পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণগুলো যেন যাদুর ছোঁয়া। তারা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে অতীতকে, যেমন কেন হ্যালির ধুমকেতু ৭৬ বছর পর পর আসে। আবার সাহায্য করে ভবিষ্যদ্বাণী করতেও, একেবারে মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি পর্যন্ত। তারা সম্ভাব্যতার সীমানা আরোপ করে যেমন ইঞ্জিনের কর্মদক্ষতায় এবং তারা এমনসব বাস্তবতার মুখোমুখি আমাদের দাড় করায় যা আমাদের কল্পনাতেও কখনো ছিল না, যেমন পরমাণুর ভেতরের শক্তি। গত শতাব্দীগুলোতে নতুন সমীকরণ নতুন যাদু নিয়ে পরের প্রজন্মকে অলংকৃত করেছে। বদলে দিয়েছে ইতিহাসের বাক। তেমনি ছয়টি সমীকরণ নিয়ে আজকের আলোচনা।

 

১. নিউটনের গতির দ্বিতীয় সূত্র (১৬৮৭)
030516_equations_1_0
► সহজ ভাষায়ঃ বল হচ্ছে ভর ও ত্বরণের গুণফল। নিউটনের অন্য দুটি সমীকরণ সমেত এই সমীকরণ চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের ভিত রচনা করেছিল। F = ma  পদার্থবিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের বলের মান গণনায় সাহায্য করে। যেমন, আপনার ওজন হলো আপনার ভর ও ত্বরণের গুণফল। এই সমীকরণ যান্ত্রিক যুগে পৌছতে অপরিহার্য ছিল। এটা আপনাকে বলে একটা ইঞ্জিনের গাড়িকে শক্তি জগাতে কতখানি ক্ষমতার দরকার, উড়ার জন্য বিমানের কত উপরে উঠতে হবে, রকেট পৃথিবীর বাঁধন মুক্ত হতে কতটা থ্রাস্ট দরকার ইত্যাদি।

 

২. নিউটনের সার্বজনীন মহাকর্ষ সূত্র (১৬৮৭)
030516_equations_2_1
► সহজ ভাষায়ঃ আমরা  পৃথিবীপৃষ্ঠের উপর থাকতে পারছি কেননা আমাদের গ্রহটা তুলামুলক বড় ও ভারী।

► যা আমাদের শিখিয়েছিলঃ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মহাবিশ্ব দুটো ভাগে বিভক্ত ছিলো পার্থিব ও আকাশস্থ। নিউটনের সূত্র পার্থিব ও আকাশের সব জায়গায় প্রয়োগ করা সম্ভব হলো। যেই ব্যাপারটার ফলে চাঁদ পৃথিবীকে ঘিরে ঘোরে। নিউটন আমাদের প্রথম প্রতিদিনকার জীবন ও স্বর্গীয় বস্তুর চলাচলের সরাসরি সংযোগ দেখালেন ।

► প্রয়োগঃ অনেকদিন ধরেই এই সমীকরণ গ্রহের কক্ষপথ গননায় ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। ১৯৫০ ও ’৬০ এর দশকে তা প্রথম ব্যবহারিক জগতে আসলো। যার মাধ্যমে কক্ষপথে স্যাটেলাইট ও চাঁদে মহাকাশচারীদের পাঠানো হতো। অবশ্য নিউটন স্বীকার করেছিলেন তিনি জানেন না ‘কেন’ মহাকর্ষ ঘটে। এর সমাধান বের করতে লেগেছিল প্রায় ২৩০ বছর। আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বে মহাকর্ষকে ব্যখ্যা করেছিলেন ভারী বস্তুর পতনের ফলে সৃষ্ট স্থানকালের বক্রতা হিসেবে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিউটনের ৩৩০ বছর পুরনো সূত্র দিয়েই কাজ চলে যায়।

 

