‘আমার ভেতরে একটা গুঁটলি বাসা বেঁধেছে।’- সান্ধ্যভোজ শেষে নিজের বিছানায় আরাম করে বসে বান্ধবীদের উদ্দেশ্যে হঠাৎ বলে বসলেন হেনরিয়েটা। ‘অ্যাঁ! কী বললি?’ চাচাতো বোন স্যাডি জিজ্ঞেস করল তাকে। ‘গুঁটলি… পিণ্ড,’ আবার বললেন হেনরিয়েটা। ‘এই যে এইদিকটাতে,’ বলে তলপেটের একটা নির্দিষ্ট অংশ দেখিয়ে দিলেন তিনি। ‘আর হঠাৎ হঠাৎ ব্যথা করে।’ ‘অ! ব্যাপারটা তো ভাল ঠেকছে না! কাউকে দেখা, হেনি। ডেল এর নতুন ভাইবোনও হতে পারে।’ ‘উমমমম… হুমমম,’ অন্যমনস্কভাবে উত্তর দিলেন হেনরিয়েটা। মাত্র কয়েক মাস আগে জন্ম নেয়া মেয়ে ডেবোরাহ বা ডেল এর কথা ভেবে কিছুটা উষ্ণ বোধ করেন। চার সন্তানের জননী হেনরিয়েটার পঞ্চম সন্তানে আপত্তি ছিল না। কিন্তু তিনি আঁচ করতে পেরেছিলেন এ ‘পিণ্ড’টির অবস্থান তাঁর গর্ভের কাছাকাছি হলেও এর প্রকৃতি গর্ভের শিশুর মত উষ্ণ ও কোমল নয়। এর কয়েক মাস পরেই অবশ্য পঞ্চম সন্তান ‘জো’ এর উপস্থিতি অনুভব করেন নিজের ভেতরে। সব শুনেটুনে চাচাতো বোন স্যাডি বললেন, ‘তোর সেই পিণ্ডটা মনে হয় তবে ডেল এর ভাইবোনই, দেখলি হেনি?’ ‘উমমমম… হুমমম,’ আবারও অন্যমনস্ক উত্তর দিলেন হেনরিয়েটা। খারাপ কিছুর সন্দেহটা তখনও যায়নি মন থেকে।

কিন্তু অভিযোগ করাটা স্বভাবে ছিল না তাঁর। ভালবাসতেন পাঁচ সন্তানের নানা আবদারমাখা সংসার সামলাতে এবং পটু ছিলেন ভাবালু স্বামীপ্রবরটির মর্জি-অমর্জি বুঝে নিতে। ঝোঁক ছিল সুন্দর জিনিসের প্রতি আর পছন্দ করতেন বাসায় বেড়াতে আসা চাচাতো–ফুপাতো ভাইবোনদের দেখাশোনা করতে। কিন্তু প্রায় ১ বছর ধরে চলতে থাকা এ ব্যথাটা শিশুসন্তান জো এর জন্মের পরও ভোগাচ্ছিল তাকে। অবশেষে একদিন যখন চার মাস বয়সী জো কে রেখে বাথরুমে স্নান করার সময় হঠাৎ রক্তপাত হতে থাকল, তখন আর ব্যাপারটাকে ধামাচাপা দেয়াটা নিরাপদ মনে করলেন না হেনরিয়েটা। জো জন্মের সময় অস্বাভাবিক রক্তপাত যে কিছুতেই বন্ধ হচ্ছিল না- সে কথাটাও মনে পড়ে গেল তাঁর। ধীরস্থিরভাবে স্নান সেরে বাথরুম থেকে বের হয়েই সোজা স্বামীর কক্ষে গেলেন। ‘আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার এখন তোমার। আমার রক্তপাত বন্ধ হচ্ছে না,’ শান্তকণ্ঠে স্বামীকে জানালেন তিনি।

