বাস্তব জগতে আমরা যত ধরনের জ্যামিতিক বস্তুর সম্মুখীন হই তার সবগুলোই ত্রিমাত্রিক জ্যামিতিক বস্তু বা থ্রিডি জ্যামিতিক ফিগার। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে যে জ্যামিতিগুলো করানো হয় তার প্রায় সবই দ্বিমাত্রিক জ্যামিতি। দ্বিমাত্রিক জ্যামিতিকে বলা হয় ইউক্লিডীয় জ্যামিতি। এই দ্বিমাত্রিক জ্যামিতির ভীত ইউক্লিড নামের একজন গণিতবিদ তৈরি করেছেন বলে এই জ্যামিতিকে ইউক্লিডীয় জ্যামিতি বলা হয়। ইউক্লিড হচ্ছেন একজন ইতিহাসবিখ্যাত গ্রীক গণিতবিদ। স্কুল কলেজে পঠিত জ্যামিতির প্রায় সবই ইউক্লিড রচিত ‘এলিমেন্টস’[1] নামের ১৩ খণ্ডের বই থেকে উৎসারিত। ইউক্লিডের এই বইটি একটা বিশেষ দিক থেকে সেরা। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি এখন পর্যন্ত সবচে নির্ভুল বই।[2] ইউক্লিডীয় জ্যামিতির নিয়ম-নীতি শুধু দুই মাত্রার তল বা সমতল বস্তুর  মাঝে কাজ করে।

চিত্রঃ ইউক্লিড ও ইউক্লিড রচিত বিশ্ববিদিত গ্রন্থ এলিমেন্টস এর ইংরেজি ও বাংলা সংস্করণ।

সমতল পৃষ্ঠ ব্যাতিত অন্যান্য পৃষ্ঠ যেমন গোলক, সিলিন্ডার, টোরাস, কোণক ইত্যাদি পৃষ্ঠে ইউক্লিডীয় জ্যামিতি কাজ করে না। এর জন্য আলাদা জ্যামিতিক নীতির দরকার হয়। যেমন ছোট্ট একটা উদাহরণ হিসেবে ত্রিভুজের কথা বলা যায়। দ্বিমাত্রিক পৃষ্ঠে ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি দুই সমকোণ কিন্তু গোলক পৃষ্ঠে তিন কোণের সমষ্টি হয় দুই সমকোণের চেয়ে বেশি এবং টোরাস পৃষ্ঠে হয় দুই সমকোণের চেয়ে কম। এই ধারণাটা জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানে দারুণভাবে ব্যবহার করা হয়। আলোক রেখার সরল পথে চলা, কিংবা বক্র পথে চলার ফলে বর্তমান অবস্থা কী আছে এবং ভবিষ্যৎ অবস্থা কেমন হবে তার ব্যাখ্যা দিতে অ-ইউক্লিডীয় জ্যামিতির এই ধারণা কাজে লাগানো হয়। সে গল্প পদার্থবিজ্ঞানের জন্য তোলা থাক।

চিত্রঃ ত্রিমাত্রিক পৃষ্ঠে ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি দুই সমকোণ নাও হতে পারে।

বাস্তবে কিন্তু দ্বিমাত্রিক কোনো বস্তুই আমরা দেখতে পাই না। দ্বিমাত্রিক যত কিছুই দেখতে পাই তার সবই ত্রিমাত্রিক বস্তুর অংশ। যেমন কাগজের পাতা। পাতার মাঝেই দ্বিমাত্রিক জ্যামিতির চিত্র আঁকি, সম্পাদ্য আর উপপাদ্য প্রমাণ করি। কিন্তু এই পাতা একটা খাতার অংশবিশেষ। ভালো করে বললে খাতার একটি পৃষ্ঠ। এখন যদি বলা হয় খাতার পাতাটি খাতা থেকে ছিড়ে নিলেই তো এটা স্বাধীনভাবে দ্বিমাত্রিক হয়ে যায় তাহলেও ভুল হবে। খাতার পাতা ছিড়ে নিলেও পাতাটি ত্রিমাত্রিক বস্তুই থাকে। পাতাটির অল্প হলেও উচ্চতা আছে। এমন কয়েকটা উদাহরণ হতে পারে দেয়াল, ব্ল্যাকবোর্ড, টেবিলের পৃষ্ঠ, টেলিভিশনের পর্দা, স্থির পানির উপরিতল ইত্যাদি। এদেরকে একটা দিক থেকে দেখলে দ্বিমাত্রিক মনে হলেও আসলে এরা ত্রিমাত্রিক।

