চিত্রঃ আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে টাইগার কানাডীয় সলোটেইল শুঁয়াপোকা।

উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটা শুঁয়াপোকা। নাম টাইগার সলোটেইল (Canadian Tiger Swallowtail)।  এরা পাতার মাঝে বসে একটু একটু করে পাতাকে কেটে চলে। অনেক পাখিই এদেরকে ভোজনের জন্য সুস্বাদু খাবার হিসেবে উদরে চালান করে দেয়, আবার অনেক পাখিই এদের দেখা সত্ত্বেও এড়িয়ে চলে। এই ধরনের শুঁয়াপোকারা অসাধারণ একটি প্রতিরোধ ব ব্যাবস্থার মাধ্যমে নিজেদের রক্ষা করে চলে। গবেষকরা খুঁজে পেয়েছেন যে, এরা পাখিদের এমনভাবে ধোঁকা দেয় যেন পাখিরা মনে করে এটা একটা সাপ!

এই শুঁয়াপোকারা তাদের শরীরে হলদেটে ও কালো রঙের সমকেন্দ্রিক[1] দুটি বৃত্তাকার ক্ষেত্র এমনভাবে বাড়িয়ে তোলে যেন দেখলে মনে হয় একজোড়া চোখ। হলুদ বলের মাঝে কালো মনি। আকারেও বড়সড়। কিন্তু দেখতে চোখের মতো মনে হলেও আদতে এরা চোখ নয়।

শরীরের এই অংশটি স্বাভাবিকভাবে উল্লেখ করার মতো তেমন কিছু নয়। তবে যখন এই প্রজাতির একটি শুঁয়াপোকা আশেপাশে কোনো পাখির উপস্থিতি অনুভব করে তখন তারা শরীরের সামনের অংশটিকে স্ফীত করে তোলে। স্ফীত হবের পর মনে হয় যেন ঐ অংশটি একটি সাপের মাথা। নিচের ছবি দুটিতে স্বাভাবিক অবস্থা ও স্ফীত অবস্থার কিছুটা তুলনামূলক পার্থক্য বোঝা যাবে।

চিত্রঃ শুঁয়াপোকার দুই অবস্থা

বিস্ময়কর এই বৈশিষ্ট্য টাইগার সলোটেইল শুঁয়াপোকাকে বিশেষ অনন্যতা দান করেছে। এই বৈশিষ্ট্য তাদের টিকে থাকতে সহায়তা করেছে। এর মাধ্যমে তাদের খাদক পাখিকে ধোঁকা দিয়ে পাখির মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নিতে পারছে। শিকারী পাখি ঐ অবস্থায় এদের সাপ বলে মনে করে দূরে সরে যায়, ফলে ওরা বেঁচে যায়।

প্রাণীজগতের অনেক প্রজাতিই এমন অনুকরণের মাধ্যমে শিকারী শত্রুকে ধোঁকা দেবার কৌশল কাজে লাগায়। কিছু কিছু পোকা আছে দেখতে মনে হয় একদম শুকনো খড়খড়ে কাঠি, রঙে চঙে দেখতেও শুকনো মরা ডালপালার মতো। থাকেও এমন রঙের শুকনো ডালপালাতেই। এরা যখন বাতাসে ডালের সাথে নড়ে তখন বোঝাই যায় না এরা কোনো প্রাণী, ডালপালার অংশ বলেই মনে হয়।[2] প্রকৃতির সাথে নিজেকে মিশিয়ে ফেলার এই বৈশিষ্ট্যটাকে বলা হয় ক্যামোফ্ল্যাজ।

অনেক প্রজাতির সাপই আছে যারা বিষধর নয়। তাদের বেলায় আত্মরক্ষার জন্য অন্য সাপের মতো শক্ত অস্ত্রটি নেই। শিকারী প্রাণী থেকে বাঁচতে ওরা বিষাক্ত সাপের অনুকরণ করে। এমন ভাব ধরে যেন এদের চেয়ে বিষধর আর কোনো সাপ নেই। এই অবস্থা দেখে শিকারী ভয় পেয়ে অন্যত্র চলে যায়।

চিত্রঃ পাতার সাথে মিলিয়ে গিরগিটির ক্যামোফ্ল্যাজ। ছবিঃ ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক

এই ধরনের বৈশিষ্ট্যগুলো প্রজাতিদের টিকে থাকতে সহায়তা করেছে। যারাই এমন বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। সোজা ব্যাপার, যে প্রজাতি অনুকরণ করে ধোঁকা দিতে পারেনি তাদের প্রতি শিকারী আকৃষ্ট হয়েছে, খেয়েছে, মেরেছে। ফলে কমে গিয়েছে সংখ্যা। আর যারা টিকে থাকার উপযোগী কৌশল রপ্ত করতে পেরেছিল তারা বিবর্তনের ছাকনিতে টিকে গিয়েছে। এর একটা দারুণ উদাহরণ হচ্ছে এই টাইগার সলোটেইল শুঁয়াপোকা। এই ব্যাপারগুলো নিয়ে অনেক বিজ্ঞানীই অনেক রকম গবেষণা করেছেন। এখনো করে চলছেন। শুঁয়াপোকাদের এই বৈশিষ্ট্য নিয়ে কয়েক বছর ধরে গবেষণা করেছেন কানাডার অন্টারিও প্রদেশের কার্লেটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তুসংস্থানবিদ থমাস শেরেট ও তার ছাত্র থমাস হোসি।[3]

তারা একটা কাজ করলেন। যে এলাকার পাতা ও মুকুলে সলোটেইল শুঁয়াপোকা আছে সেখানে তাদের স্থানে ছেড়ে দিলেন শুঁয়াপোকার কৃত্রিম সংস্করণ প্যাস্ট্রি শুঁয়াপোকা। ব্যাপারটা একদম সাদামাটা কিন্তু খুবই চমৎকার। এই প্যাস্ট্রি শুঁয়াপোকা তারা তৈরি করেছে পানি দিয়ে ময়দা গুলে তার মাঝে রঙ মিশিয়ে। পিঠা বানাতে আমরা যেমনটা সচরাচর করে থাকি।[4]

চিত্রঃ হাতের  তালুতে ময়দার তৈরি চার ধরনের প্যাস্ট্রি শুঁয়াপোকা

এদের খেলে পাখিদের কোনো সমস্যা হবে না। এদেরকে গাছের পাতায় ও ডালে ডালে রেখে দেবার পর দেখা গেল পাখিরা গপাগপ তাদের খেয়ে এলাকা শূন্য করে ফেলছে। এরপর গবেষক দুজন চোখ ওয়ালা সাপের মাথার মতো শুঁয়াপোকা সাজিয়ে রাখলেন ঐ স্থানে। দেখা গেল পাখিরা এদের খাচ্ছে না, পালিয়ে যাচ্ছে। যেন এদের কাছ থেকে দূরে থাকাটাই মঙ্গল।

অবাক করার মতো ব্যাপার হচ্ছে পাখিদের ভয় দেখিয়ে দূরে সরিয়ে দেবার জন্য এই নকল শুঁয়াপোকাদের খুব একটা ভালোমানের ছদ্মবেশ ধরতে হয়নি। বিজ্ঞানীরা এই ব্যাপারটা খতিয়ে দেখার জন্য এরপর ভুলভাল আকৃতির শুঁয়াপোকা তৈরি করলেন। আকৃতির দিক থেকে একদমই অনিয়মিত, এই ধরনের কোনো শুঁয়াপোকা প্রকৃতিতে নেই। এমনকি সাপের মাথার মতো করেও তাদের বানানো হয়নি। তবে তাদের আকৃতি যাই হোক গায়ে চোখ দুটো ছিল। দেখা গেল এই সামান্যতেও পাখিরা এদের এড়িয়ে চলে।

তাহলে ব্যাপারটা কোথায় গিয়ে দাড়ালো? কিছুক্ষণ আগে দেখেছিলাম সাপের মাথার মতো করে ছদ্মবেশ ধরতে পারে বলে তারা বেঁচে যায়, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সাপের মাথার ছদ্মবেশ তেমন একটা কাজে আসছে না। বিজ্ঞানীরা সমস্যায় পড়ে গেলেন। কোনো শুঁয়াপোকা বাড়তি একটা বৈশিষ্ট্য থেকে যদি বাড়তি কোনো সুবিধা নাই পায় তাহলে ঐ বৈশিষ্ট্য কীভাবে বিবর্তিত হল? টিকে থাকার ক্ষেত্রে কাজে না আসলে তো এরকম হবার কথা ছিল না।