ঘটনাটা ১৯৫১ সালের জানুয়ারি মাসের। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের রোয়ানোকে জন্ম নেয়া হেনরিয়েটা ল্যাকস তখন ৩১ বছর বয়সী আকর্ষণীয়া নারী-পাঁচ সন্তানের জননী। আফ্রিকান-আমেরিকান বা ‘কালো’ দের জন্য সে সময়টা খুব বেশি সুবিধার ছিল না। জন্মের সময় দেয়া ‘লরেটা প্লেজেন্ট’ নামটা পাল্টে কীভাবে হেনরিয়েটা হয়ে গেল-তিনি জানেন না। জন্মস্থান রোয়ানোকের কথাও বেশি মনে পড়ে না তাঁর। দশ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন নবম। শুধু জানেন সবচেয়ে ছোট ভাইটিকে জন্ম দেয়ার সময় মা মারা যান। তাঁর মদো-মাতাল বাবার পক্ষে যে তাদের ভাইবোনদের লালনপালনের ভার নেয়া সম্ভব হল না-সেটাও খুব বেশি বিস্ময়কর লাগে না তাঁর কাছে। তাঁদের দশ ভাইবোনকে বাবা বিলিবণ্টন করে দিলেন আত্মীয়স্বজনদের মাঝে। হেনরিয়েটা পড়লেন ক্লোভারে তাঁর দাদার ভাগে, সবার মাঝে তিনি ‘গ্র্যান্ডপা টমি’ নামেই পরিচিত। গ্র্যান্ডপা টমির হোম-হাউজেই দেখা ডেভিড ল্যাকস বা ডে এর সাথে। উষ্কখুষ্ক চুলের ডে যখন হোম-হাউজে পৌঁছলেন, হেনরিয়েটার বয়স তখন সবেমাত্র চার আর ডে এর বয়স সবে সাড়ে নয় পেড়িয়েছে। তখনও হেনরিয়েটা জানতেন না এই উষ্কখুষ্ক চুলের ছেলেটির সাথেই বাকি জীবনটা কাটাবেন তিনি, প্রথমে খেলার সঙ্গী ও পরে জীবনসঙ্গী হিসেবে।

Pic 1

       স্বামী ডেভিড ল্যাকসের সাথে হেনরিয়েটা ল্যাকস

অতীতের কথাগুলো ভাবতে ভাবতে হাসপাতালের বাইরে পুরনো বুইক গাড়িটিতে অপেক্ষারত স্বামীসহ তিন সন্তানের কথা মনে পড়ে যায় তাঁর। সন্তানগুলোর মাঝে দুইজন এখনো নিতান্তই শিশু। ‘কালো’ দের জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা পরীক্ষাকক্ষটিতে ডাক্তার-নার্সদের ছুরি-কাঁচি, যন্ত্রপাতি দেখে হেনরিয়েটা অসহায় বোধ করেন কিছুটা। বায়োপসি, সার্ভিক্স-এ কঠিন কঠিন শব্দগুলো শুনে মনে হল যেন অন্য কোন ভুবনে চলে এসেছেন, যেখানকার ভাষা তাঁর জানা নেই। ডাক্তার দেখানো, চিকিৎসা করা-এই ব্যাপারগুলোকেও বড্ড ভয় তাঁর। তবুও এখানে না এসে উপায় ছিল না। গোটা বাল্টিমোরে জন হপকিন্সই একমাত্র হাসপাতাল যেখানে তাঁর মত ‘কালো’ দের চিকিৎসা করা হত। আড়চোখে একবার হাসপাতালের প্রবেশকক্ষে দাঁড় করানো যিশুখ্রিস্টের মূর্তিটির দিকে তাকিয়ে নিলেন হেনরিয়েটা।

তাঁর পেটের ভেতরের ‘পিণ্ড’ টা যে আসলে কী-তা বের করতে ডাক্তারেরা হিমশিম খেয়ে গেলেন। হেনরিয়েটার ডাক্তার-ড. হাওয়ার্ড জোন্সকে প্রথমে চিন্তা করা সিফিলিসের সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দিতে হল। অবশেষে একে ‘জরায়ুর এপিডার্ময়েড কার্সিনোমার প্রথম ধাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।