তিন মাত্রায় উত্তরণ

কীভাবে একটি ত্রিমাত্রিক ফিগার পেতে পারি? জ্যামিতিক উপায়ে তিন মাত্রা পেতে হলে শূন্য মাত্রা থেকে শুরু করতে হবে। শূন্যমাত্রিক বস্তু হচ্ছে বিন্দু, যার দৈর্ঘ্য প্রস্থ উচ্চতা কিছুই নেই, আছে শুধু অবস্থান। তবে কলমের অগ্রভাগ দিয়ে খাতায় খোঁচা দিলে যে বিন্দুর সৃষ্টি হয় তা সত্যিকারের তাত্ত্বিক বিন্দু নয়। কারণ কলমে খাতায় আঁকা বিন্দুর কম করে হলেও দৈর্ঘ্য আছে। প্রস্থ আর উচ্চতাও আছে। যত স্বল্পই হোক আছে। কলমের কালি কিংবা পেনসিলের শিস কার্বন দিয়ে গঠিত। আর প্রতিটা কার্বন পরমাণুর দৈর্ঘ্য আছে। তাত্ত্বিকভাবে যে বিন্দুকে বোঝায় সে বিন্দু চোখে দেখা সম্ভব নয়। শূন্যমাত্রার বিন্দু যেন শূন্যেরই প্রতিনিধিত্ব করে। তবে হিসাব নিকাশের জন্য  মাঝে মাঝে কিছুটা সরলীকরণের প্রয়োজন পড়ে। যেমন অসীম সংখ্যক বিন্দু পরপর মিলে রেখার সৃষ্টি করে। এবার একে অন্য দিক থেকে দেখা যাক। রেখা শূন্য মাত্রার আর শূন্যকে অসীম দিয়ে গুণ করলে শূন্যই থাকে। কিন্তু তার অবস্থান আছে এবং এটি শুধুই ‘শূন্য’ নয়, এটি ‘শূন্যমাত্রিক’। অসীম সংখ্যক শূন্যমাত্রিক বিন্দু পরপর মিলে রেখার সৃষ্টি করে। রেখা আবার একমাত্রিক বস্তু। অসীম সংখ্যক একমাত্রিক রেখা পাশাপাশি অবস্থান করে দ্বিমাত্রিক তলের সৃষ্টি করে। তেমনই অসীম সংখ্যক দ্বিমাত্রিক তল একটির উপর একটি নিরবিচ্ছিন্নভাবে সজ্জিত হয়ে ত্রিমাত্রিক ক্ষেত্রের সৃষ্টি করে। প্রায় অনেকটা বইয়ের মতো। অনেকগুলো পাতলা পাতা একটির উপর একটি মিলে বই সৃষ্টি করে।

চিত্রঃ শূন্যমাত্রিক বস্তু হতে ত্রিমাত্রিক বস্তুতে উত্তরণ। ছবিঃ প্রাণের মাঝে গণিত বাজে[3]

দ্বিমাত্রিক তল যদি চতুর্ভুজ হয় তাহলে তার দ্বারা গঠিত ত্রিমাত্রিক বস্তুটি হবে ঘন। তল যদি বৃত্ত হয় তবে উৎপন্ন হবে সিলিন্ডার। এগুলো ভদ্র ছেলের মতো সোজাসাপ্টা উপায়ে পাওয়া আকৃতি। কিন্তু আকৃতি যদি অনিয়তাকার হয় তাহলে সেগুলো পাওয়া যাবে কী উপায়ে?

