ধরুন, আপনি বাজার করতে গিয়েছেন, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা শেষে দাম মিটিয়ে দিয়ে চলে আসছেন। হঠাৎ আপনার মাথার ভেতর কেউ বলে উঠলো, “মরিচ তো কেনা হয়নি!!” পড়িমড়ি করে আবার বাজারে ছুটলেন মরিচ কিনতে। কেউ একজন আপনাকে মনে করিয়ে দিয়েছে মরিচ কেনার কথা। অথবা একটুপর বসের সাথে আপনার একটা জরুরী মিটিং আছে। আপাতদৃষ্টিতে দেখে শান্ত মনে হলে ও ভিতরে ভিতরে আপনি নিজেকে ঝালিয়ে নিচ্ছেন সেই মিটিং এর জন্য, নিঃশব্দে মাথার ভেতর একের পর এক প্রশ্ন আর উত্তর তৈরি করে। এরকম মগজ ঘরে কথা বলা, আওয়াজবিহীন শব্দ আর বাক্য তৈরির প্রক্রিয়ার অনেক উদাহরণ আমরা আমাদের চারপাশে পাই। রাশিয়ান মনস্তত্ত্ববিদ লেভ ভিগোতস্কি সর্বপ্রথম ১৯৩০ সালে এই ঘটনার নামকরণ করেন “Inner speech” বা “অভ্যন্তরীণ বাচন” হিসেবে। মনস্তত্ত্ববিদ্যার শুরু থেকেই বিজ্ঞানীদের এ নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই। আজকে আমরা মানব মস্তিষ্কের কৌতূহোলদ্দীপক এই দিকটিকে নিয়েই কিছু কথা জানবো।

মানুষের জীবনকালে অভ্যন্তরীন বাচনের উৎসের সন্ধান পেতে চাইলে আমাদের চলে যেতে হবে একদম শৈশবে। মনস্তত্ত্ববিদ লেভ ভিগোতস্কির মতে, “অভ্যন্তরীণ বাচন” ভাষা অন্তরীকরণ প্রক্রিয়ার (Internalization) শেষধাপ। শিশুরা প্রথমে আধো আধো বুলি শিখে, তারপর একটা-দুইটা বাক্য তৈরি করে মনের ভাব প্রকাশ করে, সামাজিক  যোগাযোগ স্থাপন করে। এরপর বেশিরভাগ শিশুকেই দেখা যায় খেলার সময় নিজের মনে কথা বলতে, এই নিজের মনে কথা বলা আসলে নিজের ভেতরের চিন্তারই উচ্চস্বরে প্রকাশ, ইংরেজিতে যাকে বলে, “Thinking out loud.” শৈশবের অনেক পেলবতা, কোমলতার মতো বড়ো হতে হতে এই ব্যাপারটাও হারিয়ে যায়; আমরা আয়ত্ম করে ফেলি নিজের মনে শব্দহীন কথা বলা বা Inner speech.

শুরুতেই বলেছি এই ঘটনার আদ্দ্যোপান্ত জানার আগ্রহ বিজ্ঞানীদের অনেক আগে থেকেই; কিন্তু এই বিষয় নিয়ে প্রামাণিক গবেষণা করা বেশ ঝামেলাপূর্ণ। ব্যাপারটা অনেকটা আলো জ্বালিয়ে অন্ধকার কেমন দেখতে চাওয়ার মতো। কেননা, যেইমাত্র আপনি একজনের কাছে জানতে চাইবেন সে নিজের মনে কি বলছে এখন, সেইমাত্র এই নিজের ভেতর কথা বলার প্রক্রিয়া একটু বাধাগ্রস্থ হয় বৈকি।

এরপর ও তো বসে থাকা যায় না। অনেক বছর ধরে Russell Hurlbert এবং তাঁর সহকর্মীবৃন্দ একটি পন্থা অবলম্বন করে আসছিলেন, যা তাদের মতে মনের অকৃত্রিম অভ্যন্তরীণ কথা (Pristine Inner Speaking) জানার জন্য সর্বোত্তম উপায়। তাঁরা মনোবিজ্ঞানের এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে একটা বীপার ধরিয়ে দিতেন যা কিনা দিনের যে কোনো সময় বেজে উঠতো। শর্ত ছিলো, বীপ বেজে উঠার ঠিক আগের মুহূর্তের তাদের মানসিক কর্মকাণ্ড নিঁখুতভাবে লিখে ফেলতে হবে বীপ শোনার পর পরই। এই পদ্ধতির মধ্য দিয়ে আগাতে গিয়ে মস্তিষ্কের নীরব বাণী নিয়ে অনেককিছু জানা হয়ে গেলো বিজ্ঞানীদের। তারই কিছু তুলে ধরছি এখানে।

আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরের কন্ঠস্বর আমাদের নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত কন্ঠস্বরের মতোই শোনায়। নিজের মাথার ভেতর আরেকজনের গলার আওয়াজে নিজেরই মনের কথা শোনার ঘটনা খুবই বিরল।

