বেশ কিছু কাল আগের কথা  বলছি। তখন রাজশার্দূল এর শাসনামল বিরাজমান। শরীয়তপুরের লোনসিং নামের একটি গ্রামে বাস করতেন এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ। নাম অম্বিকাচরণ ভট্টাচার্য। পেশা যজমানি। অর্থাৎ পুজোর দক্ষিণার দাক্ষিণ্যই তাঁর  সংসারযন্ত্রকে সচল রাখতে সাহায্য করত।তবে মধ্যে কাজ করতেন স্থানীয় জমিদারের কাছারিতেও । তাঁর পরিবারেই ১৮৯৫ সালের পহেলা আগস্ট গৃহিণী শশিমুখী দেবী জন্ম দেন এক পুত্র সন্তানের। দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেওয়া পিতামাতার জ্যেষ্ঠ সন্তানটির কথাই আজকে বলতে বসেছি। তাঁর নাম গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য। ভারতীয় উপমহাদেশে তিনিই সম্ভবত কীট আচরণ বিদ্যার পথিকৃৎ।

পাঁচ বছর বয়সে অম্বিকাচরণ পরলোক গমন করেন। বাড়ে  দারিদ্র্যের মাত্রা। দরিদ্র পরিবারের দারিদ্র্যের এই কষাঘাত অম্বিকাচরণের শৈশবকে কষ্টময় করে তুলেছিল। তাই হাইস্কুল শেষ করার পর তিনি যখন ১৯১৩ সালে কলেজে আই এ পড়ার জন্য ভর্তি হলেন তখন তাঁর আর কলেজ এর পাঠ্যক্রম শেষ করা  হয়ে উঠে নি। তবে স্কুলে থাকতেই তিনি কীট পতঙ্গের প্রতি আগ্রহী ওঠেন। কীটপতঙ্গের প্রতি তাঁর আগ্রহের কথা তিনি প্রকাশ করেছেন এভাবে তাঁর জীবনীতে

” ছেলেবেলার অনেক ঘটনার কথাই ভুলে গেছি, তবে কোন কোন ঘটনার অনেক কিছু স্মৃতিই রয়ে গেছে – কতক ঝাপসা, কতক পরিস্কার। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে যোগেন মাস্টারের কথা। মাঝে মাঝে যোগেন মাস্টার ছেলেদের ডেকে এনে ম্যাজিকের খেলা দেখাতেন। একটা মজার জিনিস দেখাবেন বলে একদিন তিনি ক্লাসরুমে মাস্টার, ছাত্র সবাইকে ডেকে নিয়ে এলেন। পকেট থেকে গাঢ় খয়েরী রঙের কয়েকটি বিচি বের করে মাস্টারদের হাতে দিয়ে বললেন – দেখুন তো জিনিসটা কী এবং এতে কোন ছিদ্র বা টুটা-ফাটা আছে ? দেখতে কতকটা কাঁই বিচির মতো হলেও আসলে তা নয়, কোনও একটা অজানা ফলের বিচি – মসৃণ ও গোলাকার, কোথাও কোনও টুটা-ফাটা নেই। বিচিগুলি টেবিলের ওপর রাখার কয়েক মিনিট পরেই একটা বিচি হঠাৎ প্রায় চার ইঞ্চি উঁচুতে লাফিয়ে উঠলো। তারপর এদিক ওদিক থেকে প্রায় সবগুলি বিচিই থেকে থেকে লাফাতে শুরু করে দিল। অবাক কাণ্ড। কিভাবে এটা সম্ভব হতে পারে ? আমরা তো ছেলেমানুষ, বড়রাই কিছু বুঝতে পারেন নি। অবশেষে মাস্টারমশাই ছুরি দিয়ে একটা বিচি চিরে ফেলতেই দেখা গেল, তার ভেতরে রয়েছে একটা পোকা (Larva)। টেবিলের ওপর পড়েই পোকাটা ধনুকের মতো শরীরটাকে বাঁকিয়ে দু-প্রান্ত একত্রিত করে  এক অদ্ভুত ভংগিতে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল।

এই ঘটনা থেকেই কীট-পতঙ্গ, পোকা মাকড় সম্পর্কে একটা কৌতূহল জাগতে লাগল। নতুন কোনও পোকা-মাকড় বা গাছপালার কোনও বৈশিষ্ট্য নজরে পড়লে বিষ্ময় জাগতো বটে, কিন্তু সুসংবদ্ধ জ্ঞানের অভাবে তার প্রকৃত রহস্য উপলব্ধি করার ক্ষমতা ছিল না।

