আমাতো ডেরেক, ৩৯ বছর বয়সী সেলস ট্রেইনার ছুটি কাটাতে এসেছেন তার নিজ শহরে। এক সকালে তিনি তার দুই বন্ধু রিক এবং স্টার্ন- কে নিয়ে গেলেন এলাকার হেল্থ ক্লাবে। বন্ধুদের সাথে মজা করার এক পর্যায়ে ডেরেক সুইমিংপুলের পাটাতনে গিয়ে দাড়ালেন আর জাকুজিতে আরাম করতে থাকা রিক কে বললেন ফুটবলটা তার দিকে ছুড়ে দিতে, আর তখনই দুই বাহু প্রসারিত করে লাফ দিলেন। তার ইচ্ছা শুন্যে থাকা অবস্থায় বলটি ধরে ডিগবাজি খেয়ে পানিতে পড়া। কিন্তু হিসাবে ভুল হয়ে যায়, বল যায় ফসকে আর মাথাটা পড়ল কনক্রিটের মেঝেতে। তার মনে হল যেন মাথার উপর বোমা ফেটেছে। কান দিয়ে যে তরলের প্রবাহ অনুভব করলেন তার রং চিনতে আর ভুল হয়নি। বন্ধুরা ধরাধরি করে তাকে নিয়ে গেলেন হাসপাতালে। যাওয়ার পথে আর বার বার জ্ঞান হারালেন এবং বহু আজগুবি কথা বললেন যার মধ্যে নিজেকে পেশাদার বেসবল খেলোয়াড় দাবী করাও ছিলো।

তার এই দূর্ঘটনার প্রভাবে কানে কম শোনা, মাথা ব্যাথা, স্মৃতিভ্রম এসব স্থায়ীভাবে দেখা দিতে দুই সপ্তাহ সময় নিলেও সবচেয়ে নাটকীয় ফলাফলটি আঘাত পাওয়ার ৪ দিনের মাথায় দেখা দিলো। সেদিন বিকেলে বিশ্রাম শেষে তিনি গেলেন স্টার্নের বাড়িতে আড্ডা দিতে। কথার ফাঁকে তার চোখ গেল একটি পুরনো ইলেক্ট্রিক কিবোর্ডে। তিনি কখনোই কিবোর্ড দূরে থাক কোন বাদ্য যন্ত্রই বাজানো শেখেননি, শব্দের ব্যাকরণ সম্পর্কেও নেই কোন ধারণা। কিন্ত কিবোর্ড দেখে তার কি যেন হয়ে গেলো! তিনি পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন, তার আঙ্গুলই চাবিগুলো খুজে নিলো। তিনি বাজাতে শুরু করলেন, সুর নিয়ে খেলতে থাকলেন অভিজ্ঞ সংগীতজ্ঞের মত। কখনো দ্রুত কখনো ধীর, সুরের মোহনায় ডুবলেন-ভাসলেন, মাইনর টোন নিয়ে উড়তে উড়তে মেজরে দ্রবীভুত হলেন। যখন ডেরেক তার বন্ধুর দিকে তাকালেন, দেখা গেল সুরের মূর্ছনায় মূর্ছনা তার চোখে পানি এসে গেছে! তিনি ছয় ঘন্টা ধরে বাজিয়ে যখন সকালে তার বন্ধুর বাড়ি থেকে ফিরলেন, তখন তিনি যেন সম্পুর্ন ঘোরের মধ্যে। কি ঘটল তা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারনা নেই তার।

ধাতস্থ হবার পর তিনি শুরু করলেন ইন্টার্নেটে খোজাখুজি । খুব সহজেই খুজে পান টনি সিকোরিয়াকে, যিনি টেলিফোন বুথে কথা বলার সময় বজ্রাহত হন এবং এর পর পিয়ানো বাজানোতে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। অরল্যান্ডো সেরেল, যিনি ১০ বছর বয়সে বেসবল ব্যাটের আঘাত পান মাথায়, তাকে যেকোন তারিখ বললে মুহুর্তেই বলে দিতে পারেন সেটি সপ্তাহের কোন দিন। আলোঞ্জো ক্লেমন্স, তিনিও পাহাড় থেকে পড়ে মাথায় আঘাত পাওয়ার পর অসাধারন সব প্রাণিমুর্তি তৈরি করাতে নিজেকে আবিষ্কার করেন। এত এত উদাহরন পাওয়ার পর তিনি সত্যিকারের একজন এক্সপার্টের কথা জানলেন- ড্যারেন ট্রেফোর্ট।