হেনরিয়েটার ক্যান্সার কোষের কিছু নমুনা সংগ্রহের জন্য ড. জোন্স ডেকে আনেন ড. জর্জ গাইকে। অনেকদিন ধরেই তাঁর ল্যাবরেটরিতে অমর কোষস্তর সূচনার চেষ্টা করে আসছিলেন ড. গাই-ড. জোন্সের বন্ধুমানুষ। কাজপাগল এ খেয়ালী বিজ্ঞানীটি নিজেই নিজেকে ঠাট্টা করে ডাকতেন “পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত শকুন”- যিনি যেখানেই পেতেন টিউমার, ক্যান্সার সোজা কথা অমরত্ব লাভ করেছে এমন যে কোন কোষের নমুনা সংগ্রহ করে বেড়াতেন। তাই হেনরিয়েটার কোষের নমুনা সংগ্রহের আমন্ত্রণ সাদরেই গ্রহণ করলেন তিনি। হেনরিয়েটার ক্যান্সার কোষ আর স্বাভাবিক কোষ-দুই জায়গা থেকেই নমুনা সংগ্রহ করে নিজ ল্যাবরেটরিতে নিয়ে গেলেন গবেষণার জন্য।

ক্যান্সারে আক্রান্ত হেনরিয়েটার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো কাটে জন হপকিন্সে প্রচণ্ড যন্ত্রণায়। জরায়ুমুখে সেলাই করে দেয়া রেডিয়াম টিউবগুলো তাঁর জরায়ুর টিউমার পুরোপুরি অপসারণ করতে পারলেও থামাতে পারেনি টিউমার কোষগুলোর সারা দেহে ছড়িয়ে পড়াটা। ডাক্তারেরাও বুঝতে পেরেছিলেন তাকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। শুধুমাত্র কষ্ট কমানোর জন্য ঘুমের ওষুধ দিয়ে অচেতন করে রাখা হত তাঁকে। আর হেনরিয়েটা দাঁতে দাঁত চেপে অমানুষিক যন্ত্রণা সহ্য করতেন আর নিজের সন্তানগুলোর কথা ভাবতেন। সবচেয়ে বেশি চিন্তা বড় মেয়ে এলসিটার জন্যেই। জন্মের সময় ধাত্রীর হাত থেকে পড়ে যাওয়াতেই মনে হয় শিশুর মত রয়ে গেল মেয়েটা। ঘুমের ওষুধের প্রভাবেই কি না জানেন না শৈশবের একের পর এক স্মৃতি ঝাপসা হয়ে আসতে থাকে তাঁর চোখে-ক্লোভারে গ্র্যান্ডপা টমির হোম-হাউজ, সাদা চামড়ার শিশুদের বিদ্রূপ এড়িয়ে স্কুলে যাওয়া, গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে সামান্য ঝড়ের আভাসে ভাইবোনদের সাথে উচ্ছ্বাসে তামাকক্ষেতে দৌড়ে বেড়ানো, চাচাতো ভাইদের সাথে ঘোড়দৌড়ে অংশ নেয়া ডেভিডের জন্য উৎসাহে চিৎকার করা……। অবশেষে ১৯৫১ সালের ৪ অক্টোবর প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ভুগে মারা যান হেনরিয়েটা। কিন্তু ক্যান্সারে মৃত্যুই তাঁর শেষ পরিণতি ছিল না। অমরত্বের তখন সবেমাত্র শুরু।