ত্রিমাত্রিক বস্তু মাত্রই দ্বিমাত্রিক বস্তু হতে পাওয়া যাবে। সিলিন্ডার কিংবা ঘনবস্তুর বেলায় হয়তো একই আকৃতির পৃষ্ঠ একটির উপর আরেকটি বসে বসে তৈরি হয়েছে কিন্তু অনিয়তাকার বস্তুর বেলায় একই আকৃতির হবে না আরকি। যেমন কোণকের বেলায় একটি বৃত্তের উপর আরেকটি সামান্য ক্ষুদ্র ব্যাসার্ধের বৃত্ত, তার উপর এটি থেকে ক্ষুদ্র আরেকটি এবং এভাবে বৃত্তের আকৃতি ছোট হতে হতে একটি বিন্দুতে পৌছালে কোণক পাওয়া যাবে। একইভাবে সামান্য একটু ভিন্ন উপায়ে দ্বি-কোণক পাওয়া যায়। আর একদমই অনিয়তাকার বস্তুর ক্ষেত্রে অনিয়তাকার দ্বিমাত্রিক তল যুক্ত হয়ে এমন আকৃতি নিয়েছে ধরে নিতে হবে। থ্রিডি প্রিন্টার ঠিক এভাবেই কাজ করে। নানা আঁকারের বস্তুকে বইয়ের পাতার মতো অনেকগুলো ভাগে ভাগ করে ধীরে ধীরে একটার পর একটা সাজিয়ে গড়ে তোলে।[4]

আবর্তন

নিখুঁত জ্যামিতিক আকৃতির জন্য আবর্তন একটি দারুণ উপায়। আবর্তন হচ্ছে কোনো একটি অক্ষের সাপেক্ষে ঘূর্ণন। যেমন কার্তেসীয় স্থানাংক ব্যবস্থায় একটি অর্ধ-বৃত্তকে আবর্তন করালে একটি গোলক পাওয়া যাবে। অক্ষের সাথে তেরচা একটি সরলরেখা বা একটি ত্রিভুজকে আবর্তন করলে পাওয়া যাবে কোণক। চতুর্ভুজকে নিয়ে আবর্তন করলে পাওয়া যাবে সিলিন্ডার।
আবর্তনের মাধ্যমে অন্যান্য অনিয়তাকার বস্তুগুলোও নির্দিষ্ট আকৃতি হতে পাওয়া যায়। সাধারণ ত্রিমাত্রিক জ্যামিতিক ফিগার হিসেবে মূলত গোলক, সিলিন্ডার, পিরামিড, প্রিজম, কোণক, ফ্রস্টাম ইত্যাদি এদেরকেই বোঝানো হয়। বাকি যত ধরনের ত্রিমাত্রিক বস্তু আছে তাদের অনিয়তাকার শ্রেণিতে ফেলা হয়।

চিত্রঃ আবর্তনের ফলে অর্ধ-বৃত্ত হতে পাওয়া যায় গোলক, ত্রিভুজ হতে পাওয়া যায় কোণক। আবর্তনের মাধ্যমে অনিয়তার বস্তুও পাওয়া যায়।

উচ্চমাত্রা

তিন মাত্রা আলোচনা করতে গিয়ে তিন মাত্রার চেয়ে ছোট মাত্রা আলোচিত হয়েছে কিঞ্চিৎ। এবার তিন মাত্রার উপরের মাত্রা নিয়ে সামান্য কিছু আলোচনা থাকুক। তিন মাত্রার পরের মাত্রা হিসেবে অবশ্যই চলে আসে চার মাত্রা। এটি হচ্ছে ‘স্থানের চতুর্থ মাত্রা’। পদার্থবিজ্ঞানের কল্যাণে সময়কে সার্বজনীনভাবেই চতুর্থ মাত্রা হিসেবে ধরা হয়। স্থান ও কালের আলোচনায় স্থানের তিন মাত্রার সাথে আরেকটি মাত্রা সময় যুক্ত হয়। সেজন্য একে চতুর্থ মাত্রা হিসেবে ধরা হয়। মূলত সময়ের মাত্রা স্থানের মাত্রা হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি মাত্রা। এটিকে চার নম্বরেই ফেলতে হবে এমন কোনো কথা নেই।