ড্যারেন ট্রেফোর্টের সাথে যোগাযোগের পর তিনি আমাতোকে তার অবস্থার কথা জানালেন, “অ্যাকোয়ার্ড সাভান্ট সিন্ড্রোম”। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত উইসকন্সিনে মেডিকেল স্কুলের ড্যারেন ট্রেফোর্ট একজন সাভান্ট বিশেষজ্ঞ। প্রায় ৫ দশক ধরে তিনি সাভান্ট এবং অটিজম নিয়ে কাজ করছেন। মার্চ মাসে উইসকন্সিনের ফন্ড ডু ল্যাক হাসপাতালে এই সংক্রান্ত গবেষনার জন্য ট্রেফোর্ট সেন্টার খোলা হয়েছে। ট্রেফোর্টের ভাষায় কাউকে সাভান্ট তখনই বলা যাবে যখন তার কোন বিশেষ ক্ষমতা তার বাকী সব দক্ষতাকে ছাড়িয়ে যাবে, ঠিক খাপ খাবেনা। তার ভাষ্যমতে এখন পর্যন্ত ৫০ টি ঘটনা আছে যেখানে মাথায় আঘাত পাবার পর সেই ব্যাক্তি সৃষ্টিশীল কোন বিষয়ে অতিমানবিক পারদর্শীতে লাভ করেছেন।

এইতো গেল অ্যাকোয়ার্ড সাভান্ট সিনড্রোমের কথা। আরেক ধরনের সাভান্ট আছে, যাকে বলা হয় “কনজেনিটাল সাভান্ট সিন্ড্রোম”। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এতে আক্রান্ত ব্যাক্তিরা জন্ম থেকেই সাভান্ট। উদাহন হিসেবে চলে আসে কিম পিক এর নাম। যার ক্ষমতার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত হয়েছে টম ক্রুজ অভিনিত “রেইন ম্যান”। বাস্তবে কিমের কয়েক হাজার বই মুখস্ত পৃষ্ঠা নাম্বার সহ। আর তার আছে তথ্য ধারনের অসাধারন ক্ষমতা। যুক্তরাজ্যের স্টিফেন উইল্টশায়ারের কথা বলা যায়, যিনি হেলিকপ্টারে কোন একটি শহরে অনেক উচু দিয়ে উড়ে বেড়ান আর এর পর সাত দিন ধরে যা দেখেন তা আঁকেন। প্রতিটা গাছ, প্রতিটি জানালা একদম নিখুত আর বিস্তারিত। লেসলি লেমের কথাও বলা যায় যিনি জন্মেছিলেন ক্ষতিগ্রস্ত মস্তিষ্ক নিয়ে, তার আইকিউ ৫৮ কিন্তু তাকে যেকোন মিউজিক শুধু একবার শোনানো হলে তা অবিকল ভাবে বাজাতে পারেন, সেটা যত কঠিনই হোক। এটা একটা গুরুত্বপূর্ন ব্যাপার জন্মগত সাভান্টদের বেশিরভাগের মধ্যেই অটিজমে দেখা যায়, কিন্তু কিন্তু সবার নয়।

