[২য় পর্বের পর থেকে]

নানা কাজে নানা দিকে ব্যবহারঃ

কোনো একটি এলাকায় কৃত্রিম বৃষ্টি সে এলাকার বার্ষিক বৃষ্টির ১০%-২০% বৃষ্টি বৃদ্ধি করতে পারে। ফসল নেই এমন সময়ে অধিক বৃষ্টি হলে ঐ দৃষ্টিকোণ থেকে খুব বেশি লাভ নেই। ফসলের প্রয়োজনে ৫% বৃষ্টিই পর্যাপ্ত! সময়মতো অল্প বৃষ্টিপাত দিয়েই ভাল ফসল ফলিয়ে নেয়া যায়। এই প্রক্রিয়ায় বন্ধ্যা জমি মানে যে সকল জমিতে পানির অভাবে কখনোই ফসল করা হয় না এমন জমিতেও ফসল ফলানো সম্ভব। আবার কিছু কিছু এলাকায় এটি ভাল ফলাফল নাও বয়ে আনতে পারে। মানুষ এখনো পরিপূর্ণভাবে প্রকৃতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা শিখে নিতে পারে নি।

দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম প্রভাবনঃ

মাঝে মাঝে এমনও শোনা যায় কৃত্রিম বৃষ্টিপাত প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ঘূর্ণিঝড় হারিকেনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হবে। ঘূর্ণিঝড় এলাকায় প্রচুর মেঘ থাকে, থাকে নিম্নচাপও। যখন সে ঘূর্ণিঝড় তার প্রবল শক্তি নিয়ে লোকালয়ে আঘাত করে তখন ক্ষয়ক্ষতির শেষ থাকে না। এমন অবস্থায় সেখানকার ঘূর্ণিঝড়ের মাঝে ক্লাউড সীডিং প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ঘূর্ণিঝড়কে এলোমেলো করে ফেলা যায়, তাহলে অল্পতেই ঘূর্ণিঝড় তার শক্তি হারিয়ে ফেলবে, ফলে ধ্বংস করতে পারবে কম। ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, টাইফুন মূলত একই জিনিস। এরা দারুণ গাণিতিক নিয়ম মেনে থাকে। ঘূর্ণিঝড়ের মূল অক্ষের মেঘগুলোকে যদি বৃষ্টিতে রূপান্তরিত করে ফেলা যায় তাহলে এটা যেন অনেকটা ভিত্তি হীন, খুটিহীন হয়ে পড়ে। [ঘূর্ণিঝড়ের অক্ষ কী, মূল শক্তি কোন জায়গায় ইত্যাদি খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন “ঘূর্ণিঝড় কেন হয়” নামের লেখাটি।]

চিত্র: ক্লাউড সীডিং প্রক্রিয়া ব্যবহার করে যেভাবে হারিকেন/টাইফুন/ঘূর্ণিঝড়কে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা যেতে পারে।

এমনটাতে সফল হতে পারলে অসম্ভব শক্তিশালী এক প্রাকৃতিক দুর্যোগকে সামাল দেয়া যাবে, নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। কিন্তু মানুষ এখনো আশানুরূপ সফলতা অর্জন করতে পারেনি। আমেরিকার সামরিক বাহিনী কর্তৃক কয়েকবার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু তাতে আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যায় নি। আর পাশাপাশি কিছু কৌশলগত সমস্যাও আছে। যেমন ঘূর্ণিঝড়ের যে বিশাল শক্তি তাতে বিমান নিয়ে গেলে কয়েক মিনিটের মাঝেই তাকে ধ্বংস স্তূপে পরিণত করে ফেলতে পারে, নির্ঘাত মারা যেতে পারে চালক। দশ তলা বিশ তলা দালানই সে তুড়ি মেরে উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারে আর এখানে তো সেটা মামুলি বিমান মাত্র! অবশ্য অনেক উপর থেকে ছিটিয়ে দেয়া যেতে পারে কিন্তু সেটা অনেক দূরে হয়ে যায়। তবে সে ক্ষেত্রেও বিকল্প ব্যবস্থা আছে। চালক-বিহীন বিমান বা ড্রোন ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘূর্ণিঝড় নিয়ন্ত্রণের ড্রোন প্রযুক্তি কতটুকু ব্যর্থতা বা সফলতা আনতে পারবে সেটা ভবিষ্যতই বলে দিবে।

গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট ঝামেলাবিহীন রাখাঃ

প্রায় সময়ই দেখা যায় ক্রিকেট ফুটবল সহ খেলাধুলার বড় বড় ইভেন্ট ভেস্তে যায় বৃষ্টির কারণে। কত বারই দেখেছি বৃষ্টির কারণে ম্যাচ স্থগিত। কিংবা একদল ব্যাট করার পরে বৃষ্টি হবার কারণে অন্য দল ব্যাট করতে পারে না বা ক্রিকেটের জটিল জটিল নিয়মে খেলা সংকুচিত করে নানান হারা জেতার নানান শর্ত দিয়ে থাকে। আর দর্শক তো এত টাকা খরচ করে মাঠে যায় খেলা উপভোগ করতেই, জটিল হিসাব তো আর করতে যায় না। স্ক্রিনের পর্দায় যারা চোখ মেলে বসে থাকেন তারাও তো এমনটা আশা করেন না। এই ক্ষেত্রে কৃত্রিম বৃষ্টি একটা বিপ্লব বয়ে এনেছে। খেলার আগেই কিংবা ইভেন্টের আগেই যদি আশে পাশে থাকা মেঘকে বৃষ্টি আঁকারে নামিয়ে ফেলা যায় তাহলে খেলার মাঝে হুট করে বৃষ্টির ভয় থাকে না। খেলার মাঝে বৃষ্টি হতে গেলে তো মেঘ থাকা লাগবে, সেই মেঘই যদি আগে ভাগে নামিয়ে ফেলা হয় তবে পরে ইভেন্ট চলাকালীন সময়ে বৃষ্টি হয় না।

বর্তমান কালে FIFA, Olympic গেমস সহ অন্যান্য বড় বড় ইভেন্টে এটি প্রয়োগ করা হয়। চীনে গত বেইজিং অলিম্পিক গেমসের উদ্বোধনী দিন ও সমাপনী দিনে এমন করে বৃষ্টি যাতে না হয় সেজন্য ক্লাউড সীডিং প্রক্রিয়া ব্যবহার করে কৃত্রিম ভাবে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। চীনে পৃথিবীর সবচে বেশি কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টি ঝরানো হয়। ভারতেও কৃত্রিম বৃষ্টি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছিল। মানুষের বসবাসের সকল মহাদেশেই ক্লাউড সীডিং প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ তাই বাংলাদেশেরও উচিৎ হবে কৃত্রিম বৃষ্টি প্রযুক্তি ব্যবহার করা।

পরিবেশের উপর কৃত্রিম বৃষ্টির প্রভাবঃ

পরিবেশের চলমান বাস্তুসংস্থান ভেঙ্গে তার কাছ থেকে জোর করে বৃষ্টি নামিয়ে আনলে তার একটা বিরূপ প্রভাব প্রকৃতিতে পড়েই। প্রকৃতির অংশ হিসেবে মানুষের উপরও এসে পড়ে সে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ফলাফল। একে তো বাস্তুসংস্থান বিঘ্নিত হয় তার উপর ছিটিয়ে দেয়া সিলভার আয়োডাইডের গুড়ো বৃষ্টির সাথে ধুয়ে পরে মাটিতেই পড়ে, মানুষের বসবাসের এলাকাতেও পড়ে। সিলভার আয়োডাইডের গুড়ো একবার দুইবার কোনো এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে সামান্য বলে তেমন প্রভাব দেখা যায় না কিন্তু যখন বছর বছর কৃত্রিম বৃষ্টি নামিয়ে সিলভার আয়োডাইডের একটা প্রাবল্য তৈরি করে ফেলা হবে তখন পরিবেশ হয়ে যাবে দূষিত। মাটি হয়ে পড়বে দূষিত। গাছের উপর কিংবা পশুপাখির গায়ের উপর বৃষ্টির পানির সাথে যে সিলভার পড়বে তা সৃষ্টি করবে নানান ধরণের রোগ। অল্পতেই গাছের ছাল, পশু পাখির চামরা, চোখে ইত্যাদিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