ড. গাই এর ল্যাবরেটরিতে ততদিনে হেনরিয়েটার কোষগুলো অস্বাভাবিক কাজকারবার শুরু করে দিয়েছে। তিনি যখন হেনরিয়েটার কোষগুলো নিয়ে সহকারী মেরি কিউবেককে দিলেন, তখনও সেগুলোর প্রতি খুব বেশি আগ্রহ দেখালেন না মেরি। খাওয়াদাওয়া শেষ করে ধীরেসুস্থে দক্ষ হাতে টেস্টটিউবে ভরে ফেললেন কোষগুলোকে আর টেস্টটিউবের গায়ে রোগিণীর নামের প্রথম দুই অক্ষর লিখে কোষগুলোকে চিহ্নিত করলেন-‘HeLa’। কিন্তু তিনি জানতেন অন্যান্য কোষের মতই মানবদেহের সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত টেস্টটিউবজাত পরিবেশ বেশিদিন সহ্য হবে না কোষগুলোর। বিজ্ঞানীদের কোষস্তর নিয়ে গবেষণার পিছনেও প্রধান বাধা ছিল এটাই। ‘খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি’র মত কোষস্তর নিয়ে গবেষণার চেয়ে দেহের বাইরে তাদের বাঁচিয়ে রাখতেই বেশি খাটাখাটনি করতে হত বিজ্ঞানীদের। হেনরিয়েটার স্বাভাবিক কোষগুলো এই নিয়ম মেনে কিছুদিন পরই মারা গেলেও মেরির চিন্তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিব্যি মাসের পর মাস দেহের বাইরে বেঁচে রইল তাঁর ক্যান্সার কোষগুলো। অন্যান্য কোষের মত এঁটে থাকার জন্য কোন শক্ত পৃষ্ঠের দরকার হয় না তাদের। দিব্যি তরল কালচার মিডিয়ায় একের উপর এক বিভাজন করে করে জমা হতে থাকে এই HeLa কোষ। আসলে মানুষ বা অন্যান্য প্রাণীদেহের স্বাভাবিক কোষের একটি বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর কোষ বিভাজন বন্ধ হয়ে মৃত্যু ঘটে তাদের আর ‘contact inhibition’ নামের একটি ধর্মের কারণে বিভাজিত হতে হতে যেই অপর পাশে স্বজাতীয় অন্য কোন কোষের সম্মুখীন হয়, ওমনি কোষ বিভাজন বন্ধ করে দেয় তারা। কিন্তু টিউমার বা ক্যান্সারের ধর্মই হচ্ছে কোষের স্বাভাবিক নিয়মগুলোকে পাল্টে দেয়া। যার কারণে ‘contact inhibition’ এর নিয়মকানুন না মেনে অনবরত কোষ বিভাজন হতে থাকে তাদের।

contact inhibition     ‘contact inhibiton’ যেভাবে কাজ করে কোষের বিভাজন নিয়ন্ত্রণে

সে যাই হোক, HeLa কোষের এই অমরত্ব যে বিজ্ঞানের জগতে তোলপাড় লাগিয়ে দেবে-তা বুঝতে দেরি হল না ড. গাই এর। Cell culture এর গবেষণায়ও যে এই কোষস্তর বিপুল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে দেবে- তাও বুঝলেন তিনি। মানুষের অমরত্ব লাভের স্বপ্নটাও খুব বেশি দূরে মনে হল না তাঁর কাছে। তাই প্রথমে একটিমাত্র  HeLa কোষ ব্যবহার করে বিশুদ্ধ HeLa কোষের স্তর তৈরি করেন আর cell culture এর গবেষণায় নিয়োজিত আছেন-এমন বিজ্ঞানীদেরকে খামে ভরে ভায়ালে করে HeLa কোষ উপহার পাঠাতে লাগলেন ড. গাই। নিজেও যেখানে যেতেন-সযত্নে কাপড়ে মুড়ে সাথে নিয়ে যেতেন HeLa কোষের ভায়াল যাতে বাইরের কোন অবাঞ্ছিত জীবাণু আক্রমণ না করে বসতে পারে এদের। বিজ্ঞানীরা এ কারণে HeLa কোষকে ঠাট্টা করে ডাকতেন ‘ড. গাই এর অমূল্য সন্তান’।

শুরু হল HeLa কোষ নিয়ে গবেষণা। যে কোন রাসায়নিক বা তাপ-চাপে মানবকোষের প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা দরকার? ডাক পড়ত HeLa কোষের। ১৯৫২ সালের দিকে বিজ্ঞানী জোনাস সল্ক এর নতুন আবিষ্কৃত পোলিও ভ্যাক্সিন মানবকোষের উপর কীরকম কাজ করে তা পরীক্ষার জন্য দরকার পড়ে মানবকোষের। উৎপন্ন হতে থাকল টনকে টন HeLa কোষ। তার উপর পরীক্ষা-নীরিক্ষা চালিয়েই তৈরি হল প্রথম পোলিও ভ্যাক্সিন।

pic 2 (B)pic 2 (A)

অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে HeLa কোষ। হেনরিয়েটার দেহের ভেতরের চেয়ে তাঁর দেহের বাইরেই বেশি সময় কাটিয়ে ফেলেছে এই কোষস্তর। এমনকি এতদিনে যে পরিমাণ HeLa কোষের জন্ম হয়েছে তা দিয়ে গোটা পৃথিবী কয়েকবার মুড়ে ফেলা সম্ভব। মূলতঃ Human Papilloma Virus (HPV) এর দ্বারাই হেনরিয়েটার দেহে এ ক্যান্সার কোষের সূচনা।

মানবকোষে প্রসাধনীসামগ্রীর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জানতে হোক বা কোন বিস্ফোরকের ক্রিয়া জানতেই হোক-HeLa কোষ হয়ে ওঠে এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার সবচাইতে উত্তম মাধ্যম। এর কারণও আছে। মানবকোষের সবচাইতে উত্তম প্রতিস্থাপক তো বটেই, বেড়ে ওঠার জন্য এ কোষস্তরের চাহিদাও অন্যান্য কোষের মত খুব বেশি না-শুধু পুষ্টির জন্য যথেষ্ট খাবারদাবার আর বেড়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত স্থান পেলেই অনবরত কোষ বিভাজন করে বেড়ে উঠতে থাকে সে। যে কোন রোগে মানবকোষের প্রতিক্রিয়া জানতে জুড়ি নেই এ কোষস্তরের। ক্যান্সারের গবেষণায়ও অসাধারণ অবদান রাখে HeLa কোষ। ভাইরোলজির মত আস্ত একটি বিজ্ঞানের শাখাও প্রতিষ্ঠা করে ফেলল এ কোষস্তর। এমনকি মহাকাশে ভ্রমণ করে সেখানেও তার অমরত্বের প্রমাণ রেখে এসেছে HeLa কোষ। এ যেন প্রাচীন নর্স মৃত্যুর দেবী Hela এর মতই-যার দেহের একপাশ অপরূপ নারীমূর্তি আর অপরপাশ কঙ্কালসার মৃতদেহের। সুস্থ মানুষদের অভিবাদনের জন্য তিনি তার জীবিত হাতের বদলে কঙ্কালসার হাতটিই বাড়িয়ে দেন। আর হেনরিয়েটাও তার স্বাভাবিক কোষের বদলে বাড়িয়ে দিলেন তার ক্যান্সার কোষ-শুধুমাত্র পার্থক্য হল এ ক্ষেত্রে অভিবাদন শুধু একজন মানুষের প্রতি নয়, সমগ্র মানবজাতির প্রতি।