Rainman_poster

রেইনম্যান ছবির পোস্টার

সাভান্ট সিন্ড্রোম খুবই দূর্লভ একটি অবস্থা। সাভান্টদের পারদর্শীতা মূলত পাঁচটি ক্ষেত্রে দেখা যায়ঃ শিল্প, সংগীত, ক্যালেন্ডার গণনা, গণিত অথবা যন্ত্রসংক্রান্ত দক্ষতা। এসবের সাথে আরো রয়েছে অসাধারন স্মৃতিশক্তি, একবার শুনে অবিকল সুর সৃষ্টির ক্ষমতা এবং সিনেস্থেশিয়া। সাভান্ট সিন্ড্রমের সঠিক কারন এখনো কারো জানা নেই। রয়েল সোসাইটির একটি জার্নালে এলান স্নাইডার এবং জন মিচেলের প্রকাশিত প্রবন্ধে দাবী করা হয়, সবার মধ্যেই এই দক্ষতাগুলো রয়েছে! হ্যাঁ আপনার নিজের বুদ্ধিমত্তা এবং ক্ষমতা সম্পর্কে যতই অভিযোগ থাকুক, বিজ্ঞানীদের ধারনা আপনার মধ্যেও উপরে উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যগুলো রয়েছে কিন্তু সচেতন ভাবে আপনি সেগুলো ব্যবহার করতে পারছেন না। আমরা যা দেখি, যা শুনি সব কিন্তু আমরা মনে করতে পারিনা। কারন আমাদের মস্তিষ্ক বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যেসব তথ্য পরিবেশ থেকে সংগ্রহ করে তাকে পরিশোধিত করে তারপরে আমাদের ব্যবহার করতে দেয়। মস্তিষ্কের কিছু অস্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপের ফলে সাভান্টদের বিশেষ সুবিধা থাকে একদম অপরিশোধিত তথ্যভান্ডারে প্রবেশ করার, যেখানে “ধারনার” বাক্সে সাজানো ছাড়াই তথ্যগুলো থাকে। এই বিশেষ সুবিধা তাদের চিন্তাকে খুটিনাটি থেকে পুরো বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে সহায়তা করে। যেই খুটিনাটি তথ্য আমরা যারা সুস্থ(!) তারা অন্তর্দৃষ্টির কারনে কখনই অনুভব করতে পারিনা।

Left vs right brain

শিল্পীর চোখে মস্তিষ্কের বাম ও ডান বলয়ের পার্থক্য

যদিও সাভান্ট সিন্ড্রোমের সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে সাভান্ট দের মস্তিষ্ক নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা থেকে জানা যায় যে সহজাত হোক আর স্বোপার্জিত হোক বাম বলয়ের ত্রুটি এবং ডান বলয়ের ক্ষতিপুরনের প্রবণতা সাভান্ট দের মধ্যে বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানীরা এই পরিপূরক সক্রিয়তা ও নিষ্ক্রিয়তাকে ব্যাখ্যা করেছেন মস্তিষ্কের নমনীয়তা(Brain plasticity)র সাথে, যাতে মগজে নতুন নতুন নিউরাল সংযোগ তৈরি হয় নতুন কোন দক্ষতা অর্জনের সাথে সাথে। কিন্ত সাভান্টের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু আলাদা। বাম বলয় মূলত যৌক্তিক, আক্ষরিক এবং বোধশক্তিগত বৈশিষ্ট্যগুলোকে ধারন করে, এর কাজই হচ্ছে তথ্যের মধ্যে প্রতিমান(Pattern) অনুসন্ধান করা এবং পূর্বের অভিজ্ঞতার সাথে তার সম্পর্ক স্থাপন। অন্যদিকে ডান বলয়ে সৃষ্টিশীলতা, শিল্পচিন্তা, কল্পনা এসব সম্পন্ন হয়। আমাদের বাম বলয় আবার ডান বলয়কে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দমিয়ে রাখে। বাম বলয়ের বিশেষ অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবার কারনে, ডান বলয়কে দমিয়ে রাখার কেউ থাকেনা। যার ফলে ডান বলয় কোন বাধা ছাড়াই কাজ করতে পারে।