চিত্রঃ মনগড়া আকৃতির শুঁয়াপোকা। শুধু রঙে আর চোখ ছাড়া কোনোটাই স্বাভাবিক নয়।

বিজ্ঞানীরা ধরে নিলেন তাদের করা পরীক্ষার মাঝে কোথাও ত্রুটি রয়ে গিয়েছে। তারা কিছু একটা মিস করেছে। এই অসম্পূর্ণতা দূর করতে হবে।

একটা ব্যাপার, তারা পাখিদের দিক থেকে ব্যাপারটা খতিয়ে দেখেননি। দেখেছিলেন শুধুই শুঁয়াপোকার দিকটা, প্রথমে কি পরিমাণ শুঁয়াপোকা গুনেছিলেন আর পরে কি পরিমাণ  বাকি রয়েছে এসব। এই ফাঁকা স্থানটা পূরণ করতে তারা আরেক কানাডীয় বিজ্ঞানী ড. স্কেলহর্ন এর সাথে মিলে টিম গঠন করেন, যিনি নিউক্যাসল ল্যাবরেটরিতে প্রাণীজগতের ছদ্মবেশ নিয়ে কাজ করেছেন।

তারা আরও কয়েক রকমের প্যাস্ট্রি শুঁয়াপোকা তৈরি করেন। তবে এই যাত্রায় তারা এগুলোকে গাছের ডাল-পাতায় স্থাপন করেননি। এর বিকল্প হিসেবে এদেরকে পাখির বাচ্চার সামনে উপস্থাপন করলেন।

এবারে পরীক্ষাটা হবে অন্যরকম। এই বাচ্চারা ছোট, এর আগে কখনো সাপ দেখেনি। যখন তাদের সামনে সবুজ রঙের নলাকার প্যাস্ট্রি দেয়া হয় তখন তারা আগ্রহভরে সেগুলো খেতে থাকে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা যদি নলাকার বস্তুগুলোতে চোখের চিহ্ন দিয়ে দেয় তাহলে পাখির ছানারা এর থেকে দূরে থাকে। সিদ্ধান্ত আগের গবেষণার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, সাপের মাথার মতো ছদ্মবেশ পাখির ছানাকে খুব একটা ভীত করে তোলে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা দেয় চোখের উপস্থিতি।

কিন্তু পরীক্ষাটা এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। পরের দুই দিন পর্যন্ত তারা বেশ কয়েকবার চোখওয়ালা নলাকৃতির নকল শুঁয়াপোকা উপস্থাপন করে গেল। শেষে ছানারা অনুধাবন করল চোখ ওয়ালা নল মূলত সুস্বাদু খাবার বৈ কিছু নয়।

ড. স্কেলহর্ন ও সাথের অন্যান্যরা সিদ্ধান্তে আসলেন, পাখিরা সাপের প্রতি বড় রকমের ভয় নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। তাদের বেলায় সাপের সম্পূর্ণ বিবরণ জানার দরকার নেই। উড়ে পালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেবার জন্য শুধু সাপের চোখ দেখলেই হবে। যেখানে মুহূর্তের মাঝেই খপ করে ধরে ফেলতে পারে একটা সাপ তার সাথে কি বিশ্বাস আছে। এর চেয়ে বেশি বেশি সতর্ক থাকাই শ্রেয়। ভুল হোক আর সঠিকই হোক সাপের চোখের মতো কিছু দেখলেই দৌড়। শুঁয়াপোকারা পাখিদের এই সাপের প্রতি ভয়ের দুর্বলতাটা কাজে লাগিয়ে শিকারী পাখিকে তাদের প্রতি নিরুৎসাহিত করে ফেলে। তাদের এই গবেষণার ফলাফল Behavioral Ecology জার্নালে প্রকাশ করেন ১৪ আগস্ট ২০১৫ তারিখে।[5]

