আমাদের সমাজের প্রায় অধিকাংশ মানুষের মাঝে বিদ্যমান অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার নিয়ে তিন চারটা বই পড়েছি ইদানীং। এদেরই দুটি কাজের বই নিয়ে সামান্য কিছু আলোচনা। বইগুলো হয়তো খুব বেশি ওজনের না, কিন্তু সকলেরই পড়া উচিৎ। আর যাই হোক, জ্ঞান অর্জন করা দূরে থাকুক, অন্তত কুসংস্কার আর অন্ধবিশ্বাস থেকে তো বের হতে হবে। অতিরিক্ত জ্ঞান আহরণে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, কিন্তু প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা থেকে প্রত্যেকটি মানুষকে বের হতেই হবে।

যৌন বিষয়ে সাধারণ জ্ঞান

by

বিদ্যুৎ মিত্র (কাজী আনোয়ার হোসেন)

26142682

 

সেবা প্রকাশনীর বই পড়ে যারা বড় হয়েছে তাদের অনেকেই এই বইটা পড়েছে। এই বইটা যদিও সম্প্রতি তেমন একটা পাওয়া যায় না তারপরেও অনেকের মুখেই এই বইটার কথা শুনা যায়। বইটির লেখক হিসেবে আছে “বিদ্যুৎ মিত্র”, আদতে এই নামের আড়ালে আছেন স্বয়ং কাজী আনোয়ার হোসেন।

আমাদের সমাজে যৌনতা একটা ট্যাবু। যেখানেই ‘যৌন’ শব্দটা আছে, হোক সেটা মুখের কথায় কিংবা লেখায়, মানুষদের, এমনকি শিক্ষিত মানুষদের নাক উপচানো শুরু হবে। খারাপ কথা হচ্ছে। অশ্লীল কথা হচ্ছে। এসব কী অশ্লীল কথা বলার যায়গা?

লেখক বইটা লিখেছেন ছোটদের প্রতি লক্ষ করে। এবারেও অনেকে বলবে এসব কি ছোটদের পড়ানোর জিনিস? এগুলো পড়ে তো ছোটরা নষ্ট হবে আরও। তাদেরকে মনে হয় হাতে কলমে শেখাতে হবে যৌনতা মানেই অশ্লীল কিছু নয়। যৌন শিক্ষা মানেই কীভাবে যৌন মিলন করতে হবে তার কলা-কৌশল শেখানো নয়। যৌন শিক্ষা হচ্ছে মানুষের সাঁরা জীবনের খুবই দরকারী একটা জিনিসের উপর লক্ষ করে সৃজনশীল কিছু শিক্ষা। যে ব্যাপারগুলো প্রত্যেকটা মানুষকেই জানতে হয়।

বাবা মায়েরা হয়তো ছেলে-মেয়েদের এইসব থেকে দূরে রাখতে চাইবে। কিন্তু কথা হচ্ছে দূরে রাখতে চাইলেও ছেলে-মেয়েরা কি এইসব জানার আগ্রহ থেকে সরে যাবে? কোনো না কোনোভাবে কিন্তু ওরা এইসব ব্যাপারগুলো জেনে যায়। কেও বলবে, এগুলো তো এমনি এমনিতেই শিখে নিবে। কিন্তু কথা হচ্ছে যে সোর্স থেকে তারা শিখবে তা যে বিকৃত ও খারাপ হবে না তার নিশ্চয়তা কী?

description একটা উদাহরণ দেই, অনেকে বলে থাকে মাস্টারবেশন খুবই খারাপ জিনিস। এক ফোটা বীর্য চলে যাওয়া মানে সত্তর ফোটা রক্ত চলে যাওয়া। এটা মোটেই ঠিক নয়। এমন ধারণা দেয়া হোক আর নাই হোক, একটা বয়স থেকে সকল ছেলেই মাস্টারবেশন করে। আর ঐ ধারণা মনে থাকাতে প্রতিটা মুহূর্ত পাপবোধে ভোগে। যেটা একদমই ঠিক নয়। মাস্টারবেশনের ঠিক বেঠিক নিয়ে জিরো টু ইনফিনিটিতে একটা বড় লেখা আছে, দেখে নেয়া যেতে পারে। আর রাস্তায় রাস্তায় “কলিকাতা হার্বাল” “জার্মান হারবাল” ইত্যাদি ধান্দাবাজ লোকেদের কথার ঝুলি শুনলে তো মাথায় হাত দিতে হবে। এসব ভ্রান্ত শিক্ষা থেকে ছোটদেরকে বের করে আনতে দরকার সঠিক ও মার্জিত শিক্ষা। আর তার জন্য দরকার যৌন শিক্ষার।