প্রশ্ন করতে পারেন, আমাদের সবারই যদি সাভান্টদের মত দক্ষতা সুপ্ত অবস্থায় থাকে, তাহলে তা কেন আমরা কাজে লাগাতে পারছিনা? ব্যপারটা হয়তো এমন হতে পারে যে- ধারনা সৃষ্টি হয়ে যাবার পর আমাদের কোন জিনিসের সব বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সচেতন হবার দরকার নেই। আমরা গাছের দিকে তাকালেই গাছকে চিনতে পারি, কারন গাছের ধারণা আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে প্রথিত হয়ে গেছে। গাছের প্রতিটা ডালপালা, পাতা-ফল আলাদা ভাবে চিহ্নিত করার দরকার পড়েনা। এই কারনেই আমরা পর্যাপ্ত শিক্ষন এবং চর্চা ছাড়া বাস্তবের মত দৃশ্য একে ফেলতে পারিনা। এই কৌশল আমাদের সিদ্ধান্ত নেয়াকে সহজ করে, বিশেষ করে যদি আংশিক তথ্য আমাদের থাকে। পরিচিত বস্তুগুলোর অংশবিশেষ দেখেই আমরা চিনতে পারি বস্তুটি কি। এছাড়াও এই কৌশল আমাদের শেখার গতিও বাড়ায়, সম্পর্কযুক্ত তথ্যগুলো অর্থপূর্ন মোড়কে সাজাতে না পারলে আমাদের মগজ তথ্যের ভারে ক্লান্ত হয়ে যেত। আর সাভান্টদের যত ভালো দক্ষতাই থাকুক, এটা কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা অস্বাভাবিক অবস্থা।

যেহেতু আমাদের সবার মধ্যেই সাভান্টদের মত দক্ষতা সুপ্ত অবস্থায় আছে এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারনে তা সক্রিয় হতে পারে, তাহলে কি এদের কৃত্রিম উপায়েও সক্রিয় করা সম্ভব? হ্যা সম্ভব। ইউনিভার্সিটি অব সিডনির সেন্টার ফর দ্যা মাইন্ড এর ডিরেক্টর এলান স্নাইডার বেশ কিছু এক্সপেরিমেন্ট করেছেন কৃত্রিমভাবে সাভান্ট দক্ষতা আরোপিত করার। প্রতিটা ক্ষেত্রেই কৌশল হিসেবে মস্তিষ্কের Left Anterior Temporal Lobe(LATL) এ মৃদু মাত্রায় Repititive Transcranial Magentic Stimulation(rTMS) ব্যবহার করা হয়েছে। এই rTMS প্রয়োগক্রিত অঞ্চলে অস্থায়ীভাবে নিউরাল কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়।

সঠিক প্রশিক্ষন ছাড়া বাস্তবের মত সুন্দর ছবি আঁকতে পারিনা। যদিও আমাদের মগজ চেনা কোন দৃশ্যের প্রতিটি অংশ বিস্তারিত ভাবে ধারন করে। কিন্তু আমরা সেই বিস্তারিত তথ্যগুলো আঁকার জন্য সচেতনভাবে ব্যবহার করতে পারিনা। আমাদের মস্তিষ্ক মূলত দৃশ্যটা কি অর্থ বহন কর সেটার প্রতিই বেশি সচেতন। কোন জিনিসের অর্থকে অস্পষ্ট করে দিলে এর খুটিনাটির প্রতি নজর দেয়া সহজ হয়, যেমন একটি মুখের ছবি আঁকা সহজ যখন তা উল্টিয়ে আঁকা হয়। ২০০৩ সালে এলান স্নাইডার ১১ জন মানসিক এবং শারীরিকভাবে সুস্থ মানুষকে ১৫ মিনিট ধরে LATL অঞ্চলে rTMS প্রয়োগ করেন। rTMS এর আগে, চলার সময়, শেষ হবার সাথে সাথে এবং ৪৫ মিনিট পরে এই চারটি পর্যায়ে ১ মিনিট করে সময় দেন নিজের স্মৃতি থেকে একটি ঘোড়া, কুকুর কিংবা পরিচিত কারো চেহারা আঁকার। ১১ জনের মধ্যে ৪ জনের অংকন দক্ষতায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। স্টিমুলেশন চলাকালে তাদের ছবির বিস্তারিত অংশগুলো সম্পর্কে দখল ছিলো আশ্চর্যজনক। ওনারা নিজেরাই পরে নিজেদের আঁকা চিনতে পারছিলেন না।