স্থানের চতুর্থ মাত্রার দারুণ একটি উদাহরণ হচ্ছে ‘টেসারেক্ট’। দ্বিমাত্রিক তলে আঁকা একটি বর্গকে ভিজুয়ালি ত্রিমাত্রিকে পরিবর্তিত করে ফেলা যায়। বর্গটির পাশে আরেকটি বর্গ এঁকে দুই বর্গের কোণাগুলো যোগ করে দিলেই ত্রিমাত্রিক সদৃশ ঘনক পাওয়া যায়। এই ত্রিমাত্রিক ঘনকের চারপাশে আরও ঘনক যোগ করে একটির সাথে আরেকটির সংযোগ দিলেই চার মাত্রার টেসারেক্ট (Tesseract) পাওয়া যাবে।[5] [6]

চিত্রঃ স্থানের চতুর্থ মাত্রায় উত্তরণ।

ত্রিমাত্রিক স্থানে টেসারেক্ট বোঝা যায় না, এখানটা তো দ্বিমাত্রিক বইয়ের পাতা! টেসারেক্ট কল্পনা করে নিতে হয়। অনলাইনে ভিডিও ও এনিমেশনের মাধ্যমে দেখলে কিছুটা পরিষ্কার বোঝা যায়। ২০১৪ সালে নির্মিত স্মরণকালের সবচে মেধাবী চলচ্চিত্র পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের হৈ চৈ ফেলে দেয়া সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র ইন্টারস্টেলার এর মাঝেও টেসারেক্ট সম্বন্ধীয় একটি অংশ দেখা যায়। সিনেমার নায়ক যখন কৃষ্ণবিবরে পরে যায় পঞ্চম মাত্রার প্রাণীরা তাকে অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত টেসারেক্ট ক্ষেত্রের মাঝে নিয়ে উপস্থিত করে। সেখানে এই দিক ঐ দিক ওপর নিচ যেদিকেই তাকানো হোক না কেন শুধুই তার শিশু মেয়ের থাকার ঘরের নানা সময়ের ক্রিয়া কর্ম। অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত করে শুধু একটা মেয়ের থাকার ঘর, পড়ার ঘরের সময় ছিল কারণ পঞ্চম মাত্রার প্রাণীরা[7] পৃথিবী রক্ষার জন্য এই মেয়েকে নির্বাচন করেছিল। এই সিনেমাকে ব্যাখ্যা করে বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী কিপ থর্ন একটি বই লিখেছিলেন The Science Of Interstellar  নামে।[8] যাদের মস্তিষ্কে সিনেমার বক্তব্য ধরা পড়েনি তারা বইটি পড়তে পারেন। উল্লেখ্য প্রথম দেখাতে আমারও কিছু অংশ মাথার উপর দিয়ে গিয়েছিল। বইটা সংগ্রহ করার পর দেখি সিনেমার কানায় কানায় বিজ্ঞান আর প্রায়োগিক গণিত।

চিত্রঃ টেসারেক্ট ও ইন্টারস্টেলার চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য।

চার মাত্রার পরেও স্থানের পঞ্চম মাত্রা, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম… মাত্রা আছে। স্থানের পঞ্চম মাত্রা কল্পনা করতে গেলে মাথা ধরে যায়! ত্রিমাত্রিক বিশ্বে স্থানের চতুর্থ মাত্রা কল্পনা করতে গেলেই পরিবেশকে এলোমেলো হয়ে যায় আর এর এটা তো পঞ্চম মাত্রা। আগ্রহীরা উইকিপিডিয়াতে এনিমেশনের মাধ্যমে পঞ্চম মাত্রার স্থানের ঘূর্ণন দেখতে পারেন।[9] এই ঘূর্ণন মন দিয়ে উপলব্ধি করতে গিয়ে আমাকে হাল ছেড়ে দিতে হয়েছে! ঘনক পদ্ধতিতে চার মাত্রার স্থান হতে পাঁচ মাত্রার স্থানে উত্তরিত হলে যে ক্ষেত্র পাওয়া যায় তাকে বলে ‘পেন্টারেক্ট’।