পরিবারের হাল ধরার জন্যে তিনি শিক্ষকতার কাজ নিলেন একটি স্কুলে। স্কুলে শিক্ষকতা করার সময় তাঁর সাহিত্যের প্রতিও আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তিনি জারি গানও লেখা শুরু করেন । জারি ও পালাগানলেখার পাশাপাশি তিনি “শতদল” নামক একটি মাসিকপত্র প্রকাশ করা শুরু করেন। দুস্থদের জন্যও কাজ করার  একটি সংস্থাও গঠন করেন তিনি।

 

শ্রী গোপাল চন্দ্র ভট্টাচার্য

শ্রী গোপাল চন্দ্র ভট্টাচার্য

তাঁর জীবনী যদি পর্যালোচনা করা যায় তবে তাঁর কর্মগুলিকে বাংলাভাষায় বিজ্ঞান চর্চার প্রেক্ষিতে মহাকাব্যিক আখ্যা দেওয়াই যায়। তিনি পরবর্তী জীবনে বসু বিজ্ঞান মন্দিরে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। যদিও তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকার কারণে তিনি অনেক সুযোগ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। তবুও তিনি সত্যিকার অর্থেই মেধা মনন এবং মানসিকতার দিক থেকেও ছিলেন একজন যুক্তিবাদী এবং কুসংস্কারবিরোধী ব্যক্তিত্ব। একথা তিনি তাঁর জীবন কথাতেই লিখে গেছেন।

পূজার্চনা সামাজিক রীতিনীতি নিয়ে মায়ের সঙ্গে প্রায়ই বাদানুবাদ হতো। একবার ভাইয়ের (মেজ ভাই নেপালচন্দ্র) ভয়ানক অসুখ হয়। ডাক্তার ও কবরেজ যখন আশা ছাড়লেন তখন একদিন স্বপ্ন দেখার ভান করে একটা ওষুধ মাকে দিলাম, ওষুধ ধারণ করার পর রোগী ধীরে ধীরে আরোগ্যলাভ করে। এই ব্যাপারটাকে উপলক্ষ (করে) পদ্যছন্দে একটি ব্রতকথা লিখে ছাপিয়ে দিলাম। নাম ‘আপদ বিনাশিনীর ব্রতকথা’ বইটি ঘরে ঘরে প্রচারিত হলো। এমন কি আজও বোধ হয় এই ব্রতকথা কোনও কোনও স্থানে প্রচলিত আছে, প্রচারের পর মাকে সমস্ত বিষয়টা যে মিথ্যা তা খুলে বলি, এগুলির আসারতার কথা বুঝিয়ে দিলাম, অন্য লোকেদেরও বললাম, কিন্তু কেউ আমার এই সত্য কথা মানতে রাজি হন নি । 

জগদীশ চন্দ্র বসু তাকে বসু বিজ্ঞান মন্দিরে কাজ করতে সুযোগ দেন সত্যি । তবে একটু ভালোভাবে তাঁর জীবনী পর্যালোচনা করে দেখলে দেখা যায় সত্যিকার অর্থে কোন কোন স্থানে জগদীশ চন্দ্রের ব্যক্তিত্বের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য গোপালচন্দ্রের কর্মের স্বাধীনতা প্রকাশের অন্তরায় দাঁড়িয়েছে ।

সে যাই হোক। গোপালচন্দ্র প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন ১৯৩২ সালে।  ১৯৩৬ সালে তাঁর জলচর মাকড়সার ওপর কাজটি প্রকাশিত হয় American Museum of Natural History-এ এবং ১৯৫১ সালে আমন্ত্রিত হন International Union for the Study of Social Insects-এর সম্মেলনে। অনেক কাজের মধ্যে পিঁপড়ের লিঙ্গ নির্ধারণের পরীক্ষা এবং তার ভিতরে লুকিয়ে থাকা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নিঃসন্দেহে অন্যতম।

তিনি দলবদ্ধ পতংগ যেমন পিঁপড়া,মৌমাছি ইত্যাদির শ্রমিক, রাণী  কি ভাবে জন্মায়,তাদের প্রজনন ,রূপান্তর,পূর্ণতা পাওয়া ইত্যাদি খুব বিচক্ষণতার সাথে লক্ষ করেন। তাঁর প্রকাশিত রচনা গুলিতে পর্যবেক্ষণের দক্ষতার পরিচয় মেলে। ইংরেজি ভাষায় তাঁর রচনাকৃত পেপার সর্বমোট বাইশটি।

সত্যি কথা বলতে যে আমরা যে আজকে বাংলা  ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করছি।এই বাংলা ভাষাতে বিজ্ঞান চর্চা শুরু করা অন্যতম পথিকৃৎ গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের অবদান স্মরণ করছি  অসম্ভব শ্রদ্ধা আর বিনয়ের সঙ্গে। বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার জন্যে তিনি জীবনভর  কাজ করেন। তাঁর কর্মজীবনে তিনি প্রায় ১০০০ এর মতো বিজ্ঞান বিষয়ে আর্টিকেল লেখেন যার বেশির ভাগই বাংলায় এবং তা প্রচুর জনপ্রিয়তাও পায়।