৩. তাপগতিবিজ্ঞানের দ্বিতীয় সূত্র (১৮২৪)
030516_equations_3_1

► সহজ ভাষায়ঃ এন্ট্রপি (বিশৃঙ্খলার একটা পরিমাপ) সবসময়ই বাড়ে।

► যা আমাদের শিখিয়েছিলঃ ১৯ শতকে বাষ্প ইঞ্জিনের  কর্মদক্ষতা বিশ্লেষণের সময় ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী সাদি কার্নো বিজ্ঞান জগতের সবচেয়ে অন্তর্নিহিত এক সমীকরণ নিয়ে হাজির হলেন। এই সমীকরণ বলছে কিছু প্রক্রিয়া অপরিবর্তনীয়, এমনকি তা সময়ের বহমানতার জন্যও দায়ী। সবচেয়ে সহজ করে বললে- তাপ সবসময় উষ্ণ বস্তু থেকে শীতল বস্তুতে পরিভ্রমণ করে। এটিকে আরো বড় পরিসরে প্রয়োগ করা যেতে পারে। কেউ কেউ একে বর্ণনা করেছেন মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতিতে যেখানে সব নক্ষত্ররা পুড়ে শেষ হয়ে যাবে ও বিনাশিত তাপ ছাড়া কিছু থাকবে না।

► প্রয়োগঃ এই সমীকরণ শিল্প বিপ্লবের বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল! বাষ্প ইঞ্জিন থেকে দাহ্য ইঞ্জিন, রেফ্রিজারেটর থেকে রসায়ন প্রকৌশল, কোথায় নেই এর ব্যবহার। বাস্তব ইঞ্জিনে শক্তি সবসময় অপচয় হয় তাই এই সূত্র চিরন্তন গতিশক্তির যন্ত্রের কপালে পেরেক ঠুকে দিয়েছিল!

 

৪. ম্যাক্সওয়েল-ফ্যারাডে সমীকরণ (১৮৩১ ও ১৮৬৫)
030516_equations_4_0

► সহজ ভাষায়ঃ আপনি বিদ্যুতক্ষেত্র পরিবর্তন করে চুম্বক ক্ষেত্র বানাতে পারবেন। মানে বিদ্যুৎ ও চুম্বক আসলে একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত।

► যা আমাদের শিখিয়েছিলঃ ১৮৩১ সালে ফ্যারাডে দুটি প্রাকৃতিক বল বিদ্যুৎ ও চৌম্বকত্বের মধ্যে সম্পর্ক আবিষ্কার করেন, যখন নিকটবর্তী দুটি তারে বিদ্যুৎ দিয়ে চৌম্বক ক্ষেত্র পরিবর্তন করেন। পরে ম্যাক্সওয়েল ফ্যারাডের পর্যবেক্ষণকে বিদ্যুৎচৌম্বকত্বের চারটি সাধারণ সূত্র দিয়ে প্রকাশ করেন।

►প্রয়োগঃ এই সমীকরণ বিশ্ব-শক্তির যোগানে সহায়ক। বেশিরভাগ জেনারেটর যান্ত্রিক শক্তিকে চুম্বক ঘুরানোর মাধ্যমে কাজ করে। সাধারনভাবে বললে, এই সমীকরণ এখনো বিদ্যুৎ প্রকৌশল, যোগাযোগ প্রযুক্তি ও অপটিক্সের প্রায় সকল শাখাতেই ব্যবহৃত হয়।

 

৫. আইন্সটাইনের ভর-শক্তি সমীকরণ (১৯০৫)
030516_equations_5_2

► সহজ ভাষায়ঃ শক্তি হচ্ছে ভর ও আলোর বর্গের গুণফল।

► যা আমাদের শিখিয়েছিলঃ সমীকরণে ধ্রুবক থাকায় সামান্য ভরের পরিবর্তনের কারণে বিশাল পরিমাণ শক্তি নির্গত হতে পারে।

►প্রয়োগঃ আইন্সটাইনের সবচেয়ে বিখ্যাত সমীকরণে লুকিয়ে ছিল নিউক্লিয়ার ফিশনের ফলে বিশাল পরিমান শক্তি  লুকিয়ে থাকার ইঙ্গিত। দুটি নিউক্লিই এর সম্মিলিত ভর একটি বড় নিউক্লিই এর চেয়ে কম এবং হারিয়ে যাওয়া ভরটাই শক্তিতে পরিণত হয়। ‘Fatman’   পারমাণবিক বোমা জাপানের নাগাসাকিতে ফেলা হয়েছিলো ১৯৪৫ সালে। মাত্র এক গ্রাম ভরকে শক্তিতে পরিণত করা হয়, কিন্তু তা উৎপন্ন করেছিলো ২০,০০০ টন ট্রাইনাইট্রো টলুইনের বিস্ফোরণ!