আরও এগিয়ে কেও কেও হয়তো যৌন শিক্ষাকে সমর্থন করে নির্ভর করে বসে থাকবে স্কুলের শিক্ষকদের উপর। কিন্তু সত্য কথা হচ্ছে শিক্ষকরাও এগুলো এড়িয়ে যায়। ক্লাসে পড়ায় না। জড়তায় ভোগে।

তার জন্য ভালোয় ভালোয় মার্জিত ভাষায় সঠিক তথ্য আছে এমন বই পড়তে দেয়া উচিৎ। তাতে করে ছোটদের মনে বাজে ও খারাপ রুচিবোধ জন্মাবে না। বিকৃত কাল্পনিক চিত্র তৈরি হবে না।

সর্বোপরি অনেক বাবা মা তাদের সন্তানদেরকে এই বিষয়ে শেখাতে চান, কিন্তু কোন ভাষা ব্যবহার করে কম লজ্জা পেয়ে বোঝাবেন তা খুঁজে পান না। তাদের জন্য সমাধান হতে পারে বই। লেখক বইটা লিখেছেন তার সন্তানকে লক্ষ করে। সন্তান যেন বাজে শিক্ষা গ্রহণ না করে সেই দিক থেকে সতর্ক হয়ে নিজেই একটা বই লিখে ফেলেন। উল্লেখ্য বাজারে এমন বই খুব একটা নেই।

বইটার একটা ত্রুটি হচ্ছে কোন বয়সের জন্য বইটা লেখা হয়েছে তার কোনো নিশানা নেই। যদি প্রাথমিক শ্রেণীর বাচ্চাদের লক্ষ করে লিখে থাকেন তাহলে বইতে এমন কিছু লেখা আছে যা তাদের জন্য উপযুক্ত নয়। যেমন “নারীর চরমানন্দ” ও “সঙ্গমে তৃপ্তি”। যদি মাধ্যমিক শ্রেণীর ছেলে-মেয়েদের লক্ষ করে লেখা হয় তাহলে অনেকগুলো অধ্যায়েই বেশি সরল করে ফেলা হয়েছে। মানে যেভাবেই দেখা হোক ত্রুটি একটা রয়ে যাচ্ছেই। সবচে ভালো হয় ধরে নেয়া হয় বইটা অভিভাবকদের জন্য। অভিবাবকরা কীভাবে ছোট সন্তানদের সামনে উপস্থাপন করবেন সেটা এখান থেকে আয়ত্ব করে নিতে পারবে।

আর একটা ব্যাপার, বইতে একটা চিত্রও নেই। যেটা ভালো লাগেনি একদমই। ছোটদের জন্য কোনো বই লেখা হলে সেখানে চিত্র, কার্টুন দেয়া উচিৎ। ছোটরা এগুলোই পছন্দ করে। নিখাদ কন্টেন্ট পড়তে কোন কোন বাচ্চারই মনে চায়?

সব মিলিয়ে বইটা উৎরে গিয়েছে। বইটা সকলেরই পড়া উচিৎ, ভুল-ভাল ধারণা ও মিথ কাল্পনিক কাহিনী থেকে বেড়িয়ে আসা উচিৎ। আর এমন বই আরো লেখা হোক বাংলা ভাষায় সেই আশাই করছি।

 

_______________________________________

_______________________________________

মিথ্যার মুখোমুখি প্রতিদিন

লেখকঃ মুনির হাসান

বইটা আলোচিত হয়েছে মূলত সমাজে বিদ্যমান কুসংস্কারকে নিয়ে। এই ধাঁচের বই বাংলায় খুব একটা দুর্লভ নয়। কিন্তু তারপরেও এই বইটি অন্যসব থেকে আলাদা। এখানে আলোচিত বিষয়গুলোর প্রায় সবই আমাদের বাংলাদেশের সমাজের মাঝে প্রচলিত সংস্কার কুসংস্কারকে কেন্দ্র করে।