আমাদের বাহ্যিক কন্ঠস্বরের মতো আমাদের অন্তরীণ কন্ঠস্বর ও শব্দের প্রবলতার তারতম্য ঘটায় এমনকি আবেগের ভিন্নতা ও প্রদর্শন করে।

৩০ জন অংশগ্রহণকারীর উপর ৩দিনে ১০ বার (মোট ৩০ বার)বীপ দিয়ে চালানো পরীক্ষার পর দেখা গেলো,কিছুসংখ্যক অংশগ্রহণকারীর অভ্যন্তরীণ বাচনের কোনো অভিজ্ঞতাই হয়নি, অন্যদিকে কিছুসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক মোট বীপের ৭৫ শতাংশবার মাথার ভেতর ঘটে যাওয়া কথামালা লিপিবদ্ধ করেছেন।

অভ্যন্তরীণ বাচনের আরেকটি আগ্রহোউদ্দীপক ব্যাপার হলো, কিছু কিছু অংশগ্রহণকারী বলেছেন, তাদের মাথার একটা নির্দিষ্ট জায়গায় এটা ঘটে, কেউ কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে না পারলেও বলেছেন, মাথাই এর উৎপত্তিস্হল। এমনকি কিছু অংশগ্রহণকারী দাবি করেন তারা বুকের ভেতর থেকে আওয়াজ পান!

আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো, কিছু অংশগ্রহণকারী জোরে কথার বলার সময় ও Inner speaking ঘটার কথা বলেছেন যেখানে তার বাহ্যিক কন্ঠস্বর আর অন্তরীণ কন্ঠস্বর সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী কথা বলছে।

এতো গেলো বৈশিষ্ট্যের কথা, এখন এর কার্যসাধন পদ্ধতি নিয়ে অল্পকিছু জানা যাক। নিওরোইমেজিং পদ্ধতি ব্যবহার করে দেখা গেছে, জোরে শব্দ উচ্চারণ করে কথা বলার সময় এবং মনে মনে নীরবে কথা বলা-উভয়ক্ষেত্রেই মস্তিষ্কের বাম ইনফেরিওর ফ্রন্টাল গাইরাস (ব্রকা’স এরিয়া) উদ্দীপ্ত হয়। এই অঞ্চলের কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ হলে তা বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ উভয় বাচনকেই ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে। (চলবে)

রেফারেন্সঃ

১। Talking to ourselves: the science of the little voice in your head, The Guardian, 21 August, 2014

২। The science of how we talk to ourselves in our heads, Research Digest, 5 December, 2013

৩। Thinking Aloud About Mental Voices, Charles Fernyhough and Simon R. Jones.

লিখেছেন মেহজাবিন হোসেন

আমি মেহজাবিন হোসেন, জীববিজ্ঞানের ছাত্রী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি নিয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছি। প্রকৃতিগতভাবে বিষন্ন, অস্থির। নিজেকে জানার জন্যই ঘাটাঘাটি, লেখালেখি

মেহজাবিন হোসেন বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 4 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. সিরাজাম মুনির শ্রাবণ Reply

    ভালো লেখা আপু। ভাষাটা একদম প্রাঞ্জল। পরবর্তী পর্বের জন্য লোভ লাগিয়ে দিলেন, শীঘ্রই পরের পর্ব চাই। আর http://bigganblog.com/wp-admin/profile.php এখানে গিয়ে নিজের একাউন্টটা একটু ঠিকঠাক করে নিয়েন।

    • মেহজাবিন হোসেন Reply

      ধন্যবাদ 🙂 পরের পর্ব শীঘ্রই লেখার ইচ্ছা আছে

  2. আরাফাত রহমান Reply

    দারুণ একটা লেখা। আসলেই ছোটরা কথা বলে চিন্তা করে। অভ্যন্তরীন বাচন ছাড়াও মস্তিষ্কের অন্যান্য কি কি কর্মকান্ড সম্পর্কে এরকম তথ্যমূলক লেখা আমরা পাবো? বিজ্ঞান ব্লগে স্বাগতম 😀 !

    • মেহজাবিন হোসেন Reply

      ধন্যবাদ 🙂 মস্তিষ্কের কিছু আগ্রহোদ্দীপক বিষয় নিয়ে জানার এবং লেখার ইচ্ছে আছে ভবিষ্যতে। দেখা যাক… 🙂

      • সিরাজাম মুনির শ্রাবণ Reply

        এক মাস হয়ে যাচ্ছে পরের পর্ব পাচ্ছি না। এটা কি ঠিক? যদি দেখা যায় এমন সময় ২য় পর্ব দিলেন ততদিনে ১ম পর্বে পড়া লেখাগুলো মনে নেই! তাড়াতাড়ি পরের লেখা চাই।

        • মেহজাবিন হোসেন Reply

          কিছুদিনের ভেতরেই লিখে ফেলবো। একটু ব্যস্ত ছিলাম 🙁

  3. Pingback: মস্তিষ্কের কর্মকান্ড: অভ্যন্তরীণ বাচন (২) - বিজ্ঞান ব্লগবিজ্ঞান ব্লগ

আপনার মতামত