আবার এক দিক থেকে যেমন এক দেশ/এলাকার কৃষি জমিতে দেবার জন্য বৃষ্টি নামিয়ে নেয়া হচ্ছে তেমনি অন্য এলাকার বৃষ্টি নষ্ট করা হচ্ছে। এতে কিছুটা অসঙ্গতিও আছে, ধরা যাক একজন ধনকুবেরের অনেকগুলো জমি কৃষি জমি আছে। সে তার জমির ভাল ফসলের জন্য বৃষ্টি নামিয়ে নিলো তাই অন্য দিকে তার পাশের অন্যান্য গরিব কৃষকের জন্য একটা অবিচার করা হয়ে যায়। গরীব কৃষক তো তার অল্প জমির জন্য বৃষ্টির পেছনে এত টাকা খরচ করতে পারবে না।

যে দেশে একজন কৃষকের বেশি পরিমাণ জমিজমা থাকে না সে দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে কৃত্রিম বৃষ্টি নামানোর চেষ্টা করা হয়, যেমন চীন। চীন এমনকি বৃষ্টি নামানোর জন্য সামরিক বিমানের সর্বোচচ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। চীন একাই প্রতি বছর ৫৫ বিলিয়ন টন কৃত্রিম বৃষ্টি নামায়। এতে করে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো মেঘ বৃষ্টি হতে কিছুটা বঞ্চিত হচ্ছে। যদিও বৃহৎ পরিসীমায় এই হিসাব তেমন একটা হেরফের হয় না, তবেও এক রাজ্য ও অন্য রাজ্যে মেঘের কিছুটা হেরফের হতেই পারে।

সামান্য কিছু সীমাবদ্ধতা আর সমস্যার কথা বাদ দিলে কৃত্রিম বৃষ্টি সব দিক থেকেই আশীর্বাদ। আর ভালো কিছু একটা করতে গেলে সামান্য কিচু খারাপ মেনে নিতেই হয়। এটা সকল প্রক্রিয়াতেই থাকে। কৃত্রিম বৃষ্টিকে আমরা সহজেই গ্রহণ করতে পারি।

 

টীকা:

ড্রাই আইস: কঠিনিত কার্বন ডাই অক্সাইড CO2 । প্রচণ্ড চাপে সংকুচিত করে কঠিনে রূপান্তরিত করা হয়। অত্যধিক ঠাণ্ডা, তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে ৭৬ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। অত্যধিক শীতল বলে সাধারণত কোনো কিছুর হিমায়ন ঘটাতে ড্রাই আইস ব্যবহার করা হয়। যেমন আইসক্রিম বানাতে, পচনশীল খাবার সংগ্রহ করতে, হিমঘরে ইত্যাদিতে। এমনকি চিকিৎসাবিদ্যা প্রকৌশলবিদ্যায়ও এটি ব্যবহার করা হয় খুব। যেমন বড় কোনো নদীর মাঝে সেতু করা হবে কিংবা নদীর মাঝে/নীচে দিয়ে টানেল তৈরি করা হবে। এমতাবস্থায় টানেলের গর্তের জন্য কাদা খুঁড়বে কীভাবে? খুঁড়লে তো আবার আশে পাশের কাদা এসে আবার ভরে যাবে! কিংবা যে সুরঙ্গ করা হবে তা তো কাদার মাঝে অসম্ভব! এমন অবস্থায় কাদার চারিদিকে সুপরিবাহী পাইপের মাধ্যমে ড্রাই আইস কিংবা এরকম অতিশীতল রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। এতে করে ঠাণ্ডায় কাদা বরফের মত কঠিন হয়ে যাবে। কঠিন হবার পর সুরঙ্গ করতে আর কোনো সমস্যা থাকে না।