পরিচিত একটি ছত্রের মধ্যে থাকা ভুলগুলোকে ধরতে প্রায় সময়ই ধরা যায়না। আমাদের অর্থ চাপিয়ে দেবার প্রবণতা যেসব টুকরো অংশের কারণে অর্থ সৃষ্টি হয় তাদের সম্পর্কে আমাদের মনযোগকে দমন করে রাখে। স্নাইডার ওই আগের ১১ জনকে নিয়েই একই ভাবে প্রুফরিডিং এক্সপেরিমেন্ট করেন। rTMS ছাড়া ঐ এগারো জন বেশিরভাগ সময়েই কোন পরিচিত প্রবাদে একই শব্দ যেমন ‘The’ এর পাশাপাশি একাধিকবার বসাকে খেয়াল করেননি। এদের মধ্যে স্টিমুলেশনের পর দুইজনের বাড়তি শব্দগুলো ধরতে পারার সফলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এই দুইজন আবার আঁকার এক্সপেরিমেন্টেও অসাধারণ ফলাফল দেখিয়েছিলেন।

অনেকগুলো বস্তু কত সংখ্যায় আছে তা না গুণে সঠিকভাবে ধারনা করা সম্ভব না। হ্যা, যদি কম সংখ্যায় যেমন দুইটা, চারটা , পাঁচটা থাকে তাহলে হয়তো এক নজর দেখেই বলে দেয়া সম্ভব। তবে বিভিন্ন সময়ে অটিস্টিক সাভান্টদের এরকম ক্ষমতার কথা জানা গেছে, এই দক্ষতাকে বলা হয় নিউমারোসিটি(Numerosity)। প্রখ্যাত নিউরোলজিস্ট অলিভার স্যাকস তার বিখ্যাত বই “The Man Who Mistook His Wife for a Hat”-এ লিখেছিলেন এক অটিস্টিক জমজের কথা যারা তাৎক্ষনিক ও সঠিকভাবে বাক্স থেকে মাটিতে ফেলে দেয়া ম্যাচের কাঠির সখ্যাকে অনুমান করতে পারতো, তা সংখ্যায় একশর বেশি হলেও। এই ঘটনা স্নাইডারকে এ ধরনের একটি এক্সপেরিমেন্ট চালাতে উদবুদ্ধ করে। ১২ জনকে ব্যাক্তিকে নিয়ে তিনি এক্সপেরিমেন্টটি করেন, যাদেরকে স্টিমুলেশন দেয়ার পর মনিটরে ৫০ থেকে ১৫০ টি বিচ্ছিন্ন বস্ত দেখানো হয়। এদের মধ্যে ১০ জনের সঠিক সংখ্যক বস্ত অনুমান করার দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।

Numerosity Experiment

নিউমারোসিটি এক্সপেরিমেন্ট

প্রতিটা এক্সপেরিমেন্টেই কিন্তু মস্তিষ্কের একই অঞ্চল LATL কেই নিষ্ক্রিয় করা হয়েছিল। কেন? বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা গেছে Anterial Temporal Lobe বিভিন্ন শব্দ, ছবি, বস্তুর স্মৃতিধারণ এবং অর্থ নির্ণয়  সাথে গভীরভাবে জড়িত। এর বাম অংশ বিশেষভাবে শব্দার্থিক প্রক্রিয়া, ধারণাগত জ্ঞান এবং স্মৃতিকে শ্রেনীবিভাগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন। LATL নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে সেই ব্যাক্তি কোন বস্তুর নাম দেয়া কিংবা পূর্ব অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষমতা হারান এবং বস্তুর খুটিনাটি সম্পর্কে অনুস্মরনের ক্ষমতা অর্জন করেন। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে ওই অংশে rTMS প্রয়োগ করার পর অংশগ্রহনকারীরা অপেক্ষাকৃত জটিল বাগধারার অর্থ অনুধাবণ করতে ব্যার্থ হন। তাই স্নাইডার ধারনা করেন, এটাই হতে পারে কৃত্রিমভাবে সাভান্ট সুলভ দক্ষতা আরোপনের উপায়।