এখন নাহয় একটা জিনিস গেল, পাখিরা উড়ে দূরে চলে যায় বলে বেঁচে যায় শুঁয়াপোকারা। কিন্তু পাখিদের আরেকটা তীক্ষ্ণ দিক রয়েছে, উপর থেকে বা দূর থেকেই কোনো কিছুকে সনাক্ত করার ক্ষমতা। পাখিরা এই কাজটা ভালো পারে। এই ভালো পারার দিকটা হিসাবে রেখে শুঁয়াপোকাকে বাঁচতে হলে এমন ভান ধরতে হবে যেন দূর থেকেও যেন বুঝতে না পারে এটা আসলে সাপ নয়, পোকা। সেই কারণেই সম্ভবত কানাডীয় সলোটেইল শুঁয়াপোকারা মাথা স্ফীত করার কৌশলে বিবর্তিত হয়েছে। মাথা স্ফীত থাকলে দূর থেকে সাপের মাথা ও পোকাকে আলাদা করতে বেগ পেতে হবে।[6]

এভাবেই প্রকৃতিতে সকল প্রাণীর মাঝে টিকে থাকার লড়াই চলে হরদম। শুঁয়াপোকারা নিজেদের টিকিয়ে রাখতে ব্যবহার করে ছদ্মবেশ আবার পাখিরাপ নিজেদের অস্তিত্বের নিরাপত্তার জন্যই অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে সাপের মতো কিছু দেখলেই শত হাত দূরে সরে যায়। উভয়েই নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য এমন করছে। দৃশ্যত অদৃশ্যত সকল প্রাণীই টিকে থাকার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করে চলে। আমরা মানুষেরাও।

 

তথ্যসূত্র ও নোটঃ

[1] সমকেন্দ্রিকতাঃ যখন একাধিক বৃত্ত একই কেন্দ্রকে ঘিরে বিকশিত হয় তখন ঐ বৃত্তগুলো হবে সমকেন্দ্রিক বৃত্ত। যেমন আমাদের চোখের মনি। খেয়াল করলে দেখা যাবে আমাদের চোখের কালো অংশটি কয়েকটি বৃত্তাকার স্তরে সজ্জিত। তাই বলা যায় আমাদের চোখের ঐ অংশটি সমকেন্দ্রিক।

https://en.wikipedia.org/wiki/Concentric

[2] দেখুন- আসিফ আহমেদ, আমায় ধরো ধরতে যদি পারো, জিরো টু ইনফিনিটি জুন ২০১৫ ও জুলাই ২০১৫ সংখ্যা।

[3] Carl Zimmer, Evolving a Defense, Mimics Save Themselves, The New York Times, http://nytimes.com/2015/08/25/science/evolving-a-defense-mimics-save-themselves.html

[4] Tom Hossie, Effects Of Eyespots And Body Colour On Caterpillar Survival, http://caterpillar-eyespots.blogspot.com/2012/06/bbc-nature-covers-my-eyespot-research.html

[5] John Skelhorn, Grace G. Holmes, Thomas J. Hossie and Thomas N. Sherratt, Multicomponent deceptive signals reduce the speed at which predators learn that prey are profitable, Behavioral Ecology (2015) doi: 10.1093/beheco/arv135

[6] Carl Zimmer, Evolving a Defense, Mimics Save Themselves, The New York Times, http://nytimes.com/2015/08/25/science/evolving-a-defense-mimics-save-themselves.html

লিখেছেন সিরাজাম মুনির শ্রাবণ

আমি শ্রাবণ, পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র। মাসিক বিজ্ঞান সাময়িকী জিরো টু ইনফিনিটিতে বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবে কাজ করছি। বিজ্ঞান পড়তে ভালো লাগে, বিজ্ঞান বিষয়ক ভাবনা চিন্তা করে আনন্দ পাই।

সিরাজাম মুনির শ্রাবণ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 48 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. রুহশান আহমেদ Reply

    ইন্টারেস্টিং লেখা, পড়তে পড়তে মনে পড়লো স্টিভেন মার্টিনের নতুন একটা বই আসছে কয়দিন পরে Cheats and Deceits: How Animals and Plants Exploit and Mislead। টু রিড লিস্টে রাখতে পারেন।

  2. আরাফাত রহমান Reply

    যাঁরা নিজেদের লুকিয়ে সুবিধা নেয় তাদের বলে বর্ণচোরা! ভয়ের কারণ হওয়ার দরকার নেই, ভীতিকর ভাব নিতে পারলেই হলো। এখন তাহলে প্রশ্ন আসবে সাপদের ভয় পাখিদের মধ্যে কিভাবে গেথে গেলো?

আপনার মতামত