক্ষন না করা পর্যন্ত একই সময় সেটি তার সম্ভাবনা অনুযায়ী সব জায়গাতেই অবস্থান করবে।

কাজেই বোঝা যাচ্ছে প্রকৃতিতে সর্বদাই কিছু না কিছু রহস্য থেকে যাবে।

লিখেছেন bengalensis

পোস্টডক্টরাল গবেষক: Green Nanomaterials Research Center Kyungpook National University Republic of Korea.

bengalensis বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 70 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. সিরাজাম মুনির শ্রাবণ Reply

    এবং পদার্থবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের মাঝে আজীবনই একটা পর্দা থেকে যাবে। একসময় ভাবতাম পদার্থবিজ্ঞান হয়তো জীববিজ্ঞানের পুরো দায়িত্বই কাঁধে নিয়ে নিবে। প্রাণের সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করবে, সূত্র দিবে এবং একটা ছাঁচে ফেলে দিবে। ব্যাস, আর কী লাগে? কিন্তু পদার্থবিজ্ঞান বলে আমি পারব না। :/

    • আরাফাত রহমান Reply

      সিস্টেমস কেমিস্ট্রি বলে একটা জিনিসের নাম শুনছি যেটা অনেকটা এরকম বিষয় নিয়ে কাজ করে। সেটা হলো রসায়নের নিয়মগুলো কিভাবে একটু বিস্তৃত পরিসরে জীবনের মতো একটা জিনিস তৈরি করতে পারে।

আপনার মতামত