যে HeLa কোষ নিয়ে এত মাতামাতি, তার নেপথ্যে যে নারীর অবদান, তাঁর নাম অজানাই রয়ে গিয়েছিল গোটা বিশ্ববাসীর কাছে। তাই তাঁর পরিবারও অজ্ঞাত ছিল দেহের বাইরে বেঁচে থাকা এ অমর কোষস্তর সম্পর্কে। আসলে ড. গাই যখন হেনরিয়েটার কোষের নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন, তখন রোগীদের দেহ থেকে বিনা অনুমতিতে তাদের টিস্যুর নমুনা পরীক্ষার জন্য সংগ্রহ করা ছিল রোজকার ব্যাপার, অতএব হেনরিয়েয়াটার পরিবারকেও তাঁর কোষ সংগ্রহের তথ্যটি জানানোর প্রয়োজন বোধ করেননি ড. গাই। তাই হেনরিয়েটার মৃত্যুর প্রায় দুই দশক পরে যখন তাঁর সন্তানদের জেনেটিক তথ্য জানার জন্য জন হপকিন্স হাসপাতাল থেকে ফোন আসতে থাকল ডেভিডের কাছে, স্বভাবতই বিস্মিত হলেন তিনি। আসলে HeLa কোষ নিয়ে উন্নত গবেষণার কাজে হেনরিয়েটার কোষের খুঁটিনাটি জানার জন্য তাঁর সন্তানদের জেনেটিক তথ্যের দরকার পড়ে হপকিন্সের। কিন্তু প্রকৃত গোমর তখনও ফাঁস করেনি তারা ল্যাকস পরিবারের সামনে। ল্যাকস পরিবার প্রথম HeLa কোষ সম্পর্কে জানতে পারে সত্তরের দশকে মাইকেল রজার্স নামের এক সাংবাদিকের মাধ্যমে-রোলিংস্টোন পত্রিকায় যার ল্যাকস পরিবার সম্পর্কে একটি অনুচ্ছেদ ছাপা হয়। HeLa কোষের সন্ধান পেয়ে ল্যাকস পরিবারের সামনে এক অদ্ভুত জগতের উন্মোচন হল। বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে মৃতা স্ত্রীর কোষ কীভাবে তাঁর দেহের বাইরে বেঁচে থাকতে পারে ভেবে পেলেন না ডেভিড। এমনকি প্রযুক্তির কল্যাণে হেনরিয়েটার কোষগুলোকে দিব্যি জমাট বাঁধিয়ে ভায়ালজাত করে ১৬৭ ডলারে বিক্রি করা হচ্ছে-এ তাজ্জব তথ্যটিও হজম করতে হল তাঁকে। স্বল্পশিক্ষিত ল্যাকস পরিবারের কাছে মনে হল হেনরিয়েটার প্রেতাত্মাই বুঝি তাঁর কোষকে দেহের বাইরে বাঁচিয়ে রেখেছে এতদিন। বা ভুডুও হতে পারে। ক্লোভারে ল্যাকসদের পারিবারিক কবরস্থানে হেনরিয়েটাকে স্মৃতিফলকবিহীন কবরে শায়িত করার সময় প্রলয়ংকর ঝড়ের কথাও মনে পড়ে যায় ডেভিডের। সোজা পাত্রী তো আর ছিল না হেনি!

কিন্তু এত এত কোম্পানি যখন তাঁর কোষ ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করছে, সেখানে তাঁর পরিবারের মানুষজন অর্থের অভাবে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে-এ বিষয়টাও নিতান্ত ক্ষুব্ধ করে তোলে তাদের। সেই সাথে নিজেদের বংশের বেফাঁস তথ্য গোটা বিশ্বের সামনে উন্মোচন হয়ে যাওয়ার ভয় তো আছেই। ব্যাপারটা কোর্ট অবধি গড়ায়। অবশেষে ২০১৩ সালে NIH (The National Institutes of Health) একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয় ল্যাকস পরিবারের সাথে। এ চুক্তি অনুযায়ী যে কোন বিজ্ঞানীকে হেনরিয়েটার জিনোম বা জীনের নীলনকশা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। এ চুক্তির বদৌলতে হেনরিয়েটার পরিবারও কর্তৃত্ব পায় তাঁর বংশগতির কোন তথ্য বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে বাইরে ফাঁস হবে-তা নির্ধারণের।

২০১০ সালে রেবেকা স্ক্লুটের লেখা ‘The Immortal Life of Henrietta Lacks’ বইটির মাধ্যমে হেনরিয়েটার অবদানের বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হয় বিশ্ববাসীর কাছে। এরপর থেকে স্বীকৃতি আসতে থাকে বিশ্বজুড়ে। ২০১১ সালে মর্গান স্টেট ইউনিভার্সিটি হেনরিয়েটাকে সম্মাননা ডিগ্রী প্রদান করে। একই সালের ১৪ এপ্রিল একটি নতুন স্বাস্থ্য ও জীববিজ্ঞান গবেষণার জন্য তৈরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাঁর নামে রাখার সিদ্ধান্ত নেয় ওয়াশিংটনের এভারগ্রীন স্কুল ডিস্ট্রিক্ট। ২০১০ সালে মোরহাউজ স্কুল অব মেডিসিনের ড. রোনাল্ড পাতিলো হেনরিয়েটার কবরে স্মৃতিফলক স্থাপনের উদ্যোগ নেন। বই আকৃতির এ স্মৃতিফলকে নাতিনাতনিরা তাঁর এপিটাফ রচনা করেন-