চিত্রঃ পাঁচ মাত্রার পেন্টারেক্ট ও সাত মাত্রার হেপ্টারেক্ট এর অত্যন্ত জটিল প্রজেকশন।

তবে এমনটা ভাবা উচিৎ হবে না যে, যে জিনিষ কাজে লাগে না, যে জিনিষের দরকার নেই, বাস্তব জগতে যে জিনিষের উপস্থিতি নেই তা নিয়ে শুধু শুধু মাতামাতি করা হচ্ছে। পদার্থবিজ্ঞানের নানা সমস্যায় উচ্চ মাত্রা অনেক আলোচিত হয়। বিশেষ করে জ্যোতির্বিজ্ঞানে ও কণা পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চ মাত্রা খুব কাজে লাগে। তন্তু তত্ত্ব বা স্ট্রিং থিওরি তো বিশটিরও অধিক মাত্রার অস্তিত্বের সম্ভাবনার কথা বলে।[10] তবে অধিক পরিমাণ মাত্রা নিয়ে মন খুঁতখুঁত করা মনের জন্য আশার কথা যে, এত পরিমাণ মাত্রা বৃহৎ স্কেলে দেখা যায় না। অতিক্ষুদ্র কোয়ান্টাম জগতে তারা একে অপরের সাথে মিলে তালগোল পাকিয়ে থাকে।[11] আর সেই সাথে আমাদের ভাগ্য ভাল যে তিন মাত্রার উপরের কোনো মাত্রার প্রাণীর অস্তিত্ব বা আলামত আমরা দেখতে পাই না। যদি আলামত থাকতো তাহলে মুহূর্তে মুহূর্তে বড় মাপের এলোমেলো কিছু হয়ে যেত। একটা উদাহরণ দেই- আমরা ত্রিমাত্রিক প্রাণী এবং চাইলেই দ্বিমাত্রিক যেকোনো কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। ধরা যাক দ্বিমাত্রিক জগতের কিছু কিছু এলাকা আমাদের সামনে। বাস্তব মানুষ হাত দিয়ে দ্বিমাত্রিক জগৎ থেকে একটা মানুষকে তুলে নিলো। ত্রিমাত্রিক স্থানে এনে ঘুরিয়ে আবার সমতলে রেখে দিল। তাহলে মানুষটার সবকিছু উল্টে যাবে। আয়নায় যেমন এক দিকেরটা আরেক দিকে সরে যায় তেমন। মানুষটার হৃৎপিণ্ড যদি বাম দিকে থাকে, বাস্তব মানুষের আলামতে সেটা চলে যাবে ডান দিকে। ডান হাত ডান পা চলে যাবে বাম দিকে। আবার মজাদার কিছুও হতো। যেমন ধরা যাক, কোন দয়াবান ত্রিমাত্রিক মানুষ দেখল দ্বিমাত্রিক জগতে একজন লোক চতুর্ভুজ বা বৃত্ত কিংবা বদ্ধ কোনো জেলখানায় আটকে আছে। কয়েদীর পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয় আবদ্ধ ক্ষেত্রের বাইরে যাওয়া। কিন্তু বাস্তব মানুষ চাইলেই তৃতীয় মাত্রাকে ব্যবহার করে দ্বিমাত্রিক কয়েদীকে মুক্ত করে দিতে পারে। বৃত্ত থেকে তুলে তিন মাত্রার আরোহণ করিয়ে এবং না ঘুরিয়ে বৃত্তের বাইরে রেখে দিলেই কয়েদী মুক্ত! তেমন করে চার মাত্রার প্রাণী যদি থাকত আর তারা যদি আমাদের ত্রিমাত্রিক মানুষদের উপর উল্টাপাল্টা কিছু করত তাহলে এমনই বাজে অবস্থা দেখা দিত।[12] [13] চতুর্থ মাত্রার ব্যাপারটা রহস্যময় হওয়াতে এটা নিয়ে প্রচুর বিজ্ঞান কল্প-কাহিনী লেখা হয়। বাংলা ভাষায় মুহম্মদ জাফর ইকবালও এই বিষয়কে কেন্দ্র করে কল্প-কাহিনী লিখেছেন। নাম “ইরন”। এবার একটু কষ্ট করে পঞ্চম মাত্রা ও ষষ্ঠ মাত্রার প্রাণীদের জগৎ ও তারা কী কী দুঃসাধ্য সাধন করতে পারতো তা কল্পনা করার চেষ্টা করুন তো!

