গত ১০ জুলাই নিকোলা টেসলার জন্মদিন গেল। টেসলা আধুনিক বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার প্রবর্তক। টেসলা একজন রহস্যময় মানুষ; তাঁকে নিয়ে যতটা জল্পনা-কল্পনা, গল্প ও গুছব ছড়িয়েছে ততটা অন্য কোনো গবেষককে নিয়ে ছড়িয়েছে বলে মনে হয় না।

নিকোলা টেসলা

১৮৮২ সালে টেসলা, টমাস আলভা এডিসনের অধীনে কাজ শুরু করেন। এডিসনের অনুন্নত DC বিদ্যুৎ জেনারেটরের উন্নতি সাধনের জন্য তিনি নিয়েজিত হন এবং এই কাজের জন্য তাঁকে ৫০ হাজার ডলার পারিশ্রমিক দেওয়া হবে বলে এডিসন তাঁকে জানান। কিন্তু যন্ত্রগুলোর নতুন ডিজাইন তৈরির পর এডিসন দাবী করেন তিনি টেসলার সাথে রসিকতা করেছিলেন, এবং পরিবর্তে তাঁর সাপ্তাহিক পারিশ্রমিক ১০ ডলার থেকে উন্নীত করে ১৮ ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাব করেন। টেসলা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এডিসনের কোম্পানী ত্যাগ করেন।
১৮৮৭ সালে টেসলা আলফ্রেড ব্রাউনের সাথে যৌথভাবে টেসলা ইলেক্ট্রিক কোম্পনী চালু করেন এবং AC ডায়নামো উদ্ভাবন করেন। বিদ্যুৎ পরিবহন ও বিতরনের জন্য AC বিদ্যুৎ খুবই উপযোগী ছিলো কারণ এতে অপচয় হতো কম। সেই সময় বিদ্যুৎ বিতরনের জন্য এডিসনের DC লাইনগুলো চালু ছিলো যাতে প্রচুর পরিমাণ বিদ্যুৎ লাইনের মধ্যেই অপচয় হয়ে যেত। এ নিয়ে টেসলা এডিসনের সাথে পুনরায় দ্বন্দে জড়িয়ে পড়েন। এডিসন দাবী করেন টেসলার AC বিদ্যুতে অপচয় কম হলেও তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত AC কারেন্টই বিজয়ী হয় এবং অদ্যাবধি বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনে AC বিদ্যুৎই ব্যাবহৃত হয়ে আসছে।
বিদ্যুৎ বিতরণ ছাড়াও টেসলা এক্স রে, রেডিও, তারবিহীন সঞ্চালন ব্যাবস্থা, কৃত্রিম বর্জ্রপাত এসব নিয়েও কাজ করেন। তিনি আমেরিকা থেকে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ইউরোপে একটি তারহীন যোগাযোগ ব্যাবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
১৯১৫ সালের নভেম্বরে রয়টারে প্রকাশ করা হয় সেবছরের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার টমাস এডিসন এবং নিকোলা টেসলাকে যৌথভাবে প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেলো সেই নোবেল দেওয়া হয়েছে হেনরী ও লরেন্স ব্র্যাগসকে তাঁদের এক্সরের ক্রিস্টালোগ্রাফির সূত্র আবিষ্কারের জন্য। যদিও টেসলার জীবনীকারেরা বিভিন্ন সময় দাবী করেছেন যে টেসলা এবং এডিসন নোবেল প্রাইজের দাবীদার ছিলেন কিন্তু তাদের পারস্পরিক শত্রুতার কারণে তাঁদের পুরস্কার দেওয়া হয়নি। নোবেল কমিটি অবশ্য এই বিষয়গুলো অস্বীকার করেছে।
টেসলা একজন বহুভাষাবিদ ছিলেন। তিনি আটটি ভাষা ব্যবহারে দক্ষ ছিলেন। শোনা যায় তিনি দিনে দুই ঘন্টা ঘুমাতেন এবং অনেক সময় বিরামহীনভাবে একটানা তিনচারদিন কাজ করতেন। তিনি বিয়ে করেননি, কোনো সম্পর্কেও জড়িয়েছেন বলে শোনা যায় না এমনকি স্থায়ী বাসস্থানও ব্যবহার করতেন না। তাঁর জীবনের বিরাট অংশ কেটেছে নিউইয়র্কের বিভিন্ন হোটেলে।
টেসলার মৃত্যুর পর একটি ধারনা ছড়িয়ে পড়ে যে, তিনি বায়ুমন্ডল থেকে কয়েলের মাধ্যমে মুক্ত শক্তি সংগ্রহ করে তা বিদ্যুতে রূপান্তর করার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। এই প্রযুক্তি বড় বড় শক্তি উৎপাদন কোম্পানীগুলোর স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় বলে তারা কখনো এটিকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেয় নি। কিন্তু এটি একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বৈ কিছুই নয়। তিনি বায়ুমন্ডল থেকে বিদ্যুৎ নিষ্কাশন করেছেন বটে তবে তা ব্যাবহারিক শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহারের মতো যথেষ্ট নয়।

ফেসবুকে আপনার মতামত জানান

লিখেছেন bengalensis

পোস্টডক্টরাল গবেষক: Green Nanomaterials Research Center Kyungpook National University Republic of Korea.

bengalensis বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 70 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    টেসলা-এডিসন দ্বন্দ্ব একটা ঐতিহাসিক উদাহরণ বিজ্ঞান যে খুব নৈর্বক্তিক কোন ব্যপার নয়।

    • bengalensis Reply

      এতো খুবই কমন। রিসার্চ পেপ্যার সাবমিট করার সময় জার্নালের ওয়েবসাইটে একটা অপশনই থাকে conflict of interest ডিক্লেয়ার করার জন্য। বলা হয়ে থাকে paper politics জগতের সবচেয়ে বাজে পলিটিক্সগুলোর একটি। রবার্ট হুক তাঁর ইলাস্টিসিটির সুত্রটি চুরি হয়ে যাওয়া রোধে দীর্ঘ ১৮ বছর কোড করে রেখেছিলেন। যখন নিশ্চিত হওয়া গেলো সেটির অন্য কোনো দাবীদার নেই তখনই তিনি সেটি প্রকাশ করেছেন। খোঁজ নিলে সর্বযুগে সর্বক্ষেত্রেই এ ধরনের নমুনা পাওয়া যাবে।

আপনার মতামত