যেমন আমাদের সমাজে কেও খাবার সময় তার হিক্কা-হাঁচি ওঠলে ধারণা করা হয় দূর থেকে কেও বুঝি তার নাম নিয়েছে, আর নামটা খারাপ উদ্দেশ্যে নিয়েছে বলে খাবার সময় এই বাজে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এক শ্রেণির মানুষ আছে এই ব্যাপারটাকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দিচ্ছে। তারা বলছে ট্যালিপ্যাথির মাধ্যমে এই ধরনের ব্যাপার হতেও পারে। একজন অন্যজনের নাম নিলে তরঙ্গ আকারে তা ছড়িয়ে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে পৌঁছায়। :/  কতটা জ্ঞানপাপী হলে এইসব বলে বেড়াতে পারে। কিন্তু মূল সত্য হচ্ছে গলায় খাদ্যনালীর পাশাপাশি শ্বাসনালী অবস্থান করে। খাবার গ্রহণের সময় খাদ্য যদি ভুলে অন্ননালীর পরিবর্তে শ্বাসনালী দিয়ে ঢুকে পড়ে তাহলে এই অবস্থা হয়। খাবার শ্বাসনালী দিয়ে ঢুকলে শ্বাসরোধ হয়, এই অবস্থা কিছুক্ষণ থাকলেই মৃত্যু অবধারিত। এই খারাপ অবস্থা থেকে বাঁচার জন্য শরীরের এক নিজস্ব অবরোধ, হিক্কা-হাচির মাধ্যমে শ্বাসরোধ অবস্থা থেকে দেহকে রক্ষা করে। অবশ্যই এটা শরীরের খুব ভালো একটা দিক। লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনে মানুষ এই বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। এ নিয়ে অন্য কেও খারাপ উদ্দেশ্যে নাম নিয়েছে তা ভাবার কোনো দরকার নেই।

এই ধরনের অনেকগুলো বিষয় লেখক তার বইতে তুলে এনেছেন। পড়তে মজার।

“মুনির হাসান” স্যারের এই ধরনের একটা বই থাকতে পারে তা ধারণাতে ছিল না। বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতির অফিসে আসা যাওয়ার ফলে মুনির হাসান স্যারের সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়েছিল, যদিও তা খুবই সামান্য। স্যারের গণিতের উপর টুকটাক বই আছে। এই বিষয়ের উপর বই আছে জানতামই না। মুনির হাসান যদি এই ধরনের বই লেখাটা অব্যাহত রাখতেন তাহলে খুবই ভালো লাগতো।

ইদানীং মুনির হাসান খুব ব্যাস্ত, এই সংঘটন ঐ সংঘটন করতে হচ্ছে। বই লেখার সময় নেই বললেই চলে। বইটার ব্যপারে বলা যায় বিলুপ্তপ্রায় একটা বই। ১৯৯৪ সালে এই বইটা লিখেছিলেন। তখনকার সময়ের জন্য কতটা সাহসী কাজ ছিল আর কতটা লেখক কতটা অগ্রগামী ছিলেন, ভাবা যায়?

 

[বিঃ দ্রঃ লেখক বইটির স্বত্ব ত্যাগ করেছেন। বইটি এখান থেকে নামিয়ে পড়তে পারবেন।]

লিখেছেন সিরাজাম মুনির শ্রাবণ

আমি শ্রাবণ, পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। মাসিক বিজ্ঞান সাময়িকী জিরো টু ইনফিনিটিতে বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। বিজ্ঞান পড়তে ভালো লাগে, বিজ্ঞান বিষয়ক ভাবনা চিন্তা করে আনন্দ পাই।

সিরাজাম মুনির শ্রাবণ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 48 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. Prince Khan Reply

    মাস্টারবেশন সম্পর্কে অনেক ভুল ধারনা ছিল আজ তা দূর হলো। এই বইটি পিডিএফ আকারে পেলে খুশি হতাম?

  2. আরাফাত রহমান Reply

    আমি কিশোর-কালে প্রথম বইটা পড়ে অনেক কিছুই জেনেছিলাম। দরকারী একটা বই। তবে একেবারে শেষে কিভাবে ইচ্ছেমতো ছেলে বা মেয়ে সন্তান নেয়া যায় একটা টোটকা ছিলো — ওটা একেেবারেই ভুয়া। আরেকটা বই আছে বয়সন্ধি নিয়ে, ভালো বেশ: “তুমি এখন বড় হচ্ছো”।

    • bengalensis Reply

      যৌণ বিষয়ে সাধারণ জ্ঞান বইটি বেশ পুরোনো, বর্তমান বিজ্ঞানের ফলাফলের সাথে এর কিছু কিছু বিষয় মেলে না। যেমন: সমকামিতাকে ওই বইতে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মাস্টারেশনকে আরো বেশী প্রয়োগযোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

আপনার মতামত