চিত্রঃ কাল্পনিক দ্বিমাত্রিক প্রাণীর দর্পণীয় পরিবর্তন ও দ্বিমাত্রিক কয়েদীর নাটকীয় মুক্তি। ছবিঃ Robert O’Keefe (মিচিও কাকুর বই ‘হাইপার স্পেস’ থেকে)।[14]

বাস্তব জগতের সবকিছুতেই ত্রিমাত্রিক বস্তু। এই ছড়াছড়িময় বস্তুর মাঝে অনেক বস্তুই আছে সুষম জ্যামিতিক আকৃতির। তাদের দিকে নজর দিলে আমরা তাদের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবো। যেমন ফুটবলে, মার্বেলে আছে গোলক; পাইপে, রডে, গ্যাস জারে আছে সিলিন্ডার; কলমের প্রান্তে, রাস্তার বিভাজকে আছে কোণক; দেয়ালের ইটে আছে ঘনক, আছে প্রিজম। এদের পাশাপাশি এমন আছে যেখানে একসাথে একাধিক ভিন্ন ভিন্ন সুষম আকৃতি একত্রে অবস্থান করে। অনেক খাট বা চেয়ারের পা থাকে সিলিন্ডার আকৃতির। পায়ের উপরে থাকে গোলকার একটা বস্তু। সৌন্দর্যের জন্য দেয়া থাকে। একই সাথে সিলিন্ডার ও গোলক। নকশাদার মসজিদের গম্বুজে গোলক, উপ-গোলক, ডিস্ক, কোণক সবই থাকে। এদের উপস্থিতির ফলেই একটা স্থাপত্য সৌন্দর্য লাভ করে। প্রাচীন স্থাপত্যকলায় এদের সরব উপস্থিতি দেখা যায়। এমনইভাবে আধুনিক স্থাপত্যেও এদের দেখা যায় ভিন্ন স্বাদে। এমন কয়েকটি স্থাপত্যের ছবি নীচে তুলে দেয়া হল।

আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা গাণিতিক বস্তুর উদাহরণ, জ্যামিতিক আকৃতির উদাহরণ। আমরা চাইলে তাদের কাছ থেকে জ্যামিতি তথা গণিতের সৌন্দর্যটা উপভোগ করতে পারি। এটাও হতে পারে জীবনের খোঁড়াক। এই জিনসগুলো দেখতে উপভোগ করতে টাকা পয়সা লাগে না। যেমনটা লাগে সিনেপ্লেক্সে একটা সিনেমা দেখতে কিংবা ডিশ এন্টেনার ভাড়া দিয়ে খেলা দেখতে। ফ্রি ফ্রি পাওয়া সৌন্দর্য। প্রকৃতির মাঝে যদি এরা থেকেই থাকে আর তাদের উপভোগ করে যদি আনন্দ পাওয়া যায় তাহলে আনন্দ গ্রহণ করতে মানা কোথায়? সকলের জীবনই ত্রিমাত্রিক সাদাকালো স্বপ্নে ভরে যাক। 🙂

 