১৯৪৮ সালে তিনি সত্যেন্দ্রনাথ বসুর (হ্যাঁ , আমাদের সেই বোসন কনার সত্যেন বোস)  সাথে মিলে ” বাঙ্গালী বিজ্ঞান পরিষদ” নামে একটি বিজ্ঞান গবেষনা সমিতি গঠন করেন।

পুলিন বিহারির মতো কয়েক জন বন্ধু মিলে বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। ১৯৫০ সালে বাঙ্গালী বিজ্ঞান পরিষদের ম্যাগাজিন     ” জ্ঞান ও বিজ্ঞান”এর অফিসিয়াল সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৭৭ সালে তিনি এই ম্যাগাজিনের প্রধান উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। তিনি ভারতকোষ নামক বাংলাএনসাইক্লোপিডিয়া তৈরির সময় সহযোগী ভূমিকা পালন করেন।

তিনি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চায় অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁর রচিত পুস্তকের মাঝে “বাংলার কীটপতংগ”, “করে দেখা”(তিন খন্ড) অন্যতম। তাছাড়া তাঁর প্রতিটি রচনা একজন প্রকৃতিবিদ এবং যুক্তিবাদী হিসেবে তাঁর বৈদগ্ধ্যের পরিচয় বহন করে।

বাংলার কীটপতংগ বইয়ের প্রচ্ছদ

বাংলার কীটপতংগ বইয়ের প্রচ্ছদ

১৯৬৫ সালে তিনি কাজ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু তাঁর প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ এবং জ্ঞানের প্রতি তৃষ্ণা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অব্যাহত  থাকে। গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য, বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার পটভূমির শুধু প্রবাদ প্রতিম ব্যক্তিত্বই  নন তিনি হলেন অন্যতম। তাঁর লেখা আমাদের কাছে প্রেরণার এক অন্যতম আধার।

তাঁর জীবনে গুরুত্ব পূর্ণ পর্যবেক্ষণের মধ্যে উভচরদের মেটামরফোসিস, বায়ো লুমিনেসেনস  (bioluminescence) ইত্যাদি উল্লেখ যোগ্য।  তাছাড়া তিনি কীট আচরণবিদ্যার উপর বিস্তারিত কাজ করেন। তিনি তাঁর কাজ দিয়ে হান্স মলিশ, হাক্সলির মত  বিখ্যাত বিজ্ঞানীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন।

১৯৮১ সালের ৮ এপ্রিল তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। সত্যি কথা বলতে কি গোপাল চন্দ্রের মত অসাধারণ কিছু ব্যক্তিত্বের অবদান আমাদের আজকের দিনে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয়। তাঁর কর্মময় জীবন, বিজ্ঞানের প্রতি ছুটে চলার অপূর্ব আগ্রহ আর বিদগ্ধ এবং যুক্তিবাদী মানস ও মনন আমাদের সর্বদা প্রেরণা যোগাবে । আর উৎসাহ যোগাবে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানকে সর্বক্ষেত্রে ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষাকে বিশ্ব মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে ।

রেফারেন্স-

১. বিজ্ঞান অমনিবাস–গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য

২. বাংলার কীটপতংগ- গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য

লিখেছেন Atonu Chakrabortty

আমি দক্ষিণ কোরিয়ার পুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অণুজীববিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশুনা করছি। বিজ্ঞান বিষয়ক লেখালেখি করার চেষ্টা করি। পাশাপাশি বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের সাথে যুক্ত আছি। বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকা জিরো টু ইনফিনিটিতে নিয়মিত লেখালেখি করছি ।

Atonu Chakrabortty বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 5 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. bengalensis Reply

    চমৎকার এবং গুরুত্বপূর্ণ লেখা। অতনুকে এই লেখাটির জন্য অনেক ধন্যবাদ।

  2. অনিক Reply

    সত্যি কথা বলতে কি গোপাল চন্দ্রের মত অসাধারণ কিছু ব্যক্তিত্বের অবদান আমাদের আজকের দিনে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয়। তাঁর কর্মময় জীবন, বিজ্ঞানের প্রতি ছুটে চলার অপূর্ব আগ্রহ আর বিদগ্ধ এবং যুক্তিবাদী মানস ও মনন আমাদের সর্বদা প্রেরণা যোগাবে । আর উৎসাহ যোগাবে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানকে সর্বক্ষেত্রে ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষাকে বিশ্ব মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে।।।

    এটা সুন্দর ছিল।।। কিন্তু কালক্রমে আমরা এটা ভুলে গেছি।।।।।

আপনার মতামত