সিলভার আয়োডাইড : সিলভার আয়োডাইড AgI বৈশিষ্ট্যে অনেকটা ড্রাই আইসের মতো। কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি নামানোর ক্ষেত্রে ড্রাই আইস থেকেও বেশি উপযোগী। অত্যন্ত পানিপ্রেমী, এবং নিজেই বরফ কেলাসের মত আচরণ করতে পারে।

চিত্র: সিলভার আয়োডাইডের গুড়ো।

ভিনসেন্ট শেইফার: জন্ম ৪ জুলাই ১৯০৬, মৃত্যু ২৫ জুলাই ১৯৯৩। একজন মার্কিন আবহবিদ ও রসায়নবিদ। তিনি মূলত কৃত্রিম বৃষ্টি নিয়ে গবেষণার জন্যই বিখ্যাত।

 

  1. অবাক পৃথিবী : আব্দুল্লাহ আল মুতী; অনুপম প্রকাশনী।
  2. http://www.cwb.gov.tw/V7e/knowledge/encyclopedia/mehtm
  3. http://qz.com/138141/
  4. Wikipedia : Cloud_seeding
  5. http://en.wikipedia.org/wiki/2008_Summer_Olympics_opening_ceremony

 

লিখেছেন সিরাজাম মুনির শ্রাবণ

আমি শ্রাবণ, পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। মাসিক বিজ্ঞান সাময়িকী জিরো টু ইনফিনিটিতে বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। বিজ্ঞান পড়তে ভালো লাগে, বিজ্ঞান বিষয়ক ভাবনা চিন্তা করে আনন্দ পাই।

সিরাজাম মুনির শ্রাবণ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 48 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. Pingback: কৃত্রিম বৃষ্টি : প্রকৃতি যখন হাতের নাগালে [২] - বিজ্ঞান ব্লগবিজ্ঞান ব্লগ

  2. আরাফাত রহমান Reply

    প্রকৃতি তাহলে হাতের নাগালে! তবে কোন আবিষ্কারের সুফল-কুফল যতটা না বৈজ্ঞানিক ব্যপার তার চেয়ে এখানে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত বেশি জড়িত। তাই বলে বিজ্ঞানকে সমাজ ও মানুষ থেকে একেবারে আলাদা করে দেখা উচিত নয়, মানুষের সামাজিক প্রেক্ষিতটাও খেয়াল রাখতে পারলে ভালো।
    পুনশ্চ: আমরা এই বৃষ্টি সিরিজটি একটি ই-বুক হিসেবে পেতে পারি?

    • সিরাজাম মুনির শ্রাবণ Reply

      হ্যা ভাইয়া, বৃষ্টি নিয়ে একটি একটি সংগ্রহ করার জন্যই বৃষ্টি সিরিজের পর এই ‘কৃত্রিম বৃষ্টি’ সিরিজটি দিলাম। এটাকে ই-বুক করা যায়, তবে এখানে আরো একটু যোগ করবো। “বজ্রপাত” নিয়ে সামান্য একটু লেখা লিখে শেষ করে ফেলার ইচ্ছা আছে।

      • আরাফাত রহমান Reply

        বাহ! দারুণ হবে! বৃষ্টি কৃত্রিম বৃষ্টি বজ্রপাত’! বজ্রপাতকে ই-বইয়ের জন্য ‘অরিজিনাল’ হিসেবে রাখা যায়।

আপনার মতামত