সাভান্ট সিন্ড্রোম শুধু জিন, নিউরনের সার্কিটসজ্জ্যা এবং মগজের গূঢ়তাই নয়- তার চেয়েও বেশি কিছু। এগুলো বৈজ্ঞানিক আগ্রহের বিষয় হলেও একজন ব্যাক্তি সাভান্ট এবং তার আসেপাশের মানুষজন, শিক্ষক, থেরাপিস্ট ও তাদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া মানবিক আগ্রহের বিষয় হিসেবে অনেক কিছু শিক্ষা দেয়। কারো সম্ভাবনা শুধু তার নিউরন এবং সিনাপ্স নয়। এর সাথে রয়েছে অনুপ্রেরনা, বিশ্বাস, সমর্থন ও আসেপাশের মানুষের ভালোবাসা । যেই মানুষগুলো শুধু একজন সাভান্ট নয় একজন মানুষকেও বাঁচিয়ে রাখেন। গত ১৫ বছরে সাভান্টদের সম্পর্কে আমরা যতটা জানতে পেরেছি, তা বিগত ১০০ বছরেও জানা যায়নি এবং এই জানার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় আমরা নিজেদেরকেও জানতে পারছি, জানতে পারছি আমাদের সীমাবদ্ধতা। সম্ভাবনাময় এক অনন্য সাভান্ট হয়তো আপনার লুকিয়ে আছে আপনার মাঝেই। তাকে খুঁজতে চান?

তথ্যসূত্রঃ
১। Darold A. Treffert; The savant syndrome: an extraordinary condition. A synopsis: past, present, future; Philosophical transactions of royal society 2009.
২। Allan Snyder ; Explaining and inducing savant skills: privileged access to lower level, less-processed information; Philosophical transactions of royal society 2009।
৩। Adam Piore ; WHEN BRAIN DAMAGE UNLOCKS THE GENIUS WITHIN ; Popular Science, 2013

লিখেছেন রুহশান আহমেদ

আমি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক কনটেন্ট তৈরির একজন স্বাধীন স্বেচ্ছাসেবক। শাবিপ্রবি থেকে জিন প্রকৌশল ও জৈব প্রযুক্তি বিষয়ে একটি স্নাতক ডিগ্রি বাগানোর চেষ্টায় আছি।

রুহশান আহমেদ বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 34 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    তোমার লেখার দারুণ উন্নতি হয়েছে। স্যাভান্ট নিয়ে লেখাটা খুব মজার লাগলো। আসলে মস্তিষ্ক খুব ভালো প্যাটার্ন চেনার যন্ত্র। সব তথ্যই যদি কাঁচা অবস্থায় দেখতে হতো তাহলে আমাদের আর অন্য কিছু করতে হতো না 😀

  2. মেহজাবিন হোসেন Reply

    চমৎকার লেখা।
    পড়তে পড়তে মনে যেসব প্রশ্ন জাগছিলো, আবার পড়তে পড়তেই তার উত্তর পেয়ে যাচ্ছিলাম।
    মস্তিষ্ক নিয়ে যতোই জানছি, ততোই কিছু জানিনা- মনে হচ্ছে।
    মস্তিষ্ক নিয়ে আরো লেখা পড়ার অপেক্ষায় থাকলাম 🙂

    • রুহশান আহমেদ Reply

      অনেক ধন্যবাদ। তারপরও যদি কোন প্রশ্ন থাকে তাহলে রেফারেন্সের আর্টিকেল গুলো দেখতে পারেন। ওগুলোও দারুন।

  3. সাবরিনা সুমাইয়া Reply

    হুম, বুঝলাম। একটা rTMS মেশিন পেলে বেশ হতো।

আপনার মতামত