 

৬. শ্রোডিঙ্গারের  তরঙ্গ সমীকরণ(১৯২৫)
030516_equations_6_1

► সহজ ভাষায়ঃ এই সমীকরণ বলে কীভাবে কণার তরঙ্গ এর গতিশক্তি থেকে নির্ণয় করা যায়। এটা নিউটনের F = ma  এর কোয়ান্টাম সংস্করণ।

► যা আমাদের শিখিয়েছিলঃ যখন শ্রোডিঙ্গার ১৯২৫ সালে এই সমীকরণ প্রস্তাব করেছিলেন, তখন তা কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের নতুন তত্ত্ব স্থাপন করে যা পদার্থবিজ্ঞানীদের কণা কীভাবে চলাচল ও মিথস্ক্রিয়া করে সেই গণনায় সাহায্য করেছিল।

►প্রয়োগঃ সহজে বললে, এই সমীকরণ পরমাণুর গঠন বর্ণনা করে। যেমন নিউক্লিয়াসের পাশে ইলেক্ট্রনের গঠন ও সব রাসায়নিক বন্ধনের গঠন। আরো নির্দিষ্ট করে বললে এই সমীকরণ কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অনেক  গণনা ও বেশিরভাগ আধুনিক প্রযুক্তি  যেমন লেজার থেকে ট্রাঞ্জিস্টরের ভিত্তি! তাছাড়াও কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের চালিকাশক্তি এটি।

লিখেছেন আহম্মদ উল্লাহ ফয়সাল

আমি ফয়সাল, পড়ছি ঔষধবিজ্ঞান নিয়ে । বিজ্ঞানের প্রতি আন্তরিক টান রয়েছে। বিজ্ঞান নিয়ে যা জানি তা অন্যদেরও জানাতে ইচ্ছে হয়। বিশ্বাস করি বিজ্ঞানের চাবি দিয়ে আমরা মানবজাতিরা খুলতে পারবো মহাবিশ্বের সব রহস্যের দরজা।

আহম্মদ উল্লাহ ফয়সাল বিজ্ঞান ব্লগে সর্বমোট 2 টি পোস্ট করেছেন।

লেখকের সবগুলো পোস্ট দেখুন

মন্তব্যসমূহ

  1. আরাফাত রহমান Reply

    সংক্ষেপে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া গেল। এর সাথে সাথে একটু ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত থাকলে ভালো হতো। আকাশ থেকে একটা সূত্র পড়ে সবকিছু বদলে দিলো ঘটনা নিশ্চয়ই এমন ছিলো না 🙂

  2. আহম্মদ উল্লাহ ফয়সাল Reply

    স্বীকার করছি দেয়া উচিত ছিলো। তবে সমীকরণগুলো কি বলে ও কিভাবে পৃথিবীতে বিপ্লব ঘটিয়েছিল তার উপর জোর দিয়েছি। কেননা ছোটদের বলতে শুনি, আচ্ছা ফিজিক্সের এত সমীকরণ পড়ছি বাস্তবে এগুলো কি আদৌ কাজে লাগে ! সেটা মাথায় রেখে সমীকরণের বাস্তব জগতে ব্যবহারের নমুনা দিয়েছি। তবে ২ ও ৪ নং সমীকরণের ইতিহাসের প্রেক্ষাপট টা কিছুটা কিন্তু বলেছিলাম।

  3. প্রসূন ঘোষ রায় Reply

    আইন্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটির সূত্রটা ও মনে হয় এইখানে সংযুক্ত করা যেত । এত মিসটোরিয়াস কোন সূত্র এখনো আবিষ্কার হয়েছে বলে আমার মনে হয়না । 🙂

আপনার মতামত