“হেনরিয়েটা ল্যাকস, ১লা আগস্ট, ১৯২০-৪ঠা অক্টোবর, ১৯৫১। এক অনন্যসাধারণ নারী, স্ত্রী এবং মায়ের স্মৃতিতে যিনি বহু মানুষের জীবনে অবদান রেখেছেন।
এখানে শায়িত আছেন হেনরিয়েটা ল্যাকস (HeLa)। তাঁর অমর কোষ আজীবন মানবজাতিকে সাহায্য করে যাবে।
অশেষ ভালবাসা ও প্রশংসা, আপনার পরিবারের তরফ থেকে।”

pic 4

হেনরিয়েটার কবর ও তাঁর কবরের স্মৃতিফলক

 

তথ্যসূত্রঃ The Immortal Life of Henrietta Lacks by Rebecca Skloot
All the Way to Flesh (Documentary)

লিখেছেন Sumaiya Sharmin

আমি সুমাইয়া, অণুজীববিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা বিশেষ করে জীববিজ্ঞান বিষয়ে অনুসন্ধিৎসা প্রবল। এছাড়াও দর্শন ও মনোবিজ্ঞান নিয়ে জানার আগ্রহ রয়েছে।

Sumaiya Sharmin বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 1 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    টিস্যু কালচারের মতো একটা জটিল বিষয়কে ঝরঝরে বাংলায় উপস্থাপনাটা দারুণ লাগলো। এরকম লেখনি খুব বেশি পড়ি নি, গল্প বলার আঙ্গিকটা চমৎকার ছিলো। ইন্টারনেটে পাঠককে দিয়ে প্রায় দুই-হাজার শব্দের সুদীর্ঘ লেখা টানা পড়ে শেষ করানো বিশাল সাফল্যের ব্যপার — সেদিক দিয়ে তুমি শুরুতেই বাজিমাত করে দিয়েছো বলতে হবে 🙂

    হেলা সেল লাইনের এত বিস্তারিত জানতাম না। বিশেষ করে অনুমতি না নিয়ে হেনরিয়েটার কোষ নিয়ে গবেষণা করাটা দুঃখজনক — এখানে বায়োএথিকসের বিষয় চলে আসে।

    “অমরত্বের মৃত্যু” শিরোনামটা একটু কেমন হয়ে গেল না? বরং আমি তো দেখতে পারছি মরণশীলের অমরত্বের (হেনরিয়েটার মৃত্যু হলেও তার সেল-লাইনের বেঁচে থাকা) ঘটনাই এই লেখার বিষয়বস্তু।

    বিজ্ঞান ব্লগে স্বাগতম!

    • Sumaiya Sharmin Reply

      ধন্যবাদ, ভাইয়া, আপনার উৎসাহমূলক মন্তব্যের জন্য 🙂
      আসলে “অমরত্বের মৃত্যু” বলতে আমি এখানে বুঝাতে চেয়েছি হেনরিয়েটার মৃত্যুটাই অমরত্বের অর্থাৎ তাঁর মৃত্যুই তাঁর জন্য অমরত্ব নিয়ে এসেছে।
      অনুমতি না নিয়ে হেনরিয়েটার কোষ নিয়ে গবেষণা করার ব্যাপারটা আসলেই দুঃখজনক। মূলত এ ঘটনাই আমাকে এ বিষয়টি নিয়ে লিখতে উদ্দীপিত করেছে।

  2. রুহশান আহমেদ Reply

    HeLa সেল নিয়ে অ্যাকাডেমিক কারিকুলামে পড়াশোনা থাকলেও এরকম লেখা এটাই প্রথম। এখন চরিত্রটিই বেশ জীবন্ত মনে হচ্ছে যেন আমার কাছে।

    বিজ্ঞানব্লগে স্বাগতম, এখানে এটা আপনার প্রথম লেখা হলেও মনে হয় নিয়মিত চর্চা আছে। অনুরোধ থাকবে নিয়মিত লেখার।

    • Sumaiya Sharmin Reply

      ধন্যবাদ আপনার বিশ্লেষণমূলক মন্তব্যের জন্য 🙂
      আমারও ইচ্ছে আছে এবং চেষ্টা থাকবে নিয়মিত লেখার।

আপনার মতামত