তথ্যসূত্র ও নোট

[1] বইটির বেশ খানিকটা অংশ বাংলায় অনুবাদ হয়েছে ‘ইউক্লিড ও এলিমেন্টস’ নামে। অনুবাদ করেছেন আসিফ, প্রকাশক, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র।
[2]  মূলত এটি গণিতের বই বলে এত দীর্ঘ সময় পর্যন্ত নির্ভুল থাকার গৌরব অর্জন করতে পেরেছে। অন্যান্য বই যেমন বিজ্ঞানের বইয়ের ক্ষেত্রে স্বভাবতই সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বিজ্ঞান পরিবর্তিত হয়ে যায়। ফলে বইয়ে লেখা যে তথ্য একসময় সঠিক ছিল তা ভুল হয়ে যায়। কিন্তু জ্যামিতির উপপাদ্যগুলো অপরিবর্তনীয়, বিজ্ঞান জগতে যতই পরিবর্তন আসুক না কেন সমতলে ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি দুই সমকোণই থাকবে।
[3] সৌমিত্র চক্রবর্তী, প্রাণের মাঝে গণিত বাজে (জ্যামিতির জন্য ভালোবাসা), অনুপম প্রকাশনী, ২০১২
[4] How 3D Printing Works, http://www.printbotz.com/how-does-3d-printing-work
[5] Wikipedia : Tesseract
[6] Interstellar: Review and Explanation, Shaer Ahmed, http://bioscopeblog.net/shaerahmed/32728
[7] এখানে পঞ্চম মাত্রার প্রাণীরা মূলত মানুষই। এখানে বলা হয়েছে মানুষেরাই ভবিষ্যতে প্রযুক্তিকে আয়ত্ত করে পঞ্চম মাত্রায় বিচরণ করছে।
[8] Kip Thorne, The Science Of Interstellar, W. W. Norton & Company, 2014, ISBN, 9780393351385
[9] http://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/d/dc/Penteract.ogv
[10] তন্তু তত্ত্বের এই ব্যাপারগুলো একটু জটিল। তন্তু তত্ত্বে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণ মাত্রার সম্ভাব্যতা পাওয়া যায়। বোসনীয় তন্তু তত্ত্ব (bosonic string theory) অনুসারে মাত্রা পাওয়া যায় ২৬ টি। অন্যান্য অনেকগুলো দিক থেকে পাওয়া যায় ১০ টি। (A Brief Table of String Theories, http://www.superstringtheory.com/basics/basic5.html)
[11] মহাবিশ্বের সীমানা পেরিয়ে, কিফায়াত চৌধুরী, মাসিক জিরো টু ইনফিনিটি, জানুয়ারি, ২০১৪
[12] Michio Kaku, Hyperspace : A Scientific Odyssey Through Parallel Universes, Time Warps, and The Tenth Dimension, Oxford University Press, 1994
[13] সীমান্ত রেজা, উচ্চ মাত্রার যাদু ও রিম্যানীয় জ্যামিতির বিপ্লব, মাসিক পাই-জিরো টু ইনফিনিটি, ডিসেম্বর ২০১৪, http://bn.z2i.org/category/article/1677/dimension
[14] Michio Kaku, Hyperspace : A Scientific Odyssey Through Parallel Universes, Time Warps, and The Tenth Dimension, Oxford University Press, 1994 (পৃষ্ঠা ৪৭ ও ৪৮)

লিখেছেন সিরাজাম মুনির শ্রাবণ

আমি শ্রাবণ, পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। মাসিক বিজ্ঞান সাময়িকী জিরো টু ইনফিনিটিতে বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। বিজ্ঞান পড়তে ভালো লাগে, বিজ্ঞান বিষয়ক ভাবনা চিন্তা করে আনন্দ পাই।

সিরাজাম মুনির শ্রাবণ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 48 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. নাজিয়া Reply

    মাত্রা নিয়ে, আমার পড়া সবচেয়ে ভাল আর সহজ লেখা। ধন্যবাদ আপনাকে 🙂

  2. আরাফাত রহমান Reply

    তথ্য সমৃদ্ধ একটা লেখা যেখানে ত্রিমাত্রিক জ্যামিতির প্রাথমিক পরিচয় খুব সহজে করিয়ে দিয়েছো। আমার ভালো লেগেছে এই লাইন: “মূলত সময়ের মাত্রা স্থানের মাত্রা হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি মাত্রা। এটিকে চার নম্বরেই ফেলতে হবে এমন কোনো কথা নেই।” সময়কে আমরা অনেক সময় স্থানের তৃতীয় মাত্রার সাথে যুক্ত করে আরেকটি মাত্রা ভাবি কিন্তু বিষয়টা সেরকম না।